বর্ষার গানের কথকতা

কল্যাণ চক্রবর্তী

বর্ষার দিনে না বলা কোনও কথা কি বলা যায়? না মানা কোনও আবেগ! কোনও অব্যক্ত অনুভূতি, ঈষৎ ইচ্ছে অথবা উষুম উৎসাহ? যখন রবিরশ্মিহীন-অন্ধকার-রাতে চারিদিকের নিভৃত-নির্জন আমাদের চারপাশে খেলা করে বেড়ায়, আমাদের মুখোমুখি এনে দেয়; জগৎ সংসারকে অনবরত মিথ্যে মনে হয় কোনও চিরন্তন চিত্তবিক্ষেপে, জীবনের কলরব যখন আপনিই থেমে যায়, তখন মেঘস্বরে বাদলধারায় কী এমন রসায়নে জারিত হই আমরা! উথলে পড়া দুধের মতো কী এমন শিহরণে গাই আমরা “এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমন ঘনঘোর বরিষায়।” তাতে এ বিশ্ব জগতে কার কী-ই বা এসে যায়! যে কথা রয়েছিল পড়ে জীবনের অনন্ত গহ্বরে, অকথিত বাণী হয়ে আজ কোন মুখে তা বলা যায়? “এমন দিনে মন খোলা যায়।”

আরও পড়ুন: তুৎ পাখি উড়া দিলে…

যে বর্ষা নবীন, যে বর্ষা গগনজলে ভরে ভুবনের ভরসাস্থল, সেই চিরপরিচিত বর্ষা নারী না পুরুষ? রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বর্ষাকে কখনও নারী কখনও পুরুষ হিসাবে দেখিয়েছেন। “ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা/ শ্যামগম্ভীর সরসা”― বর্ষা এখানে নারী। “এসেছে বরষা ওগো নব অনুরাগিণী”― এখানেও বর্ষা নারীরূপা। আবার “তৃষ্ণার শান্তি,/ সুন্দরকান্তি,/ তুমি এসো বিরহের সন্তাপভঞ্জন”― বর্ষা এখানে পুরুষ। আনন্দে, আবেগে, আমেজে নানান সময়ে নানান ভাবে আমাদের কাছে ধরা দেয় বর্ষা, আমরা কি তা বুঝেতে পেরেছি?

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)

গগনে ঘন মেঘ, দামিনীর দুর্দম ঝলক, বজ্রের ঝনঝন শব্দ আর খরতর বাতাস বয়ে চলার মাঝেই অনর্গল নেমে আসে তরল জলধর। ঝরঝর মেঘরস― কী যে তার ব্যস্ততা, কোথায় যে উন্মত্ততা, কেউ কি জানে! মৃত্তিকায় থামতেই চায় না তার পয়োধিগামী প্রবাহ! তখন ‘পর জনমে’ নয়, তখনই, সেই মুহূর্তেই হই রাধা; সেই মুহূর্তেই অনবধানে চির বিরহিণী সত্তা হয়ে মিশে যাই কৃষ্ণ-চৈতন্যে। “মত্ত দাদুরী/ ডাকে ডাহুকী/ ফাটি যাওত ছাতিয়া।” বর্ষার জলে ব্যাঙের দল যৌনতায় মত্ত, দেহের ডাকে ডাহুকী ডেকে চলেছে নাগাড়ে; আমার বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে কৃষ্ণের বিরহে-বিচ্ছেদে। বর্ষা-বিরহের পদে রাধাকে এমনতরো বিষণ্ণতায় স্থাপন করেছেন বিদ্যাপতি। এই বিবিধ-বিষণ্ণতায় ভোগে বিপ্র-বাঙালি।

আরও পড়ুন: ব্রাজিলের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মাচাদো দ্য আসিসের ‘ডম কাসমুরো’

এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।।
ঝম্পি ঘন গর জন্তি সন্ততি
ভুবন ভরি বরিখিন্তিয়া।
কান্ত পাহুন কাম দারুণ
সঘনে খর শর হন্তিয়া।।
কুশিল শত শত পাত-মোদিত
মূর নাচত মাতিয়া।
মত্ত দাদুরী ডাকে ডাহুকী
ফাটি যাওত ছাতিয়া।।
তিমির ভরি ভরি ঘোর যামিনী
থির বিজুরি পাঁতিয়া।
বিদ্যাপতি কহ কৈছে গোঙায়বি
হরি বিনে দিন রাতিয়া।।

বর্ষা আমাদের নস্টালজিক করে তোলে, বরিষনে হই স্মৃতিমেদুর। কেদারা রাগে, কাহারবা তালে রবীন্দ্রনাথের কাছে ১৯২২ সালের এক বর্ষণমুখর বর্ষা বহুযুগের ওপার থেকে নিয়ে আসে রোমন্থনের গান―
বহু যুগের ও পার হতে আষাঢ় এল আমার মনে,
কোন্‌ সে কবির ছন্দ বাজে ঝরো ঝরো বরিষনে॥
যে মিলনের মালাগুলি ধুলায় মিশে হল ধূলি
গন্ধ তারি ভেসে আসে আজি সজল সমীরণে॥
সে দিন এমনি মেঘের ঘটা রেবানদীর তীরে,
এমনি বারি ঝরেছিল শ্যামলশৈলশিরে।
মালবিকা অনিমিখে চেয়ে ছিল পথের দিকে,
সেই চাহনি এল ভেসে কালো মেঘের ছায়ার সনে

আরও পড়ূন: হিন্দু পালপার্বণে জামাই ষষ্ঠী বা অরণ্য ষষ্ঠীর তাৎপর্য

মেঘ মানেই বৃষ্টি, “আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।” কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়, কেনই বা যায়― জানা নেই মেঘবালিকারও। সে কী অনাথ, সে কী মাতৃহারা? বিশ্ব-নিয়ন্ত্রা কী তার অভিভাবক? ― “পুঞ্জে পুঞ্জে দূর সুদূরের পানে/ দলে দলে চলে,/ কেন চলে নাহি জানে।” এই বালিকারা কেউ ‘আবর্ত মেঘ’, কেউ ‘দ্রোণ মেঘ’, কেউ ‘পুষ্কর মেঘ’, আর কেউবা ‘সংবর্ত মেঘ’। কারো বেগ ‘দুষ্কর’, কেউ ‘প্রলয়ের মিত’। কেউ ‘অলক’, কেউ ‘ঊর্ণা’, কেউ ‘কুন্তল’; কেউ ‘কোদালে’ ‘কুড়ুলে’ মেঘ, কেউবা ‘জলুয়া মেঘ’, কেউ ‘হাঁড়িয়া’, ‘কুড়িয়া’ মেঘ। মেঘের এই দারুণ বৈচিত্র্যেও কাজলের মতো ঘনকৃষ্ণ মেঘ দেখে মন-ময়ূরী পুচ্ছ নেচে ওঠে “স্নিগ্ধ সজল মেঘ কজ্জল দিবসে”।

ক্রমশ…

লেখক বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার ফ্যাকাল্টির বিশিষ্ট অধ্যাপক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *