শৈশবের হিরো, কৈশোরের গুরু

সৌম্য বসু

শিবাজি ব্যানার্জি এগিয়ে এসে বললেন, ‘পেনাল্টি মারবে শিশির ঘোষ!’ ভাবছেন কোন ম্যাচ? না, মোহনবাগানের কোনও ম্যাচ তো নয়ই, এমনকী শিশির ঘোষও এখানে শিশির নন। এই অধমকে ভালোবেসে শিশির বলে ডাকতেন শিবাজি স্যার। সেই সময়ের এই বাংলার যেকোনও স্ট্রাইকার হওয়ার স্বপ্ন দেখা কিশোরের মতো আমি শিশির ঘোষকে নকল করার এবং ভালো হেড দিতে পারার পুরস্কারস্বরূপ ওই ডাক। বয়ঃসন্ধির প্রায় পুরো সময়টাই শিবাজি ব্যানার্জির কাছে প্র্যাকটিস করার সুযোগ হয়েছিল। যদি বলি, আমি ওনার অন্যতম প্রিয় ছাত্র ছিলাম তাহলেও মিথ্যে বলা হবে না। এতটাই স্নেহ করতেন যে, প্রায় কুড়ি বছর পরেও এক দেখায় চিনতে পেরেছিলেন। আমার বউকে আশীর্বাদ করেছিলেন। আমি কোচিং লাইসেন্স করেছি শুনে এবং এখনও নিজের মতো করে ফুটবল খেলি শুনে অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: ‘পেনান্টি স্পেশালিস্ট শিবাজি ব্যানার্জি’ রূপকথা জন্মের চার দশক পেরিয়ে

আমরা যখন খুব ছোট, মোহনবাগানের খেলা মানে মূলত রেডিয়োর রিলে, বাবা, মামাদের মাঠ-ফেরতা বিবরণ আর ম্যাগাজিন। আশির দশকের একদম গোড়ায়, বেশি ফুটবল বোঝার বয়সই হয়নি কিন্তু ওই না-বোঝাতেই ম্যাজিক ছিল ব্রাজিল, একান্ত নিজের ছিল মোহনবাগান আর সেই মোহনবাগানকে একের পর এক জয় এনে দেওয়া শিবাজি ব্যানার্জি ছিল আমার কাছে একইসঙ্গে Engima এবং Euphoria! একে আমার স্পোর্টিং হিরো তায় বেলেঘাটার বাসিন্দা। শুধু আমার নয়, বাবারও এক অদ্ভুত আবেগ ছিল ওনাকে নিয়ে। আজ মনে হয় শুধু শিবাজি নামের প্রেমে পড়েই (কাকতলীয়ভাবে আমার ডাকাবুকো বড় মামার নামও) আমি অমর চিত্র কথার শিবাজি কমিকস কিনে ফেলেছিলাম। দুই শিবাজি নামের বীরগাথায় অনুপ্রাণিত হয়ে তখন আমি বেলেঘাটার খোয়া রাস্তাতেও দুর্জয় সাহস নিয়ে ডাইভ দিয়ে গোল বাঁচাচ্ছি। সুতো দিয়ে তৈরি গোলপোস্টে ১৫ আগস্ট বা মহালয়ার টুর্নামেন্টগুলোই তখন আমার ফেডারেশন কাপ, ডুরান্ড কাপ, গোলের নিচে আমি ‘শিবাজি’। বয়স তখনও দশ পেরোয়নি। এরপর ফুটবল শেখার শুরুর ক’দিনে পরেই চলে আসি সল্টলেকে। ইতিমধ্যে অন্যান্য সব প্রিয় খেলোয়াড় বিদেশ, মানস, শ্যামদের দেখে আমি তখন ফরওয়ার্ড! এমনকী ডান পায়ের প্লেয়ার হয়েও আমি তখন মনে প্রাণে লেফট আউট। কেন গোলকিপার হলাম না? এখন ভাবলে মনে হয়, সম্ভবত এক বছর মহামেডানে চলে যাওয়ায় শিবাজির ওপর অভিমানেই। খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। অবশ্য মনে আছে, পরের বছর ফিরে আসায় বাবার গলায় সে কি স্বস্তি! যেন পথ হারানো পরিবারের সদস্য ফিরে এলো।

আরও পড়ুন: তিনকাঠির ত্রাতা

সময়ের স্রোতে আশির মধ্যভাগে। হঠাৎ একদিন আনন্দবাজারে বিজ্ঞাপন। পূর্বাচল দিশারী ক্লাবের উদ্যোগে কোচিং ক্যাম্প খুলবেন, কে? চোখ কচলে দেখে নিলাম, হ্যাঁ! শিবাজি ব্যানার্জিই! ওই বিজ্ঞাপন দেখে আমার আর বাবার বোধহয় একই রকম আবেগের বিস্ফোরণ হয়েছিল। নাহলে তিন সন্তানের মধ্যবিত্ত পরিবার চালিয়েও সেই সময় মাসিক ৫০ টাকা বেতন দিয়ে বাবা-মা কি ভর্তি করতেন আমায়? এক স্বপ্নময় দুপুরে নিল রঙের গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট, কেডস পরে শুরু করেছিলাম প্রশিক্ষণ। গণশক্তি ভবনের মাঠে। পাড়ার অনেক বন্ধু-বান্ধব, অর্ণব, শুভ মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল সবাই মিলে নাম লিখিয়েছিলাম। প্রথম দিন কিছু বলারই সুযোগ হয়নি। হাঁ করে দেখেছিলাম সেই শৈশবের ‘ম্যাজিক ম্যান’কে। লম্বা, আলো করা চেহারা অথচ কি অমলিন হাসি। সব বাধা ভেঙে গেল অচিরেই। সেই ক্যাম্পেই পেয়েছিলাম আরও দু’জন কোচ এবং ভালো মানুষ, ওনার দাদা এবং বক্সি স্যারকে। ওনার সন্তান শান্তনু এবং ভাইপো শৈবালও আসত প্র্যাক্টিসে। কোনও দিন তাদের বাড়তি গুরুত্ব দিতে দেখিনি। সবাইকে সমান ভালোবাসতেন। সদা হাস্যমুখ ছিলেন বলেই রাগ করলে ভয় হত দ্বিগুণ। একবার একটা ম্যাচে বেশি ড্রিবলিং করছি বলে আমায় হাফ টাইমে বসিয়ে দিয়েছিলেন। আমার ওপর স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট দেখাচ্ছিল। আমার ধারণা ছিল আমি দারুণ খেলছি। অভিমান হয়েছিল খুব। পরে বুঝেছিলাম, আমায় পছন্দ করেন বলেই এই শিক্ষাদান! এর পর কখনও অকারণ ড্রিবলিং করার চেষ্টা করিনি।

আরও পড়ুন: ক্রুশ্চেভ ভার্সেস টিটো: প্রথম ইউরো কাপ ফাইনাল ছিল ‘কমিউনিস্টদের লড়াই’

সময়ের সঙ্গে স্যারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ আসে। ওনার বাড়ি গেছি। ড্রয়িং রুমে, শূন্যে শরীর ভাসিয়ে পেলের ফ্রি-কিক বাঁচানোর সেই ছবি দেখে মনে মনে প্রণাম করে এসেছি। মনে পড়ে হঠাৎ একেকদিন জলদি প্র্যাক্টিস থামিয়ে গোল করে বসে গল্প সেশন। মোহনবাগান মাঠে প্র্যাক্টিস করতে গিয়ে ওনার মুখে সারমেয়র বিষ্ঠা ঢুকে যাওয়া এবং তৎক্ষণাৎ মুখ ধুয়ে এসে আবার অনুশীলনে মন দেওয়ার গল্পের কথা মনে পড়লে এখনও কাঁটা দেয়। ডেডিকেশন একেই বলে। হঠাৎ বাবার সঙ্গে ওনার কথোপকথন মনে পড়ে গেল। বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ওর কি খেলাধুলো সত্যি হবে?’ শিবাজি স্যারের আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন— ‘ওর সামনেই বলছি, হবে, ও পারবে।’ স্যার, আমি ক্ষমাপ্রার্থী, বেশিদূর পারিনি। খুব কিছু খেলা হয়নি। আপনার নাম উজ্জ্বল করতে পারিনি। তবে কথা দিয়েছি, আপনার মতো সাচ্চা স্পোর্টসম্যানশিপ রেখে চলার চেষ্টা করেছি আজীবন, করে যাব, শিবাজির একজন নগণ্য সৈন্য হয়ে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *