জীবনের গাছপালা, জীবনের ডালপালা

অবশেষ দাস

বিরাট একটা প্রশ্নচিহ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আমাদের বেঁচে ও টিকে থাকার পরিবেশ নিয়ে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস এলে চারদিকে প্রচুর লেখালেখি চোখে পড়ে। আমরাও কিছু না কিছু লেখার চেষ্টা করি। পরিবেশকে ভালোবাসার হাতেখড়ি ছেলেবেলায় বাবার হাত ধরে হয়েছিল। বাবার ছিল ফুল বাগানের শখ। সেই শখ বাবার আজও আছে। সংসারে নানাবিধ অসুবিধা ছিল, কিন্তু রথের মেলা এলে বাবা প্রচুর গাছপালা কিনতেন। বাবার মুখে শোনা, আমাদের পরিবেশের আসল কাণ্ডারি এই গাছপালা। ধীরে ধীরে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের কথা জেনেছি। একশো পঞ্চাশটি দেশের পরিবেশ-প্রেমীরা এই দিনটিকে অন্য মাত্রায় পালন করেন। এছাড়া পৃথিবীর সব দেশেই প্রকৃতি-পাগল মানুষ রয়েছে। তাঁরাও বিশ্ব পরিবেশ দিবস পরিবেশকে একপ্রকার গঙ্গাস্নানের ব্যবস্থা করে থাকেন। অর্থাৎ, পরিবেশ রক্ষায় সবরকম কার্যকরী ভূমিকা তাঁরা নিয়ে থাকেন। তারপর প্রকৃতি নিজের খেয়ালে নিজেকে রক্ষা করবার আয়োজন প্রতিমুহূর্তে করে চলেছে। তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে জীবনের চারপাশ জুড়ে কীভাবে পরিবেশ বন্দনা এসেছে, তা বলতে সাধ হয়। জগতের কোনও উদ্যোগ ক্ষুদ্র নয়, বরং ক্ষুদ্রতার একনিষ্ঠ যোগফল অসীমের সন্ধান দেয়।

আরও পড়ুন: প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান

‘ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম’ চলতি বছরের থিম হিসেবে ঘোষণা করেছে ‘বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার’। এই কর্মসূচি সফল হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে পারব। ছেলেবেলায় আপন খেয়ালে লিখেছিলাম,

কোথায় গেল সবুজ সে বন,

স্মরণ করি পদ্যে

জলে দূষণ, স্থলে দূষণ,

দূষণ বায়ুর মধ্যে।

বাক্যে দূষণ, চিত্রে দূষণ

দূষণ এখন শব্দে

দূষণ, দূষণ— সবই দূষণ

সভ্যতা আজ জব্দে।

বলতে দ্বিধা নেই সেই ছোটবেলা থেকেই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আত্মবাণী আমরা রথের মেলা থেকে শুনেছিলাম। আর সেই বয়স থেকেই পরিবেশ আমাদের জীবন সাধনার প্রতিবেশী হয়ে উঠেছিল। আজ তেমনই একটি দিন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। তবে তিন পঁয়ষট্টি দিন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা একইভাবে এই পরিবেশ বাঁচানোর লড়াই করে যাচ্ছেন। এই লড়াইয়ে সবাইকে শামিল হতে হবে। আমরাও সেই ছেলেবেলায় অজান্তে এই লড়াইয়ে নাম লিখেছিলাম। সে গল্প বিশ্ব পরিবেশ দিবসের অঞ্জলি হিসাবে তুলে ধরলাম।

আরও পড়ুন: লকডাউনে বাদাবনের বাঘ

কচিহাতে শিউলি গাছ বসিয়েছিলাম। ক্লাশ ওয়ান হবে। ঘাস ফুল, জুঁই ফুল, গাঁদা ফুল তো আছেই। আরও অনেক রকম গাছ সব মনে পড়ছে না। একটু উঁচু ক্লাশে উঠে বাড়ির পিছনে মাঠের ধারে যে পুকুর আছে, ওখানে প্রচুর শালুক ফুল ফুটে থাকতে দেখেছি। বর্ষা এলেই ওই মাঠ যেন আনন্দে থইথই করত। ওইরকম এক বর্ষার দিনে মাঠের ধারের পুকুর পাড়ে গোটা পাঁচেক শিরীষ গাছ বসিয়েছিলাম। তারপর আর ওদের দিকে লক্ষ দিইনি। হঠাৎ একদিন দেখি সারামাঠ আলো করে ওরা আমার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। সেদিন বিস্মিত হয়েছিলাম। ঈশ্বরের কাছে ওদের জন্যে আশীর্বাদ চেয়েছিলাম। আশ্চর্য ভালো লাগা মনকে ঘিরে ধরেছিল। বুঝেছিলাম কোনও প্রচেষ্টা ছোট নয়। বরং একটুখানি সদিচ্ছা কত বড় হয়ে ধরা দিতে পারে। তখন কলেজে পড়ি। টিউশন পড়ানো নিয়ে বিদ্যুৎগতির মতো ব্যস্ত। লেখালেখি জগতে মত্ততা জেগেছে। মানুষের সঙ্গে গভীর আত্মীয়তা গড়ে উঠছে। ঘুড়ি ওড়ানো ভুলেই গেছি। মাঠের দিকে আর যাওয়াই হয় না। নদীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে দারুণভাবে। সপ্তাহের অন্তত একটি সন্ধ্যা নদীর কাছেই কাটে। নদীর ওপারের আলো মনকে আকুল করে দেয়। সন্ধ্যার আলোয় নদী লুকিয়ে পড়লেও তার নূপুর ধ্বনি লুকোয় না। বুকের সচল ভূমিতে এক আশ্চর্য দ্যোতনা জাগায়। মাঝেমাঝে মায়ের জন্যে খুব মন কেমন করে। জগতের সবকিছু মায়ের প্রাপ্য। অথচ মা জীবনের কিছুই পেল না। সংসারে শুধু দিয়ে গেল। বাবা স্বপ্ন দেখেন। অনেক স্বপ্ন। তাঁর স্বপ্নের রাজধানী আমি। এরকম কতকিছু ভাবনা নিয়ে নদীর ধারে সন্ধ্যা কাটে। কলমের ডগা দিয়ে অজস্র কবিতা নেমে আসে। এমএ পাশ করে নবাসন তুষ্টচরণ হাইস্কুলে অস্থায়ী শিক্ষকতা আর প্রাইভেট টিউশন। তাতেই গোটা সংসার নিয়ে চলে আসি ফতেপুরে। ভাড়া বাড়িতে। লড়াই। দিনের পর দিন লড়াই। খেলার মাঠের লড়াই নয়। রাজনৈতিক ময়দানের লড়াই নয়। বেঁচে থাকার লড়াই। টিকে থাকার লড়াই। একটা পরিবারকে আগলে রাখার লড়াই। তাহলেও চারপাশের গাছপালা, বিশেষ করে পুরনো গাছপালার সঙ্গে মানস-যোগাযোগ কখনও পাতলা হয়নি। অশ্বত্থ, বটের প্রতি সারাজীবনের দুর্বলতা। কী ভালো লাগে! কী অদ্ভুত অনুভূতি। অশ্বত্থ, বটের নতুন পাতা দেখে গভীর আনন্দ জাগে। ছেলেবেলায় নতুন জামা পাওয়ার  মতো লাগামছাড়া আনন্দ। জীবন ফুল ফোটা সকাল নয়; তবু নদী, দিঘি, সাগর, গাছপালাবেষ্টিত জলাশয় ছাড়া জীবনের কোথাও  কিছু আছে বলে মনে হয় না।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

একদিন কোনও একটা কারণে, মনে পড়ছে না সে কারণ। বোধহয় রান্না পূজার দিনে সবাই গ্রামের বাড়িতে গিয়েছি। যে যার কাজে ব্যস্ত। বাড়ির পিছনের মাঠের দিকে গিয়েছি। এমনিই গিয়েছি। গাছগুলো দেখার কথা একটু মনে হল। দেখি প্রকাণ্ড হয়ে ওঠা শিরীষ গাছটা মরে শুকনো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খুব কেঁদেছিলাম। ‘বলাই’ গল্পের বলাই যে আমিও হতে পারি সেদিন প্রথম আবিষ্কার করি। পুত্রের মৃত্যু শোকের মতো নিদারুণ যন্ত্রণা মনকে বিষাদঘন করে তুলেছিল। ভাবলে এখনও কষ্ট হয়। ভাড়া বাড়িতে থাকতে থাকতে খোলামেলা জায়গাতে থাকার অভ্যাসটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। এটা প্রায় মনে হত। উঠানে শুয়ে চাঁদ দেখার সুখ ভাড়া বাড়িতে ছিল না। মাঝের তলা থেকে চারতলার ছাদে যাওয়ার ইচ্ছে হত না। অধিকার বোধের অভাব হত। তাহলেও ভাড়া বাড়ি অনেক কিছুই দিয়েছে। অনেকগুলো ডিগ্রি। স্বাচ্ছন্দ্য। সাহিত্য পুরস্কার। কলেজে পড়ানোর অভিজ্ঞতা। পিতৃত্ব। নতুন বাড়ি। সরকারি চাকরি। সব পেয়েছি ভাড়া বাড়িতে থেকে। দেশ বাড়ি থেকে মাটি এনে তুলসীগাছ বসিয়ে ছিলাম ওই ভাড়াবাড়ির ভেতরে। জানালার ভেতরে আসা রোদে সে বেঁচেছিল। আর তার দুই সঙ্গী ছিল। টবে বসানো একটা অশ্বত্থ আর বট। এদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বড় বাগানের স্বপ্ন দেখেছি। নিজের হাতে গাছ ভর্তি বাগান গড়ে তোলার স্বপ্ন। প্রচুর গাছপালার স্বপ্ন। সবুজের গানে ভরে ওঠার স্বপ্ন। সে স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। ছাত্রছাত্রীদের বলি, তোদের বাড়িতে গেলে একটা গাছ বসিয়ে আসব। সারাবছর সবাইকে শুধু গাছ উপহার দিই। ওরা যে আমার প্রাণের কাছাকাছি হতে আরও বেশি কাছের তা কখনও কাউকে বোঝাতে চাইনি। ওদের সঙ্গে আমার বহু জন্মের আত্মীয়তা। আমি এটুকু তো বুঝি, আমার বাবা-মা আমার দেখা সবচেয়ে কাছের গাছ। তাদের ছায়া ধরে আজ আমিও গাছ হয়ে উঠতে চাইছি। সেরকমই এ পৃথিবীর সব গাছ পৃথিবীকে প্রতিদিন ছায়া দিয়ে আসছে। জীবনের অমৃতকুম্ভের সন্ধান দিয়ে আসছে। পৃথিবীর প্রকৃত বাবা-মা এই গাছেরাই। আমি তাদের প্রণাম করি। তাদের নিরাপত্তার জন্য আকুল হই। আজকের দিনে শুধু নয়, আগামী দিন তাদের ওপর কোনও অস্ত্র চালানো আমাদের একেবারেই উচিত নয়, এটা সহস্রবার মনে হয়। মানবতার ঊর্ধ্বে যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা অতি অবশ্যই গাছপালা। বিরুৎ, গুল্ম, বৃক্ষ মিলে যে গাছেদের জগৎ তাকে জীবন দিয়ে হলেও  রক্ষা করতে সাধ হয়। আমাদের জন্যে গাছেরা তো অনেক জীবন দিয়েছে। দেবেও। আমাদের এবার ফিরিয়ে দেবার সময় এসেছে…

নিবন্ধক বিশিষ্ট সাহিত্যকার এবং বাংলা বিভাগ , বিদ্যানগর কলেজে অধ্যাপনারত

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • Paramita Ghosh

    খুব সুন্দর প্রতিস্থাপন।

  • DHANANJOY HALDER

    হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

  • DHANANJOY HALDER

    অসাধারণ…….

  • ধনঞ্জয় হালদার

    লেখাটি অসাধারণ হয়েছে । লেখোকের এমন লেখা আমরা আরো পড়তে চাই। লেখক এর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার জানালে বাধিত হব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *