খড়গপুরের চমকায় ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে অনিন্দ্য সুন্দর শ্রীধর মন্দির

চিন্ময় দাশ

একদিকে পুণ্যতোয়া চিরপ্রবাহিনী গঙ্গা, অন্যদিকে ভারতের অন্যতম প্রাচীন রাজপথ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এই দুইয়ের মাঝখানে হুগলি জেলার প্রাচীন জনপদ বলাগড়। অযোধ্যারাম নাগ নামে এক বণিকের বাস ছিল সেখানে। ভাগ্যসন্ধানে বেরিয়ে পশ্চিমমুখে এগোতে শুরু করেছিলেন তিনি। শ’দেড়েক মাইল পথ উজিয়ে এসে থেমেছিলেন খান্দার পরগনার (মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর নগরীর অদূরে) চমকা নামের এক গ্রামে।

আরও পড়ুন: প্লাজমা-পোয়েম-প্রেয়ার একসূত্রে গেঁথেছে জগদীশ-রবি ঠাকুর-স্বামীজিকে

অযোধ্যারাম এসেছিলেন “নন্দ কাপাসিয়ার জাঙ্গাল” নামে সেকালের আর এক প্রাচীন পথ ধরে। ‘নন্দ’ নামের কার্পাস তুলোর এক ব্যবসায়ী তীর্থদর্শনে পুরীধাম যাত্রীদের জন্য পথটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। নতুন এলাকায় এসে, তুলোর ব্যবসাই শুরু করেছিলেন অযোধ্যারাম। কার্পাস তুলোর ব্যবসাতে হাত দিয়েই, তাঁরও বিস্তর লক্ষ্মীলাভ হল। দেখতে দেখতে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠেছিলেন।

আরও পড়ুন: বাংলার প্রাচীন বৈকুণ্ঠ চতুর্দশী

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় তখন। বড়লাট কর্নওয়ালিসের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ আইন প্রচলিত হয়েছে বছর ৫০ আগে। তার সুবাদে বহু ধনবান ব্যক্তি নতুন নতুন জমিদারি প্রতিষ্ঠা করছেন। ব্যবসার অর্থে অযোধ্যারামও বড়সড় একটি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করলেন। বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গড়া বস্তুর ভিতর বিশাল দিঘি আর চকমিলানো প্রাসাদ গড়লেন বসবাসের জন্য।

আরও পড়ুন: বিমানবন্দর না সবজি-মান্ডি?

জেলাজুড়ে চৈতন্যদেবের গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্লাবন চলেছে তখন। সেই প্রভাবে, অযোধ্যারামও বিষ্ণুকেই গ্রহণ করলেন আরাধনার জন্য। কোনও মূর্তি নয়, শ্রীধরজিউ নামিত শালগ্রাম শিলা প্রতিষ্ঠা করলেন বিগ্রহ হিসাবে।

সেকালে মেদিনীপুর জেলায় সেরা সূত্রধর ছিলেন ঠাকুরদাস শীল। নিবাস দাসপুর গ্রাম। মেদিনীপুর জেলার সূত্রধর সমাজের শিরোমণি তিনি। রাজা-জমিদাররা নাম লিখিয়ে রাখতেন ঠাকুরদাসকে দিয়ে মন্দির গড়াবার জন্য। তাঁকেই নির্বাচন করেছিলেন স্থপতি হিসাবে। দেখতে দেখতে বিশাল আকারের নব-রত্ন মন্দির গড়ে উঠল ঠাকুরদাসের হাতে। ঠাকুরদাস তাঁর জীবনে যতগুলি মন্দির গড়েছেন, চমকা গ্রামে অযোধ্যারাম নাগ-এর শ্রীধর মন্দিরটি তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

আরও পড়ুন: রেশম ও তসর শিল্পের সমৃদ্ধ জনপদ আনন্দপুরের রঘুনাথ মন্দির

ইটের তৈরি পূর্বমুখী তিন তলা বিশিষ্ট নবরত্ন মন্দির। ভিত্তিবেদিটি উঁচু। বর্গাকার মন্দিরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সাড়ে ২১ ফুট, উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট। তিনটি তলেই সামনে অলিন্দ। নিচতলার অলিন্দে ‘দরুণ’ রীতির খিলান যুক্ত তিনটি দ্বারপথ। থামগুলি ‘ইমারতি’ রীতির। গর্ভগৃহে একটিই দ্বারপথ। গর্ভগৃহ থেকে একেবারে ত্রিতল পর্যন্ত সিঁড়ি রচিত আছে।

কার্নিশের নীচ বরাবর একটি প্রতিষ্ঠা-লিপি আছে মন্দিরে। তার হুবহু বয়ান— ‘‘শ্রীশ্রীসৃধর জয়তি/ আরব্ধ সকাব্দা ১৭৭৮ সন ১২৬৩ সাল/ ৮ বৈশাখ ষুক্রবার-কৃত— শ্রীযুক্ত/ অযোধ্যারাম নাগ মিস্ত্রী ঠাকুরদাষ সিল মিস্ত্রী গোপাল চন্দ সাং দাসপুর।।” অর্থাৎ ইং ১৮৫৬ সালে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। 

মন্দিরের ন’টি রত্নই কলিঙ্গধারায় রথপগ বিন্যাস ও পীঢ় বিভাজন করা। দ্বিতলের চারটি রত্নে ত্রি-রথ এবং বাকি পাঁচটি রত্নে পঞ্চ-রথ বিন্যাস করা। ন’টি রত্নের গণ্ডি অংশ ভূমির সমান্তরালে পীঢ় ভাগ করা। তাতে অপার সৌন্দর্য ফুটে উঠেছিল মন্দিরে।

মন্দিরে বাড়তি সৌন্দর্য বিধান হয়েছে অজস্র টেরাকোটা অলংকরণে। সেগুলিই এই মন্দিরের প্রকৃত গরিমা। সামনের দেওয়াল জোড়া ফলক বিন্যাস। রামায়ন, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, পুরাণ কাহিনি ধরা হয়েছে মোটিফ হিসাবে। সেগুলির মধ্যে আছে— ১. রামায়ণ থেকে জনকের রাজসভায় রামচন্দ্রের হরধনু ভঙ্গ, পঞ্চবটী বনে সীতাদেবী, সুর্পণখার নাসিকা ছেদন, রাবণের সীতাহরণ, জটায়ুর যুদ্ধ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, রাম রাজা ইত্যাদি। ২. মঙ্গলকাব্য থেকে— ধনপতি এবং শ্রীপতির সিংহল যাত্রা, কমলে-কামিনী দর্শন ইত্যাদি। ৩. কৃষ্ণকথা থেকে— কালীয়নাগ দমন ইত্যাদি।

মন্দিরের দ্বিতলের অলিন্দে, কার্নিশের ওপরে, বড় আকারের দু’টি মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে সেগুলি মস্তকবিহীন। একটি মূর্তি মন্দির প্রতিষ্ঠাতা অযোধ্যারামের ছিল বলে, জানা যায়।

একটি ইটের প্রাচীর ছিল মন্দিরকে বেষ্টন করে। সেই অঙ্গনে মন্দির ছাড়াও আরও দু’টি সৌধ নির্মাণ করেছিলেন ঠাকুরদাস— উত্তরে ভোগঘর, আর দক্ষিণে দ্বিতলবিশিষ্ট একটি নহবতখানা।

এছাড়াও পৃথকভাবে উল্লেখ করবার মতো বিষয় হল, গর্ভগৃহের দরজার দু’টি পাল্লা। ৩০টি খোপে খোদাই কাজের যে অপূর্ব মুনশিয়ানা দেখানো হয়েছে, মেদিনীপুর জেলায় দারুতক্ষণ কাজের উৎকৃষ্ট নমুনা ছিল সেগুলি। তস্কর আর ধুরন্ধর পুরাপ্রেমীদের চাতুরীতে সিংহভাগই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। দু’টি পাল্লায় মোট ৩০টি ফলক ছিল, ৪টি সারিতে। ২০১৭ সালে আমরা তার মধ্যে মাত্র ৪টি দেখতে পেয়েছিলাম।

বংশবৃদ্ধির সূচনাতেই শরিকি বিভাজন শুরু হয়েছিল জমিদারদের। অযোধ্যারামের কনিষ্ঠ পুত্র নবীনচাঁদ (ওরফে নবীনচন্দ্র) নাগ পার্শ্ববর্তী নিশ্চিন্তা গ্রামে উঠে গিয়েছিলেন চমকা ছেড়ে। বিশাল অট্টালিকা গড়ে বসবাস করতেন। রাজ্য এবং রাজ্যের বাইরেও আছেন অনেকে। নবীনচন্দ্রের এক পুত্র রবীন্দ্রনাথ নাগ ছিলেন আইনজীবী। তিনি কর্মসূত্রে লন্ডনের অধিবাসী হয়েছিলেন। তাঁর বংশধরগণ বর্তমানে ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি এলাকায় বাস করেন। দেশ স্বাধীন হলে, জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে যায়। তাতে দেবতার সেবাপূজায় সংকটের সূচনা হয়। সেসময় নিশ্চিন্তার অধিবাসী শরিকরা বিষ্ণু-বিগ্রহটি তাঁদের পরিবারে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বহুকাল যাবৎ বিগ্রহ আর মন্দিরে নাই। তখন থেকে মন্দিরটি পরিত্যক্ত। অনাদরে, অবহেলায় মন্দির জীর্ণ হচ্ছে দিন-দিন। তার ওপর যোগ হয়েছে তস্কর আর ধুরন্ধর পুরাপ্রেমীদের আনাগোনা। প্রতিদিন এক পা এক পা করে ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে অনিন্দ্য সুন্দর দেবালয়টি।

সাক্ষাৎকার 
সর্বশ্রী অজয় নাগ, শান্তনু নাগ, শতদল নাগ— চমকা। দিব্যেন্দু নাগ, শরদিন্দু নাগ, অচিন্ত্য নাগ— নিশ্চিন্তা। মি. রোলান্ড চার্লস স্টুয়ার্ট— অস্ট্রেলিয়া (টেলিফোন যোগে)।

সমীক্ষা-সঙ্গী ও সহযোগিতা 
অরিন্দম ভৌমিক, মিডনাপুর.ইন।

পথ-নির্দেশ 
দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথের খড়গপুর-হাওড়া রুটে মাদপুর স্টেশন। সেখানে নেমে ৩ কিমি দক্ষিণে চমকা গ্রাম।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *