নারায়ণপুরের সরকার বাড়ির দুর্গার চালচিত্রে আঁকা থাকে গ্রামের বিদ্যালয়ের ছবি

তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়

“ভাবি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।”

বিজ্ঞাপন ঢেকে দিচ্ছে মুখ। প্রতিযোগিতার চক্করে নিজের সঙ্গে দেখা করার ফুরসতও মেলে না এখন। বাঙালির প্রিয় দুর্গোৎসবও এই বিজ্ঞাপন, প্রতিযোগিতা প্রভৃতি হাতছানির বাইরে থাকতে পারেনি। বিশেষত আলোর জাঁকজমক, প্যান্ডেল, থিমের আড়ালে শহরের পুজো থেকে ‘আনন্দ’ সরে গেছে। এ আমার ব্যক্তিগত মতামত শুধু নয় উপলব্ধিও। জাঁকজমক, বাহ্যিক আড়ম্বর যত বাড়ছে, উৎসবের নিখাদ উদ্‌যাপন ততই মিলিয়ে যাচ্ছে ব্যয়ের তুলনামূলক আলোচনার ভিড়ে। তাই তো প্রত্যেক বছর দুর্গাপুজোর সময়টা গ্রামে কাটাই। রেডিয়োতে বীরেন্দ্র ভদ্র ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে…’ ঘোষণা করেন! আমারও দিন গোনা শুরু হয়। যানজট, শহুরে ক্লান্তি, ব্যস্ততা ফেলে ছোট গ্রামটিতে গিয়ে পড়লে আনন্দের রোশনাই সূর্যরশ্মির সঙ্গে পাল্লা দিতে চায়৷ কাঁদর নদীর পাড় কাশফুলে সাদা হয়ে থাকে। ভোরের বেলা ঘাসগুলো শিশিরে স্নান করে আগমনী গান গায়।

আরও পড়ুন: কাটোয়ার জাগ্রত দেবী মহামায়ার সুপ্রাচীন এবং স্বপ্নাদিষ্ট ‘হাড়িবাড়ির দুর্গাপুজো’

আমার গ্রামের বাড়ি নারায়ণপুর। পূর্ব বর্ধমান জেলার অন্তর্গত ছোট এক গ্রাম। তিনটে পুজো হয় সেখানে। একটি বারোয়ারি পুজো। অন্য দু’টি বাড়ির পুজো। সিনহা-বাড়ি ও সরকার বাড়ির পুজো। সিনহা বাড়ির পুজোকে গ্রামের মানুষ বলে ‘ঘটে-পটে পুজো’ অর্থাৎ এখানে মূর্তি আসে না। ঘটকেই দেবীজ্ঞানে পুজো করা হয়। গ্রামের মানুষ পুজোগুলিকে কেন্দ্র করে আনন্দে মেতে ওঠে। বারোয়ারি ও সিনহা বাড়ির পুজোর গল্প না-হয় অন্য কোনও সময় বলব, আজ বলি সরকার বাড়ির পুজোটির কথা।

আনুমানিক দেড়শো থেকে দু’শো বছর আগে এই পুজো শুরু হয় নারায়ণপুরের চাতরপাড়ায়। সরকার পরিবারেরর এক পূর্বপুরুষ (অনুসন্ধান করেও তাঁর নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সরকার বংশের বয়োজ্যোষ্ঠ ব্যক্তিরাও তাঁর নাম জানাতে পারেননি। কারণ যেসব দলিলে তাঁর নাম ছিল সেসব বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়ে গেছে।) তৎকালীন অবিভিক্ত বর্ধমান জেলার মহারাজের কাছ থেকে নারায়ণপুর-সহ তিনটি গ্রামে বিপুল জমির মালিকানা পান এবং স্থায়ী বাস শুরু করেন নারায়ণপুরে। তাঁর ইচ্ছে হয় দুর্গাপুজো করার। যথারীতি পুজো শুরু হয়। খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির চালায় দেবীর পুজো শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটির চালা এখন সিমেন্টের ঘরে রূপান্তরিত হয়েছে ঠিকই, তবে তার ছাঁদ সাধারণ ঘরের মতোই, মন্দিরের কোনও আদল নেই।

আরও পড়ুন: চুঁচুড়া আঢ্য বাড়ির দুর্গোৎসব: ঐতিহ্যের ২৮৬ বছর   

দেবী এখানে দশভূজা রূপে নন, পূজিত হন এক পাটায়, হরগৌরী মূর্তিতে। মূর্তি তৈরি হয় মাটি দিয়ে। মূর্তিতে দেবীর দু’টি হাত। দেবীর বাঁ-দিকে ষাঁড়ের উপর বসে থাকেন বাঘছাল পরিহিত মহাদেব। মাথায় তাঁর জটা ও সাপ। গলার রুদ্রাক্ষের মালা। বাবা-মায়ের সঙ্গে গণেশ ও কার্তিক থাকেন না। থাকেন বাহনহীন লক্ষ্মী, সরস্বতী আর শিবের দুই চ্যালা— নন্দী ও ভৃঙ্গি। তবে গ্রাম্য ভাষায়, লোকমুখে নন্দী ও ভৃঙ্গির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘দাঁতখামুচি’, ‘ছাগলমুখী’। একপাটা বা এক চালার মূর্তির উপরের দিকে চালচিত্র আঁকা হয়। গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই চালচিত্রে আঁকা থাকে গ্রামের বিদ্যালয়ের ছবি। আমার কাছে যা অত্যন্ত অভিনব বলেই মনে হয়েছে। মূর্তিতে এখনও ডাকের সাজ ব্যবহৃত হয়।

চালচিত্রে আঁকা থাকে গ্রামের বিদ্যালয়ের ছবি

দশভূজা মূর্তির পরিবর্তে এই মূর্তি পূজিত হওয়ারও একটি ইতিহাস আছে। সরকার বংশের যে পূর্বপুরুষ পুজো শুরু করেন তিনি সস্ত্রীক কাশী ভ্রমণে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি মন্দিরে হরগৌরী মূর্তি দেখে তাঁরা মুগ্ধ হন এবং ভাবেন তাঁদের পারিবারিক পুজোর মূর্তিও হবে হরগৌরীর মূর্তি। সরকার বংশের কুলদেবতা নারায়ণ তাই এই পুজোতে পশুবলি তো দূর, চালকুমড়া, লাউ ইত্যাদি কোনও ফসলও বলি হয় না। সন্ধিপুজোয় বলিদানের জন্য নির্দিষ্ট সময়টিতে এখানে আরতি হয়। পুরনো প্রথা মেনে আজও পুজোর পর নৈবেদ্য যায় গ্রামের প্রত্যেকটি ব্রাহ্মণ পরিবারে।

দশমীর দিন আসে প্রতিমা নিরঞ্জনের পালা। এই নিরঞ্জনের ক্ষেত্রটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে একতায়। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে এই প্রতিমা নিরঞ্জন যাত্রা একটি জোরালো প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত যেন! সমাজ যাঁদের ‘অন্ত্যজ শ্রেণি’ আখ্যা দেয়, তাঁরাই বাঁশের দোলা তৈরি করে প্রতিমা নিরঞ্জন যাত্রায় যেতেন এবং যান। সঙ্গে থাকেন সরকার পরিবারের ও পাড়ার লোকজন। এই পুজোকে ঘিরে খেটে খাওয়া মানুষের আনন্দ এখনও একই থেকে গেছে।

আরও পড়ুন: চুঁচুড়ার দত্ত-বোস-মল্লিক-বড় শীল বাড়ির দুর্গোৎসব আজও টিকিয়ে রেখেছে পরম্পরাকে

কথিত আছে, দুর্গাপুজোর পর সেই স্থানে লক্ষ্মীমূর্তির পুজো করতে হয়, কিন্তু সরকার বাড়িতে আলাদা করে লক্ষ্মীমূর্তি আসে না। পুজোর চারদিন পারিবারিক প্রথামত বাড়িতেই লক্ষ্মীদেবীর পুজো হয়।  

এই পুজো নিয়ে গোলমালও কম হয়নি। আনুমানিক নব্বই থেকে একশো বছর আগে, নন্দকুমার সরকারের সময় সরকার পরিবার একটি টালমাটাল অবস্থায় পড়ে। পর পর কিছু মৃত্যুতে নড়বড়ে হয়ে যায় পারিবারিক ভিত। সেইসময় তাঁদের বাড়ির পুজো চলে যায় পাড়ার লোকেদের হাতে। তারপর কয়েক বছর এই পুজোটি বারোয়ারি হিসাবে অনুষ্ঠিত হয়! এই ঘটনার প্রায় দশ থেকে কুড়ি বছর পর দেবেন্দ্রনাথ সরকার পুজোটি পুনরায় পরিবারে ফিরিয়ে আনতে চাইলে একটি ঝামেলার সৃষ্টি হয়। অবশেষে মামলা, মোকদ্দমা হাইকোর্ট অবধি গড়ায়। জিত হয় দেবেন্দ্রনাথ সরকারের। সরকার বংশ পুনরায় পারিবারিক প্রথায় পুজো শুরু করেন। বর্তমানে এই দেবেন্দ্রনাথ সরকারের বংশধরেরাই এই পুজো চালিয়ে আসছেন। এখন পর্যায়ক্রমে পুজোর দায়িত্ব পালন করেন আশিস সরকার, পিনাকী রঞ্জন সরকার, নলিনী রঞ্জন সরকার, কুমুদ রঞ্জন সরকার, শিবপ্রসাদ সরকার ও তাঁদের সন্তান-সন্ততিরা। সরকার বাড়ির এই দেবীর কোনও দেবত্ত সম্পত্তি নেই। পারিবারিক জমিজমা থেকে প্রাপ্ত অর্থই পুজোতে ব্যয় করা হয়।  

তবে, এইসব আপাত কেঠো ইতিহাস ও পারিপার্শ্বিক কাহিনি ছাড়িয়ে আমাদের গ্রামের আট থেকে আশি বছরের হৃদয়গুলো পুজো এলে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। পারিবারিক পুজোটি ঘিরে থাকে অসংখ্য মানুষের উৎসাহ। দাদু, জেঠু, বাবা ও অন্যান্য বয়স্ক ব্যক্তির মুখে শুনেছি আগে সানাই আসত, ঢাক- ঢোল তো ছিলই। এখন সানাই আসে না, ঢাক-ঢোলের শব্দে মুখরিত হয় গ্রামখানি। শহরের প্যান্ডেলে লাইন দিয়ে আমার পরিচিত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনেরা যখন থিমের আলোচনায় মত্ত থাকেন, তখন আমি দেখি মিটমিটে প্রকৃত আলোটি ঢাকের মুখরতায় ভেসে সমস্ত কৃত্রিম বাহারি আলো টপকে যাচ্ছে। উচ্ছল হচ্ছে সারল্য, উদ্‌যাপিত হচ্ছে উৎসব।

ঋণস্বীকার: নলিনী রঞ্জন সরকার, মধুসূদন রায়

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *