শাক তোলার গান

চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়

গরিব ঘরে সন্তানের জন্য রোজ দুধের জোগান দেওয়া বেশ কঠিন ছিল বলেই হয়তো অন্নদামঙ্গলের ঈশ্বর পাটনী, দেবীর কাছে সন্তানদের দুধে ভাতে থাকার বর চেয়েছিলেন। নদী, খালেবিলে মাছ ধরতে পারলে তবেই একটু মাছ বা গুগলি জুটতে পারে, নইলে মাছ কিনে খাবার সামর্থ্যও গ্রামঘরে খুব বেশিজনের থাকত না। শাকভাত বা আরও অভাবে শুধু শাকপাতা সিদ্ধ খেয়েই বছরের একটা সময় কাটত অনেকের। শাকপাতা তাই গরিবের জীবনধারণের অঙ্গ। প্রতিদিনের জীবনে শাকের গুরুত্বের কথা বুঝিয়ে দেয় দেবী দুর্গার ‘শাকম্ভরী’ নাম আর তার ভেষজ গুণকে মনে করায় চোদ্দ শাক খাওয়ার বিধান। স্বাদ আর গুণের কারণে স্বচ্ছল পরিবারেও প্রথমপাতে একটু শাক খাওয়ার রেওয়াজ। শাক তুলে নিয়ে আসা মেয়েদেরই দৈনন্দিন কাজ; তা নিয়ে গানও তাই প্রচুর। এক একটা গান, গল্প বলে এক এক রকমের— প্রেম থেকে পরিচর্যা, প্রতিবাদ থেকে প্রত্যাখ্যান— নানা কথা গানে গানে।

আরও পড়ুন: গামছার গান

লেখকের কণ্ঠে শুনুন শাক তোলার গান

রংপুর থেকে আসা ধৌলি বর্মন শোনান—

“শাক তুলিবার গেনু মাও মুই মানসনদীর বাতায় রে
আঞ্চলেতে ঘোরে কানাই রে—
শাকের ভুঁইয়ত বাঘের পাড়া ধুমকি উঠিল গাও রে”

বালবিধবা একা মেয়েটিকে দূর থেকে পাহারা দেয়, মনের কথা ইঙ্গিতে জানায় গ্রামের কৃষ্ণ। বাঘের পায়ের ছাপ দেখে ভয় পাওয়া মেয়ে আশ্বাস পায়, ভরসা পায় কানাইয়ের আন্তরিকতায়। শাকের গানে লাগে প্রেমের সুর।

বথুয়া শাক চাষ করতে হয় না, আপনা-আপনিই ভরে থাকে মাঠেঘাটে বা চাষের ক্ষেতের আশপাশে। জলপাইগুড়ির গান—

“ও শাক তুলং রে মুঁই খুরিয়া না বথুয়া—
মুই নারীটা শাক তুলং ডালি ভরেয়া,
ও শাক তুলং হেলিয়া…”

শাক পাওয়ার আনন্দ ঝরে পড়ে সুরে সুরে। গোয়ালপাড়ার দোলা বা নীচু জমিতে বথুয়া হলফল করছে দেখে ছাওয়াপোয়াকে নিয়ে শাক তুলে আনেন বাড়ির গৃহিণী। কিন্তু রাঁধার সময়—

“সেই না শাক রান্ধিতে মুই তাতে নাই দেওং নুন
আমার বাড়ির বুড়াটার শোন গোদর গোদর গুণ”

বুড়োর গজগজানিতে গৃহিণী খুব যে কাতর নয়, তা ধরা থাকে গানের চপল ছন্দে।

“ইপার বাইতো উপার বাইতো, বাইতো দুমদুম করে 
বাইতো শাক তুলতি গেলি সাপে পট করে” 

ফরিদপুরের এ গানে শুনি, সাপে ফণা তোলায় ভয় পেয়ে, শাক তোলা ফেলে নতুন বউটি প্রথমে আসে ঘরে; সেখানে স্বামীর কটু কথায় একে একে যায় রান্নাঘরে, সদরে, গোয়ালে…

আরও পড়ুন: মাটি-জল-মুক্তামাছ

ছবি ইন্টারনেট

যেখানেই যায় কেউ না কেউ তাতে বিরক্ত হয়, রাগ করে; বোঝা যায় শ্বশুরঘরে তার নিজস্ব কোনও জায়গাই নেই। মনের কথা বলা বা শোনার মতো কোনও মানুষও নেই সেদেশে। বথুয়া শাকের গান এভাবেই কিছু অমোঘ সত্যকে ধরে রাখে সুরের বাঁধনে।

শুধু বাঘ বা সাপ নয়, আরও অনেক কিছুরই মুখোমুখি হতে হয়। কোনও এক খলিফার ক্ষেতে শাক তুলতে যান মালদা জেলার গ্রামের মেয়েরা; নানা ধরনের শাক সেখানে  ; পটললতি, পুইনক্যার শাক, মটরের- বাদামের শাক। আরও আছে হেলেঞ্চা, কলমুর শাক। এত শাক পেয়ে খুশিতে তারা ভাবতে থাকে—

“তুইলহ্যা পাইড়হা দিবো দিদির কোছাতে…
রাইনহ্যা বাইড়হা দিবো নন্দুর পাতেতে…”

কিন্তু কাজের তাল কাটে, খুশি উধাও হয়, রসিক খলিফা কোন মেয়ের সঙ্গে অনুচিত ব্যবহার করে। মেয়েরা মুখ খোলে; প্রতিবাদে মুখর হয় তারা—

“জাত মাইরা দিল রে খলিফাতে
সেই কথা ফেইলব দশের মাঝেতে…”

অভাবী মেয়েদের প্রলুব্ধ করার কথাও গানে নথিবদ্ধ করেন মেয়েরা। শাক তুলতে গেলে বাবু প্রথমে লালছড়ি দেখিয়ে বারণ করেন আর তার পরেই— “সিকি পইসা গুনতে লারি, বাবু দেখায় আধুলি…”

এখানেও চুপ করে মেনে না নিয়ে সটান জবাব বীরভূমের মেয়েদের—

“ইবার যদি দেখাস বাবু—
মাইরব তোকে শুকনা ঢিল…”

শ্রমজীবী নারী গলা তুলে কথা বলতে ভয় পান না। দলবদ্ধতা তাদের বাড়তি সাহস জোগায়।

উত্তরবঙ্গের নাপাশাক খুব বিখ্যাত তার স্বাদের গুণে—

“হাপা হাপা নাপা রে মোর ঢ্যাপা ঢ্যাপা পাত 
সেই শাক রান্দিয়া আই মুঁই শুদায় খাইনু ভাত”

(নীহার বড়ুয়া, গৌরীপুর, গোয়ালপাড়া)

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (একাদশ অংশ)

মেয়েদের গান সংগ্রহের পথিকৃৎ নীহার বড়ুয়া। ছবি: ঋষি বড়ুয়া

নাপা শাকের প্যালকা হলে আর কিছুই নাকি লাগে না। আর যদি একটু ‘হোরণ ফোড়ন দিয়া’ রান্না করা যায় তার সুবাস ছড়িয়ে পড়ে গোটা পাড়ায়। এমনই তার আকর্ষণ যে, নাপাশাকের হাঁড়ি চুরি করতে নাকি চোরও আসে—

“নাপা শাক রান্দিয়া আই মুঁই দুয়োরে গেনু নিদ
নাপার হাঁড়ি বরাবরি চোরে দিলো সিঁদ রে”

এত সাধ করে রান্না করা নাপাকে তো আর ছাড়া যায় না, তাই প্রথমে চৌকিদারের খোঁজ; না পেয়ে থানার দারোগাবাবু পর্যন্ত পৌঁছয় নাপা শাকের বৃত্তান্ত।

গান খবর দেয় দাম্পত্য খুনসুঁটির-অবাধ্য বউকে, বশে আনতে—

“কলমু শাগের আগান দিয়া দুই হাত বান্দিছে
আর নাউশাগের আগান দিয়া আঞ্চলে ডাঙাইছে” (গোয়ালপাড়া)

পাটশাক তুলতে গিয়ে পাটের ডগা ভাঙলে কিন্তু সত্যি মারও জুটতে পারে—

“পাটশাক তুলিতে পাটের ডুগা ভেঙেছে 
হেই দেখে যা পাড়ার লোক বুঢ়্যা মাইরহেছে
বুঢ়্যার মারে আমার কপাল ফাইটেছে…”

শেষে অবশ্য বুড়ির মান ভাঙে, আর জানিয়ে দেন, “মারেনি ধরেনি বুড়া সুহাগ করেছে…”

মুর্শিদাবাদের সরলপুরে কাঞ্চন ও ফিরোজা বেওয়া দিদিরা শোনান—

“হেলেঞ্চা তুলিতে নাইম্যাছিলাম জলে 
ব্যালের কাঁটা ফুইট্যা গেল পায়ে, ভাই লাটুয়া রে 
আনো যন্তর,তুলো কাঁটা…”

হেলেঞ্চা দিয়ে নাকি মাছ রান্না খুব স্বাদু হয়,তাই হেলেঞ্চার বেশ চাহিদা—

“ছেঁচা বিলে মাছ মারিলাম রে
হেলেঞ্চার শাগে মইজ্যা যায়…”

শাক এতই প্রয়োজনীয় বলে, অনেক সময় বাড়ির আশপাশেই শাকের বীজ ছড়িয়ে দেন মেয়েরা—

“বাড়ির নামোয় শাক বুনেছি 
মরি যাই, শাক হয়েছে একো ঝাড়খানি,
আমদের টুসু পাটের রানি…”

আরও পড়ুন: শিকড়ের খোঁজে

পাটশাকের গান শোনালেন মুর্শিদাবাদের রাসিনা বেওয়া ও গোলবানু বিবি। ছবি লেখক

আবার কখনও কখনও রীতিমতো চাষও করেন তাঁরা। ফসল ভালো হলে, গর্ব রাখার জায়গা হয় না; তাই গানেই হয় তার ঠাঁই—

“সোনার লাঙল রূপার ফাল 
বথুয়া বাড়িত জুড়িছু হাল..
এমন বথুয়া তুলো রে, গাও হলফল করে।
বথুয়া তুলিয়া বান্দিনু গদা 
কোমিটি দিলা গালার মালা…” (জলপাইগুড়ি) 

ভালো শাক চাষ করার জন্য ‘কৃষিরত্ন’ বা ওই জাতীয় কোনও পুরস্কার ছিল হয়তো, নইলে খামোকা গলায় মালা পরাবার কথা উঠবেই বা কেন! তবে নিজের কাজ ভালো করার একটা তৃপ্তি তো থাকারই কথা; মুর্শিদাবাদেও শুনি—

“সঞ্চি পালংয়ের শাক তুললাম গোছা গোছা রে—

সবারই শাক আসেপাশে, আমার শাকে বাজার বসে.. “

বর্ধমানের শাহানারাদিদি শোনান, শুশুনি শাক তুলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে মেয়েটি। মনের ইচ্ছে ক’দিন মায়ের কাছে বিশ্রাম নিতে যাবে। খবর পাঠালে, দাদা জানান—

“থাকো থাকো থাকো বুন গো মনকে বুঝায়ে
আমকাঁঠাল উঠলে পরে নিয়ে যাব এসে গো”

গ্রীষ্ম যায়, বর্ষা যায় শরৎও যায়; খবর আসে— “আমন ধান উঠলে পরে নিয়ে যাব এসে গো।”

ধান উঠে ফাঁকা মাঠে হু-হু হাওয়ায় দাদার কণ্ঠস্বর যেন মাঠময় ঘুরে বেড়িয়ে আর একবার আমকাঁঠাল, আর একবার আমনধান ওঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েই চলে। শরীর ছেড়ে ব্যথা এখন অনিকেত মেয়েটির মনের গভীরে ঠাঁই নেয়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *