কলকাতার প্রথম বারোয়ারি পুজো হয় বলরাম বসু ঘাটে

পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়

সে-বেশ ছোট বয়সের কথা। তখন থিম পুজোর যুগ নয়। পাড়ায় পাড়ায় একটি করে পুজো হয়। প্যান্ডেলের সাজ সাবেকি সাদা-কমলা, কি সাদা-লাল কাপড় দিয়ে চৌকো তোরণ করা। আর পার্কের পুজোগুলো বেশ ছড়ানো খোলামেলা মণ্ডপ। বাবার হাত ধরে বাড়ির কাছের চার পাঁচটি বারোয়ারি পুজোর একটা গোল সার্কেল ঘুরে দেখা আমাদের ওই চারদিনের অবশ্য কর্তব্য ছিল। ফেরার পথে বাবা বেলুন কিনে, কোকাকোলা খাইয়ে আনতেন। দিদির হাতে থাকত ক্যাপ-বন্দুক। আমার পছন্দ ছিল গ্যাস বেলুন। এইসব পুজোর মজা।

আরও পড়ুন: অসমের নীলাচল পর্বতের দুর্গাপুজো

চিত্রসূত্র: ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা ফেসবুক পেজ

ভবানীপুরের সেই পাঁচটি পুজোর একটা আমার পাড়ার, একটা সোজা গিয়ে ‘সংঘমিত্র’, তারপর ‘সংঘশ্রী’, হয়ে ডানদিকে সাউথ সাবার্বান স্কুলের পাশ দিয়ে গিয়ে হরিশপার্ক, তারপর খানিক এগিয়ে রাস্তা পেরিয়ে বলরাম বোস ঘাটের রাস্তায় ঢোকা। তার আগে মায়েদের জন্যে মিষ্টি সিঙাড়া, বালুসাই গজা কিনে নিয়ে যাওয়া হত মিত্র স্কুলের উল্টোদিকের দোকান থেকে। বলরাম বসু ঘাট রোডের এই পুজোর নাম ‘ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা’। এই পুজোর দিকে এগোতে গিয়ে ছোট্ট পাঁচবছুরে আমি বুঝতে পারতাম না, গঙ্গার ধারের এই পুজোটা দেখার কি আছে! কোনও প্যান্ডেলই নেই, সেই তো একচালার ডাকের সাজ। পাশে আদি গঙ্গা বইছে কালচে জল নিয়ে। ঘাট থেকে উঠে গেছে বাঁ-পাশে লাল রঙের চাতালওয়ালা শান বাঁধানো পাকা মণ্ডপ উত্তর-দক্ষিণে মুখ করা। যার এধারে পর পর বেশ ক’টি সাবেক শিবমন্দির, আর বটগাছ। চাতালে কিছু ছেলে ক্রিকেট খেলে। ঘাটে কিছু মানুষ স্নানে ব্যস্ত, পাড়ের কাদায় শূকর মা ছানা নিয়ে চলেছে। কতগুলি উলঙ্গ শিশু জলে ঝাঁপায়, ওঠে পড়ে, ওটাই খেলা, কখনও সিঁড়ি বেয়ে ধাঁ করে ধাক্কা দিয়ে চলে যায় লুকোচুরি খেলতে খেলতে। সকালটা এরকম। তবে সন্ধেবেলা এখানটা খুব জমজমাট। একটা ঝাড়বাতি জ্বলে ওঠে। ঢাকের বোলে নাচতে থাকে ছেলেপুলের দল, ধুনোর ধোঁয়ায় চারদিক আবছায়া মতো। আশপাশ থেকে গিন্নিবান্নি মানুষ এসে কেউ পুজো সাজাচ্ছেন, কেউ পাখা নাড়ছেন। এ পুজোয় কোনওদিন মাইকে আধুনিক গান বাজে না দেখতাম। সানাই আর তবলাবাদক বসে বাজাতেন একধারে চৈকির ওপর। পুরোহিত মশাই অনেকক্ষণ ধরে আরতি করতেন।

মূল রাস্তা হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট। রাস্তা থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে আদি গঙ্গায়, আর এক দিকের ধাপ দিয়ে ঠাকুরদালানে নেমে যেতে হয়।

আরও পড়ুন: নারকেল গাছের পরিত্যক্ত অংশ দিয়ে দুর্গা প্রতিমা গড়লেন রানাঘাট কুপার্সের যুবক

এরপর আরেকটু বড় হয়েছি, তখন বোঝার বয়স হয়েছে, ঠাকুরদা নলিনীরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে শোনা গেল, এই পুজোর একজন উদ্যোক্তা ছিলেন শরৎচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি আমাদের ঠাকুরদার বাবা। খেয়াল করে দেখি পুজোদালানের সামনে একটি বোর্ডে অনেকের সঙ্গে ওঁর নামও রয়েছে। আরও বড় হয়ে জানলাম, এই আদি ঐতিহ্যবাহী পুজোটিই কলকাতার প্রথম বারোয়ারি পুজো, যা শুরু হয় ১৯১০ সালে। মিলিয়ে দেখি, আমাদের ভদ্রাসনটিও স্থাপিত ১৯০০ সালে। তার মানে ঠাকুরদার বাবা এখানে এসে বাড়ি করার বছর দশ পর বন্ধুবান্ধব মিলে বারোয়ারি পুজো শুরুর ব্যাপারে মন দেন। এই পুজো নিয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছে, সেসব খুঁজে পড়তে শুরু করি। তখন একটু জ্ঞানবুদ্ধি বেড়েছে আর পুরনো কলকাতার কথা জানতে শুরু করেছি। অবাক হয়ে দেখি, আমার ছোটবেলার সেই চেনা ঘাটের এত ঐতিহ্য! ভাবলেই রোমাঞ্চ হয়। আর বাহ্যিক জাঁকজমকের চাইতে তখন আসল পুজোর রূপ মনে ধরা দিচ্ছে। মিলিয়ে নিচ্ছি, নিজের পড়াশোনা আর স্মৃতির ছোটবেলা। বইপত্র পড়ছি। বুঝতে পারছি এইজন্যই এই পুজোয় কোনওদিন মাইক বাজেনি, পুরোহিত মশাই মাইকে মন্ত্রপাঠ করেননি। চারদিনই এখানে খিচুড়ি ভোগ হয় আর দশমীতে পান্তাভাত। সেদিন নাকি অপরাজিতা পুজোও হয়। এসব ব্যাপারে আরও খোঁজ পাওয়ার আগেই পাড়া ছেড়ে চলে যাওয়া, মেয়েদের যেমন।

কিন্তু এর পরের এক ঘটনা আমার মনকে আরও অনেক বেশি নাড়া দিয়েছিল। একবার বন্ধুকে পুরনো পাড়া রাস্তা গলি দেখাতে দেখাতে চলে গেছি ওই পথে। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট ধরে হাঁটছি কালীঘাটের দিক থেকে। ডানদিকটা কিছু বদলালেও বাঁ-হাতি পুরনো ঘরবাড়ি মন্দির বটগাছেরা যেন একই আছে আজও। বলরাম বসু ঘাটের কাছে পৌঁছে দেখি হেরিটেজ ঘাটের স্বীকৃতি লেখা বোর্ড। কীসের জন্য! ঘাট থেকে উঠে আসা ঘেরা চাতালে স্থানীয় এক মানুষ খুঁজে দেন সেই ফলক, যা গোবিন্দপুরের সতীদাহের স্মৃতিচিহ্ন। বাচ্চারা খেলে বেড়ায় তার ওপর দিয়ে। জল ঢেলে মুছে দেখি, ফলকে সেই লেখা জ্বলজ্বল করছে। হাতে একটু কি ছ্যাঁকা লাগল! প্রণামে শ্রদ্ধায় স্মরণ করি রাজা রামমোহন রায়কে, যিনি না থাকলে এই ভয়ংকর প্রথা বন্ধ হত না কোনওদিন। শোনা যায়, দুই ব্রাহ্মণ বিধবা মা সতী হয়েছিলেন এই ঘাটেই। পরবর্তীকালে ঘাট সংস্কারের সময় ফলকটি আসল জায়গা থেকে সরিয়ে মিউজিয়ামে রাখা হয়।

সতীদাহের স্থান। অর্পণ শেঠের ফেসবুক ওয়াল থেকে

এই সরু গলি রাস্তাটিতে পুরনো দিনের দোতলা বাড়ি আর তার নীচে কত ছোট্ট ছোট্ট খুপরি দোকান ছিল, পানের, চায়ের, বিড়ির দোকান, কুচো নিমকি, চানাচুর, আট কড়াইয়ের আট ভাজা, সিদ্ধি, বাতাসা, আলতা সিঁদুর, কি না পাওয়া যেত সেইসব টিমটিমে আলো জ্বলা দোকানে। সেই দোকানদার আর দোকানিদের সঙ্গে কতদিনের আলাপ ছিল। ঘাটের চাতালে লিজ্জত পাঁপড় শুকোতে দেওয়া হত একধারে পরিষ্কার জায়গায়। কোনও বৈশাখী সন্ধ্যায় হত রামায়ণ পাঠ। বড় বড় আলো ছিল না একদম। কেমন আলো-ছায়া-মায়া মাখানো ছিল সেইসব ঘাট। সেই পুজোর এক আলাদা গন্ধ যেন। ওই রাস্তায় বহু গুণী মানুষের বাড়িও ছিল সেসময়। আশপাশেও তাই, যেমন স্যার আশুতোষের বাড়ি। তাঁদের মধ্যে বহু মানুষজন একত্রিত হয়েছেন এই পুজোকে ঘিরে। কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কেশব নাগ, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় প্রমুখ।

চিত্রসূত্র: ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা ফেসবুক পেজ

সেই ১৯১০-এর পর থেকে একনাগাড়ে এই পুজো হয়ে এসেছে। আজ ও স্বমহিমায়, নিষ্ঠার সঙ্গে সেই ঐতিহ্য মেনেই পুজো হয় সেখানে। স্মৃতি ছবি গন্ধভরা অতীত কেবল টানে। টানে টানে প্রতি বছর ফিরে যাই ওই পুজোর আলোয়।

উপরের ছবিটি লেখকের আঁকা

Facebook Twitter Email Whatsapp

3 comments

  • কাকলী

    লেখা আর আঁকা দুই অনবদ্য। ছোটবেলায় বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা, এ স্বাদের ভাগ হবে না।

  • বাঃ খুব সুন্দর স্মৃতিচারণ। খুব ভাল আর সাবলীল লেখাটা হয়েছে। এখনকার মরা পচা গন্ধ ওয়ালা আদিগঙ্গা আগে তো এমন ছিল না। অনেক ধনী ব্যক্তিরা তাদের পাল্কী করে ঘাটে নাইতে জেতেন ! তারো আগে তো ঐ নদী দিয়ে বানিজ্য তরী যেত। সেই ঐতিহ্যময় স্থানে প্রথম বারোয়ারী দুর্গাপূজার কথা সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত করেছেন লেখিকা।আন্তরিক সাধুবাদ জানাই। ছবিটিও জায়গাটিকে প্রকাশ করেছে ভাল। তাই পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয়গান গাই।
    – সুদীপ্ত রায়।

  • পিয়ালী

    ধন্যবাদ।
    আমিও ছোটবেলায় দেখেছি নৌকো ভরে জিনিস যেত। কত জল।পরপর সব ঘাট।মন্দির।কেমন অদ্ভুত আলাদা জগৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *