তামিল পত্রিকা ‘বিবেকচিন্তামণি’

সুশোভন রায়চৌধুরী

তামিল সাংবাদিকতার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়। প্রথম দিকের তামিল পত্র-পত্রিকায় ধর্মীয় প্রচার মুখ্য হলেও ধীরে ধীরে, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতি জায়গা করে নিয়েছিল তামিল পরিসরে। তামিল সাময়িকপত্রের আত্মপ্রকাশ রিলিজিয়াস ট্র‍্যাক্ট সোসাইটি কর্তৃক ১৮৩১ সালে হলেও ধর্ম সর্বস্বতাকে এড়িয়ে পরিপূর্ণ পত্রিকা বলতে আমরা যা বুঝি, তা ফাদার পার্সিভালের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দীনবর্তমানী’। তবে আমাদের আলোচ্য বিষয় ১৮৯২-তে প্রকাশিত সি. ভি. স্বামীনাথ আইয়ার সম্পাদিত পত্রিকা ‘বিবেকচিন্তামণি’। 

সম্পাদক স্বামীনাথের জন্ম ১৮৬৩ সালে, তামিলনাড়ুর তিরুভাইয়ারুতে। তাঁর পরিবার সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না শুধু এটুকু ছাড়া যে, তাঁরা একসময় খুবই প্রভাবশালী ও বিত্তবান হলেও যেকোনও কারণেই হোক তাঁদের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁর বাবা ভেঙ্কটরামা আইয়ার নিদারুণ অর্থাভাবের মধ্যেও তাঁর সন্তানের শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনও কার্পণ্যই করেননি। স্বামীনাথ তাঁর স্কুল শিক্ষা কুম্বাকোনাম থেকে শেষ করেছিলেন। 

সাংবাদিকতার সঙ্গে স্বামীনাথের যোগসূত্র নিছক কাকতালীয়। ১৮৮৫ সালে তামিলনাড়ুর রাজধানী মাদ্রাজে ‘দ্য হিন্দু’ দৈনিকের তৎকালীন মালিক ও প্রকাশক জি. সুব্রমনিয়া আইয়ারের সঙ্গে পরিচয় হয় স্বামীনাথের। সুব্রমনিয়া তাঁর তিন বছর আগে থেকেই ‘দ্য হিন্দু’ বাদে অপর একটি আঞ্চলিক দৈনিক ‘স্বদেশমিত্রম’ প্রকাশ করছেন। একসঙ্গে দু’টি সংবাদপত্র চালানোর চাপ তিনি সামলাতে পারছিলেন না। ফলে মনে মনে ‘স্বদেশমিত্রম’ চালানোর মতো একজন যোগ্য মানুষের সন্ধানে ছিলেন। স্বামীনাথকে দেখেই তাঁর পছন্দ হয় ও ‘স্বদেশমিত্রম’-এর দায়িত্ব সঁপে দেন। পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে সুব্রমনিয়া আইয়ারের নাম ছাপা হলেও অলিখিতভাবে এই পত্রিকার সম্পূর্ণ দায়িত্বই সামলাতেন স্বামীনাথ আইয়ার। প্রায় দশ বছর তিনি এই পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেখান থেকে পাওয়া সম্পাদনার অভিজ্ঞতা তিনি পরবর্তীতে কাজে লাগান ‘বিবেকচিন্তামণিতে’। 

এটা ছিল এমন একটা সময়, যখন তামিলনাড়ুতে গড়ে উঠছে বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি কেন্দ্রিক সংগঠন। যেমন— ট্রিপলিকেট লিটারারি সোসাইটি এবং মাদ্রাজ হিন্দু রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশন গড়ে উঠেছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে। ১৮৮০-তে বি. সুব্রমনিয়া আইয়ার ও এম. ভিরারাঘবচারিয়ার স্থাপন করেন ‘সোসাইটি ফর দ্য ডিফিউশন অফ ইউজফুল নলেজ’। এই সংগঠনের কাজ ছিল তামিলভাষীদের মধ্যে শিক্ষা ও রাজনীতির প্রসার ঘটানো। যদিও সংগঠনের আয়ু খুব বেশিদিনের ছিল না। মাত্র দশ বছরের মাথায় ১৮৯০-তেই বন্ধ হয়ে যায় এর যাবতীয় উদ্যোগ। সংগঠন বন্ধ হলেও এর আদর্শ ও নীতি প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল স্বামীনাথ আইয়ারকে। যার ফল, ১ মার্চ, ১৮৯২-তে তিনি স্থাপন করেন ‘ডিফিউশন অফ নলেজ এজেন্সি’। এই এজেন্সির কাজ ছিল মানুষকে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলা, যে উদ্যোগকে মাথায় রেখে তিনি প্রকাশ করেন মাসিক পত্রিকা ‘বিবেকচিন্তামণি’, মে, ১৮৯২-তে। 

আরও পড়ুন: সেইসব স্মৃতিধর

এই পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা হত ৩২ পৃষ্ঠার। বিষয় হিসেবে স্থান পেত বিজ্ঞান, ছাত্রদের নীতিকথা ইত্যাদি। দ্বিতীয় সংখ্যাতেই দেখা গেল শিশুদের জন্য স্বতন্ত্র একটা বিভাগ তৈরি করা হয়েছে, যা সেই সময়ের তামিল সাময়িকীর ইতিহাসে ছিল বিরল। এছাড়াও ছিল মেয়েদের জন্যে আলাদা বিভাগ। পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তামিল সাহিত্য ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক। আধুনিক তামিল সাহিত্যের তৃতীয় উপন্যাস, তরুণ লেখক বি. আর. রাজম আইয়ারের ‘কমলাস্বল চরিত্রম’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে ‘বিবেকচিন্তামণি’র পাতায়। ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৩ থেকে জানুয়ারি ১৮৯৫ সংখ্যায় ক্রমাগত প্রকাশিত হয়েছিল এই উপন্যাস। ঠিক তার পরের বছর স্বামীনাথ আইয়ার উপন্যাসটিকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। ১৮৯৫ থেকে এ. মাধবিয়া-র উপন্যাস ‘সাবিত্রী চরিত্রম’ প্রকাশিত হয় ধারাবাহিক রূপে। যদিও এই লেখাটি কোনও এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরবর্তীতে তাঁর ‘মুথুমিনাক্ষী’ উপন্যাসটি সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়েছে। ‘বিবেকচিন্তামণি’তে উপন্যাস ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে গ্রন্থ সমালোচনা ও দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা লেখকের তামিল অনুবাদ, যাঁদের মধ্যে মিলটন বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা উল্লেখযোগ্য। 

‘বিবেকচিন্তামণি’ সওয়াল করেছিল তামিলভাষা চর্চার সপক্ষে। যে কারণে তামিলভাষার সাহিত্যিকগুণ ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। এই পত্রিকাতেই ভি. জি. সূর্যনারায়ণ শাস্ত্রীয়ার ধারাবাহিকভাবে কলম ধরেছিলেন তৎকালীন তামিল কবি ও তাঁদের কবিতা বিষয়ক আলোচনা নিয়ে। এই পত্রিকাতে প্রকাশিত ধারাবাহিক রচনাটি সূর্যনারায়ণের মৃত্যুর পর ১৯০৩ সালে ‘তামিলপুলাভার চরিত্রম’ নামের গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। 

মজার বিষয়, সম্পাদক স্বামীনাথ আইয়ার তাঁর ‘বিবেকচিন্তামণি’র দু’টি আলাদা সংস্করণ প্রকাশ করতেন, স্কুলের লাইব্রেরি ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য শক্তপোক্ত হার্ড বাঁধাই সংখ্যা আর সাধারণের জন্য ছিল পাতলা কাগজের প্রচ্ছদ বিশিষ্ট সংখ্যা। ‘বিবেকচিন্তামণি’ যখন আত্মপ্রকাশ করে পত্রিকার দপ্তর ছিল সাইদর্জি লেনে, কিন্তু ১৯০৮ সাল নাগাদ এই ঠিকানা বদলে দপ্তর হয়ে দাঁড়ায় স্বামীনাথের বাড়ি, মায়লাপুরের অ্যাডাম স্ট্রিটে অবস্থিত ‘ললিতালয়’। 

আরও পড়ুন: স্ট্যান স্বামী নিজের সাক্ষাৎকারে যে সমস্ত কথাবার্তা বলেছেন, তা দেখলে মন একেবারে কষ্টে ভরে যায়: সমর বাগচী

স্বামীনাথের বাড়ির / পত্রিকা দপ্তরের নেমপ্লেট

ষাট বছর বয়সে পৌঁছে, স্বামীনাথ ‘বিবেকচিন্তামণি’ সম্পাদনার দায়িত্ব তুলে দেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সদানন্দ আইয়ারের হাতে। বছরটি ছিল ১৯১৭ অর্থাৎ পত্রিকার ২৫ বছর পূর্তি। সদানন্দ অবশ্য খুব বেশিদিন সম্পাদনা করতে পারেননি। কারণ ১৯২০-তেই বন্ধ হয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘বিবেকচিন্তামণি’। তবে স্বামীনাথের পুত্র হিসেবে সদানন্দ ভারতীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসে নিজের আসনকে চিরস্থায়ী করে গিয়েছেন। তিনি ১৯৩০-এর দশকে বম্বেতে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফ্রি প্রেস জার্নাল এজেন্সি’। ১৯৩৩-এ ড. পি.  ভারাদারাজুলু নাইডুর থেকে কিনে নেন খ্যাতনামা দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে। তিন বছর ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে’র মালিকানা সামলানোর পর বিক্রি করে দেন রামানাথ গোয়েঙ্কার কাছে। সদানন্দ ছিলেন ভারতের ‘প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া’র সাত জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অন্যতম। সদানন্দের সম্পাদনায় ‘বিবেকচিন্তামণি’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য না পেলেও, তাঁর বাবা স্বামীনাথ আইয়ারের সম্পাদনায়, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে, তাঁর ছোটগল্পের তামিল অনুবাদ। 

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *