বাড়ছে তাপমাত্রা, জ্বলছে ইউরোপ

ড. সোমা বসু

ক্লাইমেট চেঞ্জের ফলাফল— বাড়ছে তাপমাত্রা, জ্বলছে ইউরোপ! সম্প্রতি পৃথিবীব্যাপী বাড়ছে দাবানল, বনে-বনে আগুন লাগার ঘটনা। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলের বনভূমিতে আবারও আগুনের লেলিহান শিখা। এই বছর গরম পড়তেই শুরু হয়েছে ইউরোপ জুড়ে দাবানলের দাপট। জ্বলছে নানা দেশের বনাঞ্চল— গ্রিস, ইতালি, তুরস্ক। ইতালির বনের আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও কিছুতেই আয়ত্তে আসছে না তুর্কির দাবানল। গত এক সপ্তাহ ধরে লাগাতার এক বন থেকে অন্য বনে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। এই আগুনের লেলিহান শিখায় হেক্টরের পর হেক্টর জুড়ে শুধু যে গাছপালা বা পশুপাখি মারা যাচ্ছে, তা নয়— ভিটেমাটি ছাড়া হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। ঘর-বাড়ি হারিয়ে বনের পশু আর মানুষ আজ দিশেহারা। ইতিমধ্যেই ভূমধ্যসাগরের আশপাশের তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। ফলে, আগামী দিনে আসতে চলেছে আরও বড় বিপদ। বেশ কিছুদিন নিয়ন্ত্রণে থাকার পর আবার দু’দিন আগে থেকে ছড়াতে শুরু করেছে গ্রিসদেশের বনের আগুন। এথেন্সর কাছাকাছি অঞ্চলে লাগা এই বনের আগুনে ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য পশুপাখি। এই বছরের গরমে গোটা দেশে যেভাবে তাপমাত্রা আর শুষ্কতা বেড়েছে, তাতে বিপদের অশনি সংকেত দেখছেন বিজ্ঞানীরা। হাওয়ার তীব্রতা এবং গতিপথ দেখে এথেন্স লাগোয়া অঞ্চলের ঘরবাড়ি খালি করে অধিবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। চলছে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে সতর্ক থাকার প্রচার প্রক্রিয়া।

আরও পড়ুন: ‘অবন ও রবি’ স্বয়ং

গত একসপ্তাহ ধরে তুরস্কের বনের আগুনে কত যে পশুপাখি ভিটেছাড়া হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই— মারাও গেছে অগুনতি। তুরস্কের যে বনাঞ্চলে আগুন লেগেছে, ভূমধ্যসাগর উপকূলের সেই এলাকা (আনতালা)  তুরস্কের অন্যতম আকর্ষণীয় ‘ট্যুরিস্ট প্লেস’। ফলে, সম্পত্তি হানি হয়েছে প্রচুর। এমনিতেই করোনা, যুদ্ধ আর শরণার্থী সমস্যায় জর্জরিত তুরস্ক। গরমের সময়টায় তুরস্কের সমুদ্রতট ইউরোপীয়দের কাছে ছুটি কাটানোর এক অন্যতম জনপ্রিয় ‘ডেস্টিনেশন’। ফলে, জনপ্রিয় পর্যটন অঞ্চলে লাগা এই দাবানল তুরস্কের অর্থনীতিতে আনতে  চলেছে এক ভয়ানক সংকট।  ফায়ারব্রিগ্রেড বিমান— যার সাহায্যে একধরনের রাসায়নিক ছড়িয়ে আগুন নেভানো হয়, তারা কাজ করছে দিনরাত। রাশিয়া, ইরান ফায়ারব্রিগ্রেড বিমান, আগুন নেভানোর রাসায়নিক দিয়ে সাহায্য করছে। ক্রমাগত বিমানে করে সেসব ছড়ানো হচ্ছে, তবুও আয়ত্তে আসছে না আগুন।

প্রতিবছরই আমেরিকার বনে আগুন লাগে। কিন্তু গতবছর তা ছিল মারাত্মক। ঠিক একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে পুড়ে খাক হয়ে গেছে মাইলের পর মাইল বন— বনের পশুপাখি। গতবছরের দাবানল  এতই ভয়ানক ছিল যে, তার ইকোলজিক্যাল ইমপ্যাক্ট পড়েছে সে দেশে। আগামী ভবিষ্যতে এই ইমপ্যাক্ট পৃথিবীব্যাপী পরিবেশের ব্যাপক পরিবর্তন আনতে চলেছে। ছাড় পাচ্ছে না ভারতও। গতবছরের হিমালয়ের বনের আগুন রীতিমতো ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আরও পড়ুন: সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর

পৃথিবীব্যাপী যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে এইরকম বিধ্বংসী দাবানল যে লাগবে, অনেকদিন আগেই তার আগাম আভাষ দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। নব্বইয়ের দশক থেকেই সাবধানবাণী শুনিয়ে আসছেন তাঁরা। কিন্তু, পৃথিবীর কোনও দেশ, কোনও শিল্পপতি, কোনও রাজনৈতিক নেতাই কান দেননি তাতে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে। তাই, আজ এই হাহাকার।

জার্মানিতেও ক্রমশ দেখা দিচ্ছে শুষ্কতার প্রভাব। বেশ কিছু অঞ্চলের তাপমাত্রা বাড়ছে, কমছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। বছর দু’য়েক আগে তো জলাশয় শুকিয়ে মারা যাচ্ছিল নানা জলের জীব। ফলে প্রভাব পড়ছে চাষবাসে। দাবানল রুখতে বনে-বনে চলছে টহলদারি। দাবানলপ্রবণ এলাকার গাছগুলো বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখছেন গাছগুলোর শুষ্কতার হার। কিছু-কিছু বনে ট্যাঙ্কারে করে জল এনে ভিজিয়ে দেওয়া হচ্ছে গাছপালা। যাতে আগুন না লাগে বা আগুন ছড়াতে না পারে। এখানে গ্রিন পার্টি খুব সক্রিয়। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও পরিবেশের ব্যাপারে নিয়েছে নানান কর্মসূচি। মানুষও বেশ পরিবেশ সচেতন। তবে পৃথিবীব্যাপী পরিবেশ ধ্বংসের ফলাফল থেকে কোনও একটি দেশের রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে ক্লাইমেট চেঞ্জের ভুক্তভোগী হতে হবে সব দেশকেই। হয়তো এখনও কিছুটা সময় আছে— সব দেশ, সব মানুষ মিলেই পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *