করোনা পরিস্থিতি শিক্ষাক্ষেত্রে বৈদ্যুতিন বিপ্লব নিয়ে এসেছে, পর্যালোচনা

পারমিতা দাস

২০২০-র ৩১ ডিসেম্বর চিনের ইউহানে এক অজানা রোগ সম্পর্কে হু-কে সতর্ক করে দেয় চিন। ৭ জানুয়ারি চিন করোনাভাইরাসকে চিহ্নিত করে ও এর নাম দেয় ‘২০১৯ এন কোভিড’। ১১ মার্চ এই রোগের প্রাদুর্ভাবকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘বিশ্ব মহামারি’ নামে ঘোষণা করে। এরপর সব দেশেই একের পর এক লকডাউন ঘোষণা করা হয় এই রোগ প্রতিরোধের প্রথম উপায় হিসবে। ২০২০ সালের ২৪ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি করোনা ভাইরাসের সম্প্রসারণ ঠেকাতে লকডাউন ঘোষণা করেন। তাঁর আগেই স্কুল, কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পড়াশোনা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি, ইন্টারনেটের যুগে তার দরকার হয়নি। মার্চের শেষের দিক থেকে সব স্কুল-কলেজে ঘরে বসে অনলাইনে পঠন-পাঠন শুরু হয়ে যায়। এ-ব্যাপারে সাহায্য করেছে বিভিন্ন অ্যাপ, যেমন― গুগুল ক্লাস রুম, গুগুল মিট, জুম অ্যাপ। প্রায় এক বছর হতে চলল স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা অনলাইন পড়াশোনায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আজ থেকে স্কুলের কিছু কিছু ক্লাস শুরু হয়ে গেল। আসুন জেনে নিই, তাদের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল।

আরও পড়ুন: বীণাপাণির হিরণকিরণ ছবিখানি…

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের স্কুলের ছেলেমেয়েদের থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল তাদের  অনলাইন পড়াশোনা সম্পর্কে। অনলাইন পড়াশোনা কেমন লাগছে, তা জানতে চাইলে বেশিরভাগ পড়ুয়ারাই জানিয়েছে ঠিক আছে অর্থাৎ খারাপ লাগছে না বা খুব অসুবিধা হচ্ছে না। শতকরা ৬১.৫% এই মত দিয়েছে। আর ৬৫.৩% পড়ুয়া মনে করে ক্লাস রুমে বসে পড়াশোনা বেশি  ভালো ছিল। তাদের মতে, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা অনেক। তার মধ্যে প্রধান হল নেটওয়ার্ক সমস্যা আর ছাত্র-শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার  সুযোগ প্রায় থাকে না। প্রায় সব ছাত্রছাত্রী এই অসুবিধার কথা জানিয়েছে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিডিয়ো বন্ধ থাকে বলে ছাত্রছাত্রীদের অমনোযোগী হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। শিক্ষক এক্ষেত্রে জানতে পারেন না যে, তাঁর ছাত্রছাত্রীরা পড়া আদৌ শুনছে নাকি। এছাড়া দিনে চার পাঁচ ঘণ্টা একটানা মোবাইল বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের উপর চাপ সৃষ্টি হয় এমন কথাও অনেকে জানিয়েছে। সব বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয় না সব সময়। বিশেষ করে ব্যবহারিক বিষয়ের, তার ফলে বেশ চিন্তায় পড়েছিল। তাই গতকাল থেকে স্কুলের পড়াশোনায় ব্যবহারিক বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই বিষয়ের ক্লাস শুরু করে দেওয়া হয়েছে। দু-তিনজন ছাত্রী জানিয়েছে, স্কুলজীবনের অনেক মজা থাকে যেগুলি ঘরে বসে পাওয়া যায় না। অনলাইন পড়াশোনায় সাধারণত ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক সবাই ক্যামেরা বন্ধ করে রাখে। ৫৭.৬% ছাত্রছাত্রী জানিয়েছে, শিক্ষকদের মুখ দেখা পড়া শোনার সময় গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বেশিরভাগ (৫৩.৮%) পড়ুয়া সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। একটি বিষয়ে সবাই সহমত যে, ক্লাসরুমে বসে পড়াশোনা করা অনেক বেশি উপযোগী পড়ুয়াদের জন্য।

একথা ঠিক যে, ঘরে বসে পড়াশোনার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে নিঃসন্দেহে। সেই সমস্যা শুধু ছাত্রছাত্রীদের না শিক্ষকদেরও হয়েছে। মূল্যায়ন নিয়ে কিছু বিতর্ক থেকেই যায়। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, যে ছাত্রী বা ছাত্র সারাবছর মন দিয়ে ক্লাস করে, সে হয়তো কম নম্বর পাচ্ছে। আর যে খুব কম ক্লাস করে সে বেশি নম্বর পাচ্ছে। কারণ সে ঠিক সময় খাতা জমা দিচ্ছে না। সে বলতেই পারে আমার নেট কাজ করছিল না, তাই জমা দিতে দেরি হয়েছে। এই সমস্যা কলেজের পরীক্ষার ক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতা অতিত্রম করার কোনও উপায় নেই।

আরও পড়ুন: শতাব্দী পেরিয়ে ভ্যাকসিনের ইতিকথা: স্মলপক্স-বিসিজি থেকে করোনার ভ্যাকসিনের দিকে ভারত

Image result for online education

সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি, কোনও সন্দেহ নেই সেই বিষয়ে। বেশিরভাগ শিক্ষকই লকডাউনের আগে এমএসওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, এক্সেলের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এখন শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী সবাই খুব সহজেই গুগুল মিট, জুম অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ তৈরি করতে পারে। অনলাইনে স্ক্রিন দেখিয়ে সুন্দর করে পড়ানোর পদ্ধতি শিক্ষকরা রপ্ত করেছে। গুগুল ক্লাসরুমের মাধ্যমে নোট দেওয়াও অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল, সব টিচারদের নোট মোবাইলে রাখতে গেলে অনেক বেশি তথ্য রাখতে সম্ভব এমন মোবাইল কিনতে হবে ছাত্রছাত্রীদের। সেই মোবাইলের দাম অনেক বেশি। অত দামের মোবাইল বা কম্পিউটার বা ল্যাপটপ সবার পক্ষে কেনা সম্ভব না। তবে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীর কাছে এখন অ্যানড্রয়েড ফোন, তাই বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী ক্লাস করতে পারছে। শিক্ষকরা যে নোট দিচ্ছে, তা যদি তারা খাতায় লিখে ফেলে মোবাইলে না জমিয়ে, তাহলে আর মোবাইলে স্থান সংকুলানের সমস্যা হবে না। প্রথম প্রথম অসুবিধা হলেও প্রায় ১১ মাসে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকা উভয়ে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছে। স্কুলে এখনও বেশিরভাগ ক্লাসের পড়াশোনা অনলাইন চলছে। কলেজ খোলার নির্দেশ এখনও দেননি শিক্ষামন্ত্রী। তাই সেখানে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাই চলছে। শুধু পড়াশোনাই নয়, বিভিন্ন ওয়েবিনারও কলেজগুলি সাফল্যের সঙ্গে সংগঠিত করেছে। এক কথায় করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতি শিক্ষাক্ষেত্রে বৈদ্যুতিন বিপ্লব নিয়ে এসেছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার
সাক্ষাৎকার

শ্রেয়সী (দিল্লি), ঊষসী (দিল্লি), দিবসা (দিল্লি), প্রার্থনা (দিল্লি), শ্রীহান (দিল্লি) তৃ্ণা (কলকাতা), সুচিস্মিতা (কলকাতা), ঋষিতা (কলকাতা), মোহাক (চেন্নাই), দীপ্তর্ষি (কলকাতা), মৃন্ময়ী (কলকাতা), রূপকথা (কলকাতা), অমৃতা (কলকাতা), ত্রিণাঙ্কুর (কলকাতা), আধিঋষি (দিল্লি), দেবলীনা (কলকাতা), আরিয়ান (দিল্লি), হাসি (কলকাতা), নৈশা (দিল্লি), প্রসেনজিৎ (কলকাতা), ঋষিতা (কলকাতা), সামরিন (কলকাতা), সৈয়দ ইমরান (কলকাতা), সুমাইয়া (কলকাতা), শুভায়ন (কলকাতা) এবং শ্রেয়স (কলকাতা)।

লেখক সহযোগী অধ্যাপক, চিত্তরঞ্জন কলেজ, কলকাতা 

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *