তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ও ঔপনিবেশিক বাংলার ইতিহাসের অলিগলি

ড. মাল্যবান চট্টোপাধ্যায় 

বিশ শতকের বাংলা একটা পরিবর্তিত সমাজের কথা বলে। সেই পরিবর্তিত সময়ের কথা উঠে আসে সমকালের সাহিত্যে। কিন্তু সাহিত্য কি ইতিহাসের কথা বলে? বললে তা কতটা বলে? ইতিহাস ও সাহিত্যের মধ্যে যোগাযোগ প্রাচীনকাল থেকেই। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে ঐতিহাসিক অশীন দাশগুপ্ত বলেছেন যে, “ইতিহাস কোন না কোন ভাবে অতীতকে আশ্রয় করে। সেই অতীত থেকে ইতিহাস তথ্য সঞ্চয় করে। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমাজবদ্ধ মানুষের জীবন ব্যাখ্যা করে। ইতিহাস পুরোপুরি বিজ্ঞান হতে পারে না, কারণ ইতিহাসের তথ্য এবং বিজ্ঞানের তথ্য একরকম নয়। তাছাড়া সাধারণ নিয়ম তৈরি করতে গেলে যত তথ্য লাগে তার সামান্য অংশও ঐতিহাসিকের ভাগ্যে জোটে না। এ বাদেও অন্য একটি সমস্যা আছে। ইতিহাস মানুষের, কিন্তু ঐতিহাসিক মানুষের মনের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন না। সাহিত্য চিরকালই এই কাজটি করেছে, এখনও করে। সাহিত্যে যে-সত্যের প্রকাশ, ঐতিহাসিকের তা ঈর্ষার বস্তু। কিন্তু সাহিত্যিকের স্বাধীনতা ঐতিহাসিক স্বেচ্ছাচার বলে স্বেচ্ছায় বাদ দিয়েছিলেন। ইতিহাস ক্রমেই বিজ্ঞান ধর্মী হয়ে উঠেছিল। ইদানীংকালে ইতিহাসচর্চায় মানুষের মনের কদর বাড়ছে। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ভিত্তি করেই, ঐতিহাসিক মানসিকতার সন্ধান করছেন।” (অশীন দাশগুপ্ত, ইতিহাস ও সাহিত্য)।

আরও পড়ুন: যতীন দাস এবং ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯২৯

এই মনের সন্ধান করার ক্ষেত্রেই ইতিহাসের দরকার পরে সাহিত্যের। এখানেই গুরুত্ববহ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে ঔপনিবেশিক বাংলার সমাজের মননকে বোঝা যায়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ আগস্ট, ১৮৯৮- সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর একজন কথাসাহিত্যিক ছিলেন। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনি, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন লিখেছেন। এই বিশিষ্ট সাহিত্যিক রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। এসবের সঙ্গে তিনি নিরলসভাবে সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে চেয়েছেন কাব্যে কতকথাকে। তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে সমকাল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে যার নাম ছিল চৈতালী ঘূর্ণি। ১৯৩১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি একাধিক উপন্যাস লিখেছেন লক্ষ্য করার বিষয় হল, তারাশঙ্কর তাঁর উপন্যাসের মধ্য দিয়ে দেশকালকে ধরবার চেষ্টা করেছেন। তিনি ব্যক্তিজীবনের কথাকার নন, তিনি বিশাল জনপদ তথা মানব-ইতিহাস লিখতে চেয়েছেন। সারাজীবনে তিনি যা কিছু লিখেছেন, তা অনেকভাবেই জনজীবনের খসড়া। ঔপনিবেশিক বাংলার এক চালচিত্র মেলে তাঁর লেখনীতে।

আরও পড়ুন: ‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ গড়ার কারিগর: প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

চৈতালী ঘূর্ণি-তে স্পষ্টভাবে ঘটনাকাল দেশ করা না হলেও তারাশঙ্করের প্রথম পর্বের অধিকাংশ উপন্যাসের মতো এখানেও প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক সংকট এবং শহরমুখী মানুষ দ্বিধা-বর্ণনা থেকে ঔপন্যাসিকের ইতিহাসবোধের পরিচয় পাই। জমিদার-মহাজনের অত্যাচারে গ্রাম ছেড়ে গোষ্ঠ আমিনী আধ শহরে আশ্রয় নেয়। ধানকলে মজুরের চাকরি পায় গোষ্ঠ। উপন্যাসের শুরুতে গ্রামবাংলার হতশ্রী রিক্ততার যে-ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা দুর্ভিক্ষের ফল শুধু নয়, অনেকদিন থেকে এই পরিবর্তনের সূচনা তা তিনি উল্লেখ করেছেন বার বার, “সমস্ত গাঁটা যেন আবছা ধোয়াতে ছেয়ে গিয়েছে। নদীর ওপরেই শ্মশানের ছাই উঠছে… গাঁয়ের মাঝ থেকে একটা সাড়া নেই— যেন সব মরে গিয়েছে; আমার বুকখানা কেমন করে উঠল বাপু।’’ (চৈতালী ঘূর্ণি, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়)।

আরও পড়ুন: গোষ্ঠ পালের ইন্টারভিউ: স্মৃতিমেদুর রূপক সাহা

কিন্তু একইভাবে শহরে দু’মুঠো অন্ন জুটে যাবার সূত্রে মনুষ্যত্বের অবমাননা ঘটে কীভাবে, তাও তিনি লিখেছিলেন। তবে তারাশঙ্কর তার মধ্যেও পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন। চৈতালী ঘূর্ণি অবশ্যই সমাজ যে বদলাচ্ছে, তার ইঙ্গিত দেয়। যুগের ইতিহাস যিনি লিখছেন, তাঁকে যুগান্তরের স্বরপ সম্বন্ধে অবহিত হতেই হয়। চৈতালী ঘূর্ণি-র সঙ্গে ‘ধাত্রীদেবতা’-র (১৯৩৯) হয়তো প্রত্যক্ষ কোন যোগ নেই। তথাপি পরিবর্তশীল সমাজের সংঘাতের চিত্রের মধ্যে দিয়ে ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিভঙ্গির আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এখানে। মনে হবে যেন পূর্বের ঘটনা বহুল উপন্যাসের পরবর্তী অংশ এটি। তারাশঙ্কর তাঁর আত্মজীবনীতে যে-কালগত বোধের কথা বলেছেন, তার বিবরণ মিলবে আত্মজৈবনিক উপন্যাস ধাত্রীদেবতাতে, ”এমনি দ্বন্দ্ব সমারোহে সমৃদ্ধ লাভপুরের মৃত্তিকায় আমি জন্মেছি। সামন্ততন্ত্র বা জমিদারতন্ত্রের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দ্বন্দ্ব আমি দু’চোখ ভরে দেখেছি। সে দ্বন্দ্বের ধাক্কা খেয়েছি।” (ধাত্রীদেবতা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) ধাত্রীদেবতার শিবনাথ এর মধ্যে দিয়ে সেই সময়ের রাজনীতি সমাজ-ইতিহাসকেই উঠে আসতে দেখা যায়। শিবনাথের সমাজসেবা বা বিপ্লবী দলে যোগদান হয়তো যথার্থ কোনও পরিবর্তনের সূচনা করেনি, কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনের সময় তাঁর কারাবাস যুগান্তরের ইঙ্গিতবাহী। অন্যদিকে, নতুন ধনী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে জমিদারের বিরোধ উপস্থাপিত হয়েছে এখানে। বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের যে যোগ বিদ্যমান তা এখানে উঠে আসে। এই ঘটনার- সময়ের উল্লেখ তারাশঙ্করের মনে এবং উপন্যাসে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। রাঢ়ের গ্রাম সমাজের পরিবর্তনের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন বারবার তাঁর সাহিত্যে। কলের মালিক, কয়লাখনির মালিক আর আহমেদপুর-কাটোয়া ও নলহাটি-আজিমগঞ্জ শাখা-রেলপথ গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করে গ্রামের যে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বদল এসেছিল তা তিনি উল্লেখ করেছেন বারবার। এর বৃহত্তর তাৎপর্য খুজেছেন তিনি। ‘ধাত্রীদেবতা’তেই লেখক স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, “…পৃথিবীর সকল দেশে বিপ্লব ঘটিয়া চলিয়াছে, রাশিয়ায় স্বৈরাচারতন্ত্র নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল কালবৈশাখীর ঝঞ্ঝাতাড়নায়।” (ধাত্রীদেবতা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়)।

আরও পড়ুন: খাদ্য-আন্দোলন: শহিদ দিবস

এবার আসা যাক ‘কালিন্দী’-র আলোচনায়। ধাত্রীদেবতা এবং কালিন্দী (১৯৪০) মধ্যে রচনাকালগত ব্যবধান সামান্য। তবে এখানে জমিদার পরিবারের অন্তর্কলহ এখানে আরও তীব্র জটিল রপে ধারণ করেছে। জমিদারি মনোভাব প্রসঙ্গে এই উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র ইন্দ্র রায় বলেন যে, তাদের জমিদারির সনদ বাদশাহি আমলের আর বেগার ধরার অভ্যাস তাদের অনেক দিনের। এখানেই তাদের জমিদারি মনোভাবকে ভাষা দেন সাহিত্যিক ইন্দ্রের মাধ্যমে, ‘‘কেউ ছাড়তে বললেই কি ছাড়া যায়? বেগার আমরা চিরকাল ধরে আসছি, ধরব।’’ (কালিন্দী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়)।

এখানেই গ্রামের মধ্যে আসা নুতন আর্থিক শক্তি মিল মালিকের সঙ্গে জমিদারের বিরোধকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। নতুন আর্থিক শক্তি কীভাবে বদলে দিচ্ছিল গ্রামের আর্থিক জীবন? এই দিককে তিনি দেখেছিলেন খুবই কাছ থেকে। মিল-মালিক মুখার্জি সাহেবের সঙ্গে ইন্দ্র রায়ের ঝগড়া-বিবাদর তীব্রতা তাই কথা কাটাকাটিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, শেষপর্যন্ত মামলা হয়। মামলায় জমিদারপক্ষ পরাজিত হয়। এই পরাজয় যেন প্রতীকের মতোই, যা সময় বদলের ইঙ্গিত দেয়। এভাবেই যুগ বদলে যাওয়াকে কলমে তুলে ধরেছেন তিনি।

তারাশঙ্কর জানিয়েছেন যে, বিপ্লবী যদুগোপাল মুখোপাধ্যায় তাঁকে বলেছিলেন, গণদেবতা পড়ে তিনি চমকিত হয়েছিলেন। বিপ্লবীর মনে হয়েছিল যে, সাহিত্যিক বিপ্লবী কাজকর্ম খুবই স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। ‘গণদেবতা’ (১৯৪২)–তে বিপ্লববাদী যতীন প্রধান চরিত্র নয়। কিন্তু তার মধ্য দিয়ে লেখক অনাগত ভবিষ্যৎকেই বোধহয় প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধিকাংশ উপন্যাসের মতো ‘গণদেবতা’তেও বদলে চলা সময়ের ছবি অঙ্কন করার সচেতন প্রয়াস দেখা যাবে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা। যুদ্ধ যে কতটা বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, ওলোট-পালট করে দিয়েছিল আর্থিক স্থিতিটা কিছুটা উদ্ধৃতির নিরিখেই বোঝা যাবে।

“আঃ সেই তেরশো একুশ সালে যুদ্ধ আরম্ভ হইয়াছিল, যুদ্ধ শেষ হইয়া গিয়াছে পচিশ সালে; আজ তেরশো উনিশ সাল— আজও বাজারের আগুন নিবিল না। কঙ্কণার বাবুরা ধুলামুঠা সোনার দরে বেচিয়া কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আনিতেছে আর কালীপুরের জমি কিনিতেছে মোটা দামে। ধূলা বৈকি। মাটি কাটিয়া কয়লা উঠে— সেই কয়লা বেচিয়া তো তাহাদের পয়সা। যে কয়লার মণ ছিল তিন আনা, চোদ্দ পয়সা, আজ সেই কয়লার দর কিনা চোদ্দ আনা।” (গণদেবতা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়)।

এভাবেই যুদ্ধ-র সুযোগে ব্যবসা করে কীভাবে গ্রামবাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন ব্যবসায়ীরা এবং সনাতন জমিদাররা চলে যাচ্ছিলেন বিস্মৃতির আড়ালে (আর্থিক ও সামাজিকভাবে) তা তিনি দেখিয়েছেন। কয়লা আগেও ছিল, কিন্তু তাকে ব্যবহার করে ভাগ্য বদল করে জমিদারদের আর্থিক ক্ষমতাকেও যে প্রশ্নের মুখে ফেলা গিয়েছিল তা তিনি এই উপন্যাসে দেখিয়েছিলেন। সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন, বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে বাংলার অর্থনীতিকে প্রায় শেষ করে ফেলেছিল। তাঁর এই সমকাল বর্ণনা আমাদের মনে করাবে বিমল মিত্রের সাহেব বিবি গোলাম-এর কথা। যেখানে একইভাবে লক্ষ করা যাবে ব্যবসা করে ধনী হওয়া লোকজনের জমিদারদের টেক্কা দেবার কাহিনি।

টেক্কা দেবার কথা মিলবে আরেকটি উপন্যাসের মধ্যেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালকে স্পর্শ করে তাঁর এরূপ আরেকটি উপন্যাস মন্বন্তর। বিশ্বযুদ্ধের সময়ের মুদ্রাস্ফীতি, কালোবাজারি, কীভাবে স্থিতিশীলতাকে বদলে দিয়েছিল তা তিনি এখানেও দেখিয়েছেন। কিন্তু এইসব আর্থিক বদলের বাইরেও সমাজের নিচুতলার মানুষের মনে ও আর্থিক জীবনে যে বদল ঘটছে, তা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিরিখেই লিখে গেছেন। কেন তিনি এসব লিখেছেন? এর উত্তর খোঁজা যেতে পারে তাঁর জবানিতেই, ”১৯৪৩ সালের পূজা-সংখ্যায় বের হয়েছিল ‘মন্বন্তর’। মন্বন্তর প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলার আছে। আমার সাহিত্যকর্মের মধ্যে কালের বিবর্তনে সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে বিলীয়মান গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, বিশেষ ধারার ব্যক্তিত্ব একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। এসব আমার নিজের চোখে দেখা। ক্রমশ বিলীয়মান জমিদারশ্রেণী আমার সাহিত্যে খুব বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে।… জমিদার শ্রেণী ছাড়াও বেদে, পটুয়া, মালাকার, লাঠিয়াল, চৌকিদার, ডাকহরকরা প্রভৃতি যারা সমাজের বিশেষ অংশ জুড়ে ছিল তাদের নিয়ে গল্প রচনা করবার প্রেরণাই হোক বা অভিপ্রায়ই হোক আমার মধ্যে এসেছিল, বোধ করি এদের কথা অন্য কেউ বিশেষ করে আগে লেখেননি বা লেখেন না বলে। সামাজিক পেশার প্রভাবে এরা সচরাচর মানুষ থেকে স্বতন্ত্র ও অভিনব হয়ে ওঠে।’’ (আমার সাহিত্য জীবন, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়)।

গণদেবতা থেকে ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’— তাঁর সকল সাহিত্যেই এই প্রবণতা খুবই স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। এবার আসা যাক হাঁসুলী বাঁকের উপকথা-র কথায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস, যার মধ্যে দিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন ভাবনাগুলি একটি সংঘবদ্ধ রূপ পেয়েছে। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, এই উপন্যাসে বীরভূমের কাহার জনগোষ্ঠীর জীবনের কথা উঠে এসেছে। এই কাহারা মূলত ছিলেন নীলকরদের অধীনে কর্মরত মানুষ। নীলকরদের অত্যাচার এবং নিয়ন্ত্রণের পরবর্তীকালে তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন পালকি বাহক এবং অন্যান্য কাজে নিযুক্ত মানুষ। এদের জীবনের সঙ্গে জুড়ে থাকা বিভিন্ন ঘটনাকে তুলে ধরেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। এদের জীবনকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখতে পেরেছিলেন, তা তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছিলেন।

নীলকর সাহেবদের পরবর্তীকালে এরা তাদের আদিবাস বাঁশবাদি গ্রামেই থেকে যায় কিন্তু বদলে যেতে থাকে সমীকরণ। কোপাই নদীর হাঁসের গলার মতো জেবাক সেই বাকের তীরে থাকা এই গ্রামের কাহারদের জীবনযাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে লেখা লেখনীতে উঠে এসেছে আর সেখানে লেখক উল্লেখ করেছেন যে, কীভাবে তারা প্রথাগত পেশা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার সঙ্গে নিজেদের জুড়ে ফেলেছেন।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন উপন্যাসেই উঠে এসেছে বিভিন্ন মানুষের কথা, যারা আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের গোষ্ঠীগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। এই উপন্যাসে এ রকমই একটি চরিত্রের কথা তিনি বলেছেন, যার নাম করালী। এই মানুষটি রেলের গ্যাংম্যানের কাজ করত। আর সেই সূত্রে সে নিজের গোষ্ঠীগত পেশার থেকে কিছুটা সরে গিয়েছিল বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি এই মানুষটি নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে থাকা সংস্কার গুলিকে মানতে চাইত না। এই মানা না মানার মধ্যে দিয়েই উপন্যাসে একটা সংঘাতের বাতাবরণ ও লক্ষ্য করা যায়, যা আধুনিকতার গ্রামাঞ্চলের মধ্যে প্রবেশ করার সঙ্গে অনেকাংশেই যুক্ত। এখানে হেরে জাতে থাকে বনওয়াড়ির মানুষজন ও তাদের মূল্যবোধ।

এর পাশাপাশি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ কাহাদের এই বাঁশবাদি গ্রামের বাঁশঝাড়, ঐতিহ্যবাহী বটগাছ ও বনজ সম্পদ, প্রায় সবই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। তাই হাঁসুলী বাঁকের উপকথাগুলো বেঁচে থাকার পরিসরগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল যুদ্ধের বাতাবরণে। এভাবেই আধুনিক বিশ্বের চাপে পড়ে কীভাবে গ্রামবাংলা এবং গ্রামসমাজ পরিবর্তিত হয়েছে, তা আরও একবার এই উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে দেখিয়ে গেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। এই উপন্যাসেই করালী চরিত্রটির মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, কী করে গ্রামের প্রভাবশালী মানুষজন তাদের ক্ষমতার বিস্তার ঘটানোর ক্ষেত্রে বাধার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে এই করালী তার পূর্ববর্তী প্রজন্মের মতো গ্রামের উচ্চবর্গের মানুষের দমন-পীড়ন কখনোই মেনে নেয়নি বরঞ্চ প্রতিবাদ জানিয়েছে আর এই প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে একটা বদলে ইঙ্গিত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় দিয়ে গেছেন তাঁর উপন্যাসে। চন্দনপুর রেলস্টেশনের রেল কারখানায় কর্মরত এই করালি যেন কাহার সম্প্রদায়ের মধ্যে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছিল। পাশাপাশি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় খুব গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন, সেই সময় অর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের কথা। একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অত্যাচার এবং আর্থিক শোষণ, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির তথা রেলপথের হাত ধরে গ্রামজীবনের বদলে যাওয়ার কথা নতুন পেশার আবির্ভাবের কথা উল্লেখ করেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসে।

এই করালীর বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই লেখক দেখিয়েছেন যে আধুনিক পেশার হাত ধরে দরিদ্র নিম্নবর্ণের মানুষ নতুনভাবে সামাজিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কাহারদের মধ্যে থাকা প্রধান ও তাদের পুরনো ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধগুলো ক্রমেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল এবং সেই ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে ছিল আধুনিক পেশার সূত্রে এবং নতুন আর্থিক সমীকরণের সূত্র গুরুত্ববহ হয়ে ওঠা মানুষগুলি। এক্ষেত্রে বলা জরুরি যে, দেখা যাবে অন্যান্য উপন্যাসের মতো এখানেও তিনি দেখিয়েছেন যে, জমিদারি ব্যবস্থার হাত ধরে যারা এককালে গ্রামাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্রমে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে এবং এই উপন্যাসে সেটি চন্দনপুর রেলস্টেশন এর কাছে থাকা কারখানায় কাজের সূত্রে করলির আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার নিরিখেই প্রতীয়মান হয়।

সেই হাঁসুলি বাঁক…

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এটা খুব স্পষ্টভাবেই দেখিয়েছেন যে, যন্ত্রসভ্যতার হাত ধরে এই কাহার সম্প্রদায়ের মানুষজন মাটির থেকে অনেকটাই দূরে সরে গিয়েছিল। তারা চন্দনপুরের ঘুপচি রেল কোয়ার্টারে থাকা শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকেও তারা দূরে বালিভারা হাঁসুলী বাঁকের দিকে তাকায় তাকিয়ে ভাবে তাদের অতীত জীবনের কথা প্রকৃতি কেন্দ্রিক জীবনের কথা। এভাবেই তাঁর উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে সমকালের আর্থিক পরিস্থিতি রাজনৈতিক সমীকরণের বদল এবং বিশ্বে ঘটে চলা ঘটনাগুলির স্থানিক প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি উঠে এসেছে পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক গোষ্ঠীর কথা। যন্ত্রসভ্যতার হাত ধরে যারা নদীর কিনারের বাসস্থান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল রেল কোয়ার্টার্সের দিকে। আধুনিকতাকে এভাবেই তিনি দেখাতে চেয়েছেন।

A Look into the Man

অনেকগুলি স্তরে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বদলে যাওয়ার সময়কে দেখেছেন যেখানে জমিদারি ব্যবস্থার দাপট থেকে এই ব্যবস্থা বিলোপ সাধনের সময়কাল রয়েছে আর এই পরিবর্তনের ইতিহাসই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের উপজীব্য হয়ে উঠেছে, যা শুধু হাঁসুলী বাঁকের উপকথা বা গণদেবতা নয়, তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে। বদলে যাওয়া দিনের চিত্রকর হিসেবে তাই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন শুধু সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, ঔপনিবেশিক বাংলার অতীত কথক হিসেবেও।

সহায়ক গ্রন্থাবলি ও নিবন্ধ
● তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, রচনাবলী (গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও অন্যন্য সম্পাদিত) ১ম থেকে ৭ম খণ্ড, মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, ১৩৮৯ বঙ্গাব্দ।
● তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আমার সাহিত্য জীবন, পশ্চিমবঙ্গ  বাংলা আকাদেমি, ১৯৯৭।
● অশীন দাশগুপ্ত, ইতিহাস ও সাহিত্য, আনন্দ, ১৯৮৯। 
● Mahasweta Devi, Tarashankar’s World Of Changes And The New Order, Indian Literature, Vol. 12, No. 1, Sahitya Akademi, India, 1969। 
● বিকাশ শীল (সম্পাদিত), জনপদপ্রয়াস (পত্রিকা- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যা), ১৯৯৮।
● Sharada Ghosh, Tarashankar Bandyopadhyay’s Concept of Nature: The Context of “Hansuli Banker Upakatha, The Quarterly Review of Historical Studies, (April 2005 to September 2005 Nos. 1&2,Vol. XLV) The institute of Historical Studies, Kolkata, 2005.
● প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী (সম্পাদিত), ইতিহাস ও সাহিত্য: মুখোমুখি আয়নায়, আশাদীপ, ২০১৩।

লেখক আসানসোল গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • নবনীতা বসু

    খুব ভালো লাগল পড়ে।বিশেষত প্রথম উক্তিটি।তবে বেশ কিছু ভুল বানান ঠিক করতে হবে।সালসহ সাজিয়ে ইতিহাস ধরল সুন্দর হত।
    লেখকের সাফল্য কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *