বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের রায় পরিবারে মূর্তির বদলে হয় দুর্গার মুখমণ্ডলের পুজো

তিরুপতি চক্রবর্তী

বাঁকুড়া জেলার এক অভিনব পুজোর কথা বলি। বাঁকুড়া বেলিয়াতোড়ের রায় পরিবারে দেবী দুর্গার মূর্তির বদলে হয় মুখমণ্ডলের পুজো। হ্যাঁ শুধুই মুখ। এই পরিবারেই জন্ম নেন যামিনী রায়।

আরও পড়ুন: করোনাবিধি মেনে এবছর হচ্ছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ৪১০ বছরের পুরনো দুর্গাপুজো

যামিনী রায় ও তাঁর শিল্পকর্ম

প্রচলিত দেবী দুর্গার মূর্তির আদল থেকে ভিন্ন বেলিয়াতোড়ের রায় পরিবারের দুর্গা প্রতিমা। দেবীর মুখমণ্ডলের পুজো হয় এখানে। স্থানীয়ভাবে দুর্গা মন্দিরের নাম ‘বড়মেলা’। কারণ জানতে চাইলে যেতে হবে আনুমানিক পাঁচশো বছর আগের মল্লরাজ অধীনস্থ বিষ্ণুপুরে।

মুঘল সেনাপতি মানসিংহ প্রবল যুদ্ধ করে পরাক্রমশালী রাজা প্রতাপাদিত্য রায়কে পরাস্ত করে যশোর জয় করেন। প্রতাপাদিত্য রায়ের শক্তির উৎস ছিলেন যশোরেশ্বরী। প্রতাপাদিত্য রায়ের কনিষ্ঠ পুত্র রাজীবলোচন অতি সন্তর্পনে বুকে করে যশোরেশ্বরীকে যশোর থেকে নিয়ে আসেন মুর্শিদাবাদে। রাজপুরুষোচিত চেহারা দেখে এবং তাঁর বাগ্মিতায় মুগ্ধ হয়ে মুর্শিদাবাদের রাজা তাঁকে উচ্চপদে নিয়োগ করেন। কিন্তু কিছুদিন পর রাজীবলোচন মায়ের পুজোর ত্রুটি হতে পারে ভেবে সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপদ স্থান শ্রীক্ষেত্র বর্তমানে পুরী ধামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথের মাঝে পড়ে বিষ্ণুপুর। কাছাকাছি একটি চটিতে আশ্রয় নেন সকলে। মল্লরাজ বীর হাম্বিরের লোকজন খবর পেয়ে তাঁকে নিয়ে যায় রাজ দরবারে। মল্লরাজও তাঁর গুণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিষ্ণুপুরের দেওয়ান পদের জন্য মনোনীত করেন। মায়ের সেবাপুজোর ঠিকমতো ব‍্যবস্থা করতে পারবেন এই অঙ্গীকার পাওয়ায় পর পুত্র রাজ‍্যধরকে রাজীবলোচন দেওয়ান পদ গ্ৰহণ করার আদেশ দেন। রাজ‍্যধর দেওয়ান পদে যোগ দেওয়ার পর দেবীর মন্দির তৈরি হয়। তখন থেকেই দেবী পূজিত হচ্ছেন ‘দেবী দশভুজা’ রূপে বিষ্ণুপুরের গোপালগঞ্জে।

আরও পড়ুন: বিলুপ্ত স্রোতের প্রতীক মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো

বিষ্ণুপুরের গোপালগঞ্জের প্রতিমা

কথিত আছে রাজীবলোচনকে ওই মূর্তি গোপনে দান করেন এক দক্ষিণী ব্রাহ্মণ। বেলিয়াতোড়ের রায় পরিবার বিষ্ণুপুরের রাজ পরিবারের দেওয়ান রাজ‍্যধরের উত্তরসূরি হওয়ার সুবাদে দেবী দশভুজাকে স্মরণ করে শুধুমাত্র মুখাবয়বের পুজো করে আসছেন। দেবী যশোরেশ্বরীর অনুকরণে তৈরি মা দশভুজার পুজো হয় বিষ্ণুপুরে আর মুখমণ্ডলের পুজো হয় বেলিয়াতোড়ে। রায় পরিবার বেলিয়াতোড়ে পুজো করলেও বাহক মারফত পুজো পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিষ্ণুপুরে। বিষ্ণুপুরের দশভুজা হলেন বৈদিক যুগের অসুর নাশিনী চামুণ্ডা রূপিণী মা দুর্গা। অসুর সংহারের জন্য দেবতারা রণক্ষেত্রে যে রূপে দেবীকে সজ্জিত করেছিলেন, সেই রূপেই পূজিতা হন দেবী। এই দেবীর আশীর্বাদ লাভ করে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন রায় পরিবারের বংশধর শিল্পী যামিনী রায়। যিনি বিশ্বের দরবারে বেলেতোড়ের রায় পরিবারের নাম উজ্জ্বল করেছেন।

আরও পড়ুন: তৎকালীন বিহারের সর্খেলডিহির সর্খেল বাড়ির দুর্গাপুজো

‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ পুথির প্রথম দুই পাতা

রায় পরিবারের অপর কৃতি বিদ্বজ্জন হলেন প্রখ্যাত বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ, ভাষাতাত্ত্বিক এবং গবেষক বিদ্বদ্বল্লভ বসন্তরঞ্জন রায়। বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের নিকটবর্তী কাঁকিল্যা (কালিয়া) গ্রামের শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র বংশীয় দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্রাহ্মণের বাড়ির গোয়ালঘরের মাচার ওপর থেকে এই কাব্যের একটি পুথি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ সালে তাঁরই সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামে পুথিটি প্রকাশিত হয়; যদিও কারও কারও মতে মূল গ্রন্থটির নাম ছিল ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ’। বৌদ্ধ-সহজিয়া গ্রন্থ চর্যাপদের পর এটিই আদি-মধ্য বাংলাভাষার প্রাচীনতম আবিষ্কৃত নিদর্শন।

ছবি সংগৃহীত

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *