মেয়েটি আমার হৃদয়জুড়ে শিউলি ফুটিয়েছে

বীরেন মুখার্জী (বাংলাদেশ)

কিশোরবেলা এবং প্রারম্ভিক যৌবনে নানামাত্রিক উপলব্ধির মধ্যদিয়ে দুর্গাপুজোর দিনগুলো উপভোগ করেছি। শৈশব-উত্তীর্ণ সময়ের কথা এখন অস্পষ্ট, তবে কিশোরবেলায় দুর্গাপুজো ঘিরে যে আনন্দ-বিষাদের স্মৃতি তা এখনও উজ্জ্বল। সে সময় পুজোর আধ্যাত্মিক বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধিতে না এলেও দেবীদর্শন নিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল অপার। আমাদের গ্রামের নাম দরিশলই। সেখানে কোনও বছর ৩টি আবার কোনও বছর ৪টি মণ্ডপে পুজো হত। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া বেশিরভাগ সময় বন্ধুরা মিলে মণ্ডপে গিয়ে মূর্তি তৈরি করা দেখতাম। খড়, মাটি, বাঁশ, রশি ইত্যাদি উপকরণগুলো কীভাবে ধীরে ধীরে দেবীমূর্তিতে রূপান্তরিত করেন ভাস্কররা, সে অনুভূতি আসলে প্রকাশযোগ্য নয়। তবে এর পেছনের ইতিহাসটা মোটেও সুখকর নয়, পড়া ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে মায়ের হাতে কাঁচা কঞ্চির আঘাত কত যে হজম করেছি। তবুও সেই দিনগুলো এখন খুব অনুভব করি।

আরও পড়ুন: ত্রিপুরার দুর্গাপুজো

দেবীপক্ষের শুরু থেকেই গ্রামে পুজোর আবহ ছড়িয়ে পড়ত। শরৎকালের প্রথম অমাবস্যা তিথির পরই দেবীপক্ষের শুরু। অমাবস্যায় ভোরবেলা বাদ্যযন্ত্র সহযোগে (খোল-করতাল, হারমোনিয়াম, ঢাক, কাঁসর, ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ইত্যাদি) কলা সংগ্রহ করা হয়, এটা ধর্মীয় রীতি। সংগৃহীত কলা দিয়েই দেবীর ভোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। তো ‘কলাকাটা’ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আগের রাতেই তৈরি হয়ে থাকতাম। ভোরবেলা খোল-করতালের আওয়াজ পেলেই বাড়ি থেকে দে-ছুট। শরৎকালের হিম-হিম কুয়াশাভোরে মিশে যেতাম কলা সংগ্রকারীর দলে। মহালয়ার কীর্তন চলত মাইকে। আর কলাকাটার পর কাঁদিগুলো পুজোমণ্ডপে নিয়ে উঁচু করে বেঁধে রাখা হত। একইসঙ্গে বাড়ির আনুষ্ঠানিকতাও শুরু হয়ে যেত। ‘কলাকাটা’ শেষে বাড়ি ফিরে স্নানের পর মা আমাদের দুই ভাইকে আরাধনা সূত্র বেঁধে দিতেন ডানহাতে। আরাধনা সূত্র বলতে লাল তাগি আর দূর্বা। দূর্বা পর নাকি সৌভাগ্যের প্রতীক। প্রতিবেশী বন্ধুরাও আসত মায়ের হাতে আরাধনাসূত্র পরতে। আমরা সবাই, মা-সহ বাড়ির গুরুজনদের প্রণাম করতাম। মা আমাদের নারকেল নাড়ু খেতে দিতেন। দেবীপক্ষের শুরুর দিন থেকে নবমী পুজো সমাপন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে নিরামিষ খাওয়া চলত। ঘরদোর, তৈজসপত্র ধোয়া-মোছা করে রাখা হতো। মুড়ি-মুড়কি, খই, নারকেল নাড়ু এবং বিবিধ শুকনো মিষ্টান্ন মা তৈরি করতেন আত্মীয়-স্বজন আপ্যায়নের জন্য। আমরা দুই ভাই মিলে কত নাড়ু যে সাবাড় করেছি গোপনে, এখন সে কথা মনে হলে হাসি পায়।

আরও পড়ুন: প্রাচীন পুজোর রানাঘাট

শৈশবে মায়ের সঙ্গে ‘ঠাকুর’ (প্রতিমা) দেখতে যেতাম হেঁটে হেঁটে। মায়ের আঁচল ধরে বায়না করতাম খেলনা কিনে দেওয়ার জন্য। দূরের গ্রামের ঠাকুর দেখতে হলে অনেকে মিলে নৌকা করে যেতে হত। আমাদের অঞ্চলে ভাটোয়াইল গ্রামে হতো প্রসিদ্ধ পুজো। যার খ্যাতি ছিল এ অঞ্চলে। দূর-দূরান্ত থেকেও এ মণ্ডপে ভক্ত-দর্শনার্থীদের সমাগম হত। আর বেশিসংখ্যক পুজো হত আসবা-বরইচারা গ্রামে। নবমীর দিনে ভাটোয়াইল মণ্ডপ সংলগ্ন ফটকি নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হতে দেখেছি। বেশ মনে আছে, কুচিয়ামোড়ার নৌকা প্রথম হয়ে ‘কলস’ জিতে নিত। এ ছাড়া আমাদের গ্রামের মণ্ডপগুলোতে অনুষ্ঠিত রামযাত্রা ছিল আকর্ষণীয় একটি বিষয়। তবে শৈশব পেরোতেই পুজো দেখার বৈশিষ্ট্যও পালটে গেল। তখন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে চলত পুজো দেখা। পুজোর মধ্যে বাইসাইকেলে ১৫ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মাগুরা শহরে যেতাম সিনেমা দেখতে। পিকনিকও করতাম বন্ধুরা মিলে। আবার সন্ধ্যা-আরতির ফাঁকে মণ্ডপের পুজোরী পুরোহিতের কলা, নাড়ু চুরি করে খাওয়ার ধান্দাও বাদ যেত না। তবে সব সময় যে সফল হয়েছি, তা নয়। কয়েকবার ধরাও পড়েছি। তবে ‘ব্রাহ্মণসন্তান’ বলেই হয়তো আমাকে তেমন কোনও অসুবিধায় পড়তে হয়নি।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ হাকিমপুরের শিকদার বাড়ির পুজোমণ্ডপের পাশে একটি মাঠে প্রতিবছর নামে অতিথিদের হেলিকপ্টার

যখন অষ্টম শ্রেণিতে, তখন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ব্রহ্মচর্য পালন করে উপবীত ধারণ করি। উপনয়নের পর আমার গণ্ডি বেশ সীমিত হয়ে পড়ে। আমার পণ্ডিত পিতার সঙ্গে দুর্গাপুজোয় পৌরহিত্য করতে যেতে হত দূরের গ্রামে। পুরোহিত দর্পণ দেখে মন্ত্রপাঠ করতে হত পুজোলগ্নে। আবার পুজোর পর শ্রীশ্রীচণ্ডী থেকে শ্লোক পাঠ করতে হত ঊচ্চৈঃস্বরে। খারাপ লাগত না, তবে ঘুরে বেড়ানোটা খুব মিস করতাম। যদিও সন্ধ্যার পর তেমন কাজ আমার থাকত না, কিন্তু সারাদিনের উপবাস শেষে কাদামাটির রাস্তা পেরিয়ে বেরনোর ইচ্ছে মরে যেত।

আরও পড়ুন: শক্তিময়ী সাহসিনী দুর্গতিনাশিনী, এসো সংকটে কল্যাণকরে

No description available.

দুর্গাপুজোর সময় সকাল ও সন্ধ্যাবেলার আমেজ থাকত ভিন্ন। সকালবেলা পুজোমণ্ডপে গেলে মানসচক্ষে মনুষ্য দুর্গাদেবীর দেখা মিলত। অকস্মাৎ এমন কিছু মুখ দেখা যেত, যাদের এর আগে কোনওদিন দেখিনি! এমনও হত, চোখে চোখ পড়লে উভয়পক্ষই চমকে উঠতাম। আবার কিছু মুখ সকালে দেখতাম যাদের সন্ধেবেলা খুঁজে পেতাম না। আবার এমন কিছু মানবীকে দেখতাম, যারা দেবী প্রণামের পরই উধাও হয়ে যেত। হতে পারে এটা অতিপ্রাকৃত ঘটনা তবে মনের মধ্যে কেমন যেন একটা খোঁচা অনুভূত হত। এমনটি মনে হত প্রারম্ভিক যৌবনে। যার রেশ এখনো হয়তো অলক্ষ্যে বয়ে বেড়াচ্ছি।

এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার বছরের দুর্গাপুজোয় আমাকে পৌরহিত্য করতে যেতে হয় আমাদের উপজেলার পাশের গ্রামের এক মণ্ডপে। ষষ্ঠীর দিন বিকালে গ্রামে পৌঁছতেই হুলুস্থুল কাণ্ড টের পেলাম। গ্রামের ছোট-বড় সবাই মিলে আমাকে প্রণাম করতে আসছে পর্যায়ক্রমে। আমি একদিকে লজ্জা পাচ্ছি আবার তাদের পুরোহিত ভক্তি দেখে আপ্লুতও হচ্ছি। তাদের আতিথেয়তা, শ্রদ্ধার বিষয়টি আসলে কখনো ভুলবার নয়। এই গ্রামে পুজো করতে গিয়ে আমার একটি মজার ঘটনাও রয়েছে। মণ্ডপের পাশের একটি বাড়িতে আমার বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। দেখভালের জন্য দু’জন নারী ও একজন পুরুষ উপবাসীও রয়েছেন। যাঁরা পুজোর সময় আমাকে সার্বক্ষণিক সহায়তা করেন। আবার আমাকে সঙ্গে নিয়েই খাবার গ্রহণ করেন। রীতি অনুযায়ী একজন ব্রাহ্মণের অন্য কারও রান্না করা দ্রব্যাদি খাওয়া নিষিদ্ধ। আমি ততদিন পর্যন্ত ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কারও রান্না খাইনি। সপ্তমীর দিন বিকেলে হঠাৎ আমি বিশ্রামের সময় দেখতে পাই, পাশের জানালা দিয়ে অন্য রুম থেকে ১২/১৩ বছরের একটি মেয়ে আমাকে লুকিয়ে দেখছে। তার চোখে চোখ পড়তেই সে লজ্জায় মুখ নিচু করে। এরপর থেকে প্রায়ই দেখতাম সে আমার পাশ দিয়ে ঘুরঘুর করে। আমার বেশ মনে আছে, ওইদিন সে লালপেড়ে হলুদ শাড়ি পরেছিল। কপালে চন্দনের টিপে তাকে দেখতে দেবীর মতো মনে হচ্ছিল। এক উপবাসীর নাতনি সে, নামটি বিস্মৃত হয়েছি। ‘শিউলি’ ধরে নেওয়া যাক তার নাম। উপবাসী দিদি তার বিষয়টি বুঝতে পেরে ঠাট্টা করে তাকে আমার সামনেই বললেন, ‘দাদা ঠাকুরের সঙ্গেই তোকে বিয়ে দেব।’ সে সময় বিষয়টি সবাই হাসি-ঠাট্টায় উড়িয়ে দিলেও এরপরের ঘটনাটি ছিল বেদনাদায়ক।

দশমী পুজোর পরদিন বাড়ি ফেরার সময় বিষয়টিকে ঘিরে রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ড। মেয়েটি আমার সঙ্গে বাড়িতে আসবে। লোকজন যতই তাকে বোঝাক তার ঠাকুরদি রসিকতা করে কথাটি বলেছে, তবু সে কারও কথা মানবে না। পণ করেছে আমার সঙ্গে সে যাবেই। জামা-কাপড় গুছিয়ে এক পায়ে খাড়া সে। আমি পড়লাম মহাফ্যাসাদে। শেষতক ‘যজমানদের’ অনুরোধে ওইদিন আমার আর বাড়িতে ফেরা হল না। একটা মনোলজ্জা নিয়ে থাকতে হল। মেয়েটি আমার সঙ্গেই সারাদিন ঘুরছে। এপাড়া-ওপাড়া নিয়ে যাচ্ছে, কখনও পথের পাশে ফুটে থাকা জংলি ফুল ছিঁড়ে আমার হাতে দিচ্ছে। আমার হাত ধরছে। আমি সম্মোহিতের মতো তাকে সায় দিয়ে যাচ্ছি। শেষপর্যন্ত আমি তাকে বোঝাতে সক্ষম হই— সে যদি এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করতে পারে, তাহলে তাকে আমি নিজের বাড়িতে নিয়ে আসব। সে রাজি হয়। কিন্তু পরদিন আমি চলে আসার সময় তার সেকি কান্না। তার অশ্রুসজল চোখ দু’টো, কী করুণ, কী মায়া ভরা। মনে হলে, এখনও আমার চোখে জল ভরে ওঠে। এ ঘটনার ছয়/সাত বছর পর ওই মণ্ডপে পুজো করতে গিয়ে সন্তানসহ ওই মেয়েটির সঙ্গে দেখা হয়। পুজোর মধ্যে তার পুত্রসন্তানটির ‘মুখেভাত’ অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করতে হয় আমাকে। তখন সে আমাকে প্রণাম করতে গিয়ে অনেক কান্নাকাটিও করে। আমাকে সে অনেক শ্রদ্ধা করে এবং ভালোবাসে বলে জানায়। সেদিন প্রচণ্ড আবেগে আমার চোখেও জল এসে গিয়েছিল। অবশ্য এরপর আমি আর কখনও ওই গ্রামে পুজো করতে যাইনি সত্যি, কিন্তু অনেকদিন ধরেই মেয়েটি আমার হৃদয়জুড়ে গোপনে শিউলি ফুটিয়েছে।

দুর্গাপুজোয় পৌরহিত্য ছাড়াও দেবী বিসর্জনের স্মৃতি আমাকে এখনও আবেগতাড়িত করে। দশমীর দিন দুপুরের পর থেকে জোড়া নৌকায় প্রতিমা উঠিয়ে ঘাটে ঘাটে গিয়ে দেবী প্রদর্শন করার প্রথা রয়েছে আমাদের অঞ্চলে। ঢাকের বাদ্যের তালে তালে, ধূপের পাত্র নিয়ে আমরা মাতোয়ারা হয়ে উঠতাম। পাড়ার এবং গ্রামের বন্ধু-বান্ধবী-দিদি-বউদিরা ঘাটে আসতেন দেবী বরণ করতে। আমরা তাদের দিকে বাতাসা, নাড়ু ও সন্দেশ ছুড়ে দিতাম। প্রসাদ পেতে তাদের সেকি হইচই-কাড়াকাড়ি! অনেকে আবার রাগও করত এই রীতির, কারণ দুষ্টু ছেলেরা অহেতুক মেয়েদের দিকে বাতাসা ছুড়ে দিয়ে মজা করত। যদিওবা সাবধান করে দিতে পুজো কমিটি। তারপরও টিন-এজের ছেলেরা কী নিষেধ মানে? পুজোর সময় অল্পবয়সি অনেকের সঙ্গেই চোখাচোখি প্রেম হত, চলত কিছুদিন। তারপর সবকিছু আগের মতো। তবে এ কথা সত্য, প্রারম্ভিক যৌবনে পুজোর স্মৃতি এক অব্যক্ত অনুবূতির ঝোড়ো হাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়, যার রূপ-রস-গন্ধ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *