মহামানব যিশু খ্রিস্ট, মানবপ্রেমের ঘনীভূত রূপ

শমীক সেনগুপ্ত

মানবের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য ভগবান ঈশামসি জগতের প্রতিটি পথে পথে, দ্বারে ও গৃহকোণে জ্বেলে দিয়েছিলেন এক আলো। সেই আলোতে মানবের সকল দুঃখ, দুর্দশা, ইন্দ্রিয়ে প্রথিত সকল তমসা দূর করতে তিনি অগ্ৰসর হয়েছিলেন। যদিও এই আলোর পূর্ণতা প্রজ্বলনের যাত্রাপথটি ছিল তাঁর দুঃখে ভরা। সে দুঃখ স্বেচ্ছা কল্যাণের। এই মানব মোক্ষের জন্য তাঁকে বরণ করতে হয়েছে কাঁটার মুকুট। কষ্টে, যন্ত্রণায় দীর্ণ মুখে ফুটে উঠেছে অপার্থিব আলো।

যিশুর মৃত্যু মানবের মনে চিরস্মরণীয়! আবেগে, করুণায়, তাঁর প্রতি ভালোবাসায়― তবে এসব কিছু অতিক্রম করে জগৎ তাঁর মৃত্যুকে হৃদয়ে ধরে রেখেছে ক্ষমাসুন্দর মূর্তি রূপে। তিনি ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের তৈরি করা দূরত্ব ঘুচিয়ে তাঁকে পিতার আসন দিয়েছে। প্রথম তিনি বললেন, তোমরা সকলে সেই পরম পিতার সন্তান। ঘুচে গেল অন্ধকার― মৃত্যুর কালে দাঁড়িয়েও তিনি ক্ষমা করলেন অনুচিত প্রবৃত্তিকে। সেই কারণেই তিনি হয়ে উঠলেন সকলের পিতা। আদরের যিশু।

তাঁর মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠলেই স্বভাবত মনে পড়ে মাইকেলেঞ্জেলো কৃত সেই অবিস্মরণীয় ভাস্কর্য ‘পিয়েতা’র কথা। যেখানে মৃত যিশুর মৃত্যুতে শোকার্ত মাতা মারিয়া। রোমান ভাস্কর্য কলার একটি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এই মহান শিল্পকর্মে দেখা যায়, সেই যন্ত্রণাময় মৃত্যুর মুখের উপর এসে পড়েছে চৈতন্যের আলো। মুখে লেগে আছে শেষ হাসিটুকু, যা স্বর্গীয়।

আরও পড়ুন: বিশ্বজনীন ক্রিসমাস উৎসবের কিছু অভিনব উদ্‌যাপন

যিশু তাঁর ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এ বলেছেন― সরলতা ও বিশ্বাস এই দু’টি হল ঈশ্বর লাভের চরমতম পথ। বিস্ময়কর হল, বর্তমান পৃথিবীতে এই দু’টি বস্তু সবথেকে দুর্লভ। এখন আমরা এক সারল্যহীন পৃথিবীতে বাস করি। কিন্তু মহামানবের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য তাঁর সরলতায় ধরা পরে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিজস্ব সৃষ্টি নয়, এক পরম সত্যকে ধরে জগতের কল্যাণ সাধন তাঁর মূল লক্ষ্য। এই মূল লক্ষ্যের ঐক্যটি  ধরা থাকে প্রেম, ভালোবাসায় (Unconditional love)। সেই কারণেই এবার যিশু জন্মগ্রহণ করলেন― সামান্য আস্তাবলে। তাঁকে ঘিরে ছিল দরিদ্র মেষপালকরা। এই ঘটনাটি ভীষণ সিম্বলিক― এই মেষপালকরা দীনহীন দরিদ্র, মূর্খ। সে অর্থে ধনের, যশের, পাণ্ডিত্বের কোনও অহংকার নেই। আরও গভীরে ভাবলে এরা সকলে একেবারে গৌরবহীন। ঠিক যেন বৃন্দাবনের পথেঘাটে রাখালরাজা কৃষ্ণ খেলে বেড়াচ্ছে। বাঁশি বাজাচ্ছে। সুদামা, সুবলের দাঁতে কাটা এঁটো ফল খাচ্ছে!  কোথায় রোমের ভ্যাটিকান― ওল্ড টেস্টামেন্টের মানুষের পরিত্রাতা যিশু, আর সূদূর প্রাচ্যের ব্যাসতনয় কবি শুকদেব লিখছেন― শ্রীমদ্ভাগবত। কিন্তু দুই মহামানবের জীবনের কী অদ্ভুত মিল। সেই সাদৃশ্য হল সরলতা। আত্মগৌরব, বংশ গৌরব, পাণ্ডিত্বের যেখানে কোনও স্থান নেই!

আরও পড়ুন: সেই খেলা নেই, খেলার সাথিও নেই, লোকক্রীড়া হারিয়ে গেছে

এখন এমন একটি বইয়ের কথা আলোচনা করব, যেটি পাঠ করে যিশুর প্রদত্ত পথের দিশা আমরা খুঁজে পাব। মহামনীষী টমাস এ কেম্পিসের রচিত ‘দি ইমিটেশন অফ ক্রাইস্ট’ (The Imitation of Christ). আমরা যারা আধ্যাত্মিক পথের অন্বেষী হয়েও নির্দিষ্ট কোনও ধর্মের গণ্ডিতে নিজেদের আবদ্ধ করতে চাই না, তাদের কাছে এই বই এক অমূল্য সম্পদ। এখানে মহামানব যিশুর দিব্য নির্দেশাবলি দেওয়া আছে। এই বইটির ভেতরে মনুষ্যত্ব ও দেবত্ব লাভের এক প্রাণবন্ত নির্দেশ, উপদেশ ও প্রত্যক্ষ অনুভূতি লিপিবদ্ধ করা আছে। যিশুর পথকে জানার জন্য বা মানুষের দেবত্বের উত্তরণের জন্য এই বইটি একটি অমূল্য সম্পদ। বইটির প্রতিটি ছত্রে এক দৈব্য অনুভূতিমালা আমাদের দিব্য জীবনের দিকে অগ্রসর করে। এখানে প্রতিটি কথায় বিবেক, বৈরাগ্য, ভক্তি, সরলতা, বিশ্বাস, পবিত্রতা, ব্যাকুলতা, প্রেরণা আমাদের অন্তরে ঈশ্বরের বোধকে প্রতিষ্ঠিত করে। মানবজীবনের পূর্ণপ্রাপ্তির সাধনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং বিক্ষিপ্ত অশান্ত মনকে শান্ত করে আত্মচিন্তার শক্তি দান করে। এখানে খ্রিস্টের প্রত্যক্ষ নির্দেশগুলির ভিতর থেকে একটি দু’টি নির্দেশের দিকে আমরা আলোকপাত করব!

আরও পড়ুন: গণিত দিবসে রামানুজন ও তাঁর বন্ধুত্বের কথা

এখানে অহংকারের কথা বলা হয়েছে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে। মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আত্মজ্ঞান লাভের জন্য সর্বদা নিজেকে প্রস্তুত করা। কিন্তু এক্ষেত্রে সবথেকে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার জাগতিক বস্তুর প্রতি মোহ এবং অহংকার। যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেন তিনি অন্তর থেকে দীনহীন ভাব পোষণ করেন। যশের, অর্থের, পাণ্ডিত্যের এমন নানা জাগতিক সম্পদ আহরণে তার কোনও মোহ থাকে না। জীবনের সকল জাগতিক জ্ঞান তাঁর কাছে তুচ্ছ মনে হয়। তাঁকে জানলেই সকল জানার প্রয়োজন মেটে। ভগবান যিশুর জগতের মানুষকে আত্মজ্ঞান লাভের এই নির্দেশটির সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্যটি মিলে এক হয়ে উঠছে। যিশু বলছেন, জ্ঞানাভিমানী ব্যক্তিরা অপরের নিকট পণ্ডিত ও জ্ঞানী  বলে পরিচিত হলে সুখী হয়। এমন অহংকার আত্মোন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। জ্ঞান আহরণের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন যদি পবিত্র না হয়, তবে সেই জ্ঞান কোনও কাজে লাগে না!

‘অবিজ্ঞাতে পরে তত্ত্বে শাস্ত্রীধীতিস্তু নিষ্ফলা।
বিজ্ঞাতেহপি পরে তত্ত্বে শাস্ত্রীধীতিস্তু নিষ্ফলা।।’
                              – বিবেকচূড়ামণিঃ-৫৯

(পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করতে না পারলে শ্রাস্ত্রাধ্যায়ন বৃথা, এবং পরমতত্ত্ব উপলব্ধ হলে আবার শ্রাস্ত্রাধ্যায়ন নিষ্ফল)।

আমরা দেখতে পাই যিশুর কথার প্রতিধ্বনি হচ্ছে বিবেকচূড়ামণির এই শ্লোকটিতে।

যিশুর আগমনের বহুবছর পর শ্রীরামকৃষ্ণের মুখেও এই একই কথা উচ্চারিত হচ্ছে― “শাস্ত্রের ভিতর কি ঈশ্বরকে পাওয়া যায়? শাস্ত্র প’ড়ে হদ্দ অস্তি মাত্র বোধ হয়। কিন্তু নিজে ডুব না দিলে ঈশ্বর দেখা দেয় না। ডুব দেবার পর তিনি নিজে জানিয়ে দিলে তবে সন্দেহ দূর হয়। বই হাজার পড়ো, মুখে হাজার শ্লোক বলো, ব্যাকুল হয়ে তাতে ডুব না দিলে তাঁকে ধরতে পারবে না। শুধু পাণ্ডিত্বে মানুষকে ভোলাতে পারবে, কিন্তু তাঁকে পারবে না।”
           ―শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত ১। ১২। ২ (১৩৭০) পৃঃ ১৬১
অর্থাৎ জীবাত্মার অহংকারের নাশ হলে জাগতিক আকাঙ্ক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটলে তিনি প্রেমাস্পদ হয়ে নেমে আসেন। ভক্তের কাছে ধরা দেন। পরমতত্ত্ব বা আত্মজ্ঞান তখনই লাভ হয়।

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ-কথামৃত বাংলা বই | Shri Shri Ramakrishna Kathamrita  Bengali Book

রবীন্দ্রনাথও তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত লেখায় অনুরূপ কথাই বলেছেন―

   “যদি  তোমার দেখা না পাই, প্রভু
             এবার এ জীবনে
তবে   তোমায় আমি পাই নি যেন
           সে কথা রয় মনে।
যেন  ভুলে না যাই, বেদনা পাই
               শয়নে স্বপনে।”

এই গভীর বিরহের অনুভব যখন মানবের মনে জাগে, তখন সে তার আরাধ্যকে প্রেমিক ভাবে। আর কে না জানে, প্রেমের চরম সার্থকতা তার বিরহে! এই ব্যাকুলতাই মহামিলনের একমাত্র সম্পদ। যেখানে সকল বিভেদরেখা মুছে জীবাত্মা আর পরমাত্মা এক সুরে বেজে ওঠে। যিশুও তাঁর অনুভবমালা নির্দেশে এই শুদ্ধচিত্ত মহামিলনের কথাই বলেছেন।

শেষের পঙ্‌ক্তিতে গিয়ে বলছেন―

“যতই উঠে হাসি,
ঘরে   যতই বাজে বাঁশি,
ওগো, যতই গৃহ সাজাই আয়োজনে,
যেন তোমায় ঘরে হয়নি আনা
          সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
         শয়নে স্বপনে।”

শেষের পঙ্‌ক্তিতে এসে রবীন্দ্রনাথ বলছেন মিছে আয়োজনের কথা। আত্মপোলব্ধির দ্বার আমরা সদাই বন্ধ করে রেখেছি। আর বাইরের বৃথা আয়োজনে অপচয় ঘটছে অহর্নিশ। বাইরের সকল কিছু ছেড়ে আমরা যদি একমাত্র সেই অন্তরলোকে ভগবানকে দেখতে সচেষ্ট হই, তাহলে তিনি করুণাবশত হৃদয় মধ্যে প্রকাশিত হন। আর তখনই আত্মজ্ঞান লাভ হয়। আর তা আসে একমাত্র শরণাগত হলে। ভগবান খ্রিস্ট বলছেন― “তোমরা আমার শরণাগত হও। আমাতে বিশ্বাস রাখো। আমি তোমাদের সেই পরম পিতার কাছে নিয়ে যাব।” গীতায় ভগবান একই কথা বলছেন―

“সর্ববধম্মান্ পরিত্যাজ্য মামেকং শরণং ব্রজ
অহং ত্বাং সর্ববপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।
                                             গীতা ১৮। ৬৬
(তুমি সকল ধম্মাধম্মর্ম পরিত্যাগ করিয়া একমাত্র আমার শরণাপন্ন হও, আমি তোমাকে সকল পাপ হইতে মুক্ত করব, শোক করিও না।)

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সকল ধর্মাধর্ম ত্যাগ করে কেনই বা আমরা কেবল একজনের শরণাগত হব! হওয়ার কোনও কারণ যুক্তিবাদী মন খুঁজে পায় না। যুক্তি সব কিছুকে নিত্তিতে মেপে যাচাই করে নিতে চায়। কিন্তু মানুষের মনের অন্তরলোকের নাগাল সে পায় না। একজন প্রকৃত ভক্ত বা অন্বেষী একমাত্র সেই সন্ধান পায়। আর সেটাই হল প্রেম, যার হাত ধরেই আসে শরণাগতি।

    ”দেবর্ষিভূতাপ্তনৃণাং পিতৃণাং
    ন কিঙ্করো নায়মৃনী চ রাজন্।
    সর্ববাত্মনা যঃ শরণং শরণং
    গতো মুকুন্দং পরিহৃত্য কর্ততুম।।”
                    শ্রীমদ্ভাগবতম্-১১। ৫। ৪১

হে রাজন্! যে ব্যক্তি কর্তৃত্বের মূল কারণ অহংকারতত্ত্ব (অভিমানকে) বিসর্জন পূর্বক সংসার-ভয়হারী শরণাগত পালক মোক্ষদাতা  ভগবান মুকুন্দের শরণ গ্ৰহণ করেন, তিনি দেবতা, ঋষি, সাধারণ প্রাণী ও আত্মীয় স্বজনদের কাছে কর্তব্য পাশে আবদ্ধ হন না।

অর্থাৎ এই উপরের শ্লোক দুটি থেকে স্পষ্ট যে, শরণাগতকে তিনি যে রক্ষা করার কথা বলছেন, সে কোনও জাগতিক সুখ-দুঃখ থেকে নয়― আসলে জগতের এই মায়া থেকে তিনি তাঁর শরণাগতকে রক্ষা করেন। আর এই শরণাগতির পরীক্ষায়, প্রেমের যাত্রাপথে পদে পদে বেদনা আর বিরহ। রবীন্দ্রনাথ সেই কারণেই বেদনাকে ভূষণ করে চাইছেন।

The Malmesbury Bible

সেই কারণেই শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন― ‘‘এই অনিত্য সংসারে সব মিথ্যা, সত্য একমাত্র ভগবান”।
আবার বলছেন― সত্যই কলির তপস্যা। ভগবান যিশু-ও তাঁর দিক্-নির্দেশে এই সত্যর কথা বারবার বলছেন। যিশু বলছেন― অনিত্য রূপ বা কথার দ্বারা না বুঝাইয়া সত্যস্বরূপ স্বয়ং যাহাকে শিক্ষা দেন, তিনিই সুখী। এছাড়াও যিশু আরও বহু নির্দেশ বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধির কথা বলেছেন― জ্ঞান ও কর্তব্য, শাস্ত্র অধ্যয়ন, অনিত্য বাসনা ও অহংকার, লোকসঙ্গ, আজ্ঞানুবর্তিতা ও অধীনতা, বৃথা বাক্যালাপ, শান্তি ও মোক্ষ, প্রলোভন ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে তিনি যে উপদেশগুলি দিয়েছেন তাঁর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল― সবার উপর প্রেম, যিশুর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা, অন্তর্মুখী জীবন, বিনয়, শান্তি, শুদ্ধমনও সরলতা, আত্মচিন্তা, ঈশ্বর কৃপা।

সম্ভবত ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামকৃষ্ণ খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে জানতে উৎসাহী হন। তাঁর এক জনৈক ভক্ত এই সময় দক্ষিণেশ্বরে যেতেন এবং তাঁকে প্রতিদিন বাংলা বাইবেল পাঠ ও ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। এইসময় একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি সংলগ্ন যদু মল্লিকের বাগান বাড়িতে বেড়াতে যান। সেখানে ম্যাডোনার কোলে যিশুর ছবিখানি দেখতে পান। ছবিখানির ধ্যানে তিনি তন্ময় হয়ে যান এবং হঠাৎ করে তাঁর চোখের সামনে সব কিছু জীবন্ত ও জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। এরপর প্রায় তিনদিন তিনি দর্শন করেন, একটি গির্জা যেখানে ভক্তেরা যিশুকে ধূপ-দীপ নিবেদন করছে। তিনদিন তাঁর ওই দিব্যানুভূতি চলে। চতুর্থ দিন তিনি যখন দক্ষিণেশ্বর বাগানে বেড়াচ্ছিলেন, দেখলেন এক সৌম্যকান্তি পুরুষ তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তর বলে দিল― ‘‘ইনিই যিশু, যিনি মানবজাতির মুক্তির জন্য হৃদয়ের রক্ত দান করেছেন। প্রেমের মূর্তি খ্রিস্ট ছাড়া আর অপর কেহ নন”। মানবপুত্র যিশু শ্রীরামকৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে তাঁর শরীরে মিলিয়ে গেলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ গভীর সমাধিতে মগ্ন হলেন। এভাবে তিনি তাঁর ধর্ম সমন্বয় সাধনার পথে খ্রিস্টের দেবত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

দ্য লাস্ট সাপার। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি

আমরা পরবর্তীকালে সকলে এর পূর্ণ প্রকাশ দেখতে পাই― যখন স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর আটজন গুরুভাইকে নিয়ে এক শীতের রাতে ধুনি প্রজ্বলন করে ত্যাগ ব্রতের আদর্শে নিজেদের দীক্ষিত করেন। তখন সদ্য সদ্য শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর নরলীলা ত্যাগ করেছেন। সেই রাতে তারা সকলে যিশুর মহান জীবন কথা পাঠ করেন এবং খ্রিস্টের মতন মানব জাতির কল্যাণে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করার সংকল্প করেন। পরে জানতে পারা যায়, সেই দিনটি ছিল ক্রিসমাস ঈভ― ত্যাগব্রত গ্রহণের শুভক্ষণ।

অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও চেতনায় খ্রিস্টের প্রভাব অনস্বীকার্য। এটির প্রাথমিক বীজ সম্ভবত তাঁর শৈশবে ব্রাহ্ম পরিবারে ও পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠার ফলে ঘটেছিল। তবুও সর্ব অর্থে তাঁর চেতনা যে কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায় ও ধর্মগোষ্ঠীকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর রচনার একাধিক জায়গায় তিনি খ্রিস্টের কল্যাণ, প্রেমের কথা তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের খ্রিস্ট এক শ্রেষ্ঠ মানবপুত্র। তিনি তাঁর ত্যাগের দ্বারা, মানব কল্যাণের দ্বারা দিব্যপুরুষ হয়ে ধরা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের মানসপটে। রবীন্দ্রনাথের খ্রিস্ট চিরপ্রেমিক, ত্যাগী সন্ন্যাসী, ঈশ্বরের পুত্র রূপে জগৎ কল্যাণের দিব্য পুরুষ। যিনি জগৎ কল্যাণের জন্য দুঃখকে বরণ করে নিয়ে হয়ে উঠেছেন এক অনন্য মহাসাধক, আনন্দময় ঈশ্বরের পুত্র।

রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘‘তিনি পরম আনন্দ পরমাগতি: এই কথা উপলব্ধি করবার জন্য যে ত্যাগের দরকার যারা তা শেখেনি… এই মহাপুরুষ তাই আপনার জীবনে ত্যাগের দ্বারা, মৃত্যুর দ্বারে উপস্থিত হযে মানুষের কাছে এই বাণী এনে দিয়েছিলেন।’ (খৃস্ট/ খৃস্টোৎসব)

রবীন্দ্রনাথের কাছে খ্রিস্ট ধর্ম নয়, মানুষ খ্রিস্টের ত্যাগ, প্রেম, কল্যাণের জন্য দুঃখ বরণের পথই আদর্শ রূপে ধরা দিয়েছে। সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন― ‘‘খ্রিস্টধর্ম থেকে খ্রিস্টকে, বৌদ্ধধর্ম থেকে বুদ্ধকে, বৈষ্ণব ধর্ম থেকে বিষ্ণুকে, ব্রাহ্মধর্ম থেকে ব্রহ্মকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।”

আজ বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্মের নামে চলেছে হানাহানি, হিংসা, মিথ্যা বাইরের প্রদর্শন, তখন রবীন্দ্রনাথের এই কথা, বাণীটি আকড়ে ধরে আমরা আবারও সব ভেদাভেদ ভুলে নতুন মানুষ হয়ে উঠতে পারি! না হলে ব্যর্থ হয়ে যাবে জীবন সাধনা। মানব জমিন পতিত রয়ে যাবে, সারা জীবন মিথ্যা আবরণের পিছনে ভোগের পশ্চাতে ছুটে মরব। কিন্তু যিনি প্রেমাষ্পদ তাঁকে হৃদয় মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হবে না!

‘‘আজি শুভ দিনে পিতার ভবনে/ অমৃত সদনে চল যাই” রবীন্দ্রনাথ আমাদের এই অমৃতের অধিকারী করে দিতে চাইছেন। কিন্তু আমরা আত্মঘাতী, অমৃতে আমাদের অরুচি!

বৃহদারণ্যকোপনিষৎ-এর যাজ্ঞবল্ক্য-ও মৈত্রেয়ীর কথপোকথন মনে পড়ছে। মৈত্রেয়ী যাজ্ঞবল্ক্যকের প্রশ্নের উত্তরে বলছেন―

‘‘সা হোবাচ মৈত্রেয়ী যন্নু ম ইয়ং ভগোঃ সর্বা পৃথিবী বিত্তেন পূর্ণা স্যাং ন্বহং তেনামৃতাহোত নেতি নেতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যা যথৈবোপকরণবতাং জীবিতং তথৈব তে জীবিতং স্যাদমৃতত্বস্য তু নাশাহস্তি”।। ৩
মৈত্রেয়ী বললেন, হে ভগবান এই সমস্ত পৃথিবীর ধন সম্পদ যদি আমার হয়, আমি কি তার দ্বারা অমৃত লাভ করবো, না অমরত্ব লাভ অধরাই থাকবে? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, না! সম্পদশালী ব্যক্তি আরও ভোগে লিপ্ত হয়, তোমার জীবনও তদ্রূপ হবে! বিত্তের দ্বারা অমরত্ব লাভ হয় না।

মৈত্রেয়ী বললেন―
“সা হোবাচ মৈত্রেয়ী যেনাহং নামৃতা স্যা কিমহং তেন কুর্য্যাং যদেব ভগবান্ বেদ তদেব মে ব্রহীতি”।। ৪
মৈত্রেয়ী বললেন, যার দ্বারা আমি অমৃত পাব না তদ্বারা আমি কি করব? আপনি আমাকে অমরত্বের সাধন বলে যা জানেন, সেটাই দান করুন।

রবীন্দ্রনাথও সেই অমরত্বের সন্ধানে মানুষকে খ্রিস্টের জীবন সাধনায় ব্রতী হতে বলেছেন। তাঁর গানের বাণীকে জীবনের পাথেয় করে, প্রতিটি দিনকেই আমরা যেন শুভদিন করে তুলতে পারি। আমাদের সকল যাত্রা যেন সেই অমৃত ভবনের দিকে যায়। ভোগবাদে নয়, ব্যক্তি স্বার্থে নয়― ভগবান যিশুর প্রেমের, কল্যাণের, অমরত্বের অমোঘ পথের দিশায় আমরাও যেন মৈত্রেয়ীর মতন কেবল অমৃত লাভের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারি। হয়ে উঠতে পারি তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তান, প্রেমের ঘনীভূত রূপ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *