বনের দোল, মনের দোল

পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়

জঙ্গল কখনও রংহারা হয় না বুঝলেন! বললেন হলং-এর বনবিভাগের এক কর্মী। তাঁর সঙ্গে গল্প হচ্ছিল উদাল/ ওঁদাল নিয়ে। “এই ফল উত্তরবংলার অর্থনীতিতে বেশ ভালো অংশ নেয়। লাল রং তৈরি করতে, আর বীজ ভাজা করে খাওয়াও হয়”, সত্যিই আমরা দেখছিলাম, প্রতি বাড়ির সামনে সামনে ফল শুকোচ্ছে। অথচ আমি খানিক আগে কুড়োতে যেতেই গাইড ড্রাইভার ধমক লাগিয়েছিল! হাত চুলকে মুশকিলে পড়বেন, এই বলে। গায়ের রোঁয়া হাতে লাগলে এই হয়, সে বলল। তাতে আমার প্রশ্ন ছিল, তারপর সেরে যায় কি না! সে উত্তর দেয়নি, আর আমিও প্লাস্টিকে ভরে ফেলেছিলাম গাছ থেকে ঝরে পড়া ফলের গুচ্ছ, সাজাব বলে। এখন কথা হচ্ছে ফাগুন নিয়ে, “ধরায় এসেছে ফাগুয়া/ হোলি হ্যায়”…

আরও পড়ুন: রানাঘাটে রঙের উৎসব

উদাল পাতা। রংতুলি লেখক

“ফাগুন লেগেছে বনে বনে” কথাটা যে মস্ত সত্যি, সেইসব আলোচনা হচ্ছিল। বনবিভাগে কাজ করা মানুষ এই বনকে কতটা ভালোবাসেন, তার তারিফ করছিলাম মনে মনে। দেখার চোখ, উপলব্ধি করার চোখ খুলে দিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, একথা অস্বীকার করার নয়। এই বাংলার ফাগুন যে কী দুর্দান্ত মন পাগল করা রং নিয়ে আসে, সেইসব ভাবতে বসেছি। এই দোলের সময় সারা উত্তরবঙ্গে, শিলিগুড়ি পার হলেই দেখা যাবে সবুজ গাছের মাথায় লাল রঙের থোকা থোকা কী ফুল!, যাচ্ছিলাম হাসিমারা। পথে ট্রেন থেকে দেখা এই ছবি। কাছ থেকে দেখলাম ওগুলো ফুল নয়, ফল। উদালের ফল। বাক্সবাদাম (স্টারক্যুলিয়া ফেটিডা) ভায়রাভাই এই উদাল (স্টারক্যুলিয়া ভিল্লোসা)-এর ঘিয়ে রঙের ফুল ফোটে থরেথরে ফেব্রুয়ারিতে, বিশেষত পাহাড়তলিতে, তারপর অপূর্ব লাল ফলের বাহার বনে বনে হোলি লাগিয়ে দেয় ফুল শেষ হলেই। শীতের আমেজ থাকতে থাকতেই পাতা ঝরার খেলা শুরু হয়, তা নইলে নতুনের দল কী করে ঢুকবে?

আরও পড়ুন: আমি, গাছ, ফুল ও উত্তম কুমার

বাদামপাতা। রংতুলি লেখক

বনে বনে তোড়জোড় শুরু হয়, যাকে বলে ‘সবুজের অভিযান’। পাতায় পাতায় দোলের প্রস্তুতি। হ্যাঁ, গাছপালার রং খেলা শুধু ফুল ফুটিয়েই নয়, পাতাদের রকমসকম দেখলে অবাক লাগবে। কারোর নতুন কচি পাতায় আবির খেলার রং, কারো ঝরা পাতায় কুসুমের নতুন কচি লাল পাতা বন মাতিয়ে দেয়। মহুয়ার কচি পাতা টুকটুকে লাল, বহেড়ার-ও। অশ্বত্থের গোলাপি। ওদিকে বাদাম, জারুল আর অর্জুন ঝরার সময় লাল হয়ে ঝরে। তবে বাদাম বেশি লাল হয়। গোলাপির কথায় মনে এল সারিঙ্গা বা গ্লিরিসিডিয়ার ঝিরঝিরে সাদাটে গোলাপি ফুলের কথা, ফেব্রুয়ারির শেষে পাতাহীন গাছ ভরে থাকে। অশোকের হলুদ রং কিন্তু শীতের শেষ থেকেই রংতুলি নিয়ে নেমে পড়ে আসরে।

আরও পড়ুন: ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’

হলুদ পলাশ। রংতুলি লেখক

তারপর লালের খেলা। প্রথমে ফুটবে রুদ্রপলাশ, কমলাটে লাল, তারপর অশোক, সেইসঙ্গে সব পাতা ঝরিয়ে ফুটবে পলাশ, সিঁদুরে লাল, লাল, হলুদ, কমলা রঙের আবির খেলার পরের মাটি যেমন হয়, তেমন করে বিছিয়ে থাকে ঝরে, অগুন্তি, অশেষ। তাই কুড়িয়েই সাজা যায়, কিন্তু ডাল ভেঙে ফুল ছিঁড়ে খেলায় মাততে মাততে কেমন বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছি আমরা। রেডিয়োতে গান বাজে, “বনে কি আগুন লেগেছে/ না না না, পলাশ ফুটেছে”। আমাদের দোল খেলা কৃত্রিম রঙে, জঙ্গলের হোলি খেলা অনন্ত রঙিন। পলাশের পাশাপাশি শিমুলের লাল, মন্দার বা মাদারের লাল। লাল মাটির দেশে দেখি আরেক রকম, সোনার বরণ গলগলির (কক্লোস্পারমাম রিলিজিওসাম) সোনা হলুদ।

আরও পড়ুন: বীণাপাণির হিরণকিরণ ছবিখানি…

ও তল্লাটে পুজোর ফুল এই দিয়েই, তাই বুঝি রিলিজিওসাম নাম। শিমুল ঝরতে লাগবে হপ্তা দুই, ততক্ষণে হলুদের ফোয়ারা ছোটাবে টেকোমা। আর বসন্তদূতী, ফাগুনবউ, ট্যাবিবুইয়া ক্রিসান্থা আর গামারের হলুদ পুতুল পুতুল ফুল। এর ফাঁকে মিনাকারি রং ছেটাবে নীলমণিলতা। এদের যদি বিদেশ থেকে আসা বলে একটু দূরেও রাখি তাহলে দিশি হলুদ ফুল সোঁদাল, সোনালুর (ক্যাসিয়া ফিশ্চুলা) গাছে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে, কবে তারা হলুদ ঝাড়বাতি ঝোলাবে ডালে ডালে! ঘোর গরমে তাদের আগমনী। পাহাড়ে পাহাড়ে সাড়া পড়ে গেছে লাল রডোডেন্ড্রনের। মানুষের রং খেলার উৎসব দু-একদিনে ফুরিয়ে যায়, প্রকৃতির রঙের খেলা নিত্যনতুন। শিমুল পলাশের দিন শেষ হলেও বনের রং ফিকে হবে না, তখন আসবে কৃষ্ণচূড়ার, স্বর্ণচূড়া, রাধাচূড়া, গুলমোহর, গোলাপি ক্যাসিয়া, রক্ত কাঞ্চন, করবী, অক্লান্ত ফুটে ঝরবে ট্যাবিবুইয়া রোজিয়ার বা পিঙ্ক ক্যাসিয়ার গোলাপি ফুলেল আবির।

আরও পড়ুন: পুলিপিঠের রূপকথা

লালের দিন শেষ হলে আসরে নামবে বেগুনি জারুল, আমার দেশের গর্ব (প্রাইড অফ ইন্ডিয়া)। তারপর বর্ষা নামলে সব রং ধুয়ে দিয়ে আসবে সাদা ফুলের ঢল। বনের দোল উৎসব, রঙের উৎসব থেকেই ধার নিয়ে আমরা নকল বসন্ত উৎসবে মাতি, প্রকৃতিকে নকল করে শাড়ি জামা রঙে ছোপাই, লালে হলুদে, সবুজে গাছ হয়ে উঠতে চাই। রঙের নেশায় দুলে দুলে সুরে গানে উৎসব সাজাই।

বিঃদ্রঃ প্রচ্ছদচিত্রটি স্বর্ণচূড়ার। এঁকেছেন লেখক।

পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায় পেশায় সরকার প্রোষিত স্কুলের শিক্ষক। গাছ নিয়ে কিছু পাগলামি আছে। স্কুলের ছাদে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে জৈব চাষ করান। ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন যখন যেমন সুযোগ মেলে, সঙ্গে থাকে নোটবই যেখানে ছবি আর লেখা জমা হয়। আর ভালোবাসেন বন্ধু পাতাতে। প্রকৃতি ও মানুষ তাঁর কাছে পরম বিস্ময়কর।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Goutam Chattopadhyay

    খুঁজছিলাম কুসুমের ছবি, ও পিয়ালী এঁকে দেওয়া যায় না! দারুণ। ভেসে যাচ্ছি রঙের স্রোতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *