স্বাধীনতার পরে প্রথম ডার্বি

শুভ্রাংশু রায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যা পারেনি ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া শহরজুড়ে দাঙ্গা সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছিল। ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ কলকাতা ময়দানে বল গড়ানো কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে কিছু সময় নয় এই ঘটনা বেশ ভালোই প্রভাব পড়েছিল কলকাতা ময়দানের ওপর। ৪৬-এর ১৬ আগস্ট যখন কলকাতা জুড়ে ডাইরেক্ট অ্যাকশনের তাণ্ডব শুরু হয়েছিল, তখন ময়দানে আইএফএ শিল্ডের চূড়ান্ত পর্বের খেলা চলছিল। সেই বছর দাঙ্গার কারণে শিল্ড পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে খুব সম্ভবত দেশবিভাগ এবং স্বাধীনতা পাওয়া নিয়ে ব্যস্ততার কারণে আইএফএ-র পক্ষে ক্যালকাটা ফুটবল লিগ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এই অবকাশে, একটু বর্তমানে ফিরে একটা কথা বলে নেওয়া দরকার। করোনার কারণে যদি এই বছর কলকাতা লিগ আয়োজন করা সম্ভবপর না হয়, সেক্ষেত্রে ১৯৪৭-এর পরবর্তী সময়ে এই ২০২০-তে ক্যালকাটা ফুটবল লিগ আয়োজনে ছেদ পড়বে প্রায় ৭৩ বছর পর।

আরও পড়ুন: একশোয় পা: প্রথম ডার্বি জয়ের মধুর স্মৃতি

তবে এই সব নেতিবাচক চিন্তা ছেড়ে আমরা আশা করব, এবারও যাতে ক্যালকাটা ফুটবল লিগ আয়োজন করা সম্ভবপর হয়। তাই বাধা-বিঘ্নের গল্প ছেড়ে আবার স্বাধীনতার পরে ময়দানে বল গড়ানো শুরু হল কবে থেকে, তা নিয়ে আলোচনায় মন দেওয়া যাক।

আরও পড়ুন: ‘মোহনবাগান মাঠটাই যেন বাগান’— ১০ আগস্ট, ১৯৭৬

১৫ আগস্ট স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরে যে টুর্নামেন্ট দিয়ে ময়দানে ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু হয়, সেটি হল কোচবিহার কাপ। এটি ছিল সেই কোচবিহার কাপ, যা ১৮৯৩ সালে কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ ভূপের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল। ১৯০৪ সালে এই ট্রফিটি ছিল মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাবের ফুটবলে জয় করা প্রথম ট্রফি। ১৯২১ সালের ৮ আগস্ট এই ট্রফিতেই প্রথমবারের জন্য মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল প্রথমবারের জন্য মুখোমুখি হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সালের কোচবিহার কাপ অন্য একটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। স্বাধীনতার পর প্রথম এই কোচবিহার কাপেই প্রথমবার মুখোমুখি হয়েছিল মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল।  ততদিনে ময়দানের ইতিহাসে দু’টি দলই বড় দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। মোহনবাগান ততদিনে অন্যান্য ট্রফি বাদ দিয়ে ক্যালকাটা লিগ জিতে নিয়েছিল তিনবার (১৯৩৯, ৪৩, ৪৪) এবং অবশ্যই ছিল ১৯১১-এর সেই বহুচর্চিত শিল্ড জয়। ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যের ঝুলিতে ইতিমধ্যে ছিল দু’টি আইএফএ শিল্ড খেতাব (১৯৪৩, ৪৫) এবং তিনবার প্রথম ডিভিশন ক্যালকাটা ফুটবল লিগ (১৯৪২, ৪৫ এবং ৪৬) চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্মান। কোচবিহার কাপে অবশ্য সেই সময়ে সাফল্যের নিরিখে মোহনবাগান অনেকটাই এগিয়েছিল (মোহনবাগান সেই বছরের আগে অবধি মোট ১৪ বার এই টুর্নামেন্ট জয় করতে সমর্থ হয়েছিল। ইস্টবেঙ্গল ৪৭ সালের আগে মাত্র দু’বার এই টুর্নামেন্টে জয়ী হয়েছিল।)

আরও পড়ুন: ১৫ আগস্ট: মোহনবাগানের অন্য ধারার ‘ঘরের ছেলে’ পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি এবং শতবর্ষে বাঙালির প্রথম অলিম্পিকে অংশগ্রহণ

ঘটনাচক্রে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ৪৭-এর ১৫ এবং ১৪ আগস্ট ভারত এবং পাকিস্তান দু’টি স্বাধীন দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও ভারতের ক্ষেত্রে ইচ্ছুক দেশীয় রাজ্যগুলির ভারত-ভুক্তির প্রক্রিয়া তখন ও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। তাই কোচবিহার রাজ্যটি তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়নি (কোচবিহার ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৪৯ সালে)। এই ঘটনার উল্লেখ কেবলমাত্র ইতিহাসের ঘটনা পরম্পরার জন্য। এর সঙ্গে অবশ্যই কোচবিহার কাপ সংগঠনের কোনও সম্পর্কই ছিল না।

আরও পড়ুন: গোষ্ঠ পালের ইন্টারভিউ: স্মৃতিমেদুর রূপক সাহা

মোহনবাগানের পক্ষে সেদিন খেলতে নেমেছিলেন ডি সেন, শরৎ দাস, শৈলেন মান্না, টি আও, অনিল দে, মহাবীর, নির্মল চ্যাটার্জি, বি বসু, নায়ার, সেলিম এবং এ দাশগুপ্ত। অন্যদিকে, লাল হলুদ জার্সিতে মাঠে নেমেছিলেন পি মুস্তাফি, আর. মজুমদার, পরিতোষ চক্রবর্তী, এন রায়, ডি চন্দ্র, ডি গুহ, পি দাশগুপ্ত, এস ভট্টাচার্য, বি দাশগুপ্ত, সুনীল ঘোষ এবং সালে। ম্যাচের রেফারি ছিলেন রমেন বাগচি। খেলার প্রথমার্ধে নায়ার আর সেলিমের গোলে মোহনবাগান ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে মোহনবাগানের পক্ষে আরও দু’টি গোল করেন নায়ার এবং নির্মল চ্যাটার্জি। ইস্টবেঙ্গলের পক্ষে সালে একটি গোল করেন। শেষপর্যন্ত স্বাধীনতার পরে প্রথম বড় ম্যাচে মোহনবাগান জয়ী ৪-১ গোলে। আজকের দিনে। ৭৩ বছর আগে।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *