উৎসবের মরশুমে শুশুনিয়া পাহাড়

ড. রুচিরা চন্দ

আপনি যদি কলকাতাবাসী হন, আর উৎসবের মরশুমে কলকাতা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার মধ্যে কোনও মাহাত্ম্য খুঁজে না পান; তবে এই লেখা বিশেষভাবে আপনার জন্য। আমরা যারা, পুজোর আনন্দ, উত্সবের মেজাজ ইত্যাদি একেবারেই মিস করতে চাই না; তারা কিন্তু আবার কখনও কখনও গড্ডালিকা প্রবাহে না ভেসে একটু অন্যরকম করেও দেখে নিতে চাই সবকিছু। আর এই নতুন আনন্দের পরিমাপক আপনি অবশ্যই পেয়ে যাবেন লাল মাটির দেশে।

বাঁকুড়া মানেই লাল মাটি, টিলা পাহাড়, ভাস্কর্য নির্মাণের পীঠস্থান। আর পুজোর সময় কাশফুলের আতিশয্যে, সজীব প্রকৃতির আলতো দোলায় সে হয়ে ওঠে আরও মায়াময়। কলকাতার হাজার হাজার পুজোর ভিরে কখনও যদি একঘেয়ে লাগে, তাহলে আপনি নিজেকে নিজের মতো করে পেতে, আনন্দ উত্সবের পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে আলাপ জমাতে চলে আসতেই পারেন শুশুনিয়া পাহাড়ের একেবারে কোলের কাছে। মা সিংহবাহিনী এখানেও আপনাকে স্বাগত জানাবেন।

আরও পড়ুন­: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)

বাঙালি, আর ঘুরতে ভালোবাসেন না; তাহলে আপনি অন্য গ্রহের প্রাণী। সেইজন্যই বলছি এখানে আপনি পেয়ে যাবেন এক আশ্চর্য ট্যুর প্যাকেজ। না না কোনও ব্যবসায়ী নয়, এই প্যাকেজ আপনাকে নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। পাথুরে পথ ধরে পায়ে পায়ে চলে আসতেই হবে শুশুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশে। পেয়ে যাবেন পাহাড়ের গায়ে দুর্গাবাড়ির হদিশ। যেখানে নিষ্ঠা সহকারে পুজোর কাজে ব্যস্ত পুরোহিত। আর ঠিক তখনই আপনি বুঝতে পারবেন কলকাতার চাকচিক্য, জৌলুস, খরচের আধিক্য এখানে নেই। কিন্তু আচার পালন, মানুষের ভক্তি, দেবী আরাধনাকে এক অন্যতর মাত্রা দিয়েছে। একই পরিসরে রয়েছে কালী ও শিব মন্দিরও। আর আছে প্রাকৃতিক প্রস্রবন। একই স্থানে। পাশেই ট্রেকিং রুট। পাহাড় অভিযানের হাতেখড়িও হয়ে যাবে আপনার।

স্থানীয়দের কাছে জানতে পারবেন  এই মন্দির চত্বর খুব বেশি পুরনো নয়। বছর বারো আগের। শ্রীগোপীনাথ মহারাজ এর প্রতিষ্ঠাতা। বোধন থেকে শুরু করে সপ্তমী পুজো, অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, নবমীর প্রতীকী বলি অথবা দশমীর সকাল সকাল দেবীর যাত্রা এবং ঘট বিসর্জন এ সবই আপনাকে আচ্ছন্ন করবেই, দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি।

আরও পড়ুন: উত্তরবঙ্গের বনদুর্গা

জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের পাদদেশে আপনি আরও দেখতে পাবেন শিল্পী গ্রাম। হদিশ পাবেন ভারী ভারী পাথর কেটে কীভাবে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেই অজানা তথ্যের। আর আপনি যদি আরও একটু বেশি কৌতূহলী হন, তবে পাহাড়ের চড়াই বেয়ে বেশ খানিকটা উপরে উঠে আসলেও আপনার কানে পৌঁছবে মন্দিরের দুর্গা-ধ্বনি। পাহাড়, বনাঞ্চল, ভাস্কর্য, প্রকৃতি, শিল্প, সৌন্দর্য এইসব কিছুর হাতছানি না এড়িয়ে একবার চলেই আসুন শুশুনিয়ায়, পুজোর সময়। লাল মাটির দেশ, সাদা কাশ, সবুজ পাহাড় সবাই আপনার অপেক্ষায়। সঙ্গে আছেন মা।

রাঢ় বঙ্গের শক্তি আরাধনার ইতিহাস যদিও সুপ্রাচীন, তবু নিয়ম নিষ্ঠা আর ভক্তি নিবেদনের পবিত্রতা চিরন্তন। গ্রামের মানুষ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ডালায় চিঁড়ে, মোয়া, কিছু মরশুমি ফল নিয়ে দেবীর আরাধনা করে। হয়তো আড়ম্বরের খানিক অভাব আপনি দেখতে পাবেন, কিন্তু পারিবারিক বন্ধন, নির্ঘণ্ট মেনে অধিক রাতে অন্ধকার, নির্জনতা সবকিছুকে অবলীলায় অতিক্রম করে যখন মানুষ পৌঁছে যায় মায়ের দরবারে; মা কী তখন পারেন মুখ ফিরিয়ে নিতে! পুজো দিয়ে ফেরার পথে কিছু অস্থায়ী দোকান থেকে আপনি সংগ্রহ করতেই পারেন ঘরকন্নার কিছু টুকিটাকি পাথরের জিনিস অথবা দেবদেবীর মূর্তি। নিঃসেন্দহে যা আপনার সর্বাঙ্গীন সুন্দর বসার ঘরের শোভা বাড়াবে।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ (নবম পর্ব) – জব্বলপুর

শুশুনিয়ার সবচেয়ে কাছের স্টেশন ছাতনা। রূপসী বাংলা, আরণ্যক, চক্রধরপুরে ছাতনা। আসানসোল, রানিগঞ্জ, দুর্গাপুর দিয়েও আসতে পারেন। গাড়িতে দুর্গাপুর হাইওয়ে দিয়ে দুর্গাপুর হয়ে মেজিয়া দিয়ে সোজা শুশুনিয়া। আর একটা কথা, দশমীতে সিঁদুর খেলতে ভুলবেন না যেন। কপালে সিঁদুরের ত্রিশূল এঁকে আপনিও মায়ের কৈলাস যাত্রার শরিক হবেন নিশ্চিত।

বাঙালির সবচেয়ে বড় উত্সব দুর্গাপুজোর নানান বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবী জুড়ে। একবার না হয় এই অখ্যাত প্রায় নিভৃতে থাকা দুর্গা বাড়ির শাক্ত পুজোর রঙে রাঙিয়ে তুলুন আপনার মন। ইচ্ছেমতো ঘুরে আসুন বনানী মাঝে। শহরের ক্যাঁচ-ক্যাঁচ থেকে পালিয়ে দুর্গা নামে কান শুদ্ধ করে খানিক চিন্তাহীন একলা প্রহর, কেবল নিজের সঙ্গে; নিজের মতো করে, নিজের নিয়মে। পাশে পাবেন বাঙলার আদি বাসিন্দাদের। মেতে উঠতেই পারেন তাদের সুরে, ছন্দে, ধামসার তালে।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ বৃত্তান্ত (অষ্টম পর্ব) – কানহা ন্যাশনাল পার্ক

সঙ্গে অবশ্যই ঘুরে আসুন তপোবনে। ছোট্ট একটা টিলা, কড়োর পাহাড়। মাথায় পার্বতী মন্দির। বাঁধানো শ’খানেক সিঁড়ি। উপর থেকে দূরের মেজিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত আরামসে দেখা যায়। হাওয়ার দাপট আরও একবার মনে করিয়ে দেয় আমরা সমতল থেকে অনেকটাই উপরে আছি। শুশুনিয়া থেকে ৩০ কিমির  দূরত্বে কাপিষ্ঠা গ্রামের প্রান্তে এই পাহাড়। এখনও অনলাইন মাধ্যমের আলোচনার বাইরে এইসব জায়গার অকর্ষিত সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। সন্ধ্যায় দূরের একলা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবনের মন্দিরের মিটিমিটি আলোক মালা আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানেই রয়েছে বহু পুরনো বাঁধ গাংদোয়া। শীতের পিকনিকের মরশুম বাদে প্রায় জনশূন্য। সেচ বিভাগের একটি মাত্র অরক্ষিত পান্থনিবাস। তবে আপনি মজা পাবেন গাজর, তরমুজ, কলার আকারের বসার জায়গা দেখে। পাহাড়ে ঘেরা সুদূর প্রসারী শান্ত জলভূমিতে পড়ন্ত সূর্যের ছায়া আপনি উপভোগ করবেন। পুজোর ভ্রমণ সঙ্গে পুজো দেখা, মানে রথ দেখা কলা বেচার পূর্ণতা আর কি।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (৭) – পাঁচমারি

শেষে মিষ্টিমুখ কিন্তু আবশ্যক। তার জন্য রয়েছে বাঁকুড়ার মণ্ডা, ছাতনার প্যাঁরা বা ম্যাচা সন্দেশ। পুজোর আনন্দ রসনা তৃপ্তিতেই বোধহয় সম্পূর্ণ হয়। পাহাড়ি ঝোরায় পা ডুবিয়ে বসে এক কাপ কফি খেতে খেতে মনে পড়তেই পারে সুমনের ‘এক কাপ চা’-এর কথা। তাহলে আর দেরি না করে মনের মানুষকে সঙ্গী করে বেড়িয়ে পড়ুন। কিছু জানা, কিছু অজানা, কিছু জানাকে আবার নতুন করে চিনে নিতে।

ছবি লেখক

লেখক সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, তেহাট্টা সদানন্দ মহাবিদ্যালয়

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *