পঞ্চাশটি ঝুরোগল্পের ডালি ‘তরুণিমার কোনও অসুখ নেই’

জয় ভদ্র

বর্তমান এই বাংলার সৃজনশীল গদ্য-সাহিত্যে এই সময় ঝুরোগল্পকার হিসেবে কাজল সেন এক বিশেষ পরিচিত নাম। এই সময়ের বাংলা সাহিত্য জগতে ‘কালিমাটি’ ও ‘কালিমাটি অনলাইন পত্রিকা’ সম্পাদনার জন্য এমনিতেই এক বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। সম্পাদনার বাইরে কাজল সেন একজন কবি, উপন্যাসিক, কাহিনিকার এবং অবশ্যই একজন ঝুরোগল্পের শক্তিশালী লেখক। বলা বাহুল্য ‘ঝুরোগল্প’— এই নামকরণের উদ্‌গাতা হিসেবে জড়িয়ে আছেন আর একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, তিনি হলেন সমীর রায়চৌধুরী। সমীর রায়চৌধুরী এবং কাজল সেন— মূলত এই দুই সাহিত্যিক বর্তমানকালের বাংলা-সাহিত্যের যে স্বতন্ত্র এক বিবর্তনগামী পথের দিশা দেখিয়েছেন, তা হল এই ঝুরোগল্প বা ঝুরো-কাহিনি। যদিও এই প্রতিবেদকের আলোচ্য বিষয় শুধুমাত্র কাজল সেন রচিত ‘তরুণিমার কোনও অসুখ নেই’ এই কাহিনি গ্রন্থটি।

সুতরাং, কথাটা হল ‘ঝুরা’ অর্থাৎ (কথ্য) ‘ঝুরো’ শব্দের অর্থ হল ১. গুঁড়ারানো, চূর্ণিত; কিংবা ‘ঝুরো’ শব্দের সমার্থক ‘ঝুরঝুরে’ (বিণ.) শব্দের অর্থ ঝুরঝুর করে ঝরে এমন (ঝুরঝুরে কালি); শুষ্ক ও অসংলগ্ন (ঝুরঝুরে ভাত)। সংসদ বাংলা অভিধান, (সাহিত্য সংসদ) থেকে ‘ঝুরো’ বা ‘ঝুরঝুরে’ শব্দের অর্থটি পরিষ্কার হয়। অথবা এই গ্রন্থটির মুখবন্ধে অশোক তাঁতির বিশ্লেষণ থেকে এক জায়গায় পাই— “হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ঝুরঝুর’ শব্দের মানে লিখছেন— (বি) ১ চূর্ণ দ্রব্যের মৃদু ধারায় পতনের ভাব। ২ পত্রপুষ্প-ঝরার ভাব। ৩ [ঝিরঝির > *র] ধীর বায়ুপ্রবাহের ভাব। “সমীরণ ঝুরঝুর স্বেদলব করে দূর।— বিহারীলাল। [*ঝুরে— ঝুরঝুরভাবে পতনশীল; শুষ্ক-গুঁড়া (মাটি ইত্যাদি)।] হিন্দি ঝুর— শুষ্ক; মারাঠি ঝুর— তণ্ডুলকরণ। [ঝুরান— গুঁড়ো  করা]

অতএব, উক্ত ‘ঝুরো’ শব্দটি ও তার সমার্থক শব্দের অর্থ যেখানেই যেভাবে প্রতিস্থাপিত হোক না কেন, কাজল সেনের ঝুরোগল্পগুলিকে খুব খুঁটিয়ে ভালোভাবে পড়লে বোঝা যাবে— গল্পের  গঠনপ্রণালী, এক শব্দ থেকে আরেক শব্দের ব্যবহার, বাক্যের উপস্থাপনা, চরিত্রগুলির নির্বাক অবস্থা বা তাদের বক্তব্যের মনস্তাত্ত্বিক দিক, গল্পে ঘটনার সূত্রপাত বা তার সমাপ্ত হওয়া— এই সবকিছুই ‘ঝুরো’ শব্দ বা তার সমার্থক শব্দের অর্থগুলো গল্পগুলির পাঠ-সময়কালে প্রতীয়মাণ হয়ে ধরা দেয়।

আরও পড়ুন: অনশনশিল্পের খুঁটিনাটি

প্রসঙ্গত, আরেকটি কথায় আসা যাক। বিষয়: ঝুরোগল্পের শব্দসংখ্যা। কথাসাহিত্যের পূর্বের সনাতন আঙ্গিকগুলো যেমন উপন্যাস, ছোটগল্প বা অণু-কাহিনির অন্যতম বৈশিষ্ট্যকে তাদের নির্দিষ্ট শব্দসংখ্যা দিয়ে বিচার করা হয়। এক্ষেত্রে ঝুরো গল্পের শব্দসংখ্যা প্রথমে ৩০০ থাকলেও মাঝেমাঝে ৬০০ হয়। কিন্তু এই গ্রন্থের  লেখকের বক্তব্য সর্বাধিক শব্দসংখ্যা ৪০০ হওয়া উচিত।

ধরা যাক, প্রথম গল্প ‘অপেক্ষা’র কথা। এই কাহিনিটিকে পাঠকদের কাছে পরিচিত করার ক্ষেত্রে সারসংক্ষেপেও বর্ণনা করা বেশ কঠিন। মনে হয় যেন খবরের কাগজের কোনও রিপোর্টাজধর্মী ‘স্টোরি’ পড়ছি। গল্পে ঘটনার বিষয়টি হঠাৎ করে হাজির, সময়ের এক বিশেষ মুহূর্তে শুরু হয় যেন পরমুহূর্তেই শেষ। গল্পের মূল ঘটনার চরিত্রগুলি স্থান-কাল নির্বিশেষে পারস্পরিক সম্পর্কের সূত্রপাতটি ঘটনা পরম্পরায় ধরা দেয় না। যেটা ধরা দেয় তা হল, এই গল্পটির এক বিশেষ চরিত্রের মন-আকাশে উদয় হওয়া মানসিক অবস্থানের পাখিটিকে। যেন পাখিটি আকাশে উদয় হয়ে আবার মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। স্পষ্টত বললে বলা যায়, রমেনবাবু শ্মশানে তার আত্মঘাতী হওয়া মেয়েকে দাহকার্য করার সময় শুধুমাত্র সেই ছেলেটির কথাই মনে পড়ে তার ঘটনাস্থলে আসার ব্যাপারে— যে প্রেমিক ছেলেটি মেয়েটির জীবৎকালে তার অনাবৃত শরীরের ভিডিয়ো তুলে স্মার্টফোনে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ব্যাস এইটুকুই— ঘটনার আগে-পরের বিস্তৃতি বা ক্রম পরিণতির কিছুই ঠাওর করা যায় না। সবটাই শুধু রমেনবাবুর মনের মধ্যেকার ক্ষণিক ভাবনায় উপস্থাপনা মাত্র।

তেমনভাবে, একই কথা বলা যায়, ‘বৈধ-অবৈধ’ গল্পটির কথা। শ্যামলী তার নামকরণ নিয়ে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে (যা পাঠকের কাছে অজানা) ক্ষণিকের মধ্যে হঠাৎই নিজের মধ্যে অনুরণন শুরু করে। কারণ সে আদৌ সুন্দরীর পর্যায় পরে না, উজ্জল শ্যামবর্ণাও নয়, বরং ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণা। তাই বাস্তবত তার বিয়ে হয় না। এই হীনম্মন্যতার জায়গা থেকেই সে ভয়ংকর এক অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। পাঠক সে-কথাটা সামান্য কিছুটা আঁচ করতে পারে (ব্যক্তিটি শ্যামলীর নিজের জামাইবাবু কি?), তবে পরিষ্কারভাবে জেনে গেছে তার দিদি সোনালি।

‘মিলনাত্মক’ গল্পটিতেও দেখা যায়, মিলন মিত্রের মনের তাৎক্ষণিক ভাবনার প্রতিফলন। মিলনের খুবই অন্তরঙ্গ একজন অসমবয়সি বন্ধু আছে। দুই বন্ধুর কফিহাউসের দেখা হওয়ার ঘটনা একদিন। মিলন এদিকে এই বন্ধুরই প্রায় সমবয়সি এক মেয়েকে বিয়ে না-করে তাকে গর্ভবতী করে দিয়েছে বলে জানা যায়। ঘরে তার স্ত্রী ও দুই কন্যা বর্তমান। বন্ধুটি এর কৈফিয়ত জারি করলে মিলন মিত্র তাৎক্ষণিক তার সমাধানের কথা বন্ধুটিকে জানায়…

এই গ্রন্থে কাজল সেনের প্রতিটি গল্পেই যা ফুটে ওঠে, তা হল— স্থান-কাল সাপেক্ষে চরিত্রের হৃদয় মাঝে লুকিয়ে থাকা ভাবনা, অথবা আবেগ; যার প্রকাশভঙ্গিমায় আপাতভাবে কোনও জড়ানো-জটিলতা স্পষ্টত হয় না। যেন তা ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ে চরিত্রের অন্তঃস্থল থেকে পাঠকের হৃদয় পাত্রে— জনতা অসম্পূর্ণ রূপেও, যেন হয়তো-বা এর রেশ থেকে যায়। অশোক তাঁতির বক্তব্যেও এ-কথারই পরিভাষ লক্ষ্য করা যায়: “অসম্পূর্ণতা ঝুরোগল্পের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কোনও নিটোল গল্প এখানে থাকবে না। শুরু হবে আচমকা এবং শেষও হঠাৎ।… ঝুরোগল্প হবে ‘ওপেন এন্ডেড’।… ঘটনা, চরিত্র বা সময়ের শেষ। ঝুরোগল্প এই শেষ কথাটা বলে না।”

তাই বলা যায়, ঝুরোগল্পের ঘটনা সম্পূর্ণ নয়, অংশত হলেই চলে। কাজল সেনের গল্পগুলি পাঠে এ-কথাটা মনে দৃঢ়বদ্ধ হয়। গল্পগুলি পড়তে পড়তে যেটা আরও মনে হয়— এখানে সরাসরি প্রতীকের ব্যবহার না হয় ছদ্মপ্রতীকের বা কোয়েসির ব্যবহার হয়েছে। বিশেষত, কাজল সেনের এই গল্পগুলি অসংখ্য অবয়ব নিয়ে নড়াচড়া করলেও এখানে কোনও নির্দিষ্ট অবয়বের হদিশ পাওয়া দুষ্কর। প্রতিটি গল্পের বৈশিষ্ট্য— একটি ছোট্ট মুহূর্তে হঠাৎ করে জ্বলে উঠেই আবার হঠাৎ মিলিয়ে যায়; তারপর টেনে দেয় এক সীমারেখা— দিগন্তসীমাও বলা যেতে পারে— যার ওপারে থাকে অদেখা অজানা অনেক কৌতুহল। এখানে উদাহরণ হিসেবে এই গ্রন্থের ‘জলডাঙা’ গল্পটির কথা বলতে পারি। কিছু ইঙ্গিত ও অপূর্ণতায় গল্পটি শেষ হয়। মনে হয়, এটা কি কোনও সমকামিতা, না বিষমকামিতার দ্বন্দ্ব? না-কি নিছকই প্রেম ও বন্ধুত্বের? তাই সারাংশের উপনীত হওয়া যায়, “ঝুরোগল্পের শেষ নেই, থেমে যাওয়া আছে।”

তাই প্রসঙ্গতভাবেই আসে, এই প্রতিবেদকের কাছে এর আগে বাংলার বা বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে এই ঝুরোগল্পের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্যি এ-কথাও অনস্বীকার্য, বিশ্ব সাহিত্য-ব্রহ্মাণ্ডের সুদূর আলোকবর্ষের কতটুকুন আলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়? যাক সে-কথা। তবে বলাই বাহুল্য, উপন্যাস-ছোটগল্প বা অণু-কাহিনি বাংলার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিবর্তনের ফসল, ঝুরোগল্পও তেমনি আজকের অন্তর্জাল সভ্যতার উল্লেখযোগ্য নতুন এক বিবর্তনস্বরূপ।

এরূপ একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশককে বিশেষ ধন্যবাদ।

বইয়ের নাম: তরুণিমার কোনও অসুখ নেই
লেখক: কাজল সেন
প্রকাশক: চিন্তা

জয় ভদ্র-র জন্ম মুর্শিদাবাদ শহরে (লালবাগ)। ‘হরপ্পা’, ‘হাজার শতাব্দীর রূপকথা অথবা রাজনৈতিক বিষণ্ণতা’, ‘ইডিকেস’-এর মতো বইয়ের লেখক তিনি, নয়ের দশকের শেষ লগ্ন থেকে লেখালেখি শুরু। ‘হরপ্পা’ অনূদিত হয়েছে হিন্দি ভাষায়। এছাড়াও তাঁর ছোটগল্পগুলো একসময় বিভিন্ন হিন্দি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ছিলেন এক বিশেষ পত্রিকার কার্যকরী সম্পাদক। একটা সময় মূলত সাংবাদিকতার সঙ্গে সঙ্গে চালিয়ে গিয়েছিলেন সাহিত্যকর্ম। ২০১৩-২০১৭ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ শিশু কমিশনের (WBCPCR) সদস্য ছিলেন। এই মুহূর্তে পুরোপুরি সাহিত্যেই মনোনিবেশ করেছেন। গল্প, উপন্যাস যেমন তাঁর অবাধ বিচরণক্ষেত্র, তেমনি পুস্তক সমালোচনা এবং নাট্য-সমালোচক হিসাবেও সমাদৃত হয়েছেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *