রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

সাইদুর রহমান

১৯৬৩-র এপ্রিল। তখনও গোটা রাজ্য এমনকী বাংলাদেশেও বইমেলার ধারণা আসেনি। তখন পর্যন্ত ‘মেলা’ বলতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পূজা, পার্বণ বা লৌকিক সমাজের বিভিন্ন লোকায়ত ঘটনাকে ঘিরে এক জায়গায় মানুষের মিলিত হয়ে আনন্দ অনুষ্ঠানকে বোঝাত। সেই সমস্ত মেলার কেন্দ্রে নানান ধর্মীয় অনুষঙ্গ থাকলেও ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও রীতিনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না মেলাগুলি। বিভিন্ন ধরনের কুটির শিল্প, চারুশিল্পের প্রদর্শন ও পসরার মধ্য দিয়ে মেলাগুলি হয়ে উঠত মানুষের পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাববিনিময়ের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু নানা ধরণের ‘বই’কে নিয়ে যে ‘মেলা’ হতে পারে, যেখানে নানা ধরনের পাঠক, বই ক্রেতা ও বিক্রেতার সমন্বয়ে মানুষের ‘মিলন ক্ষেত্র’ ‘বইমেলা’ হতে পারে, সেই ধারণাটা তখনও জেলা সহ গোটা রাজ্যে কারও মাথায় আসেনি। বইমেলার ধারণাটা জেলা সহ গোটা রাজ্যে প্রথম তৈরি হয়েছিল মুর্শিদাবাদে, জঙ্গিপুরে ১৯৬৩-র এপ্রিল মাসে।

আরও পড়ুন: জনঅরণ্যে সম্প্রীতির বার্তা

ছবি লেখক

শ্রীবরুণ রায় ছিলেন জঙ্গিপুরের রঘুনাথগঞ্জের বই ব্যবসায়ী ও ছাত্রবন্ধু পুস্তকালয়ের স্বত্বাধিকারী। বই নিয়ে তাঁর আগ্রহ ও উদ্দীপনার শেষ নেই। তাঁর মাথায় এলো বই নিয়ে একটা মেলা করা যায় কিনা। এই কাজে তিনি পাশে পেলেন  আর এক বইপাগল ও কাজপ্রিয় মানুষ তথা তৎকালীন জঙ্গিপুর মহকুমা শাসক অমলকৃষ্ণ গুপ্তকে। তাঁকে পাশে নিয়ে তিনি গ্রন্থমেলার আয়োজনে লেগে পড়লেন। তাঁদের দু’জনের উদ্যোগে ১৯৬৩-এর এপ্রিল মাসে জঙ্গিপুরে প্রথম সূচনা হল বইমেলার— নাম দেওয়া হল ‘জঙ্গিপুর গ্রন্থমেলা- ১৯৬৩’। এই মেলার কর্মসচিব ছিলেন বরুণ রায় নিজে, আর সভাপতি ছিলেন অমলকৃষ্ণ গুপ্ত মহাশয়। সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন শ্রীমোহিত চট্টোপাধ্যায়, মৃগাঙ্কশেখর চক্রবর্তী, আশিস রায়, অরুণ রায়, হরিলাল দাস প্রমুখ। মেলাটি হয়েছিল রঘুনাথগঞ্জের ম্যাকেঞ্জি পার্কে। জঙ্গিপুরের ওই পুস্তকমেলা শুধু জঙ্গিপুর বা মুর্শিদাবাদ নয়, গোটা   করে নিয়েছে। এই মেলার অনেক পরে ১৯৭৬ সালের মার্চে কলকাতা বইমেলার উদ্ভব হয়। আর বাংলাদেশে ১৯৬৫ সালে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নিচতলায়। প্রসঙ্গত, পৃথিবীর প্রথম বইমেলা হয়েছিল জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে ১৪৭৮ সালে। এরপর ১৭ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে  প্রটেসন্ট্যান্ট শাসনের সময় ফ্রাঙ্কফুর্টকে বাদ দিয়ে লেইপজিগ শহর প্রকাশনা ও বইমেলার কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে প্রায় ২০৫টি জার্মান প্রকাশনীকে নিয়ে নতুন উদ্যমে চালু হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট মেলা। সেই মেলাই এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল আকারে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর। যাইহোক, জঙ্গিপুর গ্রন্থমেলার ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের জন্য উদ্যোক্তারা সে-সময় ছোট ছোট হ্যান্ডবিল প্রচার করেছিলেন। তাতে লেখা হয়েছিল, “রুঘুনাথগঞ্জের ছাত্রবন্ধু পুস্তকালয়ের সত্ত্বাধিকারী শ্রীবরুণ রায় জঙ্গিপুরে একটি গ্রন্থমেলা করার পরিকল্পনা করেন। গত ৩ মার্চ জঙ্গিপুর মহুকুমা শাসক শ্রীঅমলকৃষ্ণ গুপ্ত মহাশয়ের পৌরহিত্যে স্থানীয় ম্যাকেঞ্জি পার্কে মহুকুমার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক সমাবেশে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠানের জন্য এক পরিকল্পনা গৃহীত হয়।…” (সূত্র: ঝড়: আলোকপাত)। এই মেলাটিকে ‘বিবেকানন্দ ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতি দিবস’, ‘কথাসাহিত্য দিবস’, ‘নাট্য দিবস’, ‘সংবাদপত্র সাময়িক পত্র, অনুবাদ সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য দিবস’, ‘রবীন্দ্র দিবস’— ইত্যাদি দিবস হিসেবে পালন করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: শ্রমিকের সামান্য ‘পান্তা ভাতে’ একটু লবণের ব্যবস্থার হোক

আশিস রায়ের ফেসবুক দেওয়াল থেকে সংগৃহীত

এরপর জেলায় আর দীর্ঘদিন বইমেলা বা পুস্তকমেলা হয়নি। অবশেষে ১৯৮১ সালের ৩ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলায় দ্বিতীয় বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় বহরমপুরের কাশীশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৭৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর সাহিত্যিক মণীশ ঘটক মারা গেলে তাঁর স্মরণে ও তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘বর্তিকা’র রজতজয়ন্তীবর্ষ পালনের জন্য যে একটি উপসমিতি গঠন করা হয়েছিল— সেই উপসমিতিই এই গ্রন্থমেলাটি পরিচালনা করেছিল।  সেই মেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ‘অনীক’ পত্রিকার সম্পাদক মাননীয় দীপঙ্কর চক্রবর্তী মহাশয়। সভাপতি ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও সমাজসেবী মহাশ্বেতা দেবী। সেই মেলায় যথাসাধ্য সহযোগিতা করেছিলেন তৎকালীন জেলাশাসক প্রসাদ রায় মহাশয়। ১৯৬৩-র জঙ্গিপুর মেলাকে জেলার প্রথম বইমেলা হিসেবে ধরলে তৃতীয় বইমেলাটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৩ সালে, কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুল সংলগ্ন কাদাই রিফরমেটরি স্কুলের মাঠে। আর চতুর্থ বইমেলাটি অনুষ্ঠিত হয় ব্যারাক স্কোয়ার মাঠে, ১৯৮৪ সালে। এই দুই মেলাতেই, বিশেষ করে ১৯৮৪-র স্কোয়ার মাঠের বইমেলাতে পাঠক ও জনসমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো।

এতদিন পর্যন্ত বইমেলাগুলি পরিচালিত হচ্ছিল ব্যক্তিগত বা কখনও সমষ্টিগত উদ্যোগে বেসরকারি ভাবে। কিন্তু ১৯৮৪-র পর মুর্শিদাবাদ বইমেলা সরকারিভাবে অনুষ্ঠিত হতে শুরু করে। সরকারিভাবে প্রথম মুর্শিদাবাদ বইমেলা সংঘটিত হয় ১৯৮৪ সালে, এফইউসি মাঠে। সরকারিভাবে প্রথম সংঘটিত এই মেলার উদ্যোক্তাদের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক ও   সম্মাননীয় অভ্যাগতদের মধ্যে ছিলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি সি রমেন পোদ্দার, সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মোস্তফা সিরাজ, রেজাউল করিম ও তরুণ যুবক মইনুল ইসলাম প্রমুখ ব্যক্তিত্বরা। তারপর থেকেই আজ এই ৩৯তম বইমেলা পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলা বইমেলা সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হয়ে আসছে।

আরও পড়ুন: সর্বজনীন ও সম্প্রীতির আলোকে ‘ঈদ’

আশিস রায়ের ফেসবুক দেওয়াল থেকে সংগৃহীত

সত্যিই যে, মুর্শিদাবাদ জেলা বইমেলা আজ পর্যন্ত দীর্ঘ এক পথ পরিক্রমা করে এসেছে। দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমায় কখনো সে চড়াই, কখনো বা উতরাই পার হতে হয়েছে, কিন্তু বইমেলার যে নিজস্ব গতি, বইমেলাকে ঘিরে মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ, উদ্দীপনা, অনুভূতি, বই কেনার যে আগ্রহ— তার ঘাটতি কখনো হয়নি। বরং প্রতি বছর একটু একটু করে বই কেনার আগ্রহ বেড়েছে। এটাও ঠিক যে, প্রযুক্তি বিপ্লবের এই যুগে দাঁড়িয়ে প্রায় প্রতি মুহূর্তে  পাল্টে যাওয়া এই বিশ্বে লেখা, পড়া ও বইয়ের সংজ্ঞাটাই যেখানে পাল্টে যাচ্ছে, সেখানে বইমেলাগুলোও একটা চ্যালেঞ্জের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দুই মলাটের বাঁধানো বইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ‘ই বুক’। এবং এই ‘ই’ যুগের যুবক যুবতীদের ‘ই বুক’ যতটা কাছে টানে, বাঁধানো বই হয়তো ততটা নয়। বর্তমান এই সংকটকালেও মুর্শিদাবাদ জেলা বইমেলা কিন্তু তার চলার নিজস্ব ভঙ্গিতে আজও চঞ্চল। তবে আশাকরি এই মেলায় ধীরে ধীরে ‘ই বুকে’র স্টলও বাড়বে। নতুন কে সর্বদা স্বাগত। একটা জাতির মেধা ও মনন চর্চার জায়গা হল তার বই ও লাইব্রেরী। পরিবর্তিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে দেশ ও জাতি যত নিজেকে সমৃদ্ধ করবে, জাতির মেধা ও মনন জগতেরও বিকাশ ঘটবে। সেদিক থেকে বইমেলাও এর বাইরে নয়। তাই মুর্শিদাবাদ বইমেলাকেও খুলে দিতে হবে ‘ই বুকে’র দরজা। ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করে বইমেলাকে করে তুলতে হবে আরও আধুনিক, সময়োপযোগী ও গতিশীল।

প্রায় প্রতটি ‘মুর্শিদাবাদ বইমেলা’কে ঘিরে জেলাজুড়ে বই পাঠক ও ক্রেতাদের উদ্দীপনা থাকে চোখে দেখার মতো। একটা মফস্‌সল জেলা হয়েও এই উদ্দীপনা শহর তথা কলকাতার পাঠক মহলকে উজ্জীবিত করে ‘মুর্শিদাবাদ বইমেলা’। গতবছর লকডাউনের জন্য সেভাবে বড় করে ‘মুর্শিদাবাদ বইমেলা’র আয়োজন করা হয়নি। ছোট করে আয়োজন করা হয়েছিল। তবু দেখেছিলাম, মহামারির চোখরাঙানি উপেক্ষা করে পাঠক ও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। অর্থাৎ বইমেলাকে ঘিরে এই জেলার মানুষের একটা আবেগ, একটা উদ্দীপনা জেলার মানুষের সচেতন মনকে আরও সমৃদ্ধ করে।

  ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *