একশো বছর পূর্ণ প্রথম কলকাতা ডার্বির গোলের

শুভ্রাংশু রায়

“এবং গোলওওওলল…” পঞ্চাশ থেকে আশি, অন্তত তিনটি দশক আকাশবাণীর ধারাবিবরণীর মাধ্যমে এই শব্দ দু’টি যেকোনও আম-বাঙালির হৃদয়স্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দেয়নি, এমনটা ভাবাই বিস্ময়ের ছিল। মনে পড়েছে তো ‘ধন্যি মেয়ে’ সিনেমার মান্না দে-র গাওয়া সেই বিখ্যাত গানের একটি লাইন, “যার গোলে যাও তুমি তার বুকে পড়ে বাজ/ যার হয়ে গোল করো সে যে হয় মহারাজ…”। হ্যাঁ গোল। বাঙালির সেই ঔপনিবেশিক আমলের থেকে শুরু করে আজ এই ২০২১-তে ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠা মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ শতবর্ষ পূর্ণ করেছে মাত্র দু’দিন আগে। ৮ আগস্ট, ১৯২১-এ। কিন্তু কোচবিহার কাপের সেমিফাইনালে এই প্রথম সাক্ষাৎ ছিল নিষ্ফলা। কোনও পক্ষই গোল করতে পারেনি। তখন কোনও নকআউট টুর্নামেন্টে খেলা অমীমাংসিত হলে টাইব্রেকারের কোনও বালাই ছিল না। নিয়ম ছিল রিপ্লে ম্যাচের। সেই রিপ্লে ম্যাচটি খেলা হয়েছিল ১০ আগস্ট, ১৯২১। ঠিক একশো বছর আগে। আজকের দিনেই। এই ম্যাচের শতবর্ষের গুরুত্ব অন্যখানে। কারণ  রিপ্লে ম্যাচ  গোলহীন ছিল না। গোল হয়েছিল সর্বসাকুল্যে তিনটি। খেলার ফল ছিল  মোহনবাগানের অনুকূলে ৩-০। পাটিগণিতের সহজ হিসাবে আজকের দিনেই মোহনবাগান সমর্থকরা প্রথম ডার্বি জয়ের শতবর্ষ পালন শুরু করে দিতেই পারেন। রাস্তায় না হোক ভার্চুয়ালি তো বটেই। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, কোচবিহারের রাজার উদ্যোগে ১৮৯৩ সাল থেকেই কোচবিহার কাপ খেলা শুরু হয়। সেই থেকেই শব্দটি ব্যবহারের কারণ, একই বছরে শিল্ড প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। ১৯২০-র আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯২১ সালেই প্রথমবার কোচবিহার কাপে খেলতে নামে ইস্টবেঙ্গল।

আরও পড়ুন: ভারত বনাম ফ্রান্স: ৩১ জুলাই, ১৯৪৮

মোহনবাগানের সেই সময় গোষ্ঠ পাল, উমাপতি কুমার রবি গাঙ্গুলি দে-র নিয়ে রীতিমতো তারকাখচিত দলকে সেমিফাইনালে আটকে দিয়ে উজ্জীবিত অবস্থায় মাঠে নামে নশা সেনের (আর. সেন) নেতৃত্বাধীন ইস্টবেঙ্গল দল। এই ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মনে রাখা ভালো  দীর্ঘ সময় এটা ধরে নেওয়া হত যে, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল ১৯২৫ সালের ২৮ মে কলকাতা লিগের ম্যাচে।  ইস্টবেঙ্গল সে খেলায় নেপাল চক্রবর্তীর করা একমাত্র গোলে জয়ী হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা এবং তত্ত্ব-তালাশ এই বিষয়ে তথ্যে বদল এনেছে। এই প্রসঙ্গে অভীক দত্তের নিরলস পরিশ্রম এবং উদ্যোগকে সাধুবাদ দিতেই হয়। এই উদ্যোগ নিছক সাল তারিখের পরিবর্তন ঘটিয়েছে তাই নয় ডার্বির বয়স আরও চার বছর পুরনো করেছে, ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে যার গুরুত্ব অপরিসীম।

আরও পড়ুন: পরিতোষ চক্রবর্তী: বাংলার ফুটবলের এক অবিসংবাদিত প্রতিভা

যাই হোক, আবার ফিরে যাওয়া যাক সেই দিনটিতে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে রিপ্লে ম্যাচের দিনটি ছিল ১০ আগস্ট, ১৯২১, বুধবার। খেলাটি হয়েছিল পুলিশ মাঠে। ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সেই সময়ের বিশিষ্ট রেফারি মিস্টার ক্লেটন। আলোচ্য সময়ে সি আর ক্লেটন ক্যালকাটা রেফারি ক্লাবের বিশিষ্ট রেফারি ছিলেন এবং ম্যাচ পরিচালক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি প্রকৃতপক্ষে সেই সময় কোচবিহার কাপের মর্যাদা এবং গরিমার দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত করে। পরের দিন শহরের দু’টি প্রতিষ্ঠিত কাগজ ‘দ্য স্টেটসম্যান’ এবং ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’য় এই ম্যাচের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যা আবারও এই টুর্নামেন্টের গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করে। পরের দিনের স্টেটসম্যান কাগজের রিপোর্ট অনুসারে খেলাটি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মোহনবাগান এগিয়ে যায় রবি গাঙ্গুলির করা গোলের মাধ্যমে। অর্থাৎ ডার্বির প্রথম গোলদাতার নাম রবি গাঙ্গুলি।

আরও পড়ুন: সেই ১৭ সেকেন্ডের রূপকথা

প্রথমার্ধেই একটি দুরূহ কোণ থেকে জোরালো শটে গোল করে মোহনবাগানকে ২-০ গোলে এগিয়ে দেন পল্টু দাশগুপ্ত। তবে এমনটি ভাবার কোনও কারণ ছিল না যে, প্রথমার্ধে খেলা একতরফা হয়েছিল। ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর রিপোর্ট অনুসারে, “East Bengal had opportunities of reducing margin, but their forwards indulged in too much short passing”. দ্বিতীয়ার্ধে মোহনবাগানের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করেন এ.  ঘোষ। তাই বলা যেতেই পারে, প্রথম ডার্বি জয়ের শতবর্ষ আজকের দিনেই পূর্ণ হয়েছিল। আর সেক্ষেত্রে ম্যাচের ফলাফল মোহনবাগান সমর্থকদের এই জয়ের শতবর্ষ উদ্‌যাপনের সুযোগ করে দিয়েছে, তাতে কোনও দ্বিধা নেই।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

11 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *