করোনাবিধি মেনে এবছর হচ্ছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ৪১০ বছরের পুরনো দুর্গাপুজো

Shaborno Ray Durga Puja

ইন্দ্রজিৎ মেঘ

শারদীয়ার উদ্‌যাপনে কলকতায় এখনও কিছু বনেদি বাড়ি আছে, যেখানে ইতিহাস কথা বলে। সময়-সরণি মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও যা তাৎপর্যবাহী। ১৬১০ সালে কলকাতায় প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয় এবং এই তথ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের নাম।

আরও পড়ুন: শান্তিপুরের প্রথম বারোয়ারি পুজো সূত্রাগড় বঙ্গপাড়া বুড়ো বারোয়ারি

বাংলায় তখন বারো ভুঁইয়ার অন্যতম জমিদার ছিলেন প্রতাপাদিত্য। সেই সময় হালিসহরে বাস করতেন লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার। সাবর্ণ গোত্রীয় গঙ্গোপাধ্যায় পদবিধারী এই রাঢ়ি ব্রাহ্মণ প্রতাপাদিত্যের দরবারে চাকরি করতেন। তবে একটি ঘটনা পালাবদল ঘটিয়ে দিল অনেক কিছুর।

মুঘল বাহিনীর হাতে প্রতাপাদিত্যের পতন হল। এতে ভাগ্যের শিকে ছিড়ল লক্ষ্মীকান্তের। মুঘল সেনাপতি রাজা মানসিংহের মধ্যস্থতায় বাদশাহ জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে এহেন লক্ষ্মীকান্ত পেলেন জমিদারি। রায়চৌধুরী উপাধিও লাভ করলেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করলেন রায়চৌধুরী পরিবার।

আরও পড়ুন: মেয়েটি আমার হৃদয়জুড়ে শিউলি ফুটিয়েছে

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলার নানা জায়গায় লক্ষ্মীকান্তের জমিজমা ছিল। কলকাতা পরগনা ছিল তার মধ্যে একটি। লক্ষ্মীকান্ত জমিদারির কাজকর্মের সুবিধার জন্য বড়িশা অঞ্চলে (বর্তমানে সখের বাজার ) নির্মাণ করেন ভদ্রাসন। বৃহত্তর কলকাতার মানচিত্র ধরলে সম্ভবত ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে এই ভদ্রাসন সংলগ্ন আটচালা মণ্ডপে রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো সর্বাধিক পুরনো। সুতরং, এই ঐতিহ্যের বয়স ৪১০ বছর। স্নানন, পূজন, বলিদান এবং হোমন— পুজো পদ্ধতির এই চার ধাপ মেনেই রায়চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো এখনও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

বাড়ির পরম্পরা অনুসারে সোনার আংটি এবং সোনার আসন মৃন্ময়ীর সামনে রেখে সম্পন্ন হয় সপ্তমী থেকে নবমীর পুজো। এখন আর পশু বলি হয় না। ছাঁচি কুমড়ো দিয়েই রাখা করা হয় বলিদান প্রথা। এক কালে ১৩টি পাঁঠা বলি দেওয়া হত তিন দিনে। সপ্তমীর সকালে একটি, অষ্টমীর সকালে দুইটি, সন্ধি পুজোয় একটি এবং নবমীর সকালে নয়টি। আদি গঙ্গা ছিল প্রতিমা নিরঞ্জনের স্থান। এখন তা মজে যাওয়ায় স্থান বদল হয়ে বাবুঘাট হয়েছে। শুধু প্রতিমার তক্তাটি তুলে নিয়ে আসা হয়। পরম্পরা যে, প্রতি বছর প্রতিমা নির্মিত হয় এই তক্তার উপরেই।

এ বছর সপ্তমীতে বেহালার সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পরিবার চত্বরে দেখা হয়েছিল শাশ্বত ব্যানার্জির সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে শোনা গেল, এবছর কোভিড আবহে পুজোর রীতিনীতি সবকিছুই একই রকম থাকবে। কিন্তু মা দুর্গা যেখানে পূজিত হচ্ছেন, তার বাইরে দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মানার অনুরোধও করা হয়েছে।

মন্দিরের গ্রিলে লেখা হয়েছে, ‘দয়া করিয়া মন্দিরে মাস্ক ব্যবহার করিবেন’। আরও লেখা হয়েছে, ‘দয়া করিয়া প্রত্যেকে মাস্ক ব্যবহার করিয়া দূরত্ব বজায় রাখিয়া পূজা দিবেন’। সুতরাং যে কোভিড-বিধি সর্বত্র পালন করা হচ্ছে, এখানেও তার কোনও ব্যতিক্রম নেই। একসঙ্গে পাশের মেজো বাড়িতেও প্রত্যেক বছরের মতো এবছরেও পুজো হচ্ছে। নিজেদের পারিবারিক মন্দিরের থেকে, যেখানে রয়েছে রাধা গোবিন্দের মূর্তি, সেখান থেকে জল ছিটাতে ছিটাতে আটচালাতে ঢোকার রীতি রয়েছে।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ির পুজো মোট আটটি বাড়িতে হয়। এরমধ্যে ছয়টি বড়িশাতে। বড়িশায় পুজো শুরু আগে হালিসহরে হত লক্ষ্মীকান্তের প্রপিতামহ পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রাচীন ভিটায় পুজো। ইতিহাসে এই পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় পরিচিত পাঁচু শক্তি খাঁ নামে।

আজও এ-বাড়ির দুর্গাপুজোয় দু’বেলা তিনবার দেওয়া হয় অন্নভোগ। সকালে লুচি ভোগ, তারপরে যথাক্রমে সাদাভোগ ও খিচুড়িভোগ দেওয়া হয়। পোলাও, সাদা ভাত, চচ্চড়ি, খিচুড়ি, মাছ, পায়েস, চাটনি ইত্যাদি হল ভোগ তালিকার বিভিন্ন পদ। সন্ধিপুজোয় আর একটা অদ্ভুত রীতি রয়েছে এই পরিবারে। এই সময় একটি ল্যাটা মাছ পুড়িয়ে দেওয়া হয় ভোগে। পান্তা ভাত, কচুর শাক, ইলিশ মাছ দেওয়া হয় দশমীর দিনে। এরপর সিঁদুর খেলার পর নিরঞ্জন হয় প্রতিমার।

বেহালার বড়িশাতে রায়চৌধুরীদের যে ছয়টি পুজো হচ্ছে সেগুলো যথাক্রমে আটচালা বাড়ি, বড় বাড়ি, মেজো বাড়ি, মাঝের বাড়ি, বেনাকি বাড়ি এবং কালীকিঙ্কর বাড়ি। এছাড়াও রয়েছে বিরাটি এবং নিমতার বাড়ি। প্রতিমা পূজিত হন কবি বিদ্যাপতি রচিত দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী মতে। এবছর এই করোনা আবহে ওই পরিবারের সকলের দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা, দ্রুত করোনা মুক্ত হয়ে উঠুক পৃথিবী।

ছবি ও ভিডিও ডিকু ভট্টাচার্য

Similar Posts:

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • সুমন দাস

    খুব সুন্দর হয়েছে।
    এমন ঐতিহ্য বজায় থাকুক এই কামনাই করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *