সেই ২৫ অক্টোবর: মোহনবাগানকে জিতিয়েছিলাম ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে বসে

মিলন চট্টোপাধ্যায়

আজকেও আরেক ২৫ অক্টোবর। করোনাকালের এই ভয়াল সময়ে মনে পড়ছে একটি ঘটনার কথা। মোহনবাগান সমর্থক হিসেবে যা আমৃত্যু থেকে যাবে মনের মণিকোঠায়।

ছোট থেকেই বাড়িতে ফুটবল নিয়ে ম্যালা গ্যাঞ্জাম দেখেছি। মা বাঙাল, তাই ইস্টবেঙ্গল জিতলে বাবার অফিসে থাকার সময় বেড়ে যেত আর মোহনবাগান জিতলে মা— ‘আমি তো দাসীবাঁদি’ এসব বলে কাজ করত কিংবা একটু দ্রুত স্কুলে যেত। ইলিশ অথবা চিংড়ি— আমার অবশ্য কিছুতেই আপত্তি ছিল না, এখনও নেই। তবে মোহনবাগান জিতলে পাওনাগণ্ডা আদায় ভালো হওয়ায় ক্রমশ মোহনবাগানী হয়ে উঠেছিলুম, পরে যা অবসেশন হয়ে যায়।

ফুটবল নিজে খেলতে পারিনি, কারণ আমি কুঁড়ে এবং শারীরিকভাবে ‘সুপারম্যান’। জীবনে একবার পাড়া ফুটবলের টুর্নামেন্টে নামি, একটা গোলও দিই তালেগোলে তারপর আঘাতপ্রাপ্ত এবং অবসৃত। ব্যস্‌। খেল খতম। তবে মোহনবাগানের প্রতি ভালোবাসা বাড়তেই থাকে।

আরও পড়ুন: অনলাইনে পেলেকে ৮০তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা মারাদোনার

অনেক ম্যাচ দেখলেও রানাঘাট থেকে কলকাতা গিয়ে বড় ম্যাচ আমি আগে দেখিনি। একদিন আমার তিন ইস্টবেঙ্গলী বন্ধু বলল— চল্‌ দেখে আসি বড় ম্যাচ। আমিও হ্যাঁ বললাম। সঙ্গে দলে ভারী করার জন্য আর এক ভাই এল। সেও মোহনবাগান। আই লিগের ম্যাচ, সাল ২০০৯। গাড়ি কিনেছিল এক ইস্টবেঙ্গলী বন্ধু। সে ক্রমাগত বলে গেল ১৯৭৫-এর গল্প। আর আমাকে হ্যাটা চলছিল। তার ছেলের বয়স ৩। সেও কিছুই না বুঝে ‘ইস্তবেগল ইস্তবেগল’ বলে হাল্লা করে চলল সারাটি সময়। খাওয়াতে বললাম— বলল, আসার পথে হেরো পেটে দাদা-বউদির বিরিয়ানি খাস। গা জ্বলে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রথম বড় ম্যাচ। তাই মুখ বুজে থাকলাম।

মাঠে সব টিকিট কেটে ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে বসা হল। আমি উসখুস করছিলাম। শুরু হল খেলা। প্রথম গোল খেল মোহনবাগান। ফ্লাইট বুঝতে না পারা শিল্টন পালের জন্য। আমি অভিব্যক্তি চাপতে পারিনি। এবার শুরু হল দলবদ্ধ আক্রমণ। অমন ভয়াবহ খিস্তি বড় ম্যাচ ছাড়া শোনা অসম্ভব। এক ডাক্তারবাবু আর তার দুই ছেলেও এসেছিল খেলা দেখতে। গোল হতেই ছোট ছেলেকে আক্রমণ শুরু করলেন বাবা ও বড় ছেলে! ছেলেটি তখন আমাকে বলল— ‘চল, অইদিকে যাই’। পুলিশ কিছুতেই যেতে দেবে না। তখন আমি বললাম, ‘…আমাকে তো মার্ডার করে দেবে! ফেলে দেবে গ্যালারি থেকে। দেখছেন তো থ্রেট করেই যাচ্ছে।’ শেষে গেলাম মোহনবাগান গ্যালারিতে। আহ! কী শান্তি! যেন পাকিস্তানে ছিলুম এতক্ষণ!

এরপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। চিডি একাই ব্যারেটোর সঙ্গে শুরু করলেন সেই বিখ্যাত খেলা। দুর্বল রক্ষণ নিয়েও একা চারগোল। বিরতিতে ৩-৩ ছিল। কী সব খিস্তি যে আমিও দিলুম আর আমাকেও দিল সেসব ভাবলে ভয় করে। ইয়াকুবুও ভালো খেলেছিলেন ইস্টবেঙ্গলের। কিন্তু বিরতির পর একমাত্র বিদেশি হিসেবে হ্যাটট্রিক করেন চিডি। ম্যাচে মোহনবাগান যেতে ৫-৩ গোলে। এরপর শুরু হয় কিঞ্চিৎ বিশৃঙ্খলা। সুভাষ ভৌমিকের প্রতি বিষোদ্গারও চলছিল। এক খেলার চ্যানেল থেকে বন্ধুর ইন্টারভিউ নেওয়া হল। কিন্তু সম্ভবত ভয়াল খিস্তি বাঁচিয়ে একটিও পূর্ণ বাক্য না পাওয়া যাওয়ায় তা দেখানো সম্ভব হয়নি।

এরপর আমার পালা। আহ! অসামান্য খিস্তি দিলুম গাড়িতে। ৩ ইস্টবেঙ্গল সমর্থক আমাকে বলে গেল— ‘এমন অপয়া আর নেই। বিপ্‌ বিপ্‌, ৩৪ বছরের রেকর্ড আজ বিপ্‌ মেরে দিল’! আরও নানাবিধ গালমন্দ। বাই দ্য ওয়ে, রাস্তায় আর আমাকে খেতে দেওয়া হয়নি। পাড়ার কাউন্সিলর ছিলেন সেই বন্ধুর মামা। তিনি মোহনবাগানী। মিষ্টি নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। কেউ খেল না। আমি একাই মেরে দিলাম। মোহনবাগানের সমর্থকদের কাছে আমারও গুরুত্ব বেড়ে গেল।

৩৪ বছরের রেকর্ড ভেঙে মোহনবাগান জেতার দিনেই বুঝেছিলাম, ৩৪ বছর খুব সাংঘাতিক ব্যাপার। আমিও যদিও সে বয়স পেরিয়ে এসেছি।

আরও মনে পড়ছে— ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি ছিল আমার বউভাতের পরদিন। সেদিনও যাব বলে বেগ উঠেছিল। কিন্তু বাড়িভর্তি আত্মীয়-স্বজন। তাঁদের মধ্যে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান, উয়ারি— কত যে সমর্থক! ভেবে দেখলাম, বউভাতের পরেই আরও আত্মীয়বিচ্ছেদ অনিবার্য আর বউকে কে না ভয় পায়, ফলে দেখা হল না।

মোহনবাগান একটা আবেগের নাম। কিন্তু এও সত্য, ইস্টবেঙ্গল না থাকলে মোহনবাগান পানসে হয়ে যেত। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান— পেটরোগা বাঙালির একমাত্র দুর্বলতা। প্রেমও। মোহনবাগান আসলে এক লড়াইয়ের নাম। ঘটি-বাঙাল নয়, বাঙালির লড়াই। এই যে দুই দলের আকচা-আকাচি সেও তো ভালোবাসাই। ভালো থাকুক মোহনবাগান, ভালো থাকুক ইস্টবেঙ্গল। ও হ্যাঁ, পরিশেষে আই লিগ না জিততে পারা ইস্টবেঙ্গলকে শুভকামনা। একদিন নিশ্চয়ই জয় আসবে।

জয় মোহনবাগান।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *