‘মহানগর’ নিজগুণে আলাদা জায়গা করে নেবে

অরিন্দম পাত্র

‘প্রদীপের তলাতেই সবচেয়ে বেশি অন্ধকার থাকে’, কথাটা তো খাঁটি সত্যি কথা। কিন্তু সেই অন্ধকারে ঘুরে বেড়ানো ভূতের দলের মধ্যেও কখনও কখনও ভগবান থাকেন এক একজন! যাকে দেখে প্রথম দর্শনে ঘৃণার সঞ্চার হবে আপনার, তার প্রতিটি পদক্ষেপে আপনি শঙ্কিত হবেন, কিন্তু শেষমেশ সেই ভূতরূপী মানুষটাই আপনার হৃদয়কে আর্দ্র করে তুলবেন। তখন আপনার মনে শুধু একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাবে, মানুষটা আসলে ঠিক কি? ভিলেন নাকি হিরো?

আলো ঝলমল শহরের একটি রাতের কাহিনি আজ শোনাব আপনাদের। যে শহরের ঝকমক করা ঔজ্জ্বল্যের তলায় চাপা পড়ে যায় অনেক অপরাধ। এরকমই একটা অপরাধের গল্প বলা হয়েছে এই সিরিজে আট এপিসোড জুড়ে। যে গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ দুর্নীতিগ্রস্ত হারুণ সাহেব যিনি টাকা ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। সঙ্গে সাব ইন্সপেক্টর আদ্যন্ত সৎ মলয়। হঠাৎ সেই রাতে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলা এক হ্যারিয়ার গাড়ির তলায় চাপা পড়ে প্রাণ হারান এক নিরীহ সাইকেল আরোহী। কিন্তু সেই সাধারণ মানুষটি কি বিচার পাবেন? কারণ যাঁর গাড়ির তলায় তিনি চাপা পড়েছেন তিনি প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতার একমাত্র বিগড়ে যাওয়া শিল্পপতি পুত্র আফনান চৌধুরি। এই ঘটনায় যুক্ত না থাকা সত্ত্বেও জড়িয়ে যান আরেক সাধারণ চাকরিজীবী আবির! তার পরের ঘটনা নিয়েই গল্পের বিস্তার আর এর পরিণতি দেখতে চাইলে দেখতে হবে এই টানটান সিরিজটি!

আরও পড়ুন: শিক্ষা দিয়ে গেল ভিন্ন ঘরানার ছবি ‘শেরনি’

বাংলাদেশের মুভি বা সিরিজের সঙ্গে এই আমার প্রথম পরিচয়। এবং বলতেই হচ্ছে প্রথম পরিচয়েই প্রণয় বা love at first sight ঘটল। সুন্দর গোছানো গল্প ও চিত্রনাট্য। মাঝের দিকে অল্প স্লো স্ক্রিনপ্লে আর থানার চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকার জন্য একটু আধটু যে বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছিল না তা নয়, কিন্তু যখনই পর্দায় এসেছেন হারুণ অল রশিদ থুড়ি হারুণ সাহেব সব বিরক্তি গলে জল হয়ে গেছে। ওনার কথায় পরে আসছি। এছাড়া সাত আর আট এপিসোডের দু’টি চমকও রীতিমতো চমকপ্রদ লেগেছে। রাতের ঢাকার ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি চিত্র বেশ সুন্দর লেগেছে। তবে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অতটা মন ভরাতে পারেনি।

অভিনয় নিয়ে বলতে শুরু করলে কলম থামতে চাইবেই না হয়ত। প্রোটাগনিস্ট (নাকি অ্যান্টাগনিস্ট?) হারুণ সাহেবের চরিত্রে মোশারফ করিম বিস্মিত করেছেন, মুগ্ধ করেছেন, ঘৃণার সৃষ্টি করেছেন আবার ভালোবাসতেও বাধ্য করেছেন। সাদা ও না, কালোও না, আবার ঠিক গ্রেও না, এরকম অদ্ভুত এক দো-আঁশলা চরিত্রে অভিনয় করা কিন্তু মুখের কথা নয়। এমন একটা লোক যাকে দেখে খুব রাগ হবে, যার কথা শুনে আবার পেটে খিল ধরে হাসতেও ইচ্ছা করবে, আবার যেই লোকটাকে শেষমেশ ভালোবেসে ফেলতেই হবে, সেইরকম একটা কঠিন চরিত্র ছিল ওসি হারুণ। আর সেই কঠিন পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন মোশারফ সাহেব! ‘‘দুইটা জিনিস মনে রাখবা” বলে দুইটা দুইটা করতে করতে কখন যে প্রায় দুইশো তাঁর ফিলোজফির বা জীবন দর্শনের জ্ঞান তিনি বিতরণ করে ফেলেন, ধরতে পারবেন না। মনে দাগ রেখে যাওয়ার মতো একটা অভিনয় দেখলাম এই সিরিজে ওনার কাছ থেকে। যেমন তাঁর কমিক টাইমিং, তেমনি ডায়লগ ডেলিভারি আবার ঠিক সেইরকম অসাধারণ সিরিয়াস অভিনয়। সিজন-২’এর জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছি শুধু পর্দায় আরেকবার হারুণ সাহেবকে দেখতে পাওয়ার জন্য।

আরও পড়ুন: বিপণন ও পোকেমন: কার্ড ও গেমিং

সৎ সাব ইন্সপেক্টর মলয়ের চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান খুব ভালো। সত্যকে খুঁজে বের করার জন্য উদগ্র আকাঙ্ক্ষা অথবা নির্দোষ মানুষকে সুবিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর ছটফটানি খুব সুন্দর তুলে ধরেছেন মোস্তাফিজুর। মহিলা এসিপি-র  চরিত্রে জাকিয়া ম্যাডাম সুন্দর ও স্মার্ট অভিনয় করেছেন। প্রতিপত্তিশালী নেতার বিগড়ে যাওয়া পুত্রের ভূমিকায় শ্যামল মাওলা যথাযথভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘ম’ কারান্ত সবকিছুর প্রতি আসক্ত একটি মানুষরূপী জানোয়ারের চেহারাটা সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। আবিরের চরিত্রাভিনেতা খয়রুল বাসার ঠিকঠাক। তবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন লক আপের নিত্য বাসিন্দা চোর বাসারের ভূমিকায় নাম না জানা অভিনেতাটি। ওনার কমিক অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেমের নগ্ন রূপের মধ্যেও এক অপরাধীর সহানুভূতিশীল ও সংবেদনশীল মননের পরিচয় তুলে ধরাটা বেশ নজর কেড়ে নেয়। সমস্ত মহিলা চরিত্রের মধ্যে শুধুমাত্র রূপের ঝলকানিতে আমার নজর কেড়ে নিয়েছেন স্বল্প উপস্থিতিতে নিশাত প্রিয়ম রুমানার ভূমিকায়।

‘রে’ নিয়ে তুমুল হইচইয়ে মাঝে ‘হৈ চৈ’ প্ল্যাটফর্মে রিলিজ হওয়া ‘মহানগর’ একটা আলাদাই জায়গা করে নেবে নিজের গুণেই। এই সিরিজ অনেকগুলো প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়, সিস্টেমের খোলনলচে পালটে ফেলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে, কারোর ক্ষেত্রেই যেন ‘বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে’ না কাঁদে, সেটা দেখার জন্য আইনরক্ষকদের আরও তৎপর হবার শিক্ষাও দেয়। আর সেটা করতে গেলে আমাদের কি শুধুই মলয়দের লাগবে? নাকি অল্প হলেও কয়েকজন হারুণকেও দরকার? যে হাসিমুখে অম্লানবদনে মলয়দের বলতে পারবে, ‘‘দুইটা জিনিস মনে রাখবা, জীবনে দুইটা জিনিসই সত্য। এক কর্ম দুই কর্মফল, বাকিটা মিলায়ে নিও!”

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *