ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা

রাহুল দাশগুপ্ত

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ও দুঃসময়ে একজন বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কৌতূহলোদ্দীপক ও রোমাঞ্চকর দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যায়। বুদ্ধিজীবী হিসাবে যাঁর ভূমিকা একরকম পথিকৃতের, তিনি ভোলত্যের (১৬৯৪-১৭৭৮)। ফ্রান্সে তখন চতুর্দশ লুইয়ের স্বৈরাচারী শাসন। ভোলত্যেরের হাতে উঠে এলো তাঁর শক্তিশালী ও নির্ভীক কলম। রাষ্ট্র পরিচালনার বিরুদ্ধে শ্লেষাত্মক সমালোচনা করার অপরাধে প্রথমে বাস্তিল কারাগারে, পরে ইংল্যান্ডে তিনি নির্বাসিত হলেন। পাঁচ বছর কাটল নির্বাসনে। কিন্তু ভোলত্যেরের আসল লড়াই ছিল প্রবল-প্রতাপ রোমান-ক্যাথলিক চার্চের অমানুষিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে। বজ্রকণ্ঠে তিনি ঘোষণা করলেন, “যাজক সম্প্রদায়ের নির্বুদ্ধিতা আমাদের ঘাড়ের ওপর যে কুখ্যাত জোয়ালটি চাপিয়ে দিয়েছে, আজ তা ভেঙে ফেলার দিন এসেছে। আমাদের বিবেক তার প্রবল শক্তি দিয়ে সেই জোয়ালটিকে ঝাঁকুনি দিচ্ছে।” জীবনের ষোলো বছর ভোলত্যেরের কেটেছিল নির্বাসনে, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী একটি জায়গায়। তিরাশি বছরে মৃত্যর আগে তিনি বলেছিলেন, “দু-দিনের জন্য তো এই জীবন, এই সামান্য সময়টুকু আমরা যেন ঘৃণ্যতার পায়ে বিকিয়ে না দিই।

আরও পড়ুন: পোস্টমর্টেম: ২০২১ বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের অন্তর্স্বর

সরকার যখন অন্যায় করছে, তখন ন্যায়ের কথা বলা বিপদজনক' | The Daily Star  Bangla
ভোলত্যের

স্বৈরাচারের বিরোধিতা করায় ফ্রান্স তথা ইউরোপের মহামনীষী ভিকতর উগো (১৮০২-৮৫)-র জীবনের উনিশ বছর কেটেছিল নির্বাসনে। একসময় তিনি যে বলেছিলেন, “কেবলমাত্র নিজেরই জীবনযাপন, এই সুখভোগ করার অধিকার আমাদের নেই”, নিজের জীবন দিয়ে তার দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছিলেন তিনি। ১৮৪৮ সালে ফ্রান্সে নতুন রাষ্ট্রপতি হন নেপোলিয়ঁর ভ্রাতুষ্পুত্র লুই বোনাপার্ত। ১৮৫১ সালে তিনি নিজেকে সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ঁ হিসাবে ঘোষণা করেন এবং সমস্ত ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করেন। উগো তাঁর বিরুদ্ধে প্যারিসে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে যান এবং আশ্রয় নেন ব্রিটিশ-শাসিত জার্সি দ্বীপে। পরে তিনি চলে যান গুয়ের্নসি দ্বীপে। ‘নির্বাসন কী’ নামের দীর্ঘ প্রবন্ধে তিনি লেখেন, “অর্ধেক নেপোলিয়ঁ এবং অর্ধেক ভিক্টোরিয়া, এটা মৈত্রীর বেশি কিছু, প্রায় একটি চুম্বন।” তিনি আরও লেখেন, “এই কঠোর নির্বাসন অন্তহীন হলেও আমি তা মেনে নিচ্ছি। আমি জানতেও চাইব না, কেউ আত্মসমর্পণ করল কিনা, যাদের থাকা উচিত তারা চলে গেল কিনা। যদি হাজার জনের বেশি না থাকে তবে সেই হাজারের মধ্যে আমি একজন, যদি একশো জনের বেশি না থাকে তবে আমি তাদের একজন, যদি দশজন থাকে তবে আমি দশম, আর যদি মাত্র একজন থাকে তবে সেই এক আমি। যেদিন ফ্রান্সে স্বাধীনতা ফিরে আসবে, আমি সেদিনই ফিরে যাব, তার আগে নয়।” উনিশ বছরের নির্বাসন শেষে উগো ফ্রান্সে ফেরেন তৃতীয় নেপোলিয়ঁর পতনের পরদিনই, যখন ফ্রান্সে সাধারণতন্ত্র আবার বলবৎ হয়।

আরও পড়ুন: এটাই পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্য

ভিকতর উগো

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ভাগ, গোটা ইউরোপের অদ্বিতীয় ঔপন্যাসিক হিসাবে সেইসময় এমিল জোলা (১৮৪০-১৯০৪)-র খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। ষাটের কাছাকাছি বয়স, সেইসময়ই দ্রেফুজ ঘটনায় গোটা ফরাসিদেশ ও ইউরোপ আলোড়িত হয়ে উঠেছিল। ১৮৯৫ সালে রাজদ্রোহের অপরাধে ক্যাপ্টেন আলফ্রেড দ্রেফুজের বিচার হয় ও তাঁকে ডেভিলস দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়। দ্রেফুজ দণ্ডিত হওয়ার দু’বছর বাদে তাঁর স্ত্রীর অনুরোধে মামলার কাগজপত্রগুলি পাঠ করে জোলা বুঝলেন যে, ক্যাপ্টেন সম্পূর্ণ নির্দোষ। একজন নিরপরাধী ব্যক্তি এইভাবে লাঞ্ছিত ও দণ্ডিত হবে, আর যারা প্রকৃত অপরাধী তারা সৈন্যবাহিনীতে দিব্যি রয়ে যাবে, এটা জোলার অসহ্য মনে হল। তিনি দণ্ডিত দ্রেফুজের পক্ষে কলম ধরলেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে লিখলেন একটি ‘খোলা চিঠি’। এই চিঠি ইতিহাসে অমর হয়ে আছে, যার প্রতিটি অনুচ্ছেদের আরম্ভে ছিল, ‘অ্যাকিউজ’ অর্থাৎ ‘আমি এই অভিযোগ আনছি’। এই চিঠির শেষে তিনি দাবি করলেন, “মনুষ্যত্বের নামে আমি ক্যাপ্টেন দ্রেফুজের পুনর্বিচার দাবি করছি।”

আরও পড়ুন: বাংলা নিজের মেয়েকেই চাইল, কিন্তু বাংলার মানুষও এখনও অনেক কিছু চায়

Émile Zola - IMDb
এমিল জোলা

এই চিঠির জন্য জোলাকে গ্রেপ্তার করা হল, তাঁর বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনীকে অপমান করার অভিযোগ নিয়ে আসা হল এবং বিদ্বেষপুর্ণ কুৎসা প্রচারের অপরাধে তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেন। বিচারে তাঁর এক বছর কারাদণ্ড ও তিন হাজার ফ্রাঙ্ক জরিমানা হয়। আবেদনের ফলে এই দণ্ড খারিজ হয়। দ্রেফুজ মামলার যখন পুনর্বিচার শুরু হয়, তখন ১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে জোলাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। ইংল্যান্ডে থাকার সময় যখন তিনি জানতে পারলেন যে, পুনর্বিচারের ফলে দ্রেফুজ নির্দোষ সাব্যস্ত হয়েছেন, তখন জোলা বলেছিলেন, “পৃথিবীতে চিরকালই সত্য ও ন্যায়ের জয় হয়ে থাকে। আর জোলার মৃত্যুর পর নোবেলজয়ী আনাতোল ফ্রাঁস বলেছিলেন, “জোলা আজীবন ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। মনুষ্যত্ব ও বিবেকের তিনি জীবন্ত প্রতিমূর্তি। প্রসঙ্গত, ‘ল’অরোরে-তে প্রকাশিত জোলার খোলা চিঠি ‘আই অ্যাকিউজ’-এ যাঁরা প্রথম স্বাক্ষর করেছিলেন, ছাব্বিশ বছরের মার্সেল প্রুস্ত (১৮৭১-১৯২২) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। সে-সময় সামাজিক নির্বাসনের ভয় উপেক্ষা করেও প্রুস্ত নিজের আইনবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে দ্রেফুজের আইনজীবী লাবোরির সঙ্গে সহযোগিতা করেন ও বুদ্ধিজীবীদের আবেদনে আনাতোল ফ্রাঁসের সই জোগাড় করে আনেন। জোলার বিচারের প্রতিটি সেশনে প্রুস্ত উপস্থিত থাকতেন ও ক্রমাগত কর্নেল পিক্যাঁর (যাঁকে এই ঘটনার দ্বিতীয় নায়ক বলা হয়) পক্ষ সমর্থন করেন। বিশ শতকের মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যে দু’জনের স্থান অম্নান হয়ে আছে, তাঁরা হলেন― রোম্যাঁ রোলাঁ (১৮৬৬-১৯৪৫) এবং ম্যাক্সিম গোর্কি (১৮৬৮-১৯৩৬)। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ইউরোপে ফ্যাসিবাদ যখন প্রবল শক্তি হয়ে দেখা দেয়, তখন ১৯৩৪ সালে লেখা গ্রন্থ ‘আই উইল নট রেস্ট’-এ রোলাঁ ফ্যাসিবাদের স্বরূপকে যে ভাষায় তুলে ধরেন, তা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর সতর্কবাণী, বারবুসের সহযোগিতায় ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা, জার্মানি ও স্পেনে শ্রেণিস্বার্থের পাশবিক প্রভুত্বের উচ্ছেদে দৃঢ়পণ, এসবই পরপর ঘটে যায় সেইসময়। এই সময়ই রোলাঁ লেখেন, “গত পনেরো বছর আমি যুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে সংগ্রামের পুরোভাগে দাঁড়িয়ে লড়াই করছি। এই সংগ্রাম ধনতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে।” সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীদের আচরণে তীব্র নিন্দা করে রোলাঁ সেই সময় লিখেছিলেন, “বুদ্ধিজীবীরা সুবিধাভোগী শ্রেণি। শোষণকারীরা যে সম্মান ও সুযোগসুবিধা তাদের দেয়, তাতেই কৃতার্থ হয়ে তারা জনসাধারণের আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে।” আত্মিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ইউরোপের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে জন্ম হয় ভারত-প্রেমিক রোলাঁর। তিনি একের পর এক জীবনীগ্রন্থ রচনা করে যান, যার মধ্যে রয়েছে— গান্ধি (১৯১৪), রামকৃষ্ণ (১৯২৯) এবং বিবেকানন্দ (১৯৩০)। নিজের দুই পূর্বসূরিকে স্মরণ করে রোলাঁ সেই সময় লিখেছিলেন, “লড়াইয়ের জন্য ভোলত্যের আর ভিকতর উগোর দিকেই আমরা ফিরে তাকালাম।”

আরও পড়ুন: গণতন্ত্র ও আমরা

রোম্যাঁ রোলাঁ

যে গোর্কি একসময় ছিলেন রুশ দেশের গোপন বৈপ্লবিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, রাজরোষে নিপীড়িত ও সরকারি নিগ্রহ এড়াবার জন্য দেশত্যাগী, তিনিই রুশ বিপ্লবের পরে দেশে ফিরে সোভিয়েত নেতৃত্বের সঙ্গে সহমত হতে পারেননি এবং পুনরায় স্বেচ্ছা-নির্বাসন গ্রহণ করেন। তাঁর মৃত্যুও রহস্যের মোড়কে ঢাকা, তাঁর শেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস, ‘ক্লিম সামগিনের জীবন’ নিষিদ্ধ হয়ে যায় সোভিয়েত ভূখণ্ডে। ওই বইতে একদা যিনি ‘মা’ রচনা করেছিলেন, তাঁর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল, বুদ্ধিজীবীদের অন্তঃসারশূন্যতা দেখে তিনি হাহাকার করে উঠেছিলেন এবং তাদের তীব্র শ্লেষে ও অনুপুঙ্খ বর্ণনায় অভিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। আত্মকেন্দ্রিক ক্লিমের নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, “ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা যেন বড় কঠিন, ঠিক যেন কুচকাওয়াজের জন্য সারিতে সৈন্য দাড়িয়ে আছে। গাল দু’টো হাস্যকর রকম ফোলা, চোখ দু’টো যেন অন্ধের চোখ।”

আরও পড়ুন: রোগ এবং রোগমুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ

ম্যাক্সিম গোর্কি

বিশ শতকে যে দু’জন বুদ্ধিজীবী তাঁদের অনমনীয় দৃঢ়তা ও সৎসাহসের জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁরা হলেন, জঁ পল সার্ত্র (১৯০৫-৮০) এবং পিয়ের পাওলো প্যাসোলিনি (১৯২২-৭৫)। ভ্যাটিকান শহরের পোপের দপ্তর থেকে সার্ত্রের সমস্ত রচনাকে বর্জনের আদেশ জারি করা হয় ১৯৪৮ সালে। ১৯৫০ সালে তিনি সোভিয়েত বন্দিশিবিরগুলির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৫৮ সালে আলজিরিয়ায় ফরাসি সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান সার্ত্র। শুধু তাই নয়, আলজিরিয়ার মুক্তিসংগ্রামকে দমন করা থেকে বিরত থাকার জন্য ফরাসি সৈন্যদের কাছে আবেদন জানান। তাঁর ওই কাজের জন্য দক্ষিণপন্থী সন্ত্রাসবাদীরা দু’বার তাঁর ফ্ল্যাটে বোমা ফেলে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেন। সেই সময় ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ছিলেন জেনারেল দ্য’গল, যাঁর কাছে তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যরা এবং প্রাক্তন যোদ্ধারা সার্ত্র্রের ওই ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কাজের জন্য তাঁকে কারাদণ্ডে বা মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত করার দাবি জানান। কিন্তু দ্য’গল ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনে সার্ত্রের গৌরবজনক ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, “বুদ্ধিজীবীদের কথা বাদ দাও, দেশের ভোলত্যেরকে কখনও গ্রেপ্তার করা হয় না।”

আরও পড়ুন: একটি বিশুদ্ধ ইতরামি

জঁ পল সার্ত্র

১৯৬৫ সালে সার্ত্র ভিয়েতনামের মানুষের ওপর মার্কিন সৈন্যদের বর্বর অত্যাচার ও আমেরিকার ভিয়েতনাম নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ভিয়েতনামের গণহত্যার জন্য আমেরিকাকেই দায়ী করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি মে মাসের ছাত্র-বিদ্রোহকে সমর্থন করেন এবং পুলিশের দমননীতির তীব্র নিন্দা করেন। তীব্র ভাষায় সার্ত্র বলেছিলেন, “রাজনীতি থেকে পালিয়ে থাকা যায় না। রাজনীতি থেকে সরে থাকাও এক ধরনের রাজনীতি। একজন লেখক জগৎটাকে শুধুমাত্র ভোগ করতে পারেন না। তাঁকে একটা জায়গায় দাঁড়াতেই হবে, কোনও এক পক্ষ সমর্থন তাঁকে করতেই হবে।”

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ: সত্যজিৎ রায়ের দু’টি সিনেমা

পিয়ের পাওলো প্যাসোলিনি

১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর রোমের কাছে অস্তিয়ার সমুদ্রতীরে প্যাসোলিনিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তাঁরই গাড়ির নিচে কয়েকবার পিষ্ট করে। প্যাসোলিনির বন্ধু সার্জিও সিট্টির সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, ‘সালো’ চলচ্চিত্রের কিছু রোল চুরি যায় এবং স্টকহোম ঘুরে এসে প্যাসোলিনি ওই চোরদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। ফ্যাসিবাদ, ক্যাথলিকবাদ আর পণ্যায়নের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই করে যাচ্ছিলেন প্যাসোলিনি এবং এ ব্যাপারে তাঁর প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছিল, যৌনতা। তিনি দেখেছিলেন, পণ্যায়নের ফলে জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে নিষ্পাপতা ও সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা এবং তার জায়গা নিচ্ছে বুর্জোয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা। যৌনতাকে বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করে প্যাসোলিনি চাইছিলেন সমাজের ভেতর যে ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়াটি চলছে, তাকেই চিহ্নিত করতে। এর বিপরীতে তিনি সেইসব মানুষ ও সমাজকে দেখাতে চাইছিলেন, যারা কখনও নৈতিকতার ধার ধারে না। এইভাবেই ইতিহাসে বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা, যাকে অনায়াসেই দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরা যায় ভবিষ্যতের কাছে। কারণ এই দৃষ্টান্তগুলিই অন্যদের থেকে পৃথক করে চিনিয়ে দিতে পারে একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবী ও তাঁর সৎ প্রয়াসকে!

লেখক রাহুল দাশগুপ্ত ইউনিভার্সিটি গ্লান্টস কমিশনের স্কলারশিপ নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট। পড়িয়েছেন যাদবপুর ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক। কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির সঙ্গেও। কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন ও গবেষণা কেন্দ্রের ‘তরুণ প্রাবন্ধিক সম্মাননা’র প্রথম প্রাপক। ২০১৭ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার। বাংলা উপন্যাসের প্রথম অভিধান ‘উপন্যাসকোশ’ গ্রন্থটির জন্য পান ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘কবিপত্র’ সম্মান, ‘মানুষ দাশগুপ্ত স্মৃতি সম্মাননা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় ভারতীয় কবি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মনিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন সাহিত্য অকাদেমির আমন্ত্রণে কবিতা অনুবাদের ওয়ার্কশপে। বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এক সময় সম্পাদনা করেছেন ‘এবং সমুদ্র’ পত্রিকা, এখন করেন ‘চিন্তা’ পত্রিকা। পোস্ট ডক্টরেট করেছেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের ইন্দোলজি বিভাগে। কর্মসূত্রে গার্ডেন হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত। ভালবাসেন বই পড়তে, সিনেমা দেখতে এবং মেয়ে উপাসনার সঙ্গে সময় কাটাতে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *