শীতের সকালে ৩৬-এর বিভীষিকায় ‘৪২-এর গ্রীষ্ম’ মনে পড়ে গেল

cover

পারমিতা রায়

সকালবেলা খবরের কাগজে এরাপল্লি প্রসন্নের লেখাটা সবে শেষ করেছি― অশ্বিন, গোলাপি বল ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি। শেষ লাইনের রেশ তখনও রয়ে গেছে― ‘আমি খুব অবাক এবং হতাশই হব যদি ভারত এই টেস্ট না জিততে পারে।’ তখনও মারি-বিস্কিট হজম হয়নি। নেট অন করলাম আর পিঠে পড়ল ৩৬ ঘা! এইবার সারাদিনটা কাটবে কী নিয়ে! কেন হাতে আছে ৪২! অতএব চলো মন টেমসের তীরে। সেতো গুগল মামা আছেনই। ৪৬ বছর আগের কিস্সা নিমেষেই হাতের মুঠোয়। আজ অ্যাডিলেড তো ‘৭৪-এর লর্ডসই, তাই না? গ্রীষ্মের দাহ শীতেও কাঁপুনি ধরায়। আবার শীত ফুরোলেই বসন্ত আসে। সুতরাং কান্না-হাসির দোলদোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা চলতেই থাকবে। এরেই কয় ক্রিকেট। বিচলিত হবেন না ভাইসব। সঙ্গে থাকুন। তবে একটা কথা কিন্তু মানতেই হবে আজ ‘৪২-এর গ্রীষ্ম’র কিন্তু কলঙ্ক মুক্তির দিন। অনেক অনেক দিন ধরে গ্লানি বহন করেছে সে। এবার একটু স্বস্তি। প্রাইভেসি বলে এতদিন তো কিছু ছিল না তার। যে কেউ যখন-তখন স্কোর নিয়ে টানাটানি করত। এখন শান্তি। ঘুমোও ৪২, নিশ্চিন্তে, সেকেন্ড বয়কে কে কবে মনে রাখে! আজ আর কাল এই দু’দিন বড়জোর শেষবারের মতো জ্বলে উঠবে, তুলনা চলবে। চলবে লেখালেখি।

আরও পড়ুন: রনি রায় নামাঙ্কিত ফেয়ার প্লে ট্রফি পেল রিয়াল কাশ্মীর

আচ্ছা কাল কি প্রসন্ন কিছু লিখবেন? যদি লেখেন কী লিখবেন? টেনে আনবেন নিশ্চয়ই ৪২-কে। ‘ওয়ান মোর ওভার’-এ যা লিখেছিলেন তারই চর্বিতচর্বণ? যার শিরোনাম হয়েছিল, ‘বিলেতে বিপর্যয়’। লেখাটায় একটু চোখ বোলানো যাক:

“১৯৭৪-এ গরমে সবাই হাজির বিলেতে। একটা মমতাহীন নির্দয় সফর যা চিরকাল ‘৪২-এর গ্রীষ্ম” বলেই মনে থাকবে। কারণ সেবারই লর্ডসের টেস্টে ২য় ইনিংসে ভারত শোচনীয়ভাবে মাত্র ৪২ রান করল। সমস্ত দিক দিয়েই সে এক মহাবিপর্যয়। সেই ১৯৭১-এর ‘মাথা’রাই সফর পরিচালনায় ছিলেন― ম‍্যানেজার কর্নেল অধিকারী, অজিত অধিনায়ক, ভেঙ্কট তাঁর সহকারী। ১৯৭৪-এর গোড়ার দিকে ভারতীয় একটা দল গিয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। সেখানে তারা দু’টো বেসরকারি খেলায় একটিতে জয়লাভ করেছিল। কিন্তু বম্বে থেকেই আমরা যখন সুদূর লন্ডনে যাবার প্লেনে চাপলাম তখনই বুঝে নিয়েছি যে, আমরা মার খেতেই চলেছি। সামান‍্যতমও আত্মবিশ্বাস আমাদের ছিল না। প্রচুর নতুন খেলোয়াড়। সুধীর নায়েক আর গোপাল বোসকে গাভাস্কারের জুটি হিসেবে বাছা হয়েছে। মিডল অর্ডারে এলেন ব্রিজেশ― মদনলাল দলের নতুন চৌকস খেলোয়াড়। বাকিরা সবাই ১৯৭১-এ ইংল‍্যান্ড গিয়েছিলেন। যাবার সময় অতি সহজেই বোঝা গেল যে, অধিনায়ক এবং বিষেণ সিং বেদির মধ‍্যে চিন্তাধারার কোনও মিলই নেই। সফর শুরু হবার আগে নেট প্র‍্যাকটিসের সময়েই ম‍্যানেজারের সাংগঠনিক ক্ষমতার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল।আবিদ আলি তো মুখের উপর বলেই দিলেন যে, আনাড়ি বোলারদের বলের বিরুদ্ধে ব‍্যাট করে কোনও লাভ নেই।

আরও পড়ুন: সত্যজিৎ ঘোষ: ফ্ল্যাশব্যাকে আশির দশকের কলকাতা ফুটবল দুনিয়া

ইস্ট বোর্নে ডেরিক রবিন্স একাদশের বিরুদ্ধে খেলাটি চলাকালীন বেদি এবং ওয়াদেকারের মধ‍্যে ফাটাফাটি হয়ে গেল। প্রসন্ন বেশ রসিয়ে সেই ফাটাফাটির ধারাভাষ্য দিয়েছেন। ঘরের কথা এইভাবে হাটের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া কতখানি নীতিসংগত, এই প্রশ্ন উঠবেই। এতে ‘আপন মনের মাধুরী’ও মিশে যায়। ব‍্যক্তিগত ইচ্ছে অনিচ্ছারও প্রভাব থাকে ঠিকই, তবু পরিবেশ সম্পর্কে কিছু তথ‍্যও উঠে আসে। প্রসন্ন লিখেছেন, বেদির এক বন্ধুর বাড়ির ঘরোয়া আসরে এই ‘ফাটাফাটি’র শুরু। এই আসরে টেস্ট খেলোয়াড়দের অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল, আর প্রসন্নও তাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। প্রসন্ন আর বেদি ওয়াদেকারকে জিজ্ঞেস করেন, এই যে পর পর শেষ তিনটি সিরিজ ভারত জয় করেছে তাতে খেলোয়াড়রা ব‍্যক্তিগতভাবে কী লাভ করলেন? ওয়াদেকার ক্ষেপে গেলেন আর বেদি, প্রসন্নকে দলে খেলার অনুপযুক্ত বলে বসলেন। বেদিও ক্ষেপে গেলেন, ওয়াদেকরকে ক্ষমা চাইতে বললেন। ওয়াদেকার শেষে রেগে বললেন, ‘আপনারা সকলেই পতৌদির চামচা’। পরেরদিন ব্রেকফাস্ট টেবলেও সেই ঝামেলা গড়াল। বেদি হুমকি দিলেন ওয়াদেকার ক্ষমা না চাইলে তিনি নিজের কাউন্টিতে ফিরে যাবেন। ওয়াদেকার ক্ষমা চাইলেন বটে, তবে প্রসন্ন বুঝতে পেরেছিলেন দু’জনের মধ‍্যে এই সিরিজে আর বনিবনা হবে না। আর সিনিয়রদের মধ‍্যে এই বাদানুবাদ নতুনদের একেবারে হতবাক করে দিল। ম‍্যাঞ্চেস্টারে প্রথম টেস্টে গাভাসকর সেঞ্চুরি করলেন। কিন্তু ভারত হেরে গেল ১১৩ রানে । লর্ডসের মাঠে দ্বিতীয় টেস্টে ইংল‍্যান্ডের ৬২৯-এর জবাবে ভারত করল ৩০২। ফলো অন এড়ানো গেল না। আর তারপর তো সেই লজ্জার ৪২। প্রসন্ন লিখছেন, ‘ব‍্যাটিং যে আমাদের খুবই খারাপ হয়েছিল তা বলব না। কিন্তু জিওফ আরনোল্ড আর ক্রিস ওল্ড সত‍্যিকারের সুন্দর বোলিং করে নিজেরা ন’টা উইকেট নিয়ে নিলেন। ভেঙ্কটের বদলে আমি এই টেস্টে খেলেছিলাম আর ১৬৬ রানে ২ উইকেট সংগ্রহ করেছিলাম। দ্বিতীয় টেস্ট খেলার সময় ওয়াদেকার ও বেদির মধ‍্যে ভুল বোঝাবুঝি হল।আমার মনে হয় সর্বতোভাবে ইংল‍্যান্ডের প্রাধান্য লক্ষ‍্য করে খেলায় ওদের আর কোনও আগ্রহ রইল না। কিন্তু এটা দলের পক্ষে ভালো হয়নি।’

আরও পড়ুন: কলকাতা থেকে আইএফএ শিল্ড ঘরে নিয়ে গেল রিয়াল কাশ্মীর

বার্মিংহামে শেষ টেস্টে আবার পরাজয়। প্রসন্ন বলছেন এই সফরে ভারতের কোনও সুযোগ ছিল না। নিষ্প্রাণ পিচগুলো ছিল স্পিন আক্রমণের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তবে বার্মিংহাম টেস্টে সুধীর নায়েকের লড়াইয়ের তিনি প্রশংসা করেছেন। আর ‘মোজা’ নিয়ে কোনও বিতর্কে যাননি। যাই হোক, দেশে ফেরার পর পর যে কমিটি গড়া হল সেই কমিটি নিম্নমানের খেলা আর খারাপ আবহাওয়াকে পরাজয়ের কারণ বলে চিহ্নিত করলেন। পতৌদি আবার নেতৃত্বে ফিরলেন।

ক্রিকেটে এসব চলতে থাকবে। খুবই স্বাভাবিক ব‍্যাপার। কিন্তু এটাও তো ঠিক ক্রিকেট শুধু মাঠের লড়াই নয়। একটি হার কতরকমভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। যেমন― ‘সামার অফ ফরটি টু’র প্রসঙ্গ উঠলেই আমার মনে পড়ে যায় আনন্দ ব‍্যানার্জিকে। ইডেনে সামার ক্রিকেট টুর্নামেন্টে চল্লিশ বলে সেঞ্চুরি করেছে। ফাস্ট বোলার। কোচিং ক‍্যাম্পের অ্যান্ডি রবার্টস। ষোলো বছরের আনন্দের প্রতিভা ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। আর পাশাপাশি একটা ক্লান্তি, দমে ঘাটতি তাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে।মতি নন্দীর ‘অপরাজিত আনন্দ’ আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। এই উপন‍্যাসের কেবল একটি দিনের কথা বলেই আলোচনায় ইতি টানব।

আরও পড়ুন: সর্বনিম্ন রানের রেকর্ড গড়ল ভারত, দেখে নিন টেস্ট ক্রিকেটের সর্বনিম্ন স্কোরগুলি

২৪ জুন ১৯৭৪, সোমবার, উপন‍্যাস শুরু হচ্ছে। নেতাজি পার্ক থেকে ক্রিকেট কোচিং ক্লাস সেরে আনন্দ বাড়ি ফিরছে। সন্ধে হয়ে গেছে। ঘরে ফিরে ক্লান্ত আনন্দ শুয়ে থাকে খাটে। একসময় ঘুমিয়েও পড়ে। ঘুম ভাঙলে দেখে ঘরে আলো জ্বলছে। আর মেজদা অরুণ বাইরের বারান্দায় ট্রানজিসটারে বিবিসি-তে কান পেতে রিলে শুনছে। আনন্দের গলা শুনে থমথমে মুখে অরুণ ঘরে ঢোকে। ট্রানজিসটার কানে চেপে ধরে খাটে বসল। আনন্দ বলল দুদিন বাকি, ইন্ডিয়া ম‍্যাচ বাঁচাতে পারবে? উত্তর আসবে এরকম কোনও আশা আনন্দের ছিল না। মেজদার মুখে মেঘ জমেছে। আনন্দ আবার বলে— ‘‘ছশো উনত্রিশ আর ভারতের তিনশো দুই, তার মানে দুশো সাতাশ রানে পিছিয়ে, ইনিংস ডিফিট না হয়।” অরুণ হাত তুলে ওকে চুপ করতে বলে আরো কুঁজো হয়ে চোখমুখ কুঁচকে রেডিয়োটা কানে চেপে ধরে। আমরা বরং এই উত্তেজনার স্বাদ খোদ মতি নন্দীর কলম থেকে ধার করে রোমাঞ্চিত হই

‘‘টু ফর নান ছিল, এখন কত?… গাভাসকার আছে তো?”

আনন্দ কি একটা বলতে যাচ্ছিল, অরুণ হাত তুলে চুপ করতে বলে আবার বারান্দায় গেল? আনন্দ তোয়ালে নিয়ে ভাবল, স্নান করতে যাবে কি যাবে না। দেয়াল-ঘড়িতে রাত সাড়ে সাতটা। বারান্দায় অরুণ কুঁজো হয়ে, রেডিয়োর অ্যান্টেনাটা তার কান ঘেঁষে থরথরিয়ে কাঁপছে লাউডগার মতো।
স্নান করে, খেয়ে, উপরে এসে দেখল অরুণ খাটে দু’হাতে চোখ ঢেকে শুয়ে। আনন্দর পায়ের শব্দে তাকাল। আনন্দ স্কোর জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, তার আগেই অরুণ বলে উঠল— “শ‍্যেম, শ‍্যেম। ওনলি ফরটিটু— বিশ্বাস করতে পারা যাচ্ছে না, মাত্র বিয়াল্লিশ!”

আরও পড়ুন: অমল আলোয় ফুটবলার অমল গুপ্ত: কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

“অল আউট বিয়াল্লিশে!” আনন্দও বিশ্বাস করতে পারছে না।
“মাত্র সতেরো ওভারে, পঁচাত্তর মিনিটে ইনিংস খতম! কী লজ্জা!”
আনন্দর মনে হল তার বুকের মধ‍্যে একটা ব‍্যস্ততা ভীষণ উত্তেজনায় ছটফট করছে। ধড়ফড় করছে একটা কিছু। ধীরে ধীরে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
“একজনও পেস খেলতে পারে না। পারবে কী করে, খেলেছে কখনও? দেশে কি ফাস্ট বোলার আছে?”
আনন্দ মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। মেজদাটা আপন মনেই গজ-গজ করে যাচ্ছে।

… … … … … …

“এত বছর ধরে শুধু কথা আর কথা। তৈরী করা উচিত, তৈরী করতে হবে, অথচ কাজের কাজ কিন্তু একদমই হল না। এতবড় একটা দেশে কেউ জোর বল করতে পারে না, জোর-বলে ব‍্যাট করতে পারে না! কী এমন বোলার ইংল্যান্ডের! আর্নল্ড আর ওল্ড। এই সেদিনই তো ওদের খেললে এখানে আমাদের এই ব‍্যাটসম‍্যানরাই, সিরিজও জিতল আর চার-পাঁচ মাসের মধ‍্যেই এই অধঃপতন, বিয়াল্লিশ! ছি ছি ছি।”

ষোলো বছরের আনন্দর চোখ ভারী হয়ে জড়িয়ে আসে। ঘুমের মধ‍্যে তলিয়ে যাওয়ার আগে মতি নন্দীর আনন্দের মনে হয় সে এখন আর শোবার ঘরের বিছানায় নেই,সে এখন লর্ডসে। ইংল্যান্ড ব‍্যাট করছে আর বল হাতে সে ছুটে যাচ্ছে প‍্যাভিলিয়নের দিক থেকে।চীৎকার উঠছে: “ফরটিটু… ফরটিটু। রিভেনজ, রিভেনজ” আর ইন্ডিয়ার নতুন ফাস্ট বোলার আনন্দ ব‍্যানার্জি ক্ষেপে উঠেছে, ইংল‍্যান্ডকে চুরমার করতে তাণ্ডব শুরু করেছে বল নিয়ে। ইংল‍্যান্ড অলআউট হচ্ছে। কত রানে? ওয়ার্ল্ড টেস্ট রেকর্ড নিউজিল্যান্ডের টোয়েন্টিসিক্স। তাহলে ইংল‍্যান্ডের টোয়েন্টিফাইভ, পঁচিশ। নতুন রেকর্ড। লর্ডসে আগুন ছোটাবে আনন্দ।সব লজ্জা সব অপমানের প্রতিশোধ নেবে সে।

পরের দিন ঘুম ভাঙে তার। গা-হাত-পা ব‍্যথা। ওষুধ দেয় মেজদা। অফিস যাবে অরুণ। ক্রিকেট ব‍্যাটের মত জুলপি বাঁচিয়ে দাড়ি কামানোয় ব‍্যস্ত মেজদাকে আনন্দ বলে
“মেজদা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবার আসছে?”

“অ্যান্ডি রবার্টস আসবে ?”

“আসবে না আবার, না এলে উইকেটগুলো নেবে কে?”
“আমায় একদিন খেলা দেখাবে, যেদিন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফিল্ড করবে?

এটাই ক্রিকেট।

Similar Posts:

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • কিছু ঘটনা দুঃস্বপ্নের মত বেঁচে থাকে জীবনে যাকে বলা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *