আমার ঘোরা বাংলাদেশের গ্রামের পুজোর পিছুডাকা দিনগুলি

BD Durga

সিদ্ধার্থ অভিজিৎ (বাংলাদেশ)

আমি ২০০২ সালকে আমার শৈশবের শুরু বলে মনে করি। কারণ, আমার স্মৃতির যাত্রা ২০০২ থেকেই। সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার একটা প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম। শহর থেকে এলাকাটা ঢের দূরে, যোগাযোগ ব্যবস্থাও সেসময় ছিল একেবারে নড়বড়ে। আধুনিকতার ছোঁয়া তখন কেন, এখনও পর্যন্ত ক্ষীণ। আমার গ্রাম ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় নানা ধর্ম-নানা জাতির সহবস্থান। আমার বাল্যকাল কেটেছে এই গ্রামে। মেঠো পথ এক গাঁয়ের সঙ্গে আর গাঁয়ের গাঁটছড়া বেঁধেছে শক্তপোক্ত করে। গ্রীষ্মের প্রখর গরমে গরুর খুরের চাপে পথের শুকনো ধুলো হাওয়ায় চঞ্চল, আবার বর্ষায় সে পথে কাদা-মাটির ছড়াছড়ি। আমার বাল্যস্মৃতির দুর্গাপুজো আমাকে আজও শিহরিত করে। আমাদের দু’চার গাঁয়ের মধ্যে কোনও দুর্গাপুজোর চল ছিল না। কাছাকাছি বলতে, প্রায় ২ মাইল দক্ষিণে আর আড়াই মাইল উত্তরে পুজো হত। পায়ে হাঁটা পথ। ফলত, আমার বাড়ির পাশের খুব কম লোক পুজো দেখতে যেত।

আরও পড়ুন: দেবী যাক বিসর্জনে

২০ বছর আগের স্মৃতিগুলো হাতড়াতে বসে আজ খুব পুলকিত হচ্ছি। আহ্! কি দিন ছিল। বলতে দ্বিধা নেই, আমার মা ধর্মভীরু মানুষ। তাঁর মতো এমন পুলুকে মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি৷ অন্য লোক যাক বা না যাক, দুর্গাপুজোয় মা অঞ্জলি দিতে যাবে না, এটা হতেই পারে না। মায়ের হাত ধরে আমার প্রথম দুর্গাপুজো দেখা (অন্তত যতটুকু মনে করতে পারি!)। মা অষ্টমী পুজোর দিন সকাল সকাল আমাকে টেনে তুলতেন ঘুম থেকে। প্রায় তিন কিলোমিটার পায়ে হাঁটা পথ, তাড়াতাড়ি রওনা না হলে পৌঁছতে পৌঁছতে অঞ্জলি শেষ। এমন ঘটনা অনেকবারই ঘটেছে। আমরা পৌঁছে দেখি পুজো প্রশস্ত। দেখতাম সকালে উঠে মা স্নান করে ফুল তুলে আনতেন, সেই ফুল নিয়ে যেতাম অঞ্জলি দিতে। বর্তমানের মতো অধিক সংখ্যক পুজো উদ্‌যাপিত না হওয়ায়, মজাটা ছিল অন্য ধরনের।

দুর্গাপুজোর কথা প্রথম শুনি আমার ঠাকুরদার কাছ থেকে। ঠাকুরদা প্রতিদিন সন্ধ্যায় সন্ধ্যা আহ্নিক শেষ করে হয় রামায়ণ না হয় মহাভারত নিয়ে বসতেন। সংস্কৃত নয়, কাশীদাসী রামায়ণ ও কৃত্তিবাসী মহাভারত। আমি আর ঠাকুরমা পাশে বসে শুনতাম। আসলে ঠাকুরমা শুনত, আমি দেখতাম। সচিত্র রামায়ণ বা মহাভারতের চিত্রই ছিল আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ‘ভীমের কীচক বধ’ কিংবা ‘পুষ্পক রথে করে রাবণের সীতা হরণে’র চিত্রগুলো স্মৃতিকে আজও রোমাঞ্চিত করে। যাইহোক, এই রামায়ণ পড়তে পড়তে ঠাকুরদা একদিন শোনালেন রামচন্দ্রের অকালবোধনের কাহিনি। কেরোসিন-কুপির নিভু আলো লেখাগুলোর সঙ্গে মিশে রহস্যময় আলো-আঁধারির জন্ম দিত। আজও সব স্মৃতি ভাস্বর। ঠাকুরদা সবিস্তারে দিয়েছিলেন দুর্গাপুজোর কাহিনি বর্ণনা। সে প্রথম শুনলাম মহিষাসুর। নামটা কেন জানি না মনে গেঁথে গিয়েছিল। তাই প্রথম যেদিন মায়ের হাত ধরে দুর্গামণ্ডপে প্রবেশ করেছিলাম সেদিন শত প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে আমার মুখ ফসকে বেরিয়েছিল— ‘মা, মহিষাসুর ঠাকুর কোনডা?’ মা অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। আর মনে নেই।

আরও পড়ুন: বোলপুরের অনতিদূরে সেরান্দী গ্রামের পটের দুর্গাপুজো যেন এক জাঁকহীন জৌলুস

কাছে-পিঠে দুর্গাপুজো প্রায় হতই না। ফলত দেখতাম, প্রায় প্রতিবছর নবমী পুজোয় আমরা মামার বাড়ি বেড়াতে যেতাম। নবমী-দশমী বিজয়া কাটত মামাবাড়িতে। মামাদের ছিল সংখ্যা বহুল যৌথ-পরিবার। মামা, মাসিমারা সবাই চাকরির সুবাদে বাইরে থাকতেন। দুর্গাপুজোই ছিল আমাদের এক ঘরোয়া পুনর্মিলনী। কয়েকটা দিন কাটত বেশ হই-হুল্লোড়ে। মন্দির থেকে মন্দিরে পুজো থেকে বেড়ানোর খুব একটা চল আমাদের ছিল না। খুব কমই ঘোরা হত। মামাদের উপজেলা শহর বটিয়াঘাটা বাজারের পুজো ছিল আমাদের কাছে বিশাল কিছু, স্বপ্নের মতো। বটিয়াঘাটা, মাইলমারা, পারবটিয়াঘাটা, ফুলতলা, দেবীতলা, আমতলা এলাকা দিয়ে চলত আমাদের ঘোরাঘুরি।

আর পাঁচটা বাঙালির মতো, আমাদেরও দুর্গাপুজো শুরু হত মহালয়া থেকে। আমাদের বাড়িতে সন্তোষ কোম্পানির একটা বড় রেডিয়ো ছিল! ‘হক’ ব্যাটারি দিয়ে রেডিয়োটা চালানো হত। আমার বাড়ি (আশাশুনি) থেকে কলকাতা বেতার তরঙ্গ শুনতে খুব একটা সমস্যা হত না। তুলনামূলকভাবে ঢাকা অথবা খুলনা বেতার শুনতাম যান্ত্রিক গোলযোগ পরিস্থিতিতে। মহালয়ার আগের দিন সন্ধ্যার পর থেকে আমাদের রেডিয়ো বন্ধ থাকত। বন্ধ থাকত বলতে পরবর্তীতে যাতে চলার সময় কোনও ধরনের যান্ত্রিক গোলযোগ না ঘটে সেভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রস্তুত করে রাখা হত। বিকাল থাকতেই বাবা বা কাকাকে দিয়ে ঠাকুরদা দোকান থেকে তিনটা ‘হক’ ব্যাটারি আনিয়ে রাখতেন। সন্ধ্যা হতেই ঠাকুরদা সন্তোষ কোম্পানির রেডিয়োটার পুরনো ব্যাটারিগুলো পাল্টে নতুন ব্যাটারিগুলো দিয়ে রেডিয়োটার পেট ভর্তি করে দিতেন। বারবার চেক করতেন ‘আকাশবাণী কলকাতা’র ভয়েজ। নভ মোড়াতেন এদিক-সেদিক। মহালয়ার দিন ভোর সাড়ে চারটেয় (বাংলাদেশ সময়) ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনতেই হবে। কোনওদিন এর ব্যত্যয় ঘটতে দেখিনি। ভোর ৪টেয় ঠাকুরদার ডাকে বাড়ির সবার ঘুম ভাঙত। হাত-মুখ ধুয়ে সবাই একযোগে বসে যেতাম সন্তোষ রেডিয়োটার সামনে। আমার বয়স তখন কম, তবুও স্মরণ করতে পারি শ্রীবীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র মহাশয়ের ওই ভরাট কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত।

একটু বয়স বাড়তে দেখলাম আমাদের গ্রাম ও আশপাশের গ্রামেও জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেছে। মজাই লাগত। তবুও দুর্গাপুজোয় মামার বাড়ি থাকব না একথা আমি চিন্তাই করতে পারব না। অনেক ভেবে একটা সমাধানে পৌঁছলাম। ষষ্ঠী থেকে অষ্টমী কাটাব বাড়িতে, আর নবমী থেকে মামার বাড়ি। একটু বড় হওয়ার সুবাদে একটু করে স্বাধীনতাও ভোগ করতে শুরু করেছি। শুনতাম শ্যামনগর, দেবহাটা, কালীগঞ্জ এলাকায় খুব প্যান্ডেল-ট্যান্ডেল হয়, প্রতিমায়ও থাকে নানা চমক। প্রায় প্রতিবছর তাই বাড়ির বন্ধুবান্ধব নিয়ে ওই সমস্ত এলাকায় পুজো দেখতে যেতাম। ইঞ্জিন চালিত দু’টো বা তিনটে ভ্যান ভাড়া করা হত। অষ্টমীর অঞ্জলি দিয়েই উটে পড়তাম ভ্যানে। ফিরতে ফিরতে রাত ১২টা।

২.
নবমীর দিন বাড়ি থেকে মামা বাড়ি চলে আসতাম। কখন মা সঙ্গে আসতেন আবার কখনও-বা একাই। মামার বাড়ির পুজো দেখার সবথেকে আনন্দের ছিল বিজয়া দশমী। এক অদ্ভুত আনন্দের চল ছিল মামার বাড়ি। বিকাল থেকেই শুরু হত মামাতো দিদিদের সাজুগুজুর পালা। মূল ঘটনা শুরু হত সন্ধ্যায়। বাড়ির বড়রা প্রত্যেকে ছোটদের বাজার খরচ দিতেন। মনে পড়ে, সবথেকে কম বাজার খরচ যা পেতাম (একজন) সেই পরিমাণ এখন হাস্যকর মনে হলেও তখন তা ছিল বিশাল কিছু। দুইটাকা। বড়মা (বড় মাসিমা), সেজো মাসিমা, মেজো মামি, মেজো মামা, সেজো মামা, সেজো মামি, ছোট মামা, ছোট মামি, দাদা দিদিরা প্রত্যেকের কাছ থেকে আদায় করা হত সাধ্যমতো বাজার খরচা। আহা কি শান্তির দিন ছিল। এখনও পাই বাজার খরচা, তবে সেই বাল্য শান্তি উধাও। এখন তুলনামূলক বিচারে অনেক বেশি বাজার খরচা পাই, অনেক বন্ধুবান্ধব হয়েছে, কিন্তু খুব মিস করি সেই পুরনো দিনগুলো। ভাইবোন সবাই মিলে বাজার না ঘুরে মোলার মাঠে বসে বাদাম, পাপড় ইত্যাদি খেতে খেতে গল্পে গানে আড্ডায় কাটানো বিজয়ার সন্ধ্যা-রাত কাটানোই আমার স্মৃতির আসল পুজো। মোদ্দা কথা, পুজো বলতে আমার কাছে ওই পুনর্মিলনীটাই।

Similar Posts:

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *