একদা রাজার হাতে গড়ে ওঠা মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণার রঘুনাথ মন্দিরের চেহারা আজ বড়ই করুণ

চিন্ময় দাশ

পূর্বকালে নাম ছিল ‘মানা’। পরে, রাজা চন্দ্রকেতুর নাম থেকে চন্দ্রকোণা নামের পত্তন। বহু কিংবদন্তি, লোকশ্রুতি আর লোককথা জড়িয়ে আছে এই নগরীর সঙ্গে। ইংরেজ আসার আগে, পর পর কয়েকটি রাজবংশ রাজত্ব করেছে এখানে― মল্ল, কেতু, ভান আর বর্ধমান রাজবংশ। ১৬৯৬ সালে ‘বাংলার শিবাজি’ শোভা সিংহ বর্ধমান আক্রমণ করে রাজা কৃষ্ণরামকে হত্যা করেছিলেন। সে-যুদ্ধে শোভার সহযোগী ছিলেন চন্দ্রকোনার অধিপতি রঘুনাথ সিংহ। পরে ১৭০২ সালে, কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র কীর্তিচাঁদ (বা কীর্ত্তিচন্দ্র) এক ভয়ানক যুদ্ধে রঘুনাথকে হত্যা করে, চন্দ্রকোণা দখল করে নেন।

আরও পড়ুন­: বিগ্রহহীন, পরিত্যক্ত আর ভারী জীর্ণ কেশপুর বাদাড় গ্রামের লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির

সেই ভয়ানক যুদ্ধে, কীর্তিচাঁদের গোলার আঘাতে, চন্দ্রকোণার অসংখ্য মন্দির একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। তবে, সেগুলির ভিতর কয়েকটি মন্দির তিনি নতুন করে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। কীর্তিচাঁদের নতুন করে মন্দির নির্মাণ সম্পর্কে একটি লোকশ্রুতি প্রচলিত আছে। যুদ্ধশেষে বর্ধমান ফিরে যাওয়ার সময়, কয়েকটি দেববিগ্রহ তিনি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন, বর্ধমানে প্রতিষ্ঠা করবেন, এই মানসে। সেদিনই রাত্রিকালে স্বপ্নাদেশ পান তিনি― দেবতা বর্ধমান যেতে সম্মত নন। তাঁকে যেন চন্দ্রকোনাতেই পুনঃস্থাপন করা হয়। দেবাজ্ঞা লঙ্ঘন করেননি রাজা।

আরও পড়ুন­­: প্রাচীনতমের বিচারে কাঁথি মহকুমায় তৃতীয় ও পটাশপুর থানায় সর্বপ্রাচীন কিশোররায় মন্দির

চন্দ্রকোণা নগরের একেবারে পশ্চিম সীমায় একটি শীর্ণ জলধারা প্রবাহিত ছিল। সেটিকে রামায়ণের ‘সরযু নদী’ এবং লাগোয়া গ্রামটিকে ‘অযোধ্যা’ নামকরণ করেন কীর্তিচাঁদ। অযোধ্যাতেই বিশাল এলাকা পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রঘুনাথজিউ, লালজিউ এবং রামেশ্বর শিবের তিনটি মন্দির স্থাপিত হয়। সমগ্র দেবস্থলীটি ‘রঘুনাথ ঠাকুরবাড়ি’ নামে পরিচিত হয়েছিল। সেই তিনটি মন্দিরের ভিতর রঘুনাথের মন্দিরটি নিয়েই আমাদের আজকের জার্নাল। কেবল ঠাকুরবাড়ির নয়, এটি ছিল চন্দ্রকোণা নগরীরও প্রধান এবং বৃহত্তম মন্দির।

আরও পড়ুন: খড়গপুরের চমকায় ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে অনিন্দ্য সুন্দর শ্রীধর মন্দির

কেবল ৩টি মন্দির নয়, মন্দির চত্বরে আরও কয়েকটি সৌধ আছে। স্থাপত্য হিসাবে প্রতিটিই স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্রপূর্ণ। ঠাকুরবাড়িটি গড়ে তোলা হয়েছিল দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের ‘দুর্গ-মন্দির’-এর আদলে। উঁচু প্রাচীরের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। ভিতরের প্রাঙ্গণটি দু’ভাগে বিভক্ত। বাইরের ভাগে শিবের মন্দির, রাসমঞ্চ। আর, ভিতরে রঘুনাথ এবং লালজি-র মন্দির। এছাড়াও আছে―

১. নাটমন্দির  রঘুনাথ মন্দিরের সামনের ঈশান কোণে, রাজকীয় গড়নের উন্মুক্ত একটি সৌধ। বর্তমানে মাথার ছাউনি সম্পূর্ণ বিনষ্ট। তবে সেটি নির্মিত হয়েছিল দালান-রীতিতে।

২. ভোগমণ্ডপ  উঁচু ভিত্তির উপর স্থাপিত ‘দালান-রীতি’র দক্ষিণমুখী, আয়তাকার সৌধ। ত্রিখিলান দ্বারপথ। ভিতরের সিলিং খিলান-রীতির। মাথার বাইরের ছাউনি চালা-রীতির। রঘুনাথ মন্দির এবং লালজি মন্দিরের দুই বিগ্রহ এনে ভোগ নিবেদন করা হত এখানে।

৩. তোষাখানা  পৌনে ৩১ ফুট দৈর্ঘ্য, ২০ ফুট প্রস্থের বিশাল কোষাগার। এই এক-দ্বারী সৌধটি চার-চালা রীতিতে নির্মিত।

৪. স্নানবেদী  পুষ্যাভিষেক ছাড়াও, রঘুনাথ এবং লালজির স্নানের জন্য বিশাল মাপের একটি স্নান-বেদি নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রথমে প্রশস্ত একটি অধিষ্ঠান মঞ্চ। তার উপর, চার কোণে চারটি স্তম্ভের মাথায় চার-চালা ছাউনি দেওয়া সৌধ। বেদির গড়নটি বেশ দৃষ্টিনন্দন। বড় মাপের ডম্বরুর আদলে গড়া।

আরও পড়ুন: রেশম ও তসর শিল্পের সমৃদ্ধ জনপদ আনন্দপুরের রঘুনাথ মন্দির

চারটি সৌধই মাকড়া পাথরে নির্মিত। বস্তুত, এই ঠাকুরবাড়ির সম্পূর্ণত পাথরেই নির্মিত হয়েছিল। ইটের ব্যবহার নেই।

মূল রঘুনাথ মন্দিরের স্থাপত্যটি দেখা যাক এবার। পূর্বমুখী মন্দিরটি কলিঙ্গ প্রভাবে শিখর-দেউল হিসাবে নির্মিত। সামনে পীঢ়-রীতির জগমোহন, মাঝে অন্তরাল এবং পিছনে শিখর-রীতির বিমান। জগমোহন ও বিমান সৌধ দু’টি সম্পূর্ণ বর্গাকার। একটি আদর্শ শিখর-মন্দির নির্মাণের অনেকগুলি শর্তই অনুসরণ করা হয়েছে এখানে। বিমানের পা-ভাগে ৬টি, বান্ধনাতে ৩টি এবং বরণ্ডীতে ৪টি বেষ্টনী নির্মিত হয়েছে। তল-জাঙ্ঘ ও উপর-জাঙ্ঘে কোনও ভাস্কর্য বিন্যাস নেই। তবে বরণ্ডীর উপর গণ্ডীর সূচনা অংশে, তিন দিকের দেওয়ালে তিনটি ‘প্রতিকৃতি রেখদেউল’ এবং রাহাপাগ-এর উপরি অংশে, বান্ধনা ও বরণ্ডীর মধ্যবর্তী এলাকায়, ৩টি করে মূর্তি সন্নিবেশ করা হয়েছে। তার প্রত্যেকটিতেই উপরের মূর্তিটি লম্ফমান সিংহমূর্তি। কলিঙ্গ-রীতির উজ্জ্বল নমুনা এই মন্দির। 

জগমোহনের বাঢ় অংশের ত্রি-বেষ্টনীর উপর, গণ্ডি অংশটি পীঢ়-রীতিতে নির্মিত। সেটি প্রশস্ত চারটি থাক-এ বিভক্ত। বিমানের গণ্ডি অংশের অনুরূপ, জগমোহনের বাঢ় অংশেও তিন দিকের দেওয়ালে ‘তিন থাক পীঢ়া যুক্ত প্রতিকৃতি-দেউল’ রচিত আছে।

বিমান এবং জগমোহন― দু’টি সৌধেরই শীর্ষক অংশে বেঁকি, আমলক, কলস ও বিুষ্ণচক্র শোভিত। বিমান, অন্তরাল এবং জগমাহন― তিন সৌধের সিলিং নির্মিত হয়েছে চতুষ্কোণ লহরা-রীতিতে। জগমোহনের চারটি এবং গর্ভগৃহের একটি― পাঁচটি দ্বারপথও লহরা-রীতির। সমগ্র মন্দির মাকড়া পাথর (ল্যাটরাইট)-এর বড় আকারের চৌকো স্ল্যাব দিয়ে নর্মিত। দেওয়ালের গায়ে ছিল চুন-বালির পঙ্খের মসৃণ আস্তরণ। একেবারেই জীর্ণ এই মন্দিরে পঙ্খের আস্তরণ যতটুকু দেখা যায়, তা আজও সমীহ কেড়ে নেওয়ার উপযোগী।

একদিন এক মহারাজার হাতে একেবারে রাজকীয় গরিমায় গড়ে উঠেছিল মন্দিরসৌধটি। পরে মহারাজ তেজচন্দ্র একবার সংস্কারও করিয়েছিলেন। কিন্তু পরিত্যক্ত জীর্ণ মন্দিরটির বর্তমানে ভারি করুণ চেহারা। নহবতখানা সহ প্রধান ফটক, পিছনের বিমান সৌধটির খাড়াখাড়ি অর্ধেক অংশ একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। আজ এই খণ্ডহরের সামনে দাঁড়ালে, বেদনায় বুক ভারী হয়ে যায়।

সহযোগিতা
সর্বশ্রী রামকৃষ্ণ ব্যানার্জি, গণেশ দাস― চন্দ্রকোণা। সুগত পাইন― দাসপুর। পার্থ দে― তমলুক। শোভন মাইতি― কলকাতা।

পথ-নির্দেশ
মেদিনীপুর, ঘাটাল শহর, কিংবা চন্দ্রকোণা রোড রেল স্টেশন― যে কোনও দিক থেকে সরাসরি চন্দ্রকোনা যাওয়া যায়। ক্ষীরপাই হয়ে, বর্ধমান বা আরামবাগ থেকেও পৌঁছনো যাবে সহজেই। মন্দির নগরী চন্দ্রকোনা। এক সফরে, অনেক রীতির অনেকগুলি মন্দির দর্শন করে নেওয়া যায়।

ছবি লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *