তর্পণ তৃপ্তির তিল জল

অলক্তা মাইতি

মহালয়া মানেই ভোর ভোর চণ্ডীপাঠ। সারাবছরের ধুলো ঝেড়ে রেডিয়োর জেগে ওঠা। পুজোর শুরু। কিন্তু শুধুই কি এইটুকু? পিতৃপক্ষের অবসান ও মাতৃপক্ষের সূচনার এই দিনটার মাহাত্ম্য অনেক। মহাভারতে বলা আছে, মৃত্যুর পর কর্ণের আত্মা স্বর্গে অধিষ্ঠিত হলে তাঁকে খাদ্য হিসেবে শুধুই সোনা আর নানাবিধ রত্নসামগ্রী দেওয়া হয়। কর্ণ তো অবাক! খাদ্য নেই, জল নেই, শুধু সোনাদানা দিয়ে কী হবে? কৌতূহলী কর্ণ এর কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, জীবিতকালে দানবীর কর্ণ প্রচুর সোনাদানা, মণিমাণিক্য দান করেছেন কিন্তু কখনোই পিতৃপুরুষের উদেশ্যে জল বা খাদ্য দান করেননি। তাই জীবন অতিক্রান্ত হলে এই তাঁর কৃতকর্মের ফল তিনি এভাবেই ভোগ করবেন। এদিকে কর্ণ তো নিজের পিতৃপুরুষ সম্পর্কে বহুদিন ছিলেন অজ্ঞ। যুদ্ধের আগে আগেই মাতা কুন্তী তাকে তাঁর আসল পরিচয় জানিয়েছেন। তাই জল না দেওয়ার বিষয়টা ভুল হলেও সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। তাঁর অবস্থা বিচার করে দেবরাজ ইন্দ্র দিলেন ভুল সংশোধনের বিধান। মর্তলোকে গিয়ে ষোলো দিন কর্ণকে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে জল ও তিল প্রদান করতে হবে। সেইমতো কাজ করার পরই কর্ণের দোষ খণ্ডিত হল। এই ষোলো দিনই হল পিতৃপক্ষ। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথির পরে যে প্রতিপদ, সেই দিন থেকে আগামী অমাবস্যা অবধি চলে পিতৃপুরুষের প্রতি জলদানের এই ক্রিয়াপদ্ধতি। পিতৃপক্ষের শেষদিন অর্থাৎ অমাবস্যা তিথি, যাকে আমরা এখন মহালয়া বলেই চিহ্নিত করি, সেই দিনই পিতৃপুরুষকে জল দানের সবচেয়ে পুণ্যতিথি বলে মনে করা হয়।

মহাভারতের যুদ্ধে কর্ণ-অর্জুনের চরম সংঘর্ষের মুহূর্তটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু হিন্দু মন্দিরের দেওয়ালে খোদিত আছে। ঠিক যেমন আংকর ওয়তে। উপরেরটি বারোশো শতাব্দীর হয়সালেসওর মন্দিরের দৃশ্য।

সাধারণত বলা হয়, উত্তরায়ণের সময় দেবতারা সদা জাগ্রত থাকেন। উত্তরায়ণের সময় অতিক্রান্ত হলে দেবতারা নিদ্রিত হন। মহাভারতে ভীষ্মকে আমরা দেখি শরশয্যায় শুয়েও তিনি উত্তরায়ণের জন্য অপেক্ষা করেন। তাঁর আগে প্রাণ ত্যাগ করেন না। উত্তরায়ণের সময়কে শাস্ত্রে বলা হয়েছে আলোকময় অর্ধ। এই সময়কে চিহ্নিত করা হয়েছে সমস্ত রকম পুজাপাঠের উপযোগী সময় হিসাবে। কিন্তু উত্তরায়ণ অতিক্রান্ত হলে এই যে দক্ষিণায়ণের বিস্তীর্ণ সময়, এই সময় কিন্তু আদতে অন্ধকারময়। এই জন্য দুর্গাপুজোতেও দেখি অকালবোধনের ক্রিয়া। অসময়ে দেবীর ঘুম ভাঙানো হয়েছিল রাম-রাবণের যুদ্ধের আগে। এখনও দুর্গাষষ্ঠীর বিকেলে দেবীকে অকালবোধনের মাধ্যমেই জাগিয়ে তোলা হয়, অধিষ্ঠিত করা হয় বেলগাছের তলায়। এই দক্ষিণায়নের সময়ে বিভিন্নভাবেই দেখি পরলোকগত বিদেহী আত্মার স্মরণে বিভিন্ন আচার। কখনও তা পিতৃতর্পণ, কখনও দীপাবলির আগের চতুর্দশীতে চৌদ্দ বাতি জ্বালানো, আবার কখনও গোটা কার্তিক মাস জুড়ে প্রতি সন্ধ্যায় জ্বেলে রাখা আকাশ প্রদীপ। এই সমস্ত রকম কাজের মধ্যে দিয়ে আদতে আমরা যা করি, তা হল পরলোকপ্রাপ্ত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।

উত্তরায়ণের অপেক্ষায় শরশয্যায় ভীষ্ম

তর্পণ আসলে কী? এককথায় বলতে গেলে তৃপ্ত করার প্রয়াস। কী দিয়ে তৃপ্ত করা? এক অঞ্জলি জল ও তিল। এই সামান্য উপাদানেই তৃপ্ত করা সম্ভব। অন্তত তর্পণের বিধি তাই বলছে। জল এখানে রস ও তিল অন্ন বা শস্যের প্রতীক। নাভি সমান জলে দাঁড়িয়ে সাধারণত পূর্বমুখে তর্পণ করা হয়। তবে বৃষ্টির জলে তর্পণ নিষিদ্ধ। এমনকী তর্পণ করতে করতে বৃষ্টি এলেও মাথায় ছাতা ধরতে হবে। তর্পণের আগে আচমন, তিলক ইত্যাদি বিভিন্ন আচারের পালনের মাধ্যমে খানিকটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। তারপর তীর্থ আবাহন মন্ত্রে মাধ্যমে কুরুক্ষেত্র গয়া গঙ্গা প্রভাস ইত্যাদি পুণ্য তীর্থকে তর্পণ ক্ষেত্রে জাগ্রত করা হয়। এরপর শুরু হয় দেব তর্পণ। অঞ্জলি পূর্ণ জল নিয়ে উচ্চারণ করা হয়—

”ওঁ দেবা যক্ষাস্তুথা নাগা গন্ধর্ব্বাপ্ সরসোহসুরাঃ।
ক্রূরাঃ সর্পাঃ সুপর্ণাশ্চ তরবো জিহ্মগাঃ খগাঃ।
বিদ্যাধরা জলাধারা স্তথৈবাকাশগামিনঃ।
নিরাহারশ্চ যে জীবাঃ পাপে ধর্ম্মে রতশ্চ যে।
তেষামাপ্যায়নায়ৈতদ্ দীয়তে সলিলং ময়া।”

অর্থাৎ, দেব যক্ষ নাগগণ, গন্ধর্বগণ, অপ্সরাগণ, অসুরগণ, ক্রূর স্বভাবের জন্তু, সর্প, সুপর্ণ অর্থাৎ গরুড় জাতীয় পক্ষী, বৃক্ষসকল, সরীসৃপ, সকল সাধারণ পাখি, কিন্নর, জলচর, খেচর, নিরাহারী এবং পাপকাজে ও ধর্ম কাজে রত যত জীবগণ আছে, তাদের তৃপ্তির জন্য আমি জলদান করছি।

এঁকেছেন ইন্দ্রজিৎ মেঘ

দেব তর্পণের পর ডানদিকে ঘুরে শুরু হয় মনুষ্য তর্পণ।জল দিয়ে বলা হয়—

”ওঁ সনকশ্চ সনন্দশ্চ তৃতীয়শ্চ সনাতনঃ।
কপিলাশ্চসুরিশ্চৈব বোঢ়ূঃ পঞ্চশিখস্তুথা।
সর্ব্বে তে তৃপ্তিমায়াস্তু মদ্দত্তেনাম্বুনা সদা।”

অর্থাৎ সনক, সনন্দ, সনাতন, কপিল, আসুরি, বোঢ়ু ও পঞ্চশিখা প্রভৃতি সকলে আমার প্রদত্ত জল দ্বারা তৃপ্তি লাভ করুন।

এরপর আবার পূর্ব মুখে দাঁড়িয়ে করা হয় ঋষি তর্পণ। সেখানেও মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত, পুলহ, ক্রতু, প্রচেতা, বশিষ্ঠ, ভৃগু ও নারদ প্রভৃতি ঋষিগণের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয়।

এই সমস্ত পুণ্যবান মুনিঋষিদের স্মরণ করার পর আসে কুলজাত, পিতৃপুরুষের পালা। মন্ত্র উচ্চারণ করে রীতিমতো নেমতন্ন করে ডাকা হয় পিতৃপুরুষদের। তারপর নাম-গোত্র-সম্বন্ধ উল্লেখ করে পিতৃকুল ও মাতৃকুলের মৃত ব্যক্তিদের একে একে জল দেওয়া হয়।

এঁকেছেন জয়িতা ভৌমিক

কিন্তু এখানেই যদি শেষ ভাবি তাহলে মারাত্মক ভুল হয়ে যাবে। এরপর শুরু হয় তর্পণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ভীষ্ম তর্পণ। আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই সময়ের অভাবে ঠাকুরমশাইরা বাদ দিয়ে ফেলেন এই অংশটা। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে ভীষ্ম তর্পণ আসলে ভীষ্মের উদ্দেশ্যে তর্পণ। যেহেতু ভীষ্ম নিঃসন্তান ছিলেন তাই সরাসরি তার কোনও উত্তরসূরি নেই তর্পণ করার মতো। কিন্তু তাঁর মতো বীর, ধর্মপরায়ণ মানুষ সত্যিই দুর্লভ। তার সেই আজীবন ব্রহ্মচারী থাকার প্রচণ্ড প্রতিজ্ঞার প্রতি সম্মান জানিয়ে তর্পণের সময় তাকেও জল দেওয়ার বিধি আছে।

এর পর আসে অগ্নিদগ্ধাদির তর্পণ। নিজের বংশে যাঁরা অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন, যাঁদের দাহাদি সংস্কার অর্থাৎ অন্তিম সংস্কার হয়েছে বা হয়নি, তাদেরকে জল দ্বারা তৃপ্ত করার পদ্ধতি এই অগ্নিদগ্ধাদির তর্পণ।

এঁকেছেন ইন্দ্রজিৎ মেঘ

তর্পণ অনুষ্ঠানের শুরুতে যে ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিকতার কথা ভাবতে বাধ্য হই। আসতে আসতে সেই ভুল কাটতে শুরু করে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে। খুব সাধারণ অর্থে কী মনে হয়, আমি এবং আমার পূর্বপুরুষ শুধু এই দুই পক্ষই জড়িয়ে আছে তর্পণের এই বিধির বেড়াজালে। শুধু আমার বংশের যারা তাদের জন্যই আমার যত চিন্তা, যত ক্রিয়া। কেবল তাদের তৃপ্তি নিয়েই আমার যত মাতামাতি। কিন্তু শাস্ত্র আসলে সেই সংকীর্ণতা, সেই মলিনতা থেকে মুক্ত করে আমাদের। বিন্দু থেকে বৃত্তে উপবীত হই আমরা। বংশ, পরিবারের ছোট্ট চৌহদ্দি থেকে মুক্ত হই আমরা তখন যখন উচ্চারণ করি—

“ওঁ যেহবান্ধবা বান্ধবা বা যেহন্য জন্মনিবান্ধবাঃ।
তে তৃপ্তিমখিলাং যাস্তু যে চাস্মত্তোয়কাঙ্খিণঃ।”

অর্থাৎ, যাঁরা আমার বন্ধু ছিলেন এবং যাঁরা আমার বন্ধু নন, যাঁরা জন্মজন্মান্তরে আমার বন্ধু ছিলেন বা যাঁরা আমার কাছে জল প্রত্যাশা করেন, তাঁরা সবাই সম্পূর্ণরূপে তৃপ্তি লাভ করুন।

সর্বজনীনতার, সৌহার্দ্যের এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর হয় না।

মোটামুটিভাবে এই হল তর্পণের বিধি। শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী সন্ধ্যা আহ্নিকের মতো তর্পণও প্রতিদিনের বিধি। সেটাই প্রধান তর্পণ। স্নানের সময় যে তর্পণ করা হয়, প্রতিদিন তাকে বলে স্নানাঙ্গ তর্পণ। কিন্তু রোজ এই বিধি পালন না করতে পারলে পিতৃপক্ষের পনেরো দিন বা তাও না সম্ভব হলে মহালয়ার সকালে তর্পণ অবশ্যই করা উচিত বলে মনে করা হয়।

বনবাস কালে দশরথের মৃত্যুর পর রাম রোজই স্নানের শেষে তর্পণ করতেন। কিন্তু বনবাসের কঠিন সময়ে এত কাজের মধ্যে যথাবিহিত তর্পণ অনুষ্ঠান করা বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাই তিনি করলেন কী তর্পণের সামগ্রিক অনুষ্ঠানের এই যে বিভিন্ন মন্ত্রের কথা এতক্ষণ আলোচনা করলাম, সবটাকে নিয়ে তৈরি করলেন এক সার মন্ত্র। বলা হয় রামের তৈরি সেই একটি মন্ত্রের উচ্চারণেও একই ফল লাভ করা সম্ভব। রামচন্দ্র তাঁর সেই মন্ত্রে বললেন—

“আব্রহ্ম ভুবনাল্লোকা দেবর্ষি-পিতৃমানবাঃ।
তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্ব্বে মাতৃমাতা মহাদয়ঃ।
অতীতকুলকোটিনাং সপ্তদ্বীপ নিবাসিনাম্।
ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ম।”

অর্থাৎ, সমস্ত ব্রহ্মলোক ও অনান্য লোকের সমস্ত দেবতা, ঋষি প্রভৃতি, সমস্ত পিতৃগণ, পিতৃ পিতামহাদি এবং মাতামহাদি সকলে তৃপ্ত হন। আমার বহুকোটি কুল যা বহু জন্মে গত হয়েছে, সেই সমস্ত কুলের পিতৃ-পিতামহাদি এবং সপ্তদ্বীপ নিবাসীরা ও ত্রিভুবনের যাবতীয় পদার্থ সকলে আমার প্রদত্ত জলে তৃপ্ত হোন।

বলাই বাহুল্য যে, এই এক মন্ত্রে শ্রীরামচন্দ্র সব তর্পণের সম্পূর্ণ ফল লাভ করেছিলেন। কিন্তু সময় সংক্ষেপের বিষয়ে রামচন্দ্রের ভাই লক্ষ্মণ আরও এগিয়ে থাকবেন। বনবাসকালে কাজের তাড়া বোধ হয় সবচেয়ে তাঁর। হবে নাই বা কেন? ঘুম-খাওয়ার সময় নেই যাঁর, তাঁর কি আর এত উপাচার সহযোগে নিত্য তর্পণের সময় আছে? তাই তিনি শুরু করলেন সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি। একটিই মন্ত্র। এক লাইনের মাত্র। কিন্তু তাতেই সমাহিত হয়েছে গোটা বিশ্ব। তিনি বললেন, “ওঁ আব্রহ্মস্তন্তপর্য্যন্তং জগত্তৃপ্যতু।” অর্থাৎ ব্রহ্মা থেকে তৃণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ জগৎ অর্থাৎ জগতের স্থাবরজঙ্গমাদি সকলেই আমার এই জলে তৃপ্তি লাভ করুন। লক্ষ্মণের এই একখণ্ড বাক্য নিবন্ধের সম্পূর্ণতাকে খণ্ডন করার সাধ্যি কারুর হয়নি। তাই শাস্ত্রকাররা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, এই তর্পণেও সমস্ত ফলোদয় হতে বাধ্য।

এঁকেছেন ইন্দ্রজিৎ মেঘ

সনাতন ধর্মের গোড়ার কথা জন্মান্তরবাদ। শরীরের মৃত্যুর পরও আত্মার থেকে যাওয়া, আবার ফিরে আসা এই নিয়েই হিন্দুত্বের চর্চা। সর্বোপরি এই যাতায়াতের ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে থেকে আস্তে আস্তে মোক্ষের পথে এগিয়ে যাওয়াই হিন্দুধর্মের সমস্ত দর্শনের মূলকথা। তর্পণের অনুষ্ঠান সেই বিদেহী আত্মার অস্তিত্বকেই স্বীকার করে নেয়। তাদের পরিতৃপ্তির ব্যবস্থা করে। কামনা করে তাদের ঊর্ধ্বগতির। এ তো গেল বিশ্বাসীর কথা। হিন্দুধর্ম নাস্তিকেরও ধর্ম। তাই যদি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মন বিদেহী আত্মার তৃপ্তির ধারণার সঙ্গে সহমত নাও হতে পারে, তাহলেও তর্পণের এই অনুষ্ঠান তার দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে বৃহত্তর একটা বার্তা বয়ে আনে। সেই বার্তা সমস্ত জীবকুলকে আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধে। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সবার জন্য কিছু করে যেতে বলে। এমনকী তর্পণ শেষে জল থেকে উঠে এসে কাপড় নিংড়ানো জলটুকু যে ব্যক্তি অপুত্রক, যার হয়ে তর্পণ করার কেউ নেই তাকে সমর্পণ করতে বলে। অন্যের তৃপ্তির জন্য তিন আঁচলা জল আর সামান্য তিলের ব্যবস্থা করতে শেখায় তর্পণ। অবশ্য শুধু খাঁচায় বন্দি কাকাতুয়ার মতো বুলি আওড়ালে সে উপলব্ধি হওয়া মুশকিল। মন্ত্রের শক্তি তখনই সর্বোচ্চ যখন তা সজ্ঞানে, সমস্ত অর্থ অনুধাবন করে বলা যায়।

বিতর্ক আছে মহিলারা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারেন কিনা। সাধারণ পুরোহিতেরা বলে থাকেন, “না পারে না”। তবে তাঁরাই আবার বলেন, বিধবা মহিলার ক্ষেত্রে তাঁর নিজের ছেলেপুলে না থাকলে, স্বামী শ্বশুর বা শ্বশুরের বাবার তর্পণ করার অধিকার তাঁকে দেওয়া হয়েছে।

যদিও আমরা জানি বেদ নারীকে যজ্ঞের অধিকার দেয়। তবুও স্বাভাবিক তর্পণে তার অধিকার কেন সীমায়িত থাকবে বোঝা বেশ কঠিন। মহাভারতে দেখেছি যযাতি স্বর্গচ্যুত হলে তাঁর কন্যা মাধবী ও মাধবীর চার ছেলের পুণ্যফল তাকে ফের স্বর্গে স্থাপন করে। এই উদাহরণ জানার পরও কি বলব নারীপ্রদত্ত জলে পূর্বপুরুষের তৃপ্তি সম্ভব নয়?

ধর্মের চর্চা যতদিন থাকবে, ততদিন থাকবে তাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন। আসলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই তো এগিয়ে যাওয়া। অবস্থার প্রয়োজনে আচার পালটাবে বৈকি। শুধু দর্শন থেকে সরে না আসাটাই কাম্য।

এঁকেছেন চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

এবছর কোভিড পরিস্থিতির জন্য গঙ্গায় তর্পণ সম্পূর্ণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেশ কিছু স্থানীয় প্রশাসন। অথচ এ বছরই বহু বহু প্রিয়জনকে হারিয়েছি আমরা। বেশ কিছু তরতাজা প্রাণ জীবনকে সম্পূর্ণভাবে ভোগ না করতে পারার অতৃপ্তি নিয়ে চলে গেল। তাদেরকে তৃপ্ত করব কীভাবে? শুধু আচারে নয় প্রভাব থাকুক আচরণে। এই পৃথিবীর যতটুকু শস্যে, যতটুকু জলে আমার অধিকার তার থেকে খানিক তুলে নিয়ে নিবেদন করি ব্রহ্মা থেকে তৃণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ জগতের তৃপ্তি সাধনের কাজে। সকলের তৃপ্তিই হোক আমার প্রার্থনা।

প্রচ্ছদ ছবি চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *