বৃহত্তর সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ প্রান্তিক মানুষের সহজ পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা পূরণ করেছে

সমীরণ মণ্ডল, লাহিড়ীপুর (সাহেবঘাট), গোসাবা

বৃহত্তর সুন্দরবনে দুই ধরনের জলাভূমি। মিষ্টি ও নোনা জল। সুন্দরবনাঞ্চলের মানুষের প্রাণীজ প্রোটিনের প্রায় আশি শতাংশ পূরণ হয় এই দুই ধরনের জলাভূমি থেকে সংগৃহীত মৎস্য সম্পদ থেকে। যদিও সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনও উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়নি। তাই সুন্দরবনে মাছের বর্তমান অবস্থা, বিলুপ্তপ্রায় মাছ এবং বিলুপ্ত মাছের সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র স্থানীয় খাদ্যতালিকা এবং রপ্তানিযোগ্য কিছু মাছ কাঁকড়ার পরিচয় পাওয়া যায়। সাধারণ এই মাছগুলোকে চিংড়ি (বাগদা, গলদা, হরিণা, চাওড়া) কাঁকড়া এবং সাদা মাছ বলে দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়।

আরও পড়ুন: গামছার গান

তবে মোটামুটি বৃহত্তর সুন্দরবনে এখনও চুরাশি প্রজাতির বাণিজ্যিক মাছ পাওয়া যায়। যার মধ্যে কাঁকড়া ও চিংড়ি বারো প্রজাতির এবং নয় প্রজাতির শামুখ রয়েছে। সমগ্র সুন্দরবনে তিন প্রজাতির কামট এবং নয় প্রজাতির চাকুল, শঙ্কর বা শামলা পাতা মাছ পাওয়া যেত, যার অধিকাংশ বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। পাঁচ প্রজাতির কুচে মাছ পাওয়া যেত সুন্দরবনে। কুচে খুব কম লোকের খাদ্যতালিকায় থাকলেও বৃহত্তম সুন্দরবনে কাঁকড়ার ধরার চারা হিসাবে ব্যবহার করার ফলে অধিকাংশ আজ বিলুপ্তপ্রায়। কাঁকড়ার চারা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে ওড়িশা থেকেও কুচে আমদানি করা হত।

আরও পড়ুন: চূর্ণী নদীর তীরে…

লুচো, তিরন্দাজ বা আর্চার ফিশের স্বাদ একে বিলুপ্তপ্রায় করে তুলবে, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। যদিও পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে এর সংখ্যা কমই ছিল। এছাড়াও জাভা, কইভোল, পায়রাতেলি বা চিত্রা সহ কোঁকা মাছেদের প্রান্তিক সুন্দরবনবাসী বাঙালি ভুলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। সুন্দরবনের সবথেকে বেশি পরিচিত মাছ পারশে (টেবলা পারশে এবং গোল পারশে) বৃহৎ সুন্দরবনের প্রায় সর্বত্র বিরাজমান কিন্তু শীতের সময় টেবলা পারশে এখন পাতে পড়ে না তেমন। ভাঙন, বাটা, খরশুলাদের সাক্ষাৎ পাওয়া দুষ্কর। সুন্দরবনের কাঁকশেল বগি মাছেদের স্বাদ তুলনাহীন। মেন মাছ, আড়ি মাছের সময় আসে যায়, এখন কিন্তু প্রত্যাশা রয়ে যায়। দুই প্রজাতির কাইন সহ কচুমুখী (গাঁটি)-র তরকারির স্বাদ মুখে লেগে থাকার কথা আমৃত্যু। গাগরা ট্যাংরা, নোনা ট্যাংরা, তুলবেলে, চ্যাটা বেলে, কাঁটা বেলে, ভোলা, ফ্যাসা, আমুদি ও বাঁশপাতা যদিও দেয়নি ব্যথা। মৃত্যুভয় মিশ্রিত ট্যাপা মাছের স্বাদ ও গন্ধে মন ভোরে ওঠে। অনেকেই না জেনে খেতে গিয়ে বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে।

আরও পড়ুন: গড়িয়ার রথবাড়ি

কাইন, ছবি সংগৃহীত

এছাড়াও দেখতে কালো কুৎসিত, খেতে ভালো, খাওয়া উচিত গনগইনা বা দুধ কোমল আজ প্রায় বিলুপ্তির দেশে। তাড়ে (তাড়িয়াল) মাছেদের এখন দাতিনা, পারশেদের তাড়িয়ে বেড়াতে দেখি না আর। সাদা ও লাল দাতিনার মধ্যে লাল বিলুপ্তির পথে সুন্দরবনের বহু অংশ থেকে। চার ধরনের ফ্যাসার স্বাদের ফাঁসে পড়েছি কতবার। বহুদিন আসে না ইলিশ গাঁড়ালে বা দত্ত নদীতে, যদিও সুন্দরবনের দুই ধরনের ইলিশ সব জায়গা থেকেই হারিয়ে যায়নি এখনও। তবে ‘চন্দনা’ (ইলিশ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া কঠিন বিষয়। বৃহৎ সুন্দরবনের বাংলাদেশের অংশের সুন্দরবনের ভিতরে আন্ধারমানিক, জোংরা, পোড়ামহলের মাঝারি আকারের ঝিলগুলোতে বর্ষার সময় ট্যাংরা, পুঁটি, খলসে, শোল, টাকি, কই, মাগুর, শিংয়ের মতো জিওল মাছগুলো আজও সুন্দরবনের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে চলেছে।

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

পারশে, ছবি সংগৃহীত

মাছ ভিটামিন A-এর একটি বিশেষ উৎস। মাছের ভিসেরা এবং চোখ ভিটিমিন A সমৃদ্ধ। মাছ থেকে আমরা ক্যালসিয়ামের চাহিদাও পূরণ করতে পারি। ১০০ গ্রাম ছোট মাছে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ৮০০ মিলিগ্রামেরও বেশি এবং বড় মাছের কাঁটা সহ খেলে ক্যালসিয়ামের অপচয় কম হয়। খাদ্যতালিকায় ছোট মাছ জিঙ্কের চাহিদাও মিটাতে সক্ষম এবং মাছের মাথা ও ভিসেরা থেকে হিম আয়রণের চাহিদাও পূরণ হয়ে যায়, যে আয়রণ অপুষ্টির অন্যতম একটি কারণ। আমরা উদ্ভিদ বা শাকসবজি থেকে যে আয়রন পাই, সেটি ননহিম আয়রন। এর থেকে মাছের হিম আয়রন বেশি প্রয়োজনীয়।

আরও পড়ুন: ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

দাতিনা, ছবি সংগৃহীত

আমাদের শরীরের আয়োডিনের চাহিদা পূরণে আয়োডিন যুক্ত লবণের সঙ্গে সঙ্গে নোনা মাছের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। এছাড়াও মাছে রয়েছে ফসফরাস, পটাশিয়াম, সেলেনিয়াম, ভিটামিন B6. B12, কারনোসাইন, ক্রিয়েটাইন ছাড়াও ওমেগা-৩। এই ওমেগা-৩’তে EPA এবং DHA বর্তমান। মানুষের শরীরে Eicosa Hexaenoic Asid এবং Docosa Hexaenoic Asid-এর ভূমিকা অপরিসিম। যে কারণে পুষ্টি বিজ্ঞানের পরামর্শমতো আমাদের সপ্তাহে ৪০০ গ্রাম মাছ অবশ্যই খাওয়া উচিত। সুন্দরবনের মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রতি সাঁজে নোনা মাছের সন্তোষজনক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ফলে আয়োডিন, সোডিয়াম লবণ, ওমেগা-৩ এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয়।

খরশুলা। ছবি: রবীন খাটুয়া
গুলে মাছ। ছবি: রবীন খাটুয়া
লুচো, আর্চার ফিশ। ছবি: অম্বর চক্রবর্তী
গেছো কাঁকড়া। ছবি: রবীন খাটুয়া
Ornate onch slug… ম্যানগ্ৰোভ অঞ্চলের খোলা ছাড়া এক ধরনের শামুক। জোঁরা (আদিবাসী খাদ্যতালিকার)। ছবি: অম্বর চক্রবর্তী।
জাভা। ছবি সংগৃহীত
কইভোল। ছবি সংগৃহীত
শামলা পাতা। ছবি সংগৃহীত
তাড়িয়াল। ছবি সংগৃহীত
পায়রাতেলি। ছবি সংগৃহীত
রেখা বা কোঁকা মাছ। ছবি সংগৃহীত
বাঁশপাতা মাছ। ছবি সংগৃহীত
চ্যাটা বেলে। ছবি সংগৃহীত
টেপা মাছ। ছবি সংগৃহীত
Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • ভবশেখর মণ্ডল

    আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ। কিছু তথ্য নেব?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *