’৮৮-র সিওলের সেই দুপুর নয়, ’৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিকের বিকেলকেই যেন ফিরে পেতে চায় ভারতীয় হকি দল

শুভ্রাংশু রায়

ফিরে না চাওয়ার কথাটি দিয়েই আলোচনার সূত্রপাত করা যেতে পারে। আজ কয়েক ঘণ্টা পরে ভারতীয় পুরুষ হকি দল যখন গ্রেট ব্রিটেনের বিরুদ্ধে অলিম্পিকের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে নামবে চার দশক পরে সেমিফাইনাল এবং তারপর পদক জয়ের লক্ষ্যে, তখন অলিম্পিকে ভারতীয় পুরুষ দলের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে একটি অদ্ভুত তথ্য জানার সুযোগ হল। সেটি হল ১৯৮০-র পরে ১৯৮৮ সালে এই এশিয়া মহাদেশে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অলিম্পিকের আসরে অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিওলে ভারতীয় দলের অল্পের জন্য সেমিফাইনালে প্রবেশ মেলেনি। এবং যে দলটির কাছে হেরে ভারতীয় দল সেমিফাইনাল থেকে ছিটকে গিয়েছিল, সেটিই ছিল গ্রেট ব্রিটেন।

সেবার অলিম্পিকে ভারতের কাছে যেমন চরম হতাশা এসেছিল স্প্রিন্ট কুইন পি টি ঊষার হতাশজনক পারফরম্যান্স করে হিট থেকেই বিদায় নেওয়া, তেমনি এদেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে হকির ফলাফলও বেশ হতাশজনক ছিল। কারণ দেশের হকিপ্রেমীদের আশা ছিল যে, ১৯৮৪-এর অলিম্পিকে ব্যর্থতার পরে ১৯৮৮-তে ভারতীয় হকি দল ঘুরে দাঁড়াবে। সেবারের ভারতীয় দলে পারগত সিং, মহিন্দর পাল সিং, অশোক কুমার, সোমায়া, মহম্মদ শাহিদের মতো খেলোয়াড়রা থাকায় ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা খুব একটা অমূলক ছিল না।

আরও পড়ুন: সেই টোকিওই কি ফিরিয়ে দেবে ভারতীয় পুরুষ হকি দলের মহিমা

মহিন্দর পাল সিং (ডানদিকে) ১৯৮৮ অলিম্পিকে ভারতীয় হকি দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ছবি: দ্য হিন্দু

১৯৮৮-তে ভারতীয় পুরুষ দল সোমায়ার অধিনায়কত্বে ১৮ সেপ্টেম্বর পুল বি-র প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। সেওন্যাম হকি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ভারত পরাজিত হয় ০-১ গোলে। পরের ম্যাচে ২০ সেপ্টেম্বর ভারত অমীমাংসিতভাবে খেলা শেষ করে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ( ১-১)। ২২ সেপ্টেম্বর তৃতীয় ম্যাচে অবশ্য আয়োজক দেশ দক্ষিণ কোরিয়াকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে প্রথম জয় ছিনিয়ে নেয় ভারত। ২৪ সেপ্টেম্বর ভারত আরও বড় ব্যবধানে কানাডাকে হারিয়ে (৫-১) দুই পয়েন্ট তুলে নেয়। সেই অলিম্পিকে  পুরুষ হকিতে অংশগ্রহণকারী বারোটি দেশকে ছ’টি করে দু’টি পুলে বিভক্ত করা হয়েছিল এবং স্থির ছিল প্রত্যেক পুল থেকে দু’টি সেরা দল সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। পুল বি-তে ভারত শেষ ম্যাচ খেলতে নেমেছিল গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে।

ঘটনাচক্রে দু’টি টিমই পাঁচ পয়েন্টে দাড়িয়েছিল। পুলে প্রথম দল হিসেবে ইতিমধ্যে সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। ২৬ সেপ্টেম্বর ভারত যখন গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে খেলতে নামে, তখন ড্র হলেই ভারত পুলের দ্বিতীয় দল হিসেবে গোল পার্থক্যে সেমিফাইনালে পৌঁছে যেতে পারত। সেদিন ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের ৩৭, ৪৬ এবং ৫০ মিনিটে পরপর তিনটি গোল করে গ্রেট ব্রিটেন সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়। স্বপ্নভঙ্গ ঘটে ভারতবাসীর। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, সে বছর অলিম্পিকে পুরুষ বিভাগে হকিতে স্বর্ণপদক জয় করে গ্রেট ব্রিটেনই। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে।

আরও পড়ুন: শৈশবের হিরো, কৈশোরের গুরু

’৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিকে ফাইনালে সেই সোনালি শুরুয়াত ভারতের। ছবি: olympics.com

অথচ এই গ্রেট ব্রিটেনকে হারিয়েই ভারত স্বাধীনতার পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধান্তে প্রথম অলিম্পিকে সোনা জয় করেছিল। সেবার অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংল্যান্ডেই। লন্ডন শহরে অনুষ্ঠিত ১৯৪৮ অলিম্পিকে হকিতে (তখন কেবলমাত্র পুরুষদের ফিল্ড হকিই অলিম্পিকের অন্তর্ভুক্ত ছিল) মোট তেরোটি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল।

ভারতীয় দল ছিল গ্রুপ ‘এ’-তে। সেই গ্রুপে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল স্পেন, অস্ট্রিয়া এবং আর্জেন্টিনা। ৩১ জুলাই, ১৯৪৮ স্বাধীন ভারতে নতুন করে ভারতীয় হকি দলের অলিম্পিক যাত্রা শুরু হয়েছিল অস্ট্রিয়াকে ৮-০ গোলে দুরমুশ করে। ৪ আগস্ট ভারত আবার বড় ব্যবধানে হারায় আর্জেন্টিনাকে (৯-১)। গ্রুপের শেষ ম্যাচে, ৬ আগস্ট ভারত স্পেনকে ২-০ এবং সেমিফাইনালে প্রবেশ করে। সেমিফাইনাল খেলাটি হয়েছিল ৯ আগস্ট এবং ভারত নেদারল্যান্ডকে ২-১ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে প্রবেশ করে এবং গোল্ড মেডেল ম্যাচে মুখোমুখি হয় আয়োজক দেশ গ্রেট ব্রিটেনের। গ্রেট ব্রিটেন বললে শুধুমাত্র আয়োজক দেশ বললেই হয় না। গ্রেট ব্রিটেনের প্রায় দু’শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ছিল ভারত এবং সদ্য ঔপনিবেশিক শাসন মুক্ত হয়েছিল, এমনকী স্বাধীনতার এক বছরও পূর্ণ হতে তিনদিন বাকি ছিল। কারণ ঐতিহাসিক ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ফাইনাল ম্যাচটি খেলা হয়েছিল ১২ আগস্ট, ১৯৪৮।

আরও পড়ুন: ১৫ আগস্ট: মোহনবাগানের অন্য ধারার ‘ঘরের ছেলে’ পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি এবং শতবর্ষে বাঙালির প্রথম অলিম্পিকে অংশগ্রহণ

টোকিওয়…

সেমিফাইনাল ম্যাচের লাইন আপ দেখেই যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল ভারত যদি ফাইনালে খেলে, তাহলে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী তার দীর্ঘদিনের শাসক গ্রেট ব্রিটেন অথবা সদ্য আলাদা হয়ে জন্মানো পাকিস্তান হবে। ভারতের সামনে গ্রেট ব্রিটেন পড়েছিল, কারণ আয়োজক দেশ তার শাসন থেকে সদ্য মুক্ত পাকিস্তানকে প্রথম  সেমিফাইনালে ২-০ গোলে পরাজিত করে। ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে ভারতীয় হকি দল গ্রেট ব্রিটেনকে ৪-০ গোলে পরাজিত করে স্বাধীন ভারতের প্রথম অলিম্পিক গোল্ড মেডেল জয়লাভ করে। চলতে থাকে ভারতীয় হকি দলের গৌরবগাঁথা। যে ট্র্যাডিশনের ব্রেক হয়েছিল ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে ভারত ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হেরে যায়। আবার পরের অলিম্পিকে এই টোকিও শহরে ঐতিহাসিক ওহিও হকি স্টেডিয়ামেই ভারত পুনরায় হকিতে তার হৃতগৌরব অর্জন করে পদক তালিকায় হকির মাধ্যমে স্বর্ণপদক লাভ করে। আজ যখন  ভারতীয় দল সেই টোকিওতে গ্রেট ব্রিটেনের মুখোমুখি হতে চলেছে, তখন মনপ্রীত সিংয়ের ছেলেরা সিওল অলিম্পিকের স্মৃতি নয়, যেন ’৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিকের  সুখ স্মৃতিকে ফেরত পেতে চাইবেন। পরিসংখ্যান অবশ্য দু’টি দেশের টিমকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে, কারণ অলিম্পিকের এ-যাবৎ আটটি সাক্ষাতের লড়াইয়ে উভয় দেশই চারটি করে ম্যাচ জিতেছে। তাই আজ রবিবারের সন্ধ্যায় একটি উপভোগ্য হকি ম্যাচের প্রত্যাশায় আমরা থাকতেই পারি।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

3 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *