কবি অয়ন চৌধুরীর দেওয়া মহাবিষপানেই আমাদের মৃত্যুর প্রবাহ অপার অন্তরীক্ষে, ‘হে বিষ! হে অন্তরীক্ষ!’

ধীমান ব্রহ্মচারী

(১)

‘কেবল শ্মশানই ঘুমায় না কখনো প্রখর নৈঃশব্দ্যে

তার ধোঁয়া ওড়া নাভিকুণ্ডে আমাদের সমস্ত নিয়মিত পাপ পুড়ে যেতে দেখি’…

ছোটবেলা থেকে একটা কথা মায়ের মুখে শুনেছি, যে চিতা কোনোদিন ফাঁকা থাকে না। রাবণের চিতা নাকি সর্বদা জ্বলে। এখানেও চিতা জ্বলছে। কিন্তু যেন কোনো শব্দ নেই। নিঃশব্দে। ভয়ংকর একটা পরিস্থিতি পৃথিবীজুড়ে। মহামারির ছোবলে আমরা গ্রাস হয়ে যাব। না, এরকম নেতিবাচক ভাবনা ভাবব না। এখনো অনেকটা পথ বাকি আছে, আমাদের। এ তো সবে শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক। আর এই সময়েই আমাদের প্রজন্মের কবি লিখছেন—

‘শনিবার আমাদের বন্ধ দিন। জাতীয় সড়ক, চৌমাথা কিছুটা উদাসীন শুয়ে থাকে

রাত হলে হেডলাইট ভেঙে যায় দু-একবার চিৎকারের পর

কারা যেন লুট করে। ঘুমচোখে বুলেট দেখেছি ছিন্ন আকাশের নকশা কাঁপিয়ে

শীতের বিপরীতে জড়োসড়ো হয়ে শুই পাতার ভিতরে সহস্র কোলাহল নামিয়ে!’

সমাজের ওপর রাষ্ট্র ও তার সন্ত্রাস মাঝেমধ্যেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বুক কাঁপিয়ে দেয়। আমাদের স্নায়ু হয়ে যায় স্তব্ধ। গলার স্বর উধাও হয়ে যায়। চোখ ভরে ওঠে লাল রক্তের সঞ্চালনে। চারিদিকে একটা হাওয়া। যার নাম ‘সন্দেহ’। সে ঘুরে ঘুরে বেরায় আমাদের চারপাশে। লেখার শুরুতে দু’টো কবিতার লাইন বলেছিলাম: ‘কেবল শ্মশানই ঘুমায় না কখনো প্রখর নৈঃশব্দ্যে’— আমাদের প্রত্যেকেরই একটা অভিজ্ঞতা আছে এই শ্মশানের। ‘পরিবার-আত্মীয়-স্বজন’ নিয়েই যখন আমরা বেঁচে থাকি, তখন এই শেষ তীর্থক্ষেত্র সম্পর্কে আমাদের নতুন করে কিছুই বলার থাকে না।

আরও পড়ুন: মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’: মধ্যবিত্তের সংকট

বইটির নাম, ‘হে বিষ! হে অন্তরীক্ষ!’ কবি অয়ন চৌধুরী। —কী অদ্ভুত না, এই নামকরণ? আসলে আমাদের ভেতরে শক্তি আর ভেতরের চিন্তা। তেমনই বাইরের শক্তি ও পাশাপাশি বাইরের চিন্তা সমানুপাতিক ভাবেই চলাফেরা করে। আমরা এদেরকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলি। একটা প্রসঙ্গ টেনে আনি এই আলোচনায়: ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ উপন্যাস। লিখছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক আলবেয়ার কামু। যার শুরুটা হচ্ছে: ‘মা মারা গেছেন আজকে। অথবা কাল; আমি ঠিক জানি না’— তখনই এই হাড় হিম হয়ে যাওয়া শরীরের যে অভিব্যক্তি যে উপসর্গ এবং তার যে প্রকাশ অর্থাৎ গোটা বিশ্ব সম্পর্কে একটা উদাসীন দোলাচলতার প্রকাশ। ব্যস, আপাতত এখানে এতটুকু কথাটা বললাম। এবার আবার, আলোচিত কবির কবিতায় ফিরি: আমাদের কবিও কি তাই বলছেন না? বর্তমানে আমরা যে সময়ের মধ্যে যাচ্ছি, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব যেকোনো চিন্তাশীল মানুষের মধ্যে স্পন্দিত হবে। এই পরিস্থিতিতে যেখানে সমাজ বিপন্ন— যোগাযোগ ব্যবস্থা— স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, এমনকী জীবন। মহামারির কবলে ত্রস্ত গোটা একটা সভ্যতা। বিভিন্ন জনসংযোগ মাধ্যমে খবর আসছে— সঙ্গে খবর ভাসছে; আসছে মৃতদেহ কাতারে কাতারে অথবা লাশ পুড়ছে শ্মশানে। বেপরোয়া ভাবে। সন্তর্পণে। এই বীভৎসতা ছবি দেখেছে আমাদের অনেক অগ্রজ কবি। আমারই এক কবি বন্ধু লিখছেন:

‘ওরা আসছে

যমুনার জল ভেঙে

বুলান্দ দরওয়াজার গা ঘেঁষে।

মিরকাশিমের তলোয়ারের কানায় যে রক্ত লেগেছিল,

সেই রক্ত শুষে নিয়ে

ওরা আসছে।

রাজা তখন মখমলের চাদরে বসে—

দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে সেনাপতির সাথে

মৃত্যুর হিসাব করতে ব্যস্ত।

আর কটা লাশ যমুনায় ভাসলে,

রাজা তুমি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসে হাত নাড়বে?

ওরা কিন্তু আসছে

ওরা ভাসছে।’ (ওরা আসছে/ শুভদীপ দে)

এখানে দেখুন সভ্যতার একটা রেখা কীভাবে সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে। সম্প্রতি আমাদের একটি রাষ্ট্রীয় দল শাসিত রাজ্যের নৃশংসতা এ কবি বন্ধুরও সূক্ষ্ম হৃদয়কে কেমন যেন তোলপাড় করেছে। ব্যক্ত করেছে তাঁর ক্ষোভ কবিতায়। এও একরকম প্রতিবাদের স্বর থেকে সরে গিয়ে ভাবী মৃত্যুর আহ্বানকে আলিঙ্গন করে নেওয়া।

(২)

এবার এই পর্বে আমি ভাবনাগুলোর ভেতরে যাব। প্রথমেই কবি অয়নের বইয়ের ১৪নং কবিতায় আসি যেখানে, ও খুব স্পষ্টভাবেই দেখছে আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করছে। সারা বইয়ের কবিতার বিন্যাস দু’টো পঙ্‌ক্তিতে। প্রথম পঙ্‌ক্তিতে চারটে করে লাইন। আর দ্বিতীয় বা শেষ পঙ্‌ক্তিতে একটা লাইন। ৫৮টা কবিতা দিয়ে তৈরি বইটাতে একটা চোরা নিস্তব্ধতা লুকিয়ে আছে কোথাও। আমার কবিতাগুলো পড়ে বারবার মনে হয়েছে একটা অদৃশ্য প্রবাহমানতার কথা। একটা বিমূর্ততা। যেগুলোকে আমরা ধরতে পারি না কখনোই সেভাবে। শুধুমাত্র কবির মতোই, আমরা’ নৈঃশব্দের ভিতরে’ এগিয়ে যাই। এখানে ‘অন্ধকার’, ‘নৈঃশব্দ’, ‘শ্মশান’, ‘গহ্বর’, ‘শূন্য’— প্রত্যেকটা শব্দের প্রয়োগ প্রায় সব কবিতার মধ্য দিয়ে বারবার উঠে এসেছে। এরমধ্যে দু’একটা কবিতায় একেবারেই নেই, ঠিকই কিন্তু ‘হাড়’ বা ‘ঘুম’ অথবা ‘পাথর’— এরকম শব্দগুলোয় বারবার কবিতার শরীরে সেই অনুভূতি-অনুভব নির্মাণ করেছে যেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের যে যদি ধরেইনি কবি এখানে তাঁর ১নং কবিতা থেকে একটা অন্তরীক্ষে যাত্রা শুরু করেছেন। এবং তিনি পৌঁছবেন তাঁর অন্তিম একটা লক্ষ্যে। এই লক্ষ্য কী? আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, আমি বলব এই কবিরই আরো একটা কবিতার লাইন:

আরও পড়ুন: যে উপন্যাসে ছড়িয়ে রয়েছে সন্ত্রাস

‘শব্দ হারিয়ে গেলে আমি ঘুমেরও ভিতর হেঁটে বেড়াই শহরের আলোকবাতিতলে’ (যদি দু’টুকরো জেরুজালেম ছুঁড়ে দাও ঝুল বারান্দা থেকেই/ অয়ন চৌধুরী)। আসলে কবি জন্ম নিয়েছেন একটা গর্ভ— গহ্বরে। যেখানে আলো অপেক্ষা অন্ধকার অনেক বেশি, অনেক গাঢ়। সেখানে আছে একটা রহস্য। এই রহস্যের উদ্‌ঘাটন হয় গর্ভপাতে। অর্থাৎ একটা গর্ভ ও একটা ব্রহ্ম। এ প্রসঙ্গে আরো একটা ঘটনার কথা মনেপড়ে আমার নিজেরই। বছর ন’য়েক হবে। আমার এক কাছে বন্ধু। পদার্থবিদ্যার ছাত্র। স্টিফেন হকিংয়ের বিখ্যাত আবিষ্কার ব্ল্যাকহোল। এই নিয়ে আমি একদিন ওকে, প্রশ্ন করেছিলাম, ব্ল্যাকহোলটা ঠিক কী? আর ওখানে নাকি সময় স্থির হয়ে যায়? মানে ঘড়ি নাকি ওখানে কাজ করে না! বিষয়টা কী-রে? আমি সাহিত্যের ছাত্র। ও বিজ্ঞানের। তাই আমার মতো করেই ও উত্তর দিল, ধর তোর বয়স এখন যা। তার থেকে শুরুর সেই বয়সে পেছনে ফিরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বল কত বয়স? আমি বললাম, তা বছর এক। শুনে বলল, এবার ওই এক বছর থেকে আরও এক বছর ছ’মাস পেছনে গিয়ে দাঁড়া। এবার বল কত বয়স? বললাম, মায়ের গর্ভে। ও বলল, ব্যাপারটা ঠিক তাই। একটা কণা থেকে বিরাট এই মহাশূন্যের সৃষ্টি। এবং এই শূন্য ক্রমশ পরিবর্তনশীল ও একই সঙ্গে পরিবর্ধনশীল। মানে এটা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঁচা মাথায় বুঝলাম কিছু কিছু। আজ এই কবিতার ভেতর দিয়ে এই ব্রহ্মের প্রবাহ দেখতে পাচ্ছি। এবং এই কবিতার মধ্যে দিয়ে শ্মশান, সেখানে চিতা পুড়ছে। মানুষের মৃতদেহ। সেই দেহ পুড়ে ছাই হয়ে পঞ্চভূতে মিশছে। সেই ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুত ও ব্যোম। কত বড় ভেতরের একটা ভাবনার প্রবাহ না থাকলে এভাবে ৫৮টা কবিতার মধ্যে দিয়ে একই সরলরেখায় পার হওয়া যায় না। আমাদের অয়ন হয়তো এভাবেই, একটু একটু করে সামনের অন্তরীক্ষে যাত্রা করেছে। বইটার ১৮নং কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তির তিন নম্বর লাইনে বলছেন, ‘হে বিষ! হে অন্তরীক্ষ! তোমাদের সম্ভাবনার মতো বারংবার কোপ নেমে আসে’: খুব ভুল যদি নাভাবি তাহলে এই কোপ ভালোবাসার? এই বিষ কি আমাদের পৌরুষের অস্তিত্ব? এই অন্তরীক্ষ কি আসলে যোনিপথ বেয়ে যাওয়া ভেতরে নারীগর্ভ! বিরাট একটা প্রশ্ন, একটা ভাবনাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে কবি হাঁটছেন। এই একটা গতি। সেটা অন্তরের। সেটা সারাব্রহ্মের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্নায়ুর যোগসূত্র। এই যোগের পূর্বাভাস কবি অনায়াসেই পান। ১৯নং কবিতার শুরুই হচ্ছে, ‘অন্ধকার এ-সময়ে ঘনিষ্ঠ হও মৃত্যুর পূর্বাভাসের মতো’। মৃত্যুর চরম মুহূর্তে এসে একটা উপলব্ধি। এভাবেই কবির চিন্তা কতটা বাস্তবিক হয়ে পড়ে। এই সময়ে আমরাও সবাই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই যাচ্ছি। হঠাৎ করে কত অনভিপ্রেত পরিজন-স্বজনের মৃত্যুর খবরে শিউরে উঠছি থেকে থেকে। সমাজ বাস্তবতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত কবি লিখেই যাচ্ছেন। ২৯নং কবিতার একটা লাইন আমাদের শেষ পরিণতির ছবি দেখিয়ে দিচ্ছে: ‘সামান্য সাদা ফুল, একটি মানুষের নির্জনতার মতো ছায়া এসে পড়ুক তাতে’— এই ছায়াই তো কায়া। কায়া রূপ মৃত্যু। মৃত্যুরূপী ছায়া। দেখুন সবটাই কেমন আবার একটা দিকেই এসে মিশছে।

মৃত মানুষেরা এখানে ভেসে আসছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে, সে-কথা আমরা কবি শুভদীপের কবিতায় পেলাম। অদ্ভুতভাবে অয়নের কবিটাতেও দেখছি সেই রাজনৈতিকতার কথা। যেমন ২৮নং কবিতায়: ‘মানুষে মানুষে খুন, রাহাজানি। ছুরির ফলায় রেখেছি প্রণাম’— এটাও তো একটা দ্বন্দ্বের সূচনা। তার জন্যই কবির একটা প্রস্তুতি। যাকে কবি নিজেই করেছে প্রণাম। অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে কোথাও।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

আরও একটা কথার প্রসঙ্গ টানি। ১৯৬০ সালে জানুয়ারিতে একটা দুর্ঘটনায় মারা যান আলবেয়ার কামু। এর কিছুদিন পরই সার্ত্র একটি প্রতিবেদন লেখেন যেখানে তিনি বলছেন, (যার বাংলা তর্জমা দাঁড়ায়): …সর্বদা অস্থির এই মানুষটি, যিনি আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলেছেন, আর নিজেই উত্তরসন্ধানী এক প্রশ্ন হয়ে উঠেছেন। সম্ভাব্য এক দীর্ঘ জীবনের মাঝখানে তিনি দাঁড়িয়েছেন। আমাদের জন্য, নিজের জন্য, সেইসব মানুষের জন্য যারা প্রচলিত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, যারা তাকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের জন্যও প্রয়োজন ছিল নৈঃশব্দ থেকে কামুর বেরিয়ে আসা, একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া, একটা পরিণতিতে পৌঁছানো…। আবার এক ন্যক্কারজনক দুর্ঘটনা কামুকে আমাদের কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছে। অস্তিত্বের গভীরে আমাদের যা দাবি, তার অর্থহীনতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে কামুর মৃত্যু… মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি হঠাৎ আক্রান্ত হন এক সংকটে, যে সংকট তাঁর জীবনকেই পালটে দেয়; তখনই তিনি আবিষ্কার করেন absurd-কে। মানবজাতির বিবেচনাহীন অস্থীকরণ’। (নবপত্রিকা/ ২ সেপ্টেম্বর, ২০১২)

আমরা কি এই অনস্তিত্বের কথা খুব সহজে ভুলে গেছি? এখানেও তো কবি অয়ন কোথাও এই ভেতরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা এই ‘হিম রক্ত প্রবাহ’ বা ৪৭নং কবিতায় লিখছেন, ‘ভিতরের প্রতিটি আগোল খুলতে খুলতে অন্ধকারটুকু রুয়ে গেছে ভিতরেই’— আমরা এভাবেই শতকবর্ষ ঘুরে ঘুরে সেই প্রবাহ উপলন্ধি করি। কবির দেওয়া মহাবিষপানেই আমাদের মৃত্যুর প্রবাহ অপার অন্তরীক্ষে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *