চৈত্র সংক্রান্তি আর গাজনের দিনগুলো

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

চৈত্র সংক্রান্তির দিনটিকে বলা হত ‘ছাতু সংক্রান্তি’। বাড়িতে আগের দিন দোকান থেকে এনে রাখা হত ছোলার ছাতু, যবের ছাতু, খইয়ের ছাতু। অনেক বাড়িতে অসচ্ছলতায় আটা ভেজে তৈরি হত ছাতু, কিনে আনা হত সস্তাদরের খেসারির ছাতু। অনেক অসাধু দোকানদার সেই সময়ে ছোলার ছাতুতে খেসারি মেশাতেন। খেসারি খাওয়ায় তখন পক্ষাঘাতের ভয় ছিল। ভেজাল এড়াতে দুই-একবার মা বাড়িতেই বালির কড়াইয়ে ভেজে নিলেন ছোলা আর যব। ভাজার সময় ভারি একটা মিষ্টি গন্ধে ভরে থাকে চারপাশটা। তারপর লোহার হামানদিস্তায় গুঁড়ো করে নেওয়া হল ভাজা ছোলা, যব। তার দানাময় গুঁড়ো এরপর শিলের মধ্যে বেটে নিলেন মা। তিনি সেদিন চাল ভেজে তৈরি করতেন মুড়ি, এই মুড়ি গুঁড়িয়ে যে ছাতু হত, তা অসাধারণ খেতে। মনে আছে ছুটির দিন দুপুরের শেষ আঁচে আমি নিজেই কতকটা আটা ভেজে ছাতু করে নিতাম। মা বলতেন আটার ছাতুতে অম্বল হয়। ছোট মানুষ আমি, কে আর অম্বলের ধার ধারে! চৈত্র সংক্রান্তির দিন সকাল সকাল স্নান করে ছাতু খাওয়ার আলাদা আনন্দ। সেদিন ছাতুই জলখাবার। সঙ্গে থাকে ভেলিগুড়, কাঁঠালিকলা, দই, সন্দেশ। সেদিন উল্লাসই আলাদা, সব বাচ্চারা নাচানাচি করতে থাকি। বাড়িওয়ালার বাড়িতে, হারামামির (হারাধন চ্যাটার্জি সহধর্মিণীকে পাড়ার সবাই এই নামেই ডাকতেন) বাড়িতে, গীতু-মিতুদের বাড়িতে রকমারি ছাতুর আয়োজন। কারও বাড়ি গেলেও ছাতুমাখা খেতে দেন। উপাদান, পরিমাণ আর মাখার গুণে এক এক বাড়িতে এক এক স্বাদের মনে হয়।

আরও পড়ুন: প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

রানী চন্দের লেখায় পাই, “চৈত্র সংক্রান্তি― ‘ভাইছাতুর’ দিন। তিন মাথায় (তে-পথের মোড়ে) ভাই দাঁড়ায়, বোন মুঠো মুঠো খইয়ের ছাতু ভাইয়ের পায়ের ফাঁক দিয়ে উড়িয়ে দেয়― বার বার তিনবার। বলে― ‘ভাইয়ের শত্রু নিপাত হোক।’ মায়ের অনেক ভাই, মা অনেক ছাতু ওড়ান। তে-মাথার পথটা সাদা হয়ে যায়।” আমার মা বলতেন, পূর্ব পাকিস্তানে থাকতে এই প্রথা দেখেছেন, করেওছেন। ছাতুতে সাদা রাস্তায় কুকুর চেটে যায়। নানান পিঁপড়ের দল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাকি ছাতু মুখে করে নিয়ে গর্তে ঢোকে। নবান্নের ‘কাক-বলির’ মতোই প্রকৃতির রাজ্যে নানান প্রাণীকূলের প্রতি কৃতকৃত্য। কিন্তু উদ্বাস্তু বাঙালির হাতে তখন পয়সা কই ছাতু ওড়ানোর! তাই বলা হত, সেদিন ছাতু খেলে শত্রু নিধন হয়।

আরও পড়ুন: কাসুন্দি-তৃতীয়া

রানী চন্দ

সারা চৈত্রমাস ধরে যারা গাজন দলের সঙ সেজে এসেছে, যারা বাবা তারকনাথের নামে মাটির মালসায় ভিক্ষান্ন মেগেছ, আজ তাদের শিবের পুজো। এদিন আর তাদের দেখি না। রহড়ায় কাছাকাছি চড়কমেলার আয়োজন কখনও দেখতে যাওয়া হয়নি। শুনেছি অনেক আগে সুখচরে নাকি গাজনের বড় মেলা বসত। আমাদের ছোটোবেলা দেখেছি মাস জুড়ে রোজই কেউ না কেউ গাজন সন্ন্যাসী ভিক্ষা করতে আসত― খালি পায়ে গেরুয়া খাটো ধুতি, খালি গায়ে ভস্ম মাখা, উত্তরীয় গলায় জড়ানো, কাঁধে গেরুয়া থলে, হাতে ত্রিশূল। গলবস্ত্র হয়ে অন্য হাতে মাটির মালসা গৃহস্থের কাছে ভিক্ষার্থে এগিয়ে দেবার আগে সুর করে গায়, “বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে/ বাবা মহাদে…..ব!” খুবই স্বাভাবিক ও পরিচিত ব্যাপার ছিল সেইসময়। গাজন সন্ন্যাসিনীরাও থাকতেন, কখনও জোড় বেঁধে আসতেন গাজন সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনী। জানতাম এঁরাই যথার্থ শৈবপন্থী। বংশানুক্রমে গাজনের মাসে সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন তাঁদের। আবার অনেকে হয়তো অভাবের তাড়নায় ভিক্ষাবৃত্তি এই সুযোগে করে নিতেন। গরিব ঘরের এই শৈব-ভিখারিদের অধিকাংশই শ্রমিক-মজুর বা কৃষক ঘরের মানুষ, কেউ কেউ বাজারের সবজি-বেচা হাটুরে। তেল-সাবান না মেখে মাসভর তাঁরা দিনে উপবাসী, সন্ধ্যায় শিবের পুজো করে একবেলা নিরামিষভোজী।

আরও পড়ুন: ‘বনলতা সেন’ আসলে মৃত্যু, জন্ম থেকে জন্মান্তরে যাবার বিশ্রাম

সোফি শার্লোট বেলনোস (১৭৯৫-১৮৬৫)-এর বাংলায় হিন্দু এবং ইউরোপীয় শিষ্টাচারের চব্বিশটি প্লেটের চিত্রকৃত চরক পূজার চিত্র।

তবে গ্রামগঞ্জে ছেলেছোকড়ার দল গাজনে মাতে। তাদের দলে একজন মূল হোতা বা মুরুব্বি থাকে, তাকে ঘিরে একদল অনুচর। তিনিই যেন শিব, বাকিরা নন্দী-ভৃঙ্গী, তাদের মধ্যে একজন কালীও সাজে। রানী চন্দের লেখায় পাচ্ছি, “চৈত্রমাস পড়লে ছোটোমামাকে আর পাওয়া যায় না বাড়িতে। তিনি নীলপূজার গাজনে মাতেন। মা-মামারা রাগ করেন; কিন্তু যারা গাজনে মাতে― তারা সবাই ছোটোমামার অনুচর। মুরুব্বিকে নইলে জমে না তাদের। … গাজনের দল এ সময় বাড়ি বাড়ি আসে, সবাই মিলে তাণ্ডব নাচ নাচে, গায়। ছোটোমামাও সেইসঙ্গে থাকেন, দলের সঙ্গে নাচেন, গান; কেবল নিজ বাড়ির ধারে-কাছে আসেন না কখনো। … মামীরা কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছেন― এবারে গাজনের আসল সন্ন্যাসীকে দেখতে পাবেন; কিন্তু আমাদের বাড়ির দু’তিনটে বাড়ির আগে হতেই পলকে ছোটোমামা উধাও হয়ে যান। কখন যান― কেউ ধরতে পারে না। ছোটোমামা বাড়িতে ফেরেন চড়ক পূজার মেলা শেষ করে। আমাদের জন্য নিয়ে আসেন রঙিন কাগজের ফুল, শোলার টিয়ে পাখি, পয়সা জমাবার পেট ফাঁপা মাটির বুড়ো― আরো নানা জিনিস। বৌঠানদের জন্যও লুকিয়ে লুকিয়ে এনে দেন অনেক কিছু। মামীরা খুশি থাকেন ছোটো দেওরের প্রতি।”

আরও পড়ুন: রঙের গাঁ খোয়াবগাঁ

নীল পূজা, কলকাতা, ১৮৪৮

চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন মায়ের নীল পুজো। সারাদিন নির্জলা উপবাস থেকে বিকেলে চৌধুরি পাড়ার শিব মন্দিরে জল ঢেলে নীলের বাতি দেখান। প্রত্যেক সন্তানের জন্য মঙ্গল কামনা করে মাটির প্রদীপ জ্বালান। এদিন মায়ের ভাত খাওয়া মানা। সকালে বড়দানার সাগু ভিজিয়ে রাখা হয়। বাবা নিয়ে আসেন বেল, কাঁঠালি কলা, তরমুজ, শশা, ফুটি, শাঁকালু, কদমা, বাতাস ভেলিগুড়। কাঁচাদুধ দিয়ে সাগু মাখার নিয়ম, কিন্তু মা এই নিয়মটি মানেন না, কারণ আমরা বাচ্চারা যে মায়ের সাগুমাখা খাই। দুধ মাটির সরায় কাঠের আগুনে ফুটিয়ে নেন মা। শিবলিঙ্গে জল ঢেলে এসে মা ভেজানো সাগু মাখেন, দিদিরা মিলে ফল কেটে দেন, বেলের পানা তৈরি করেন, আমি আর বোন চুপটি করে দেখি, তারপর বাটি-গ্লাস এগিয়ে দিই। আমরা ভাইবোনেরা বেলের পানা আর সাগুমাথা, কাটাফল তৃপ্তি করে খেতে দেখলে মায়ের মুখ আনন্দে ভরে ওঠে। মা শিবের শতনাম আর প্রণাম মন্ত্র উচ্চারণ করেন। বাবাও ইতোপূর্বে শিবপুরাণ থেকে পাঠ করে শুনিয়েছেন। এরপর সারাদিনের সাংসারিক কাজ সেরে উপবাসী শরীরে ফলমিষ্টি-সাগু পড়লে তন্দ্রায় জড়িয়ে আসে মায়ের চোখ। পরদিন ছাতু সংক্রান্তি, সকালে নানান লোকাচার পালন। তাই আমরা সবাই সেদিন সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ি। দূরে কোথা থেকে শিবযাত্রার গান মাইকে বেজে ওঠে, “শিব ঘোছাও আমার মনের ভ্রম/ ব্যোম ব্যোম ব্যোম ব্যোবোম ব্যোম।”

লেখক বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার ফ্যাকাল্টির বিশিষ্ট অধ্যাপক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *