যে উপন্যাসে ছড়িয়ে রয়েছে সন্ত্রাস

সুমিত নাগ

নিমাই হৃদয়পুর যাবে। তার প্রয়োজন ‘সার্টিফিকেট’। এ এমন এক শংসাপত্র যা যোগ্যতার মাপকাঠি, এবং তা দিতে পারেন, একমাত্র ‘সর্বশক্তিমান’। তিনিই হৃদয়পুর কিংবা নিমাইয়ের বসবাসরত দ্বীপটি-সহ আরো কয়েকটি দ্বীপের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। নিমাইয়ের দ্বীপেই একদিন তিনি থাকতেন। তাঁর কথা এখনও বলেন, নিমাইয়ের কাছের মানুষ বুড়ো অভিনেতা, ইনি আর সর্বশক্তিমান একইসঙ্গে তাঁদের অভিনয়জীবন শুরু করেছিলেন। নিমাই বেরিয়ে পড়ে, তার সার্টিফিকেটের খুব প্রয়োজন।

এভাবেই শুরু হয় রাহুল দাশগুপ্তর উপন্যাস ‘সার্টিফিকেট’। উপন্যাসের শুরুতেই লেখক স্পষ্ট করে দেন, কয়েকটি মোটিফ। নিমাই, এক সৎ ও যোগ্য অভিনেতা। বুড়ো অভিনেতা, যিনি যোগ্য হলেও প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। আর সর্বশক্তিমান, যিনি পরবর্তীতে ‘বাবা’, বলে চিহ্নিত হবেন উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্রের সংলাপে ও উদ্ধৃতিতে, তিনি এক স্বৈরাচারী।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

তবে, তিনি নৃশংস নন। বরং তাঁর পন্থা ডিপ্লোম্যাসি। উপন্যাসটির শুরুতে, প্রেক্ষাপট ও পেট্রিয়ার্কের উপস্থিতি মনে করায়, লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু উপন্যাসকে। কিন্তু এই একটি জায়গা, ডিপ্লোম্যাসি, এখানেই লেখক আলাদা করে দেন দু’টো জগৎ। লাতিন আমেরিকার স্বৈরাচারী মিলিটারি ক্যু-নির্মিত পেট্রিয়ার্ক ইনি নন। ইনি অনেক বেশি ‘গণতান্ত্রিক’ সমাজের স্বৈরাচারী, যাঁকে দেখা যায়, জানা যায় অথচ দেখে মনে হয়, তিনি হিংস্র মন, বরং পিতার মতো আশ্রয়দাতা। নিমাইও তাঁর কাছে পৌঁছে তাঁকে, আর সকলের মতোই ‘বাবা’ সম্বোধন করে।

এরপর, যে-মূল সুতোর ওপরে এই উপন্যাস দাঁড়িয়ে থাকবে, তা হল নিমাইয়ের সার্টিফিকেট জোগাড় করার চেষ্টা ও তার অসহনীয় অপেক্ষা। এই অপেক্ষা, যা মনে করাবে, সিস্টেমের মধ্যে লাল ফিতের ফাঁস, কীভাবে যোগ্য ব্যক্তির সঙ্গে হয় প্রতারণা, কীভাবে বিকিয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে শিল্প ও সংস্কৃতি এবং আরও অনেক কিছুই— এক কাফকায়েস্ক পৃথিবী, যার ঘূর্ণিপাকে ঘুরে ঘুরে তলিয়ে যাচ্ছে, নিষ্পেষিত হচ্ছে যোগ্যতা। পাঁচ দিনের গল্প এই, তাতেই স্পষ্ট হবে, মুখগুলি— ‘বাবা’ ও নিমাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়বে, নাবিক, অচ্যুত, ধ্রুপদি, অমলকান্তি, শুভাশিস-সহ আরো কয়েকজন, যারা এক বৃহৎ জালের অংশ, উচ্ছিষ্ট ভোগী এবং ক্রীতদাস। নিমাই একটিও নয়, সে তাই জালের অংশ নয়, জালের মধ্যে আটকে যাওয়া পতঙ্গ। মাকড়সাটি আসছে তাঁকে গিলে ফেলতে, সে জানতেও পারে না। ভুলক্রমে, মাকড়সাকেই সে আদর্শ মনে করে বসে একসময়।

আরও পড়ুন: একটি লিটল ম্যাগাজিন ও মৃণাল সেন

উপন্যাসটি পড়ার সবথেকে উপভোগ্য দিক হল, কোনো সময়েই লেখাটি একই জটিলতার ঘূর্ণিপাকে ঘুরে মরে না। একটি জটিলতাই যে জন্ম দেয় আরো একটি জটিলতা, সেটিই আবার আরো একটি— এভাবে ক্রমাগত জটিলতার সৃষ্টি হয়ে চলেছে এবং সব সমস্যার সৃষ্টি ও সমাধানের পিছনে আছেন একজনই, তা পরিষ্কার করে দেয়। এভাবেই তৈরি হয় পূর্বে উল্লেখিত জালটি। তার সুতোর রসদ, মাকড়সা ও আটকে পড়া পতঙ্গের ইতিকথা। দক্ষ নির্মাণের মধ্য দিয়ে লেখক এই ‘জাল’ বুনেছেন, তার বিভিন্ন স্তর-সুদ্ধু। যা অত্যন্ত তারিফযোগ্য।

উপন্যাসের মাত্রই চরিত্রগুলির গভীরতা ও বিভিন্ন মাত্রাগত বিচার জরুরি। ‘বাবা’ এবং ‘নিমাই’—উপন্যাসের দুই মূল কাণ্ডারি, দুই বিপরীত প্রান্ত বিন্দু, দীর্ঘ স্পেকট্রাম সৃষ্টি করেছে এরা— দু’জনেই লেখকের তুখোড় নির্মাণ। তাদের চরিত্রের গতিপ্রকৃতি ও আচরণ, শুধু তাদের নিজেদের স্পষ্ট করেনি, উপন্যাসটিকে একমাত্রিক হওয়া থেকেও রক্ষা করেছে— যে-সম্ভাবনা এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে অবশ্যই ছিল। বাকি চরিত্রগুলি, এই স্পেকট্রামের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। তাদের স্থানবিন্দু, সুবিধা মতো বদলায়। যদিও, তা সবক্ষেত্রেই, ‘বাবা’র অভিমুখী। এই চরিত্রনির্মাণগুলিও চমৎকার। শুধু, তাদের সংলাপ আরও একটু বহুস্তরীয় ও কূটনৈতিক হলে, কাহিনির পক্ষে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হত বলেই মনে হয়। একইসঙ্গে, তাদের নামকরণের ধারাবাহিকতা থাকলে আরো ভালো হত। নামহীন ‘নাবিক’ বা ‘বুড়ো অভিনেতা’, অথচ নাম ও পদবি-সহ শুভাশিস সাউ বা অমলকান্তি দাসের নামকরণের কারণ স্পষ্ট নয়। একইভাবে, আরো একটু স্পষ্ট হলে, হৃদয়পুর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট, পাঠকের পক্ষে জায়গাটি আরও স্পষ্টভাবে চিনে নিতে সুবিধা হত।

এই উপন্যাসের সবথেকে বড় গুণ লেখক যেভাবে লেখাটির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছেন, মেলোড্রামা ও মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রচের মধ্যবর্তী পথ অনুসরণ করে, বেশ সরু তারের ওপর দিয়ে হাঁটার সাহস দেখিয়েছেন। এবং লেখাটির একেবারে শেষ অংশটি, যেভাবে কিছুটা পরাবাস্তব (নাকি অন্য কিছু?) ছুঁয়ে যায়, তাতে, লেখাটি আরো একটি নতুন মাত্রা পায়।

রাহুল দাশগুপ্তের উপন্যাস ‘সার্টিফিকেট’— গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে, নষ্ট সমাজকে দেখা। আমাদের ভিতরের ও বাইরের নিমাই, বুড়ো অভিনেতা, ধ্রুপদি কিংবা সর্বশক্তিমানকে খুঁজে নেওয়া। যে-সমাজ আমাদের চোখের সামনে, অথচ আমরা স্বেচ্ছায় অন্ধ হয়ে আছি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *