বীরদের নগর আর উলার মেলা

সম্পা গাঙ্গুলি

ব্রিটিশ শাসনকালের আগে গঙ্গা তীরবর্তী বীরনগরের নাম ছিল ‘উলা’। প্রবাদ আছে যে, উলু বনাকীর্ণ বিস্তীর্ণ চরের আবাদ থেকেই এই স্থানের পত্তন হয়েছিল বলেই এর নাম ‘উলা’ রাখা হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন পার্সি শব্দ ‘আউল’ বা ‘জ্ঞানী’ থেকেই এর নাম ‘উলা’ রাখা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: উজ্জয়িনী

উলাই চণ্ডী মন্দির

বীরনগর বা উলা ছিল জমিদার অধ্যুষিত অঞ্চল। কথিত আছে যে, দস্যু দমনে স্থানীয় মানুষের বীরত্ব দেখে ইংরেজরা এই স্থানের নাম দিয়েছিলেন ‘বীরনগর’— অর্থাৎ ‘বীর’দের নগর! জানা যায় খ্রিস্টীয় উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে জমিদার মহাদেব মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে একবার দস্যু হানা দিয়ে লুট করতে গেলে বীরনগরের সমবেত জনগণ ওই দস্যুদলকে দমন করেন এবং ১৮ জন দস্যুকে বন্দি করেন। তার পর সেই বন্দি দস্যুদের ‘কলকাতা কোর্ট অফ সার্কিট’ (kolkata Court of Circuit ) তৃতীয় জজের বিচারে চিরনির্বাসিত করা হয়। এর পরই নাকি সেই ইংরেজরা উলার নাম পরিবর্তন করে নাম দেন ‘বীরনগর’।

আরও পড়ুন: আঁধার আমার ভালো লাগে

উলাই চণ্ডীতলার বটগাছ

বীরনগর নদিয়া জেলার একটি অতি প্রাচীন জনপদ ও সমৃদ্ধ পৌরসভা (যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৯ সালের ১ মার্চ)। এই পৌরসভার সপ্তম পৌর পিতাছিলেন কবি নবীন চন্দ্র সেন। কারণ তৎকালীন নিয়মানুসারে রানাঘাট মহকুমার মহকুমা শাসকই পদাধিকার বলে পৌরসভার পৌরপিতা হতেন। ১৮৫৭ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত বহুদিন ব্যাপী ম্যালেরিয়া জ্বর ও মহামারির ফলে এই বীরনগরের জনসংখ্যা দিনে দিনে কমতে থাকে।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)

মুস্তাফিদের দুর্গা মন্দির

উলা বা বীরনগরের বিখ্যাত জমিদার বংশ ছিল মিত্র মুস্তাফি, মুখার্জি, খাঁ বংশ ইত্যাদি। মিত্র মুস্তাফি বংশের খ্যাতি ও মর্যাদা চরমে পৌঁছয় জমিদার রামেশ্বর মিত্র মুস্তাফির সময়কালে। তিনি ছিলেন পণ্ডিত মোহন মিত্রের পুত্র। এ ছাড়া রামেশ্বর মিত্র নিজেও একজন শিক্ষিত ও সম্মানীয় ব্যক্তি ছিলেন। সেই সময়ে ভারতে রাজ করছেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব। আর বাংলার সুবেদার পদে ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। রামেশ্বর মিত্র ছিলেন শায়েস্তা খাঁ-র কোষাধ্যক্ষ ও হিসাবরক্ষক। ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে নিজের কাজের পারদর্শিতার জন্য স্বয়ং আওরঙ্গজেব তাঁকে ‘মুস তৌ ফি’ বা ‘মুস্তাফি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এবং এর স্মারক চিহ্ন হিসেবে একটি ‘সোনার পাঞ্জা’ উপহার দেন। কিন্তু বর্তমানে সেটি কোথায় এবং কার কাছে আছে, তা জানা যায় না। এই রামেশ্বর মিত্র মুস্তাফি একটি অপরূপ সুন্দর চণ্ডীমণ্ডপও তৈরি করেছিলেন। যার নিদর্শন এখনও নবনির্মিত চণ্ডীমণ্ডপের ভিতরে রয়েছে।

আরও পড়ুন: এক সমুদ্রকন্যা ও তার সমুদ্র-সুতো তৈরির গল্প

দ্বাদশ মন্দিরের গেট

রামেশ্বর মুস্তাফির আর এক সৃষ্টি হলো তাঁর বাড়ির রাধাকৃষ্ণ মন্দির স্থাপন। তখন বাংলায় ‘এক বাংলা’ বা ‘দোচালা’ মন্দিরের চল ছিল। এই ধরনের জোড়া বাংলা স্টাইলের রাধাকৃষ্ণ মন্দির বীরনগর ছাড়া একমাত্র বিষ্ণুপুরে দেখতে পাওয়া যায়। ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে এই বংশের শিবরাম মুস্তাফি বীরনগরে তৈরি করেন ‘দ্বাদশ মন্দির’।

বীরনগরের আর এক জমিদার বংশ মুখার্জি পরিবারের মহাদেব মুখার্জি ঢাকা থেকে ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে উলা বীরনগরে আসেন এবং রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অধীনে জমিদারি গ্রহণ করেন। কথিত আছে যে, জমিদার মহাদেব মুখার্জি ঢাকা থেকে ১০ ফুট উচ্চতার একটি পিতলের রথ নিয়ে আসেন। তবে এই রথের উৎসবের জাঁকজমক ঘটান এই বংশেরই জমিদার বামন দাস মুখার্জি। এই রথের চাকাগুলো ও পিতলের ছিল। গোটা বীরনগর জুড়ে এই রথ পরিক্রমা হত। কিন্তু এখন আর তেমন জাঁকজমক হয় না।

আরও পড়ুন: ত্রাসের‌ ‌কবিতা‌ ‌

মুখার্জিদের সিংহ দরজা

এই উলা বীরনগর শিক্ষা সংস্কৃতিতেও অনেক উন্নত ছিল। এখানে বহু উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যেমন কৃষ্ণরাম ন্যায় পঞ্চানন, শিব শিব তর্ক রত্ন, হেমচন্দ্র মিত্র, চন্দ্রশেখর বসু, ভক্ত বিনোদ ঠাকুর, কৃষ্ণনগর রাজসভার হাস্যরসিক মুক্তারাম মুখোপাধ্যায়। এছাড়াও বিখ্যাত সাহিত্যিক রাজশেখর বসুর পৈতৃক বাড়িও ছিল এই উলা বীরনগরে। রাজশেখর বসুর দাদা গিরীন্দ্রশেখর বসু, যিনি ভারতীয় মনস্তত্ত্বের জনক তাঁর সঙ্গেও এই বীরনগরের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

আরও পড়ুন: জ্যাঙ্গো, র‍্যাম্বো আর ফুটবল

রাজশেখর বসুর পৈতৃক বাড়ির সদর দরজা

উলা বীরনগরে বিশেষ বিশেষ কিছু দর্শনীয় স্থানও আছে। যেমন জোড়া বাংলা মন্দির, মিত্র মুস্তাফির বাড়ি, রাজশেখর বসুর পৈতৃক বাড়ি, উলাই চণ্ডীতলা, উলা শঙ্করীর মন্দির, চণ্ডীমণ্ডপ, দ্বাদশ মন্দির ইত্যাদি। কিন্তু এই দর্শনীয় স্থানগুলো সংস্কারের অভাবে এখন প্রায় নষ্ট হতে বসেছে।

প্রাচীন বীরনগরে আরও একটি বিখ্যাত জিনিস তৈরি হত সেটি হল ‘ডাকের সাজ’। যা দিয়ে প্রতিমা সাজানো হয়। এই ডাকের সাজ সর্বপ্রথম বীরনগরে তৈরি করেছিলেন নীলমণি আচার্য ও কানাইলাল আচার্য নামে দুই ভাই। এঁরা বীরনগরের পালিত পাড়ায় বসবাস করতেন। পরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁদের কৃষ্ণনগরে নিয়ে যান। সেই থেকে ওই আচার্যদ্বয়ের বংশধরেরা পাকাপাকিভাবে কৃষ্ণনগরেই বসবাস করতে থাকেন, বর্তমানে তাঁদের আর কোনও বংশধর বীরনগরে থাকে না।

আরও পড়ুন: ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

এর প্রাচীন ইতিহাস জানাও কঠিন নয়। ষোড়শ শতাব্দীর অন্যতম গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থেও উলা বীরনগরের উজ্জ্বল উপস্থিতি নদিয়া তথা বীরনগরবাসীর কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এছাড়া ও কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে উলার উল্লেখ বীরনগরবাসীর কাছে গর্বের বিষয়। চণ্ডীমঙ্গল কাব্য থেকে জানা যায় যে, শ্রীমন্ত সওদাগর ও তাঁর পিতা ধনপতি সওদাগর সিংহল থেকে ফেরার পথে এই উলার ঘাটে দেবী চণ্ডীর পুজো করে গিয়েছিলেন। অপর দিকে এই উলা বীরনগরের আর এক সুসন্তান দুর্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কর্তৃক রচিত ‘গঙ্গা ভক্তি তরঙ্গিণী’ গ্রন্থে ও উলা বীরনগর এবং সেখানকার বট বৃক্ষের নীচে অবস্থান কারিণী দেবী চণ্ডীর কথা উল্লেখ করা আছে। তাঁর রচিত গঙ্গা ভক্তি তরঙ্গিণীর একটি স্তবক উল্লেখ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে—

আরও পড়ুন: অভিন্ন হৃদয় বন্ধু: অ্যাশ, ব্রক, মিস্টি এবং পোকেমন

“অম্বিকা পশ্চিম পাড়ে     শান্তি পুর পূর্ব ধারে,
রাখিয়া দক্ষিণে গুপ্তি পাড়া ,
উল্লাসে উলায় গতি বট মূলে ভগবতী
যথায় পাতকি নহে ছাড়া।
বৈশাখেতে যাত্রা হয় লক্ষ লোক লক্ষ্য হয়,
পূর্ণিমা তিথিতে পুণ্যচয়,
নৃত্য গীত নানা নাট দ্বিজ করে চণ্ডীপাঠ
মানে যে মানোসা সিদ্ধ হয়।”

আরও পড়ুন: ‘পকেট হারকিউলিস’ হার মেনেছিলেন

বীরনগর বড়বাজার শিব মন্দির

সেদিনের সেই উলাই বর্তমানে বীরনগর নামে পরিচিত। উলা বীরনগরের আপামর জনসাধারণের রক্ষাকারিণী দেবী উলাই চণ্ডী এই বটবৃক্ষের ছায়া তলে সারাবছর ধরে পূজিতা হলেও প্রতি বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার তিথিতে দেবী চণ্ডীর বার্ষিক পূজা মহা সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে দীর্ঘ কয়েকশো বছর ধরে। এই পূজো উপলক্ষে বট বৃক্ষের নীচে এক দিনের মেলাও অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে প্রায় ভোররাত থেকেই মেলা শুরু হয়ে যায়। বটবৃক্ষের চতুর্দিক ঘিরে বহু পুরোহিত বসে ভক্তদের পুজো করে দেবার জন্য। হাজার হাজার মানুষ আসে দূর-দূরান্ত থেকে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের মানুষই এই উলাই চণ্ডীমেলায় অংশগ্রহণ করেন। আবার মেলা শেষে যে যার মতো ঘরে ফিরে যায়। দোকানপাটে ভরে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ। চলে দর কষাকষি, হাঁক-ডাক, বেচা-কেনা। ক্রেতা-বিক্রেতার হই-হট্টগোলে মেলার প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে জমজমাট। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও বহু দোকানপাট ও বহু লোকের সমাগম ঘটে এই মেলায়। জিলিপি, পাঁপড় ভাজার গন্ধে চারিদিক ভরে ওঠে। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই উলাই চণ্ডী মেলারও যবনিকা পতন ঘটে। এই মেলা বীরনগরের দলমত নির্বিশেষে সমস্ত শ্রেণির মানুষের আবেগের মিলন ক্ষেত্র। বীরনগর শহরের এমন কোনও বাড়ি নেই যে, সেদিন উলাই চণ্ডী মেলায় আসে না। কিন্তু গত দু’বছর ধরে এই উলাই চণ্ডীর মেলা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সমস্ত বীরনগরবাসী মর্মাহত। কারণ সারা পৃথিবী জুড়ে যে ভয়ংকর করোনা অতিমারি চলছে তার আঁচ বীরনগরেও পড়েছে।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ এবং চার বাঙালি যুগপুরুষ

অন্যদিকে, এই মেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বীরনগরের অর্থনীতিও। তাই উলাই চণ্ডীমেলা বন্ধ হওয়ায় সমস্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। বহু লোক এই মেলায় বিভিন্ন রকম ভাবে অর্থ উপার্জন করে। কিন্তু এই অতিমারি সব কিছুই নষ্ট করে দিয়েছে।

উলাই চণ্ডীর মেলার সময়েই আর ও দু’টো পুজো অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণপাড়া বারোয়ারি মণ্ডপে হয় মহিষাসুরমর্দিনী এবং বড়বাজারে অনুষ্ঠিত হয় বিন্দুবাসিনী পুজো (মা দুর্গারই আর এক রূপ)। এই বিন্দুবাসিনী পুজো উপলক্ষে ও বীরনগর বড়বাজারে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এখানেও বহু লোক সমাগম ঘটে। সমস্ত বীরনগরবাসী এই দিনগুলোর জন্য অপেক্ষা করে থাকে।

আরও পড়ুন: অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

জোড়া বাংলা মন্দির

জমিদারি আমলে এই বিন্দুবাসিনী মেলা উপলক্ষে যাত্রা, কবি গান, খেউড়, টপ্পা, ঝুমুর ইত্যাদি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হত। এখনও যাত্রা গান অনুষ্ঠিত হয় মেলার চারদিন অর্থাৎ যে চার দিন প্রতিমা থাকে। এখানেও দোকানপাট, ক্রেতা বিক্রেতার ভিড়ে মেলা জমজমাট হয়ে ওঠে। কিন্তু এই করোনা অতিমারিতে উলাই চণ্ডীর মতো এই মেলাও বন্ধ রয়েছে। কিন্তু যে সমস্ত মানুষ এই মেলা উপলক্ষে অর্থ উপার্জন করে বা করত তাদের উপরে এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক আঘাত নেমে এসেছে। আশা রাখি, করোনা মুক্ত পৃথিবীতে এই উলাই চণ্ডীর মেলা প্রাঙ্গণ পুনরায় ‘মানুষের মিলন মেলায় মুখরিত হয়ে উঠবে’।

ছবি ঋণ: চৈতি ধর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *