পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা বান্নু সমাজের হাতে শুরু হওয়া রাবণ দহন আজ রাঁচির ঐতিহ্য

ইন্দ্রজিৎ মেঘ

সালটা ১৯৪৮। ৭৩ বছর আগে সালে রাঁচিতে শুরু হয়েছিল রাবণ দহন। আয়োজকরা তখন কল্পনাও করতে পারেননি যে, তাঁদের এই ছোট্ট অনুষ্ঠান একদিন গোটা রাঁচির মানুষেরই উৎসব হয়ে উঠবে। পশ্চিম পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের একটি আদিবাসী এলাকা বান্নু শহর থেকে শরণার্থী হয়ে রাঁচিতে এসেছিল ১০-১২টি পরিবার। সেই পরিবার মিলে তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব দশেরা উদ্যাপন করেছিল রাবণ দহনের মাধ্যমে।

আরও পড়ুন: অতিমারির ভয়ংকরতার মধ্যেও পুজোর আনন্দ নতুন করে বেঁচে থাকার খোরাক

তৎকালীন ডিগ্রি কলেজ (পরে রাঁচি কলেজ, মেইন রোড পোস্ট অফিসের সামনে) প্রাঙ্গণে ১২ ফুট রাবণের নির্মাণকাজটি নিজ হাতে করেছিলেন স্বর্গীয় লালা মনোহর লাল নাগপাল, স্বর্গীয় কৃষ্ণ লাল নাগপাল, স্বর্গীয় আমির চাঁদ সতিজা, স্বর্গীয় তাহল রাম মিনোচা এবং স্বর্গীয় শাদিরাম ভাটিয়া এবং স্বর্গীয় কিষান লাল শর্মা। রাঁচিতে দশেরা দুর্গাপূজার মতো উদ্যাপিত হয়েছিল। প্রথমবার আশপাশের লোকেরা রাবণ দহন দেখেছিল। প্রথম বছর সন্ধ্যায় যখন রাবণ জ্বালানো হল, সেই সময় তিন-চারশো জন পাঞ্জাবি এবং স্থানীয়রা ড্রাম বাজিয়ে এই মুহূর্তটিকে উপভোগ করেছিলেন। রাঁচির সমাজকর্মী সন্দীপ নাগপাল জাগরণ.কম-কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন এই বিষয়ে। তিনি জানালেন, রাঁচি-সহ পাঞ্জাবের সব শহরেই রাবণের মুখোশ আগে গাধার মতো ছিল। ১৯৫৩ সালের পর রাবণের কুশপুতুলের প্রধান মুখোশ মানুষের মুখের আদলে তৈরি হতে শুরু করে।

আরও পড়ুন: ‘চলে গেছে দিন তবু আলো রয়ে গেছে’— চলে যাওয়ার ৩৪ বছর পরে আজও আলোকিত কিশোর কুমার

১৯৪৯ সাল পর্যন্ত মেইন রোডের ডিগ্রি কলেজের প্রাঙ্গণে রাবণের পুত্তলিকা নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে এরপর বান্নু সমাজ তাদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে। কারণ রাবণ তৈরির জন্য জায়গাটি খুবই ছোট পড়ছিল। এরপর রাবণের উচ্চতা ১২ ফুট থেকে ২০ ফুট বাড়ানো হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত রেলওয়ে স্টেশনে খাজুরিয়া তালাবের কাছে রেস্ট ক্যামেরা (রিফিউজি ক্যাম্প)-এ রাবণের পুত্তলিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। রাবণের দৈর্ঘ্য তখন আরও বেড়ে ২৫ থেকে ৩৫ ফুট পৌঁছয়। নির্মাণের সমস্ত খরচ বহন করেছিলেন স্বর্গীয় মনোহর লাল, স্বর্গীয় তেহাল রাম মিনোচা এবং স্বর্গীয় আমির চাঁদ সতিজা।

সমাজকর্মী সন্দীপ নাগপালের কথায়, “আমার বাবা অশোক নাগপাল এই ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন। বাবাকে রাবণের কাঠামোর উপর পুরনো সংবাদপত্র চিপকানোর কাজও দেওয়া হয়েছিল।” এটা বলা দরকার যে, প্রায় ১০-১২ বছর ধরে অশোক নাগপাল নিজের হাতে দায়িত্বের সঙ্গে এই কাজ করেছিলেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত বারি পার্কে (শিফটন প্যাভিলিয়ন টাউন হল) রাবণের কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর সময় ভিড়ও উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। ২৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের জমায়েত হত। নাচ করে, গান গেয়ে রাবণের মুখোশ পুজো করে রাবণ পোড়ানো হত। তবে অনুষ্ঠানের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বান্নু সমাজ এই অনুষ্ঠানের ভার পাঞ্জাবি হিন্দু ভ্রাতৃত্বের হাতে তুলে দেয়। আর বর্তমানে রাঁচিতে দুর্গাপুজোর মতো রাবণ দহনের ক্রেজও বেড়েছে।

আরও পড়ুন: কুমারীপূজা: বাংলাদেশের দিনাজপুরের রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রম

লালা দেশরাজ, লালা কাশ্মীরি লাল, লালা কে.এল.খন্না, লালা ধীমান জি, লালা রাধাকৃষ্ণ বির্মানি, ভগবান দাস আনন্দ, রামস্বরূপ শর্মা, মেহতা মদন লাল পাঞ্জাবি হিন্দু ভ্রাতৃত্বের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। রাবণ তৈরি শুরু হয় দোরান্দা রাম মন্দিরে এবং রাবণ দহন রাজভবনের সামনে নক্ষত্র বনে টানা দুই বছর ধরে আয়োজন করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বৃদ্ধির কারণে আয়োজকরা মোড়াবাড়িতে রাবণ দহন অনুষ্ঠান আয়োজন করাকেই উপযুক্ত মনে করেছিলেন। ১৯৬০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই মোড়াবাড়িতেই চলছে রাবণ দহন। পাঞ্জাবি হিন্দু ভ্রাতৃত্বের আয়োজকরাও মেঘনাথ ও কুম্ভকর্ণের পুত্তলিকাও তৈরি করতেন, আজও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। তবে করোনার বিধিনিষেধ মেনে গুচ্ছের নির্দেশিকা জারি করে সেখানে দুর্গাপুজোর অনুমতি দেওয়া হলেও রাবণ দহনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কারণ, এই অনুষ্ঠান বিশাল সংখ্যক জনতাকে আকর্ষণ করে।

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *