সৎ মানুষের লোভ

রাহুল দাশগুপ্ত

জীবনে সব ক্ষেত্রে জেতা যায় না। কখনও হারও স্বীকার করে নিতে হয়। তখন কোনও একটি ক্ষেত্রে হার স্বীকার করে মনোযোগ দিতে হয় অন্য ক্ষেত্রগুলিতে। হার মানে পুরোপুরি হার স্বীকার। মনের মধ্যে যেন কোনও জয়ের লোভ না থাকে। এভাবে নির্মোহ হতে হতে, হেরে যেতে যেতে, কমিয়ে আনতে হয় জয়ের লোভকে। আর বাড়িয়ে তুলতে হয় জয়ের একটিমাত্র সম্ভাবনাকে, সমস্ত মনোযোগ একাগ্র করে তুলতে হয় সেই একে। এইভাবে বহু এক। হয়ে ওঠে। অনেক জয় বাকি সমস্ত হারের পর একটিমাত্র জয়ে এসে স্থির হয়ে যায়। আর ওই স্থিতি থেকে আসে বিস্তৃতি। ওই একটি মাত্র জয়ের দিকে তাকালে ছড়ানো বিস্তৃত জীবনটাকে দেখা যায়, যে নিজেকে গুটিয়ে গুটিয়ে, অনাবশ্যক ভারকে বর্জন করতে করতে, পরমাণুর মতো একটি স্থির বিন্দুর ভিতর থিতু হতে চায়।

বামন স্বপ্ন দেখত, সে চাঁদে যাবে। সব বামনই চাঁদে যেতে চায়। বামনেরা সবাই একরকম। যদিও তাদের চাঁদটা নানারকম হয়। আমরা একটি বিশেষ বামনের গল্প বলতে বসেছি। ফলে সেই বামন ও তার চাঁদের দিকেই মনোযোগ দেব। আর আপাতত ভুলে থাকব অন্য বামন ও বাকি চাঁদকে।

আরও পড়ুন: পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি, মোহনবাগান এবং বাঙালির প্রথম অলিম্পিকে অংশগ্রহণ: ১৫ আগস্ট, ১৯২০

আমাদের বামনের জন্ম পৃথিবীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই গ্রামে যুগে যুগে শুধু সৎ মানুষেরাই জন্ম নিয়েছে। এই বামনটিও অত্যন্ত সৎ। যদিও লোভ রয়েছে ষোলোআনা। সৎ মানুষেরাই বেশি লোভী হয়। তারা জানে, সবাই সৎ হয়ে জন্মায় না। বেশিরভাগ মানুষই জন্ম থেকেই অসৎ ও ধূর্ত। নিজের এই বিশেষ গুণটির জন্য সৎ মানুষেরা মনে মনে গর্ব বোধ করে। কিন্তু কখনও সেই গর্বকে তারা প্রকাশ করে না। বরং কেউ প্রকাশ করে দিলে তারা লজ্জা পায়। তারা তখন লাজুক। কিন্তু ওই পর্যন্তই তারা সহ্য করে। সততা তাদের উদ্ধত করে তোলে। ঔদ্ধত্য থেকে জম্মায় ক্রোধ। কেউ তাদের লোভী বললে তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। কারণ এই লোভ সে লোভ নয়। গুটিকয় সৎ মানুষের লোভ দুনিয়ার অমূল্য সম্পদ। অসৎ মানুষেরা তাদের লোভের মুঠোয় সারা দুনিয়াকে দখল করলেও, কোনওদিন সেই সম্পদের অধিকারী হতে পারবে না।

বামন যত বড় হয়, ততই তার লোভ বেড়ে যায়। লোভে লোভে একদিন সে গ্রাম ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ে। তারপর সাত ঘাটের জল খেয়ে একদিন এসে পড়ে এক শহরে। দুনিয়ার কেন্দ্রে নাকি এই শহর। ইতিহাস বইয়ে এমনই লেখা রয়েছে। শহরে এসে পৌঁছনোর পর সে কয়েক দিন বিশ্রাম নেয়। তারপর খুঁজতে বেরোয় তারই মতো আরেকজন সৎ মানুষকে। এমন একজন সৎ মানুষ, যে তার বন্ধু হবে, সহমর্মী হবে, এমনকী শিক্ষকও হয়ে উঠবে। এক কথায় যার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সে জীবনের দুর্বোধ্য পাণ্ডুলিপিটিকে পড়তে শিখবে। জীবনের সমস্ত সততা দিয়ে সে ওই পাণ্ডুলিপিটিকে পড়তে চায়। এই সততার স্বীকৃতি চাই। এই সততার প্রতিষ্ঠা চাই। এই তার লোভ। কে দেবে সেই স্বীকৃতি? কে দেবে সেই প্রতিষ্ঠা? সেই আরেকজন সৎ মানুষ। বামন সেই আরেকজন সৎ মানুষকে খুঁজতে বেরোয়।

অফুরন্ত জীবনীশক্তি নিয়ে বামন সেই আরেকজন সৎ মানুষকে খুঁজতে বেরোয়। ক্রমে তার কিছু বন্ধুবান্ধবও জুটে যায়। বামন ভাবতে শুরু করে, এরা সবাই সৎ। অবিকল তারই ছাঁচে ঢালা একেকজন সৎ মানুষ। এরকমই এক বন্ধু জানায়, তুই চরণ তালুকদারের সঙ্গে দেখা কর। সৎ মানুষ হিসাবে এ শহরে শ্রীচরণেরই নামডাক সবচেয়ে বেশি। নাম শুনেই বামন শ্রীচরণের ভক্ত হয়ে যায়। ফোনে তাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়। তারপর গুটিগুটি পায়ে একদিন তার সঙ্গে দেখা করতে যায়।

বামন ভেবেছিল, শ্রীচরণকে সে একাই পাবে। তার কাছে খোলা বইয়ের মতো জীবনের আগাগোড়া সমস্ত পৃষ্ঠাকে দাড়ি, কমা, সেমিকোলন সহ পড়ে শোনাবে। আর সবশেষে জানাবে নিজের অভিলাষ। সে জানাবে, যদিও সে বামন, তবু সে চাঁদে যেতে চায়। হ্যাঁ, একমাত্র চাঁদই তার গন্তব্য। আর এ ব্যাপারে সে শ্রীচরণের সাহায্য চায়। সে চায়, শ্রীচরণ তার বন্ধু, শিক্ষক ও সহমর্মী হয়ে উঠুক। শ্রীকৃষ্ণ যেমন অর্জুনের সারথী হয়েছিলেন, তেমনই শ্রীচরণও তার সারথী হয়ে তাকে জীবনের গলিঘুঁজি পার করে দিক। সমস্ত সততা দিয়ে সে শ্রীচরণকে অনুসরণ করতে রাজি।

কিন্তু শ্রীচরণকে একা পাওয়া গেল না। তাঁকে ঘিরে অনেক মানুষের ভিড়। আর সেই ভিড়ের ভিতর মধ্যমণি হয়ে স্বয়ং অবতারের মতো তিনি বিরাজ করছেন। সেই ভিড়ে এক কোণে ঠাই হল বামনের। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বুঝতে পারল, এই ভিড়ে যারা রয়েছে, তারা সবাই একেকজন বামন। নানাভাবে তারা শ্রীচরণকে তোষামোদ করছে। আর এই তোষামোদদের ভিতর দিয়েই তারা প্রকাশ করে চলেছে নিজেদের অভিলাষ। এরা সবাই চাঁদে যেতে চায়। যদিও এদের একজনের সঙ্গে অন্যজনের চাঁদের কোনও মিল নেই।

সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল স্বয়ং শ্রীচরণের ভূমিকা। ইনি দীর্ঘকায়, শ্বেতাঙ্গ, মধুরভাষী। সবাইকেই অকুণ্ঠচিত্তে অভয় দিয়ে চলেছেন। যদিও কারও কথাই খুব মন দিয়ে শুনছেন না। কেমন যেন ভাসা-ভাসা চোখে তাকিয়ে আছেন জনতার দিকে। জনতাও বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। তিনি যা বলছেন, তাকেই টপ করে গিলে নিচ্ছে। বাহবা দিয়ে উঠছে। যেন দু’টি পক্ষ হয়ে গিয়েছে, যারা পরস্পরকে প্রতারণা করার খেলায় মেতে উঠেছে। এক পক্ষে জনতা, যে স্রেফ শ্রীচরণের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে চলেছে। অন্য পক্ষে স্বয়ং শ্রীচরণ, যিনি অগভীর আশ্বাস বিলিয়ে জনতাকে তুষ্ট করে চলেছেন। আর যত সময় গড়াচ্ছে এই প্রতারণার খেলায়, উভয় পক্ষই ক্রমে ক্রমে আরও কৌশলী ও দক্ষ হয়ে উঠছে। যে যত বেশি প্রতারণা করতে পারছে, সে তত বেশি বিপক্ষের কাছ থেকে সমীহ আদায় করে নিচ্ছে। আর এ ব্যাপারে শ্রীচরণই যে সবচেয়ে দক্ষ সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি

এই ভিড়ের মধ্যে হদ্দ বোকার মতো বসে ছিল বামন। হঠাৎ সেদিকে চোখ পড়ল শ্রীচরণের। তিনি মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বরে বলে উঠলেন, কী চাই খোকা?

কণ্ঠস্বরের গাঢ়তায় বামন একেবারে থতমত খেয়ে গেল। তারপর যখন খানিকটা সামলে নিতে পারল, দেখল ঘরভর্তি বামনেরা তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। শ্রীচরণের প্রশ্নটা বামন এবার নিজেই নিজেকে করল। তারপর জবাব দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠল, আমি চাঁদে যেতে চাই।

ঘরভর্তি বামনেরা এমন অকপট ঘোষণা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। একজন উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল, বলে কী ছোকরা! একে চিনে রাখা দরকার, এ ছোকরা বিপজ্জনক।

এমন প্রস্তাব শুনে শ্রীচরণ মুচকি হাসলেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন, তা, আমার কাছে এসেছ কেন? আমি তো চাঁদে যাওয়ার টিকিট বিক্রি করি না।

আমি টিকিটের খোঁজে আসিনি। আমি একজন সৎ মানুষের খোঁজে এসেছি যে আমার বন্ধু, শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক হবে। আমি শুনেছি, শহরে এমন মানুষ মাত্র একজনই আছেন। আর সেই মানুষটি হলেন স্বয়ং আপনি। দয়া করে আপনি আমাকে ফেরাবেন না।

শ্রীচরণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মাথা নীচু করে কী ভাবলেন। তারপর জানতে চাইলেন, তা, হঠাৎ চাঁদে যাওয়ার ইচ্ছে হল কেন তোমার?

বামন এখন শুধু শ্রীচরণকেই দেখছে। আর সবাই যেন কোনও জাদুর ছোঁয়ায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। শুধু সে আর শ্রীচরণ মুখোমুখি বসে, আর কেউ নেই, কোনও দৃশ্য নেই, শব্দ নেই, সম্পর্ক নেই, বাস্তবতা নেই। বামনের কণ্ঠস্বরও এখন আর স্বাভাবিক নেই, আবেগে ঘন আর ভারী হয়ে উঠেছে।

সে বলে চলে, আমার ঠাকুরদার বাবা ছিলেন তাঁতশিল্পী। চমৎকার মসলিন বানাতেন। সারাদুনিয়ায় আমাদের গাঁয়ের মসলিনের খ্যাতি ছিলা। আমার ঠাকুরদার বাবা ছিলেন গাঁয়ের সেরা শিল্পী। তখন আমরা স্বাধীন ছিলাম। কিন্তু সেই স্বাধীনতা বেশিদিন টিকলা না। আপনার চেয়েও গায়ের রং শাদা, এমন একদল বণিক এসে বলল, আমাদের কাপড় তৈরি বন্ধ করে দিতে হবে। ওরা বিদেশ থেকে যে কাপড় নিয়ে আসবে, তাই সবাইকে পরতে হবে। ওদের কাছে অনেকরকম অস্ত্রশস্ত্র ছিল। ওরা আমার ঠাকুরদার বাবা ও গাঁয়ের বাকি শিল্পীদের বুড়ো আঙুল কেটে নিয়েছিল, সমস্ত মসলিন আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল, যারা প্রতিবাদ করতে গেছিল তাদের গুলি করে মেরে ফেলেছিল, আমাদের গায়ের তাঁতশিল্প ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমার ঠাকুরদার বাবার নাকি আর কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি। রাতের অন্ধকারে কোথায় সে পালিয়ে যায়। ঠাকুরদা বলতেন, উনি চাঁদে চলে গেছেন। দুনিয়ার মাটি ওঁকে জায়গা দেয়নি। কিন্তু উনি ছিলেন মহৎ শিল্পী। চাঁদে গিয়ে নিজের শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন!

পৈতৃক জীবিকা হারিয়ে আমার ঠাকুরদা তো মহাফাঁপড়ে পড়লেন! গাঁয়ের নিজস্ব জীবিকা ছিল কাপড় তৈরি। এখন কাপড় আসে বাইরে থেকে। ফলে তাদের কিছু করার রইল না। অনেকের মতো আমার ঠাকুরদাও চাষবাষ শুরু করলেন। কিন্তু চাষিগিরি করা কী সহজ কথা নাকি! অনেক কষ্টে ছোট একটুকরো জমি জুটল বটে, কিন্তু চাষ করার জন্য যা কিছু দরকার, সেসব কিছুই নেই। উপযুক্ত যন্ত্রপাতি নেই, সুস্থসবল জন্তুজানোয়ার নেই, জলসেচের ব্যবস্থা নেই, অথচ বছর-বছর খাজনা দিতে হবে। এই খাজনার ভাগ খানিকটা পেত ওই বিদেশি বণিকেরা, বাকিটা যেত গায়ের কয়েকজন মোড়লের ঘরে। এই মোড়লেরা বণিকদের সাহায্য করত আর বণিকেরা ওই মোড়লদের গাঁয়ের সবার মাথার ওপরে চাপিয়ে দিয়েছিল। সারাগ্রাম ও গ্রামবাসীরা হয়ে উঠেছিল তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি।

ফসল বেচে যে অর্থসংগ্রহ হয়, তা দিয়েও খাজনা মেটানো যায় না। মোড়লদের তোষামোদ করে গায়ে একদল নতুন মানুষ খুব শক্তিশালী হয়ে উঠল। এদের বলা হত মহাজন। এই মহাজনরা কৃষকের বন্ধু সেজে তাদের ঋণ দিত আর সুদসহ সেই ঋণ বছরে বছরে বেড়ে গিয়ে কৃষকের পক্ষে অপরিশোধ্য হয়ে উঠত। আমার ঠাকুরদার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। শেষপর্যন্ত ঋণ শুধতে না পেরে জমি বেঁচে দিয়ে নিজের জমিতেই সে ক্ষেতমজুর হয়ে যায়। একবার পাকা ধানের গানে ভরে উঠেছে তার জমি, গভীর রাতে আমার ঠাকুরদা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। বাবা বলতেন, ঠাকুরদা চাঁদে চলে গেছেন। এই দুনিয়ার জমি বন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখানে জমির মালিক কৃষক নয়, মহাজন, মোড়ল আর বণিক। এখানে ফসল ফলিয়ে লাভ নাই। চাদের জমি উর্বর। ঠাকুরদা সেই উর্বর জমিতে ফসল ফলাতে গেছেন!

ঠাকুরদা চলে যাওয়ার পরেই গাঁয়ে আবার আমূল পরিবর্তন এলো। গাঁয়ের অর্ধেকেরও বেশি কৃষিজমিতে গজিয়ে উঠল প্রাচীন দুর্গের মতো দেখতে ধোঁয়ায় ঢাকা কলকারখানা। বণিকেরা বুঝেছিল, শিল্পোন্নয়ন করতে হবে। কৃষিসম্পদের পাশাপাশি চাই খনিজ ও শিল্প সম্পদ। কৃষিশক্তির পাশাপাশি শিল্পশ্রমশক্তি। তবেই আমাদের গাঁ’টাকে আগাগোড়া লুণ্ঠন করা সম্ভব হবে। বিদেশি বণিকদের পাশাপাশি দেশি মোড়ল-মহাজনেরাও ইতিমধ্যে দু’পয়সা কামিয়ে নিয়েছে। কৃষিজমির বৃদ্ধি আর সম্ভব নয়, তা নির্দিষ্ট, কিন্তু পুঁজি বাড়তেই থাকে, তার কোনও সীমান্ত কেউ বেধে দিতে পারে না। বিদেশি বণিক, যারা কলকারখানা তৈরি করে শিল্পপতি বনে গেছিল, তাদের পাশাপাশি দেশি মোড়ল-মহাজনদের উত্তরাধিকারীরাও সঞ্চিত অর্থকে মূলধন হিসাবে খাটিয়ে বেশ কিছু কলকারখানার মালিক হয়ে বসল। এতসব কলকারখানার জন্য চাই প্রচুর শ্রমিক।

আরও পড়ুন: জয় হো…

জমিজমা হারিয়ে যারা ক্ষেতমজুর হয়ে গেছিল, রাতারাতি তারাই ওইসব কলকারখানায় শ্রমিক বনে গেল। আমার বাবাও ছিলেন ওই রকমই একজন শ্রমিক। যা মজুরি পেতেন, তাতে সংসার চলত না। অনাহার, অর্ধাহার, বস্ত্রাভাব, ঘুপচিমতো প্রায়ান্ধকার খুপড়িতে বসবাস, সংসার চালাতে গিয়ে ঋণের পর ঋণ— এইসব আমাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। অথচ শরীর-সংসার যতই অচল হয়ে পড়ুক, একদিন কামাই করলে মজুরি কাটা যাওয়ার ভয়ে, দাবদাহ শৈত্যপ্রবাহ-প্লাবন উপেক্ষা করে তাকে হাড়ভাঙা খাটতে হত। একদিন মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মিছিল বেরোলো, আমার বাবাও সেই মিছিলে যোগ দিতে গেলেন, আর ফিরলেন না। মা বলেন, বাবা চাঁদে চলে গেছেন। বাবা ছিলেন দক্ষ মজুর। কিন্তু এই দুনিয়া তাঁকে উপযুক্ত মজুরি দিতে পারত না। উপযুক্ত মজুরির খোঁজে তাই চলে গেছেন!

একটানা কথা বলে বামন হাঁপিয়ে গেছিল। নিজের গাঁয়ের একশো বছরের ইতিহাস, এসব মনে করে করে বলা কী সোজা কথা নাকি! বিশেষ করে যে ইতিহাসের সে প্রত্যক্ষদর্শী নয়, আরও অনেকের মতো সামান্য এক শ্রোতা মাত্র! যে ইতিহাস কোথাও লেখা নেই, কোনও ঐতিহাসিক যে ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামায় না, যে ইতিহাস আদৌ ইতিহাসই নয় স্রেফ জনশ্রুতি, তার কাহিনি বলা কী যে সে লোকের কাজ! নাঃ, বামন এ কাজের অনুপযুক্ত। কাহিনি সে গুছিয়ে বলতে পারে না। ওসব মা-ঠাকুমারা পারত। ওদের মতো কাহিনিকার কোনও দেশে কোনও কালে কখনও জন্মাবে না। বামনের শুধু একটাই যোগ্যতা রয়েছে। সে সৎ। ফলে কাহিনিটি রসালো না হলেও বিশ্বাসযোগ্য। বামন বানিয়ে বলতে পারে না। শুধু যা শুনেছে, তাই বলতে পারে। মূল কাহিনিতে গোঁজামিল থাকলে বামনের সেখানে কিছুই করার নেই!

বামন আবার শুরু করে, এবার আমার নিজের কথা। বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর মা আবার বিয়ে করলেন। মায়ের ইচ্ছে ছিলো না। যাকে বিয়ে করলেন, বাবার কারখানায় তাকে সবাই বড়বাবু বলে ডাকতো। পদটি কেরানির, কিন্তু লোকটি কেউকেটা, মায়ের দিকে অনেকদিন ধরেই নজর ছিলো। বাবা কিছুই রেখে যেতে পারেননি, অসহায় মা বাধ্য হয়ে বড়বাবুর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। বড়বাবু গোড়া থেকেই আমাকে অপছন্দ করত। মুখ বাঁকিয়ে বলত, শুধু বিজনেস আর টেকনলজি দিয়ে হয় না বুঝলি! তাহলে তো মালিক আর শ্রমিকে, মোড়ল আর চাষায় গোটা গাঁ-টা ভরে যেতো! আমাদের জায়গাটা কোথায় হত, বল দেখি? আগে বণিকরা গাঁ চালাত, এখন চালায় শিল্পপতিরা। আমরা ছাড়া তাদের চলবে? আমরা কলম পিষে পিষে হাত খইয়ে ফেলি, তবেই না মালিকের হিসেবের খাতায় মুনাফা জমা হয়, আর গরিব মানুষের ভাঁড়ার ফাঁকা হতে হতে ঠুটো জগন্নাথের আস্তানা বনে যায়! কে আমাদের তৈরি করল বল দেখি? টেকনলজি নয় রে, এরে কয় ‘ইডিওলজি’। বাংলায় এর অন্য একটা নামও রয়েছে। মগজধোলাই। বিদেশিরা মগজধোলাই না করলে আমার মতো শিক্ষিত কর্মচারীরা, কেরানিও বলতে পারিস, আকাশ থেকে পড়ত না, বুঝলি?

একটু থেমে আবার সে শাসানোর ভঙ্গিতে শুরু করত, নিজের গাঁ, মাটি, পরিবার, পরিজন তাদের প্রতি তোর বাপ-ঠাকুরদার মতো আমিও যদি সৎ থাকতাম, যেভাবে ওরা সবাই আত্মহত্যা করেছে, সেভাবে আমার প্রাণটাও বেঘোরে খোয়া যেত। ভাগ্য ভালো ওইসব আহাম্মকের দলে নাম লেখাইনি, গাঁ-মাটি-পরিবার-পরিজন কাউকে চিনিনি, দেশি-বিদেশি মালিক যা বলে গেছে, মাথা নুইয়ে মেনে নিয়েছি, লোক ঠকাতে বললে ঠকিয়েছে, লোক ঠেঙাতে বললে ঠেঙিয়েছি, লোকের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে পেন্নাম করতে বললে, করেছি, সে লোক দেশি না বিদেশি একবারও ভাবতে যাইনি, আর তাই না ঠাঁটেবাটে আজ বেঁচেবর্তে রয়েছি? তোর রক্ত বদরক্ত, খুব খারাপ, নিজেকে এখন থেকে বদলে নে, নইলে পিটিয়ে শরীরের হাড়মাস এক করে দেব। আর তাতেও যদি শায়েস্তা না হোস, তবে পেছনে লাথি মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব।

আর সত্যিই হাড়মাস এক হওয়া নিয়ে আমার তেমন একটা ভয় ছিল না, ওটা আমাদের পরিবারে নতুন কোনও ব্যাপার নয়, আমার লোভ ছিল বাড়িতে। ইট-সিমেন্ট-কংক্রিটের বাড়িতে আমার বাপ-ঠাকুরদা-ঠাকুরদার বাপ কেউ কখনও থাকেনি। বাপ থাকতেন শ্রমিকদের বস্তিতে, ঠাকুরদা থাকতেন খড়-মাটির চালাঘরে, ঠাকুরদার বাপ লেপেপুছে নিজের হাতে ওই চালাঘরটি বানিয়েছিলেন। আমার অবশ্য অন্য একটা লোভও ছিল। লোভ আমার জন্মগত। আমার সৎ বাপের এক খুড়ো ছিল। তাঁকে আমি পাগলাদাদু বলে ডাকতাম। এই পাগলাদাদুর নিজস্ব একটা লাইব্রেরি ছিল। সেই প্রথম আমার লাইব্রেরি দেখা। আর সে কী আর যে সে লাইব্রেরি! যেদিকে তাকাও শুধু বই আর বই। অতএব আমার বাপ-ঠাকুরদা কস্মিনকালেও যা করেনি, আমি তাই করতে শুরু করলাম। বই পড়তে শুরু করলাম। যত পড়ি, তত মনের মধ্যে কেমন যেন ওলোট-পালট হয়ে যায়। আমার লোভ আরও বেড়ে গেল। বুদ্ধি আরও পাকা হতে শুরু করল। বাপ-ঠাকুরদার জন্য মনে কষ্ট বাড়তে শুরু করল। আর সৎ বাপটির গালিগালাজগুলো। বোধগম্য হতে শুরু করল।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা আন্দোলনে মুর্শিদাবাদ

পাগলাদাদুর লাইব্রেরিতে অনেক বিদেশি গল্পের বই ছিল। তার মধ্যে কয়েকটা আমি বারবার পড়তাম। এক পাগলের গল্প ছিল। পাগলটার নাম দন কিহোতে। সে কেবলই বদমায়েশদের শায়েস্তা করতে চাইত আর তার কাছে যত বড়লোক আর পাদ্রিগুলিই ছিল বদমায়েশ। একটা ভণ্ডের গল্পও ছিল। সেই ভণ্ডের নাম জুলিয় সোরেল। এই ভণ্ডটিও বড়লোকদের খুব ঘৃণা করত আর তাদের শায়েস্তা করার জন্যই নিজেও বড়লোক হতে চাইত। একটা নির্বোধের গল্প ছিল। এই নির্বোধটার নাম প্রিন্স মিশকিন। সে খুব গরিব ছিল, তারপর একদিন হঠাৎ বড়লোক হয়ে গিয়েও তাদের মতো হতে পারল না, কিছুতেই না, বরং দুঃখী মানুষদের প্রতি তার মায়া-মমতার শেষ ছিল না। একটা খুনির গল্পও ছিল। এই খুনির নাম ছিলো রাসকোলনিকভ। সে খুন করেছিল এক সুদখোর মহাজনকে, কারণ তার ধারণা হয়েছিল ওই মহাজনের টাকাগুলো তার কাছে থাকলে গরিব-দুঃখীদের অনেক উপকার করতে পারবে। আর ছিল এক দাগি অপরাধীর গল্প, তার নাম ছিল জঁ ভলজ, সমাজ যাদের অপরাধী ঠাওরাত, সেই দুঃখী-গরিব-বেশ্যা-বিপ্লবীদের সে উপকার করে বেরাত।

গল্পগুলো আমি পড়তাম, আর চোখের জলে বিছানা ভাসাতাম। কী শোচনীয় পরিণতিই না হয়েছিল লোকগুলোর! পাগল আর দাগি অপরাধী মারা গেছিল। অল্প কিছুদিনের জন্য পাওয়া হুঁশ আর অর্থ খুইয়ে নির্বোধ আগের মতোই গরিব আর নির্বোধ বনে গেল। ভণ্ডটির প্রাণদণ্ড হল। আর খুনিটিকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ভেবে দেখলাম, লোকগুলো কেউই তো মন্দ ছিল না। বরং অনেকের চেয়েই ঢেরগুণ ভালো ছিল। গরিব-দুঃখীদের কথা ভাবত। আর নিজেরাও কী দুঃখীই না ছিল। তবে ওদের ওই পরিণতি হল কেন? তারপর আরও ভেবে দেখলাম, আমার বাপ-ঠাকুরদা-ঠাকুরদার বাপের ওই পরিণতি হল কেন? বাপটা শ্রমিকদের মজুরিবৃদ্ধির দাবিতে মিছিলে গিয়ে আর ফিরল না, ঠাকুরদা নিজের ঘাম-রক্ত-অস্থি-মজ্জা দিয়ে তৈরি নিজেরই জমি থেকে বিতাড়িত হয়ে ক্ষেতমজুর বনে গেল, আর ঠাকুরদার বাপ গায়ের সেরা শিল্পী হওয়া সত্বেও তার আঙুল কেটে নেওয়া হয়েছিল, তার যে হাতের কাজ দুনিয়াজোড়া মানুষকে অভিভূত করে দিয়েছিল, সেই শিল্পকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিলো! নিজের বাপ, ঠাকুরদা, ঠাকুরদার বাপের সঙ্গে ওই পাগল, ভণ্ড, নির্বোধ, খুনি, দাগি অপরাধীর মিল খুঁজে পেয়ে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আহা, ওরা সবাই কত দুঃখভোগ করেছিল!

আগেই বলেছি, বই পড়ে বুদ্ধি আমার পেকে উঠেছিল। ভাবনাও আমার যেন কিছুতেই আর থামতে চায় না। ভাবছি আর ভাবছি, রাতদিন কেবল ভেবেই চলেছি। ভেবে দেখলাম, পাগল, ভণ্ড, নির্বোধ, খুনি আর দাগি অপরাধীটা বড়লোকদের বড় বেশি জব্দ করতে শুরু করেছিল। বড়লোকরা তাই ওদের শায়েস্তা করে ছেড়েছিল। আমার বাবার মজুরিবৃদ্ধি হলে দেশি-বিদেশি শিল্পপতি মালিকদের মুনাফা কমে যেত। আমার ঠাকুরদার জমিটা থাকলে, মোড়ল-মহাজনেরা জমির মালিক হতে পারতো না। আমার ঠাকুরদার বাপের বুড়ো আঙুলটা না কাটলে বণিকদের ওই বিদেশি কাপড়গুলো এদেশের উঁচু মানের কাপড়ের কাছে কল্কে পেত না। নিজেরা জব্দ হবে না বলেই ওই বণিক, মোড়ল, মহাজন, শিল্পপতিরা আমার বাপ, ঠাকুরদা, ঠাকুরদার বাপকে শায়েস্তা করেছিল। জেনেবুঝে ওরা কখনও কারও ক্ষতি করেনি, সে মানুষই ওরা ছিল না। অথচ কার যে কখন প্রতিপক্ষ হয়ে বসে আছে ওরা তা টেরও পায়নি। মানুষের কর্মই কাউকে তার বন্ধু, কাউকে শত্রু বানিয়ে তোলে। কিন্তু ফলাফল জেনে কেউ তো কর্ম করতে বসে না। আর বসলেও সে হিসাব মিলিয়ে দেওয়া মোটেই সহজ কথা না।

একটা পাকুড় গাছের ছায়ায় বসে আমি আর পাগলাদাদু গল্প করতাম। পাগলাদাদু বলত, জানিস বাছা, ওই শ্বেত বণিকগুলো আসার পরই আমাদের গায়ে যেন উলটপুরাণ শুরু হল। চাষের জমিও কেনাবেচা করা যায়, এমন আজব কথা এসব গাঁয়ে কেউ কখনও শুনেছিল নাকি? ওরা এসে ফসলকেও পণ্য বানিয়ে দিল, সেই পণ্য বেচবে বলে বাজার তৈরি করল। আর এখন দেখ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, এমনকী কবিতা-গানও পণ্য হয়ে উঠেছে। সারা দুনিয়াটাই এখন একটা বাজার, আর সেই বাজারে সবকিছুই পণ্য। দয়া, সহানুভূতি, সম্পর্ক, শিল্প, প্রেম, করুণা— এসবের বদলে দুনিয়াটা এখন পুঁজি, মূলধন, উদ্বৃত্ত, মুনাফা, লাভ, লোকসান, বাজার-এসবের নিয়মে চলছে। এই পুঁজিসর্বস্ব দুনিয়ায় মানুষ বড় বিপন্ন, বিচ্ছিন্ন, একা হয়ে পড়ছে রে! সবাই সবাইকে ফাঁকি দিচ্ছে আর ভাবছে, ‘খুব লাভ করেছি!’ বাজারের নিয়ম মানতে গিয়ে মানুষ একটা মস্ত ফাঁকির ফাঁদে পড়ে গিয়েছে।

একটু থেমে পাগলাদাদু আবার বলতে শুরু করে, এই দেখ না, একটা ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি। তুই খবরের কাগজ পড়িস। খবরের কাগজে যে সাহিত্য ছাপা হয়, তাও পড়িস। টিভি দেখিস, তাতে যেসব সিরিয়াল হয়, সেগুলিও দেখিস। তোর বাপ, ঠাকুরদা, ঠাকুরদার বাপের মতো দেশের আসল মানুষগুলোর জীবন নিয়ে খবর, সাহিত্য, সিরিয়াল দেখেছিস কখনও? সব জায়গায় শুধু বড়লোকদের কথা, তাদের কেচ্ছা-কাহিনি, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠের কিসসা, নাইট ক্লাব-অবৈধ সম্পর্ক-বলিউড-ক্রিকেট ব্যবসায়ী-মাস্তান-পার্টিনেতাদের খোশগল্প, বাজারবিকিনি-বুলেটের রমরমা! যে মানুষগুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশটাকে চালু রেখেছে, যাদের বুকের ওপর পা রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওই বড়লোকদের কাগুজে ঠুনকা দুনিয়া, তাদের বুকে মাথা রেখে পরম মমতায় সেই বুকের ভিতর জমে থাকা অভিমান আর দীর্ঘশ্বাসে মাখামাখি গল্প-কবিতা কেউ শুনতে চেয়েছে কখনও? তোরা আবার সেইসব নিয়েই বড়াই করিস। বাছা, একটা মস্ত ফাঁকির ফাঁদে তোরা আটকে গেছিস, মানুষকে বাদ দিয়ে কয়েকটা অমানুষের গায়ের লোম নিয়ে কাড়াকাড়ি লাগিয়ে দিয়েছিস, ওদের জীবন একটা মস্ত ফাঁকি, সেই ফকির মোহে ওরা তোদের ভুলিয়ে রাখতে চায়, চিন দেশে মানুষকে যেভাবে আফিং খাইয়ে ভুলিয়ে রাখত, তোরা ওদের ঝাঁ-চকচকে জীবন, ওদের বলিউড-ক্রিকেট-নাইট ক্লাব-শৌখিন কবি সম্মেলন আর গানের কম্পিটিশন দেখে নিজেদের অভাব-দুঃখ, গান-কবিতা আর আসল মানুষগুলোকে ভুলে আছিস!

একবার কথা শুরু করলে, পাগলাদাদু আর থামতেই চাইত না। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে পরম মমতায় বলে যেতো, চাঁদে যাওয়ার লোভ সমস্ত সৎ মানুষেরই থাকে। তুইও খুব লোভী। তুই বরং চাঁদে চলে যা বাছা। তোর বাপ, ঠাকুরদা, ঠাকুরদার বাপ সবাই চাঁদে চলে গেছে। এই দুনিয়াটা ওদের কারও মনের মতো ছিল না। তুই-ও এখানে মনের মতো কিছু পাবি না। একাগ্র হয়ে সাধনা কর। দেখবি, ঠিক একদিন চাঁদে পৌঁছে যাবি। আর যদি এমন কোনও সৎ মানুষকে পাস, যে তোর বন্ধু, শিক্ষক আর পথ প্রদর্শক হবে, তবে সেই তোকে চাঁদে যাওয়ার পথ বাতলে দিতে পারবে। তবে আগে দেখে নিস, লোকটি সৎ কিনা! একটা সময় ছিল যখন যুগে যুগে এ গায়ে শুধু সৎ মানুষেরাই জন্মেছে। তোর শরীরেও সেই রক্তই বইছে। এখন কিন্তু সময় পাল্টেছে। বিদেশিরা এসে অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। আমাদের গায়ের অনেক মানুষ, যেমন তোর সৎ বাপ, ধূর্ত বণিকগুলোকে দেখে, ওদের ভাষা আর শিক্ষায় মগজধোলাই হয়ে, নিজেদের পাল্টে ফেলেছে। সবচেয়ে ভালো হয়, তুই যদি শহরে চলে যাস। শহরগুলোই বণিক-দুনিয়ার মুখোশ। ওখানেই ওদের বাজারগুলো, যেখানে ওরা পসরা সাজিয়ে বসে থাকে। পেটের দায়ে ওদিকেই এখন সবাই চলে যাচ্ছে। খুঁজেপেতে দেখ, হয়তো কোনও সৎ মানুষ পেলেও পেতে পারিস। পাগলাদাদুর কথা শুনেই একদিন রাতের অন্ধকারে আমি গা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। পাগলাদাদু আমার লোভকে উসকে দিয়েছিল। পাগলাদাদুই বুঝিয়েছিল, লোভ না থাকলে সততার অগ্নিপরীক্ষা হয় না। এই আমার জীবনকাহিনি!

আরও পড়ুন: সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)

গল্প শেষ করে বামন সারা ঘরের দিকে তাকালো। ঘর প্রায় ফাঁকা। বেশিরভাগই কখন চলে গেছে। সামান্য দু’একজন যারা আছে, তারা সবাই ঢুলছে। শ্রীচরণ তাদের জন্য চা নিয়ে আসতে কাকে নির্দেশ দিলেন। তারপর বামনের দিকে ফিরে মৃদু হেসে বললেন, চাঁদে যেতে গেলে একটা পরিচয় লাগে। তোমার বাবা শ্রমিক ছিলেন, ঠাকুরদা ছিলেন কৃষক, ঠাকুরদার বাবা ছিলেন তাঁতশিল্পী। আমার বাবা বিপ্লবী ছিলেন। ভেবেছিলেন বোমাবাজি করে আর ভয় দেখিয়ে শ্বেতাঙ্গ বণিক-শিল্পপতি-শাসকদের এই শহর থেকে তাড়িয়ে দেবেন। পারেননি। তাঁর ফাঁসি হয়েছিল। আমি মামাবাড়িতে মানুষ হলাম। আমার মামারও একটা পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন একটা কাপড়ের কারখানার মালিক। বুর্জোয়া, পুঁজিপতি, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি— কত নামেই না তাকে ডাকা হত। বিদেশিদের তিনি খুব পছন্দ করতেন।

বলতেন, তোর বাবার মতো বিপ্লবীরা লড়াই করে শহরটাকে স্বাধীন করুক। আমি বিদেশিদের চটাব না। তোর বাবারা বিদেশিদের তাড়াবে। কিন্তু ক্ষমতা দখল করব আমরা। বিদেশিরা এ দেশের সমস্ত শিল্প ও লগ্নি পুঁজি আমাদের হাতেই দিয়ে যাবে। এখনই আমরা ওদের পুঁজির সমান-সমান অংশীদার। ওরা চলে গেলে সবটাই আমাদের হবে। তা অবশ্য হয়নি। সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে বিদেশিরা পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়েছে। ওদের বহুজাতিক সংস্থাগুলো শহরের বাজার দখল করে নিয়েছে। আগে আমার মামার মতো মানুষেরা বিদেশি ব্যাঙ্ক আর বাণিজ্য সংস্থাগুলোর দালালি করত, এখন ওরা বহুজাতিক সংস্থাগুলোর দালালি করে। বিদেশি বহুজাতিকের স্বদেশি কারখানাগুলো ওরাই চালায়। কিন্তু সে যাই হোক, আমার মামারও একটা পরিচয় ছিল। বাবা, মামা দু’জনেই যে যার মতো করে চাঁদে গেছে। কিন্তু তোমার পরিচয় কী? ভাবুক? এটা এখন একটা পরিচয় হয়েছে বটে! অবশ্য ভাবুকদের এখন অন্য একটা নামে ডাকা হয়। বুদ্ধিজীবী! এখানে যারা আসে তারা সবাই বুদ্ধিজীবী। বুদ্ধিজীবীরা আবার দারুণ প্রতিভাবান হয়। তাদের কেউ কবিতা লেখে, কেউ গান গায়, কেউ ছবি আঁকে, কেউ সিনেমা করে, কেউ নাটক করে, কেউ মূর্তি বানায়, কেউ নাচে, কেউ বাঁশি-সরোদ-সেতার বাজায়, কেউ বই ছাপে, কেউ পত্রিকা প্রকাশ করে। তুমি কি বুদ্ধিজীবী?

বামন মাথা চুলকে বলল, আমার তো কোনও প্রতিভা নেই! আমি একজন সৎ মানুষ। এটা কি কোনও পরিচয় হতে পারে না?

মানুষের পরিচয় তার কর্মে। সৎ মানুষের কী কর্ম থাকতে পারে? আর কর্মহীন মানুষ তো চাঁদে যেতে পারে না!

বামন কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, জীবনে আমি একটা কাজই করে এসেছি। ভাবনা। নিরন্তর একের পর এক ভাবনা আসে আর সর্বদাই তা কাহিনির আকারে আসে। আমাদের গায়ের একশো বছরের ইতিহাসে কত বিচিত্র মানুষ, আশ্চর্য সব ঘটনা, লোকছড়া-জনশ্রুতি-লোকগান, সেসবই কাহিনির আকারে আমি ভেবে যাই। বিচ্ছিন্নভাবে কোনও ভাবনা আসে না। আমি কাহিনি ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না।

শ্রীচরণ একটা হাই তুলে বললেন, তুমি তাহলে কথকতা শুরু করে দাও। একাগ্র হয়ে ভাববা, তারপর যেসব কাহিনী মনে আসবে, সেগুলো কথকতা করে মানুষকে শোনাও। এইভাবে একদিন আসবে, যখন রোজ তুমি চাঁদকে স্বপ্নে দেখবে। আর তখনই বুঝবে, সময় এসে গেছে, চাঁদ আর দূরে নেই।

সেই থেকে বামনের কথক-জীবন শুরু হয়ে গেল। কথকতা করতে গিয়ে তার পরিচয় হল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সঙ্গে। এই বামনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাড়ামি শেখাতে যায়। শহরে তাই এর খুব প্রতিপত্তি। বহু সভাসমিতির উপদেষ্টা। বামনের হাত ধরে বলল, দারুণ গল্প বলেছ। আজ থেকে আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

গল্প নয়, আমি আমার জীবন-কাহিনি বলেছি।

ওই একই হল। একদিন আমার বাড়ি এসো। তোমার কথকতা শুনব।

নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষকটির বাড়ি গিয়ে বামন দেখল সে বাড়ি নেই। অনেক দূর থেকে বামনকে আসতে হয়েছে। শিক্ষকটি চাইলেই তার মোবাইলে খবর দিতে পারত। কিন্তু এইটুকু সৌজন্যও তার নেই। বিষণ্ণ হয়ে বামন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলল। একটা সেমিনার হলে সবাই গম্ভীর মুখে বসে আছে। আর শিক্ষকটি একটা ডুগডুগি বাজিয়ে খুব রঙ্গরসিকতা করছে। বামনকে দেখেও সে চিনতে পারল না। অনেকক্ষণ পর বামন শিক্ষকটিকে একা পেয়ে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

শিক্ষকটি ওকে দেখেই মুখ খিচিয়ে বলে উঠল, তুমি এত সৎ কেন? কে কবে কথা দিয়ে রেখেছে? লোকে ঠিকই। বলে, তুমি। দারুণ। ডেনজারাস লোক!

সেই থেকে বামনের বদনাম হয়ে গেল। সেই বদনাম বেড়েই চলল। এক দম্পতি মাঝেমধ্যে বামনের কথকতা শুনতে আসতো। হঠাৎ একবার মহিলাটি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো। পুরুষটি বলল, একদিন এসো। তোমার কথকতা শুনলে আমার স্ত্রীর ভালো লাগবে। বামন বলল, আমি কী আপনার সঙ্গেই যাব?

না, না, আমি খুব ব্যস্ত থাকি। অনেক কাজ সেরে আমাকে যেতে হয়। আমি সময় বলে দিচ্ছি, তুমি চলে এসো।

নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে বামন হাসপাতালে গিয়ে হাজির হল। পুরুষটি আর কিছুতেই ওপর থেকে নামে না। ঘণ্টাদু’য়েক অপেক্ষা করে বামন ফোন করল। পুরুষটি প্রায় আকাশ থেকে পড়ার স্বরে বলে উঠল, তাই নাকি? আমি এখুনি আসছি।

পুরুষটি নেমে এলে বামন বিনীতভাবে বলল, আপনি কিন্তু দু’ঘণ্টা আগে আমাকে আসতে বলেছিলেন। দু’ঘণ্টা ধরে আপনার জন্য আমি নিচে অপেক্ষা করছি।

পুরুষটি অবাক হওয়ার ভান করে তাকাল। তারপর বামনের পিঠে হাত রেখে শ্লেষ করে বলে উঠল, কে কবে সময় মেনে চলেছে? আঁ? অত সৎ হওয়ার বাতিক কেন তোমার? তুমি তো ভাই ডেনজারাস লোক! সেই শেষ। দম্পতিটি আর কখনও বামনকে কথকতা করতে ডাকেনি।

কয়েকদিন পর এক টাক মাথা সরু লিকলিকে দেড়েল প্রোমোটারের সঙ্গে বামনের আলাপ হল। প্রোমোটারকে দেখলেই মনে হয় শরীরে কোনও মেরুদণ্ড বা হাড়ের কাঠামো নেই। দাঁড়িয়ে যখন কথা বলেন, দেখে মনে হয় ব্যালেনৃত্য করছেন। এই দেড়েল প্রোমোটার একটা কথকতার আসর পরিচালনা করত।

বামনের কথকতা শুনে প্রোমোটার আপ্লুত হয়ে বামনের হাত ধরে বললেন, আহা, শ্রোতাকে যেন মজিয়ে দিতে পারেন আপনি। আপনার কথকতা শুনলে আপনাকে শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে হয়। বয়সে আপনি আমার চেয়ে অনেক ছোট, কিন্তু আপনার গুনের জন্য আপনাকে আমি মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা করি।

প্রোমোটারের ভক্তি দেখে বামন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। আবেগে তার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এলো, কোনও কথাই সে বলতে পারলো না। তার চোখের কোণে অশ্রুবিন্দু দেখা দিল।

বামন ভুলে গেল, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। পাগলাদাদু বারবার তাকে সতর্ক করে দিত, যে প্রশংসা সুলভে জুটে যায়, তার প্রতি কর্ণপাত কোরো না। সেই প্রশস্তি স্থায়ী হয় না।

এরপর থেকেই সেই দেড়েল প্রোমোটার কথক-বামনের প্রতি কেমন জানি উদাসীন হয়ে গেল। দেখলে আগের মতোই মিষ্টিমুখ করে কথা বলে। কিন্তু চোখে জেগে ওঠে কেমন একটা উদাস-উদাস ভাব। দেড়েল প্রোমোটারের কথকতার আসরেও বামনকে আর ডাকে না। একদিন তো রাস্তার উল্টোদিকের ফুটপাথ দিয়ে দেড়েল প্রোমোটার তার কয়েকজন সাগরেদের সঙ্গে যাচ্ছিল। রাস্তা পেরোনোর আগেই সে না দেখতে পাওয়ার ভান করে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। একদিন বামন নিজেই যেখানে দেড়েলের কথকতার আসর বসে সেখানে গিয়ে হাজির। গেটে তাগরাই চেহারার এক সাগরেদ পথ আটকে দাঁড়াল।

বামন বিনীতভাবে বলল, আমি আজ কথকতা করতে আসিনি। শুনতে এসেছি।

সাগরেদ গর্জন করে উঠল, এখানে তোমার প্রবেশ নিষেধ।

বামন অবাক হয়ে জানতে চাইল, কেন? কী এমন দোষ করেছি ভাই তোমাদের কাছে? সাগরেদের সুর নরম হয়ে এলো। বামনের পিঠে হাত দিয়ে বলল, যে নিজেই ভিখিরি তার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসেছ কেন?

মানে? বামন অবাক হয়ে যায়।

আঃ, তুমি বড় বেশি সৎ হে, বাঁকাচোরা কথা একেবারে বোঝো না! আরে, যে নিজেই শ্রদ্ধা ভিক্ষা করে বেড়ায়, তার তোমাকে কী দরকার? তুমি যে শ্রদ্ধা দিতে এসে নিয়ে ফিরে গেছো! ডেনজারাস লোক ভাই! বলেই সাগরেদটি হো-হো করে হেসে ওঠে। তারপর চোখ গোল গোল করে বলে, শোনো, দেড়েলের সাগরেদগিরি করে আমাদের চোখ এমন পোক্ত হয়ে গেছে যে, মানুষ চিনতে ভুল হয় না। তবু কোথাও বেফাঁস কিছু বলেছ বলে যদি কানে আসে, গর্দান নিয়ে নেব।

আরও পড়ুন: অশান্ত সময়ে ফিরছে আফগানিস্তান!

বামনের বদনাম বেড়েই চলে। একটা কথকতার আসরে সে কথকতা শেখাতে যেত। সেবার ওই আসরের অনেক ছাত্রছাত্রীই বিভিন্ন পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করল। বছরের শেষে সেই কৃতী ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। মঞ্চে উঠে ছাত্রছাত্রীরা সবাই আবেদন করল, আমরা সবাই বামন স্যারের মুখ থেকে কিছু শুনতে চাই। বামন অপ্রস্তুত ছিল। এই প্রস্তাবে সম্পূর্ণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিন্তু বলতে তাকে হলই। সে সবার আগে ওই আসরের ডিরেক্টরকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ওনার কাছ থেকেই আমার যা কিছু শেখা। অতএব ধন্যবাদ আমার নয়, ওনারই প্রাপ্য। আর আমি যা কিছু শিখেছি, তা ছাত্ররাই শিখিয়েছে। ওদের সহজাত প্রতিভা রয়েছে, আমি শুধু সেই প্রতিভাকে ব্যবহারের কিছু কিছু মামুলি কৌশল বলে দিয়েছি। ওটা আমি না বললেও কিছু যায় আসত না, কারণ কয়েক মুহূর্ত চোখ বুজে ভাবলে ওরা নিজেরাই ওই কৌশলগুলো জেনে যেত। অতএব প্রশংসাও আমার নয়, ওদেরই প্রাপ্য। ছাত্রছাত্রীরা হাততালিতে ফেটে পড়ল। লজ্জায়, সংকোচে বামন চোখমুখ লাল করে মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইল।

পরদিনই ওই আসরের ডিরেক্টর বামনকে ডেকে পাঠাল। বামন দুরুদুরু বুকে তার এমুড়ো ওমুড়ো দেখা যায় না, এমন চওড়া টেবিলের সামনের গিয়ে দাঁড়াল। ডিরেক্টর বলল, মশাই, কাল থেকে আপনাকে আর আসতে হবে না।

বামনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে ভেবেছিল, ডিরেক্টর বুঝি তার কাজের জন্য পিঠটিঠ চাপড়ে দেবে। তার বদলে এসব কী শুনছে সে?

ডিরেক্টর বলে চলল, কালই আপনার ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দেবেন।

বামন আমতা আমতা করে বলল, কেন স্যার? আমি কি কোনও দোষ করেছি?

ডিরেক্টর হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, আহা, দোষ করবেন কী, আপনার জন্য আমাদের আসরের নামডাক কত বেড়ে গেছে জানেন? এবার আগের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি ভর্তির আবেদন জমা পড়েছে! মশাই, দোষ করলেই শুধু চাকরি যায় না, দোষ না করলেও যায়।

তবে স্যার। তাড়িয়ে দিচ্ছেন কেন?

তাড়িয়ে দেব না তো কি দুধকলা দিয়ে কালসাপ পুষব? ডিরেক্টর ভেংচি কাটল। তারপর সুর নরম করে বলল, আপনি মশাই যেমন সৎ তেমনি ডেনজারাস! আমি এমন কর্মচারী রাখব, যার কাজকম্ম দেখে লোকে তাকে ভুলে গিয়ে শুধু আমার কথাই বলবে। আর এক বছর এসেই আপনি এমন কাণ্ডকারখানা জুড়লেন যে, লোকে আমাকেই ভুলতে বসেছে! আমার টাকা, আমার ডেরা, আর আমাকেই লোকে ভুলে যাবে, সে কি হয়, আপনিই বলুন!

কথকতার বাৎসরিক উৎসবে বামনের অনেক ছাত্রছাত্রীকে ডাকা হল, কিন্তু টানা দশবছর যা হয়ে চলেছে, এবারও বামন ডাক পেল না। উৎসবের কয়েকদিন পর এক কথকতার আসরে উৎসব-কর্তার সঙ্গে বামনের দেখা হয়ে গেল। এই কর্তাটি গোড়ায় বামনের কথকতা শুনে হামেশাই নিজের বাড়ি ডেকে পাঠাতো, নানারকম ফাইফরমাস করত, এক কথায় কথকতা নিয়ে বামনের নিষ্ঠা-ভালোবাসার সদ্‌ব্যবহার করত, কিন্তু কখনোই সেই কথকতার ব্যাপারে কোনও উৎসাহ দেখাত না। বামন নিজের কথকতা শোনাতে যেত, কথকতার কলাকৌশল, দেশজ প্রয়োগের মৌলিকতা, এসব ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে যেত, কিন্তু ফাইফরমাস খাটতে খাটতেই তার সময় চলে যেত। কর্তাটি রোজই আশ্বাস দিত, ওসব বড় বড় কথা পরে শুনলেও হবে। ওর জন্য সারাজীবন পড়ে আছে। আর কাজটা যদি এক্ষুনি না হয়, তবে আমার উৎসবের অন্তত তিনটে স্পনসর হাতছাড়া হয়ে যাবে। কর্তাটি যেন সর্বদাই অপ্রসন্ন, বামন কুলি-কামিনের মতো খাটতো, কিন্তু কর্তার মুখে হাসি ফোটার বদলে দাবিদাওয়া বেড়েই চলত। উৎসবের পর উৎসব চলে যেত, বামনের ডাক আসে না। উৎসবে কথকতা করলে অনেক টাকা পাওয়া যায়। বেঁচে থাকার জন্য বামনেরও টাকা প্রয়োজন। অথচ টাকা পাওয়ার বদলে কর্তার বেগার খাটনিতে সামান্য আয় ফতুর হয়ে যায়।

একদিন আমতা আমতা করে কথাটা বামন বলেই ফেলল। কর্তা, এবার অন্তত আমায় সুযোগ দিন।

কেন, এত তাড়াতাড়ি কীসের? কর্তা বামনের মুখে ধোয়া ছেড়ে জানতে চাইল।

তাড়াতাড়ি। আমার কত পড়ে যারা এসেছে, তারাও উৎসবে কথকতা করে ফেলেছে। টাকাপয়সা আমারও তো দরকার।

কর্তা হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল। শরীরের আলস্য ভেঙে সজাগ হয়ে বামনের চোখ চোখ রেখে বলল, তারা, তোমার মতো সৎ?

মানে?

তারা কী তোমার মতো ইয়ে, মানে। ডেনজারাস?

কী বলছেন। কর্তা? সব কেমন যেন…

যেন… জটিল ঠেকছে, তাই তো? ওহে, তোমার মতো কথক আমি অনেক পাব, ও তো রাস্তাঘাটে ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরছে, আমি নিজে তো… সে যাক গে, কিন্তু অমন একটা সৎ ছোকরা কোথায় পাব বলো তো? তোমার কাজ অন্য কাউকে দিলে সে এমন গুবলেট করে ফেলে না! সেও না হয় যাক গে, সৎ হয়ে যখন জন্মেইছ, কাজ করো, এ শহরে কাজের লোকের বড় অভাব, উৎসবের জন্য কথক আমি ঠিক জুটিয়ে নেব, ও নিয়ে তোমাকে মাথার চুল না ছিঁড়লেও চলবে!

সেদিনের পর এই প্রথম কর্তার সঙ্গে আবার দেখা। বামন কথকতা করতে উঠবে, ঠিক সেই সময় কর্তা হাতে মাইক নিয়ে উদ্যোক্তার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, এ কাকে ধরে এনেছ হে? এবার তো দেখছি তোমার গাড়ির ড্রাইভারকে দিয়েও তুমি কথকতা করাবে। আমাকে আগে থেকে জানালে, নিজে না এসে না হয় আমার রাঁধুনিকেই পাঠিয়ে দিতাম!

কথকতা করে বামন বাড়ি ফিরছে, একটা অন্ধকার গাছের নিচে কর্তা ও তার সাগরেদকে সিগারেট ফুঁকতে দেখতে পেল বামন। এই সাগরেদটিকে সম্প্রতি কথকতার জন্য একটি বড়োসড়ো পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছেন কর্তা। সাগরেদটি বারবার কর্তার পেছনে চলে যাচ্ছিলো। কর্তা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো, কী হয়েছে রে? আমার কী লেজ আছে যে পিছনে গিয়ে খুঁজছিস?

কাল রাতে স্বপ্নে তাই দেখেছি কর্তা।

কী বলি! কর্তা হুংকার দিয়ে উঠল।

যা দেখেছি, তাই বললাম কর্তা। আপনার যে পায়ে অত করে তেল মালিশ করলাম, সেই পা-টা একটা লেজ হয়ে গেছে!

সাগরেদটিকে শায়েস্তা করতে গিয়ে কর্তার চোখে পড়ে গেলো বামন। মুহূর্তে কর্তা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তারপর ভেংচি কেটে বলে উঠল, আহা, এ যে সৎ মানুষ দেখছি! কী সৌভাগ্য আমার! আজ যখন কথকতা করছিলে, চোখে সে কি জ্যোতি!

সাগরেদটি মাথা হেলিয়ে বলল, বাপরে, সত্যি কি জ্যোতি!

কর্তা বলে চলল, ওই আলোর সিঁড়ি দিয়ে আমাদের সৎ কথক উঠতেই থাকবে, উঠতেই থাকবে, একেই তো আমাদের শ্বেতাঙ্গ বন্ধুরা বলে থাকেন, এনলাইটমেন্ট। এইভাবে একদিন ঠিক সে চাঁদে পৌঁছে যাবে, এই শহর থেকে তো আবার চাঁদ দেখা যায় না, ঠিক আছে বাঁ-দিকের কালো মানুষের পার্টির টাকায় এবার যখন আমি ডানদিকের শ্বেতাঙ্গদের শহরে মদ্যপান আর ফুর্তি করতে যাবো, তখন সেই চাঁদ দেখে, সেই এনলাইটমেন্ট দেখে, আহা, কী সুড়সুড়ি, কী সুড়সুড়ি, ঠিক যেমনটি দিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ভাঁড়, না, সে বোধহয় ভাঁড়ামির শিক্ষক, কথকতার আসরের সেই ডিরেক্টর আর ব্যালেনাচিয়ে দেড়েল প্রোমোটার!

তখন সৎ মানুষকে একটা পুরস্কারও দিয়ে দিও কর্তা, হেঃ হেঃ, সাগরেদটিও কুৎসিতভাবে হেসে ওঠে, তারপর হঠাৎ চমকে ওঠে, কর্তা, আপনার লেজ, আপনার লেজ…

কর্তা সাগরেদের গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে বলে, লেজ আমার না তোর আহাম্মক, নেড়ে একবার দেখে নে!

একবার এক অসুস্থ বৃদ্ধের সঙ্গে বামনের আলাপ হল। এই বৃদ্ধকে বামন কথকতা শোনাতে যেত। কিন্তু বৃদ্ধের অসুস্থতা ও দারিদ্র্য দেখে তার মন গভীর সমবেদনায় ভরে যেত। নিজের সামান্য আয় থেকে বৃদ্ধকে সে যথাসাধ্য সাহায্য করত। বৃদ্ধের ছেলে বিদেশে থাকত। হঠাৎ একদিন সে ফিরে এলো। বহুদিন পর ছেলেকে পেয়ে বৃদ্ধও খুশিতে ঝলমল করে উঠল। সেদিন রাতে বামন ঢুকতেই বৃদ্ধের মুখ গোমড়া হয়ে গেল।

বামন চিন্তিতভাবে বলল, কিছু হয়েছে নাকি দাদু?

না, কী আর হবে, তবে কাল থেকে তুই আর আসিস না।

কেন দাদু?

তুই বড় সৎ, বাছা, আর আমার ছেলেরই বয়সি।

আমরা দু’জনে দুই ভাইয়ের মতো তোমার সেবা করব। তা কী হয় বাছা? ভাই ভাইয়ের পেটে ছুরি মারে, আর পরের ছেলের ওপর ভরসা কী? আমার সামান্য যা কিছু আছে, সব ওই ছেলের জন্য রেখে দিয়েছি, তুই থাকলে তোর প্রতি অবিচার করতে হবে। সে আমি পারব না বাছা, আমার ছেলেও ওসব সইতে পারবে না। তুই বরং চলেই যা। আর কোনওদিন আসিস না।

বামন বিমর্ষ হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পুরনো আমলের ভারী লোহার গেট খুলে বেরিয়ে এলো। সামনেই চওড়া পিচের রাস্তা। সেই রাস্তা পেরিয়ে বৃদ্ধের ছেলে এদিকেই আসছে।

অস্ফুটে বামনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, ভাই!

ছেলেটি শুনতে পেয়েছে বলে মনে হল না। বামনের দিকে একবার কটাক্ষপাত করল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে, ডেনজারাস!’ শুধু এইটুকু ছুড়ে দিয়েই নিমেষে গেট খুলে বাড়ির ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

বহুদিন শ্রীচরণের কোনও খবর নেই। শ্রীচরণই বামনকে কথক-ঠাকুর হতে বলেছিলেন। অথচ তারপর থেকে একটা খবরও নেননি বামনের। অথচ বামন তো এই শহর ছেড়ে কোথাও যায়নি। শ্রীচরণের আশপাশেই ঘোরাঘুরি করেছে। মানুষ এত নির্লিপ্ত হয়ে যায় কী করে? পাগলাদাদুর বইয়ের ঘরে গোর্কি বলে এক সাহেবের কাহিনি পড়েছিল বামন। ওই ঘরেই ছিল রোলাঁ, জিদ আর সার্ত্র বলে আরও তিনজন সাহেবের গল্প। ছোকরা আর কথক গুণী হলেই এই সাহেবগুলো ক্ষেপে যেত। তাদের ভালো করার জন্য, উন্নতির জন্য, তাদের কথকতার কথা লোকজনকে বলে, উৎসাহ দিয়ে, বিভিন্ন জায়গায় আসর বসিয়ে, চিঠি দিয়ে তারা কতভাবে সাহায্য করত। তারা মনে করত, প্রবীণ আর অভিভাবক হিসাবে এটুকু করা তাদের কর্তব্য, তবেই না দেশজ সংস্কৃতি সচল-সজীব থাকবে! আর আমাদের শহরে?

আমাদের বামন ভাবে, আমাদের শহরের প্রবীণ আর অভিভাবকেরা কেমন যেন স্থবির হয়ে যান। তাঁরা অনেক উচুতে গম্ভীর বিষণ্ণ স্থির এক ভাবমূর্তি নিয়ে বসে থাকেন আর সর্বদাই আশা করেন তরুণরাই তাঁদের কাছে, না, তাদের ভাবমূর্তির কাছে যাবে, তাদের করুণা প্রার্থনা করবে, দয়াভিক্ষা করবে। তরুণদের অসহায়তা, দুর্বলতা, অনিশ্চয়তা তারা মুখরোচক খাদ্যের মতোই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন, সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধা বিলিয়ে সর্বদাই তাদের অনুগত করে রাখতে চান। আঃ, তারা কখনোই তরুণদের পাশে এসে দাঁড়ান না, তরুণদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেন না, তাদের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের যোগ ঘটিয়ে তাদের নিজেদের সমান-সমান ভাবেন না, প্রাণ দিয়ে তাদের রক্ষা করতে চান না, সঠিক পথ বাতলে দিতে পারেন না। অথচ তরুণরা তাদের কাছ থেকে এগুলোই আশা করে। তরুণদের কাছে এই মানুষগুলো ক্রমেই যেন শৌখিন দ্রষ্টব্যে পরিণত হচ্ছে, এর বেশি কোনও ভূমিকাই এদের নেই! লোকে যেভাবে মিউজিয়ামে মমি দেখতে যায়, এদের কাছেও তরুণেরা সেভাবেই গিয়ে দর্শন দিয়ে আসে। যথারীতি ভক্ত পরিবৃত হয়ে শ্রীচরণ বসে ছিলেন। খুব আওয়াজ, কোলাহল এখানে। বামন ঢুকতেই প্রায় খেকিয়ে উঠলেন, কী চাই?

না কিছু তো চাই না, এমনিই এসেছি!

সবাই তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, তাই এসেছ?

না, আমি। একটা নতুন। কথকতা শোনাতে এসেছি।

তোমার কথকতা কিস্‌সু হয় না। আমার শোনার সময় নেই।

ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু কথকতাটা আপনাকে নিয়েই বানিয়েছিলাম…

আমার আর কথকতার মধ্যে তুমি এলে কোত্থেকে? নিশ্চয়ই তোমার কোনও মতলব রয়েছে…

না, আমি শুধু এই কথাটা বলতেই…

এসব কথা আমার শোনার সময় নেই, তুমি কোথায় কী করে বেড়াচ্ছ আমার জানার দরকার নেই, অন্য যুবকেরা যেভাবে বেঁচে আছে, সেভাবে থাকতে পারলে থাকো, নইলে চলে যাও, তুমি জানো না…

কী, কী। বলতে চান আপনি?

সৎ মানুষের লোভ! চাঁদে যাবেন উনি! এক পা বাড়ালেই গভীর খাদ, উনি এসেছেন ত্রাণ করতে! আরে, নিজের পায়ে আগে দাঁড়া, তারপর বেশি ওস্তাদি দেখাবি। তা না, কিছু না হয়েই উনি সবাইকে কী হতে হবে বাতলে দিচ্ছেন! মুছে যাবি তুই, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবি, তোর একটা ছাইও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে… ডেনজারাস… বলতে বলতেই শ্রীচরণ কেমন যেন উদাস হয়ে যান। চারদিকে আওয়াজ ওঠে, সন্ত! সন্ত!

আরও পড়ুন: গীতিকার টানে…

বামন মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসে। একটা পাকুড় গাছের ছায়ায় এসে বসে। হঠাৎ কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলে ওঠে। বামন বুঝতে পারে, এ পাগলাদাদুর কণ্ঠস্বর। পাগলাদাদু বলে চলে, বিদ্যেসাগর শেষ জীবনে সাঁওতাল পরগনায় কেন চলে গেছিল বলত? কারণ ওখানেই তখন চাঁদ ছিল। গগ্যাঁ শেষ জীবনটায় তাহিতিতে চলে গেছিলো। তলস্তয় বাড়ি-জমিদারি-নিজের সমস্ত রচনার সত্ত্ব ছেড়ে চলে গেলো কী দীনহীনের মতো! জিদ, সেও থাকতে পারেনি, আফ্রিকার কোথায় যেন চলে গেছিল। কেন গেছিল বলো তো? চাদের খোঁজে। মহামানব হয়েও ওরা চাঁদ পায়নি। তাই চাদের খোঁজে ওদের সব ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।

একটু থেমে আবার সে বলে, তোর বাপ ছিল শ্রমিক, সে গেছিল চাদের খোঁজে। কৃষক ঠাকুরদা আর তাঁতশিল্পী ঠাকুরদার বাপ আগেই চাদে গেছিলো। শ্রীচরণের বিপ্লবী বাবা, যে কেবল বোমাবাজি করত আর ভয় দেখাত, (আরে, শহরের সব পয়সাও’লা ইতিহাস-রসজ্ঞ এমনই তো বলে!), শহরের জন্য, দুঃখী মানুষকে অত্যাচার-শোষণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের প্রাণ দিয়েছিল, সেও দেখ চাঁদে গিয়ে হাজির হয়েছে। চাদে যেতে গেলে জীবনের একটা মানে থাকা চাই। এমন একটা মানে, যা শ্রীচরণের মামার মতো মানুষের জীবনকে ধ্বংস না করে, শ্রীচরণের বাবার মতো রক্ষা করার চেষ্টা করবে। জীবনে সব ক্ষেত্রে জেতা যায় না, বাছা। অন্য সবকিছু থেকে মনোযোগ সরিয়ে কেবল একটা দিকে নজর দে। সৎ হয়ে ওঠ। সৎ হওয়ার জন্য আরও লোভী হয়ে ওঠ। সৎ মানুষের লোভ বড় দুর্লভ ঘটনা। দুনিয়ায় এমন ঘটনা বড় একটা ঘটে না!

সূর্য কখন ডুবে গেছে, বামন টেরই পায়নি। খুব জোরে বাতাস বইছিল। কিন্তু সেই বাতাস টেনে নেওয়ার ক্ষমতা বামনের ছিল না। একটা আস্ত চাঁদ নেমে এসে বামনকে গিলে খেতে চাইছিল। আর সেই আলোকিত মুখগহ্বরের ভিতর ঢুকে বামনের দম আটকে আসতে চাইছিল…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *