এক সমুদ্রকন্যা ও তার সমুদ্র-সুতো তৈরির গল্প

নবনীতা সেন

এক যে আছে কন্যে, বাড়ি তার সুদূর ইতালি। সেখানে ভূমধ্যসাগরের তীরে ছোট্ট এক দ্বীপে সে থাকে। তার আছে এক বিশেষ গুণ, সমুদ্রের অতলদেশের ঝিনুক থেকে মন্ত্রপূত উপায়ে সে সিল্কের সুতো তৈরি করতে পারে। যা অন্ধকার থেকে আলোতে আনলে সোনার মতো ঝলমল করে। আর তা এতটাই হালকা যে, সেই সুতোয় বোনা দু’টি দস্তানা একটা আখরোটের খোসায় দিব্যি পুরে ফেলা যাবে। রূপকথার মতো শোনালেও বিষয়টি সম্পূর্ণ সত্যি।

আরও পড়ুন: জ্যাঙ্গো, র‍্যাম্বো আর ফুটবল

মানুষের চুলের থেকেও তিনগুণ বেশি সূক্ষ্ম সামুদ্রিক সিল্ক

নাম কিয়ারা ভিগো। ভিগোর পরিবার ইতালির দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে সার্ডিনিয়ার সবচেয়ে পুরনো শহর সান টানন্টিয়েগোতে বিগত হাজার বছর এবং আঠাশটি প্রজন্ম ধরে বিশেষ সিল্কের সুতো তৈরির সঙ্গে যুক্ত। কেবলমাত্র পরিবারের মেয়েরাই পারেন এই গুপ্তবিদ্যার উত্তরাধিকারী হতে। কিয়ারা এখন বিশ্বের একমাত্র এবং অন্তিম সামুদ্রিক সিল্কের সূচীশিল্পী। মাত্র চার বছর বয়সে মাতামহীর কাছে এই শিল্পে তাঁর হাতেখড়ি। বারো বছর বয়সে তিনি হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর শিল্পী। তারপর থেকে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ঘরে বসেই যৎসামান্য সরঞ্জাম এবং হাতের নখ দিয়ে তিনি বুনে চলেছেন একের পর এক বিস্ময়।

আরও পড়ুন: অভিন্ন হৃদয় বন্ধু: অ্যাশ, ব্রক, মিস্টি এবং পোকেমন

নিজের শিল্প নিদর্শন হাতে কিয়ারা ভিগো

সামুদ্রিক সিল্ক বা বাইসেস পাওয়া যায় এক বিশেষ প্রজাতির ঝিনুক থেকে, যার নাম ‘পিন্না নবিলিস’। স্পেন, ইতালি সংলগ্ন ভূমধ্যসাগরে এদের নিবাস। এই ঝিনুকের উচ্চতা তিন ফুট অবধি হতে পারে, বাঁচে বছর পঁচিশ। বিপন্ন প্রজাতির হওয়ায় এই ঝিনুক সংগ্রহ নিষিদ্ধ। কিন্তু কিয়ারার কাছে রয়েছে সমুদ্রের তলায় যাবার ইতালি সরকারের অনুমতিপত্র। তিনি জানান, ১০০ বার সমুদ্র অভিযান করলে মোটে ৩০০ গ্রাম কাঁচামাল সংগ্রহ সম্ভব হয়, যা থেকে মাত্র ৩০ গ্রাম ব্যবহার করা যায় সুতো তৈরিতে।

আরও পড়ুন: যখন বৃষ্টি নামে

সমুদ্রের তলায় ‘পিন্না নবিলিস’ প্রজাতির ঝিনুক

সমুদ্র থেকে ঝিনুক সংগ্রহের পরবর্তী পর্যায়গুলিও অত্যন্ত সময় এবং শ্রমসাধ্য। কিয়ারা সম্পূর্ণ একা হাতেই সামলান পুরো ব্যাপারটা। প্রথমেই লবণাক্ত ভাব কাটানোর জন্য সংগৃহীত ঝিনুক থেকে প্রাপ্ত তন্তুগুলিকে জলে ডুবিয়ে রাখতে হয় পঁচিশ দিন এবং প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর জল বদলাতে হয়। পরে তন্তুগুলি শুকনো করে বিশেষ চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে ফেলা হয় যাতে কোনও লবণের কণা না থাকে। এরপর সবচেয়ে শক্ত কাজ হল প্রতিটা জট পাকিয়ে থাকা তন্তুগুলি যা মানুষের চুলের থেকেও তিনগুণ বেশি সূক্ষ্ম সেগুলিকে আতশকাচ দিয়ে আলাদা করার প্রক্রিয়া। পরবর্তী অংশটি জাদুবিদ্যার থেকে কোনও অংশে কম নয়। কিয়ারা লেবুর রসসমেত পনেরটি মশলা এবং শ্যাওলার গোপন মিশ্রণে তাঁর বোনা সুতো ডুবিয়ে রাখেন। গুপ্ত মন্ত্রোচ্চারণ করে দ্রবণ থেকে যখন সুতো বের করেন, তখন তা বাদামি থেকে স্বর্ণবর্ণ হয়ে উঠেছে। কিয়ারার দাবি, এই মন্ত্রবলেই সুতো সোনার রং পায়। সুতো বোনার সময়ও চলতে থাকে নিরন্তর মন্ত্রোচ্চারণ। শুধু সুতো তৈরি নয়, ফল, ফুল এবং ঝিনুক থেকে ১২৪ ধরনের ভেষজ রং তৈরির গোপন রহস্যও কিয়ারার নখদর্পণে। সেইসঙ্গে তার কাছে রয়েছে বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত ১৪০ ধরনের সুতো বোনার নকশা।

আর পরিশ্রম, কিয়ারা জানান, ৫ সেমি বাই ১২ সেমি সিল্কের আয়তাকার কাপড় বুনতে মোটামুটি সময় লাগে পাঁচ বছর এবং ওজন হয় মাত্র ১ গ্রাম। এই সুতো এতটাই হালকা। একটা জামা বানাতে কিয়ারা নেন কুড়ি বছর। তিনি বলেন, ‘তার কাছে দ্রুততার কোনও মূল্য নেই’।

আরও পড়ুন: ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

সামুদ্রিক সিল্কে বোনা কাপড়, যা সূর্যের আলোয় স্বর্ণালি হয়ে ওঠে

শোনা যায়, কিয়ারাকে এই গুপ্তবিদ্যা শেখাবার জন্য কেউ কেউ কয়েক মিলিয়ান ডলার অবধি দিতে রাজি ছিলেন। কিয়ারা নেননি। তাঁর পারিবারিক শপথ, সুতো তৈরির এই বিদ্যা সে অন্য কাউকে শেখাবে না এবং এই সূচীশিল্প নিয়ে কোনওরকম বাণিজ্যিক বিনিময় করবে না। ‘দ্য মাস্টারস অফ বাইসেস, সিল্ক অ্যান্ড লিনেন’ বইয়ের লেখক মালগোরজাটা বিনিয়েকা তাঁর বইতে জানিয়েছেন, সামুদ্রিক সিল্ক তৈরিতে যুক্ত শিল্পীরা একধরনের সামুদ্রিক শপথে বিশ্বাস করেন যে, এই শিল্প নিয়ে বাণিজ্য করলে তা দুর্ভাগ্যের কারণ হতে পারে। তবে বিক্রি না করলেও কিয়ারার তৈরি পোশাক, কারুশিল্প স্থান পেয়েছে ভ্যাটিকান, লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, প্যারিসের বিশ্ববিখ্যাত লুভ্যরে মিউজিয়ামে। কিয়ারা তাঁর তৈরি এই শিল্প উপহার দেন অনেককেই। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট থেকে ডেনমার্কের রানি। আর উপহার দেন সেই মহিলাদের যাঁরা বিশ্বাস করেন, এই বিশেষ সিল্কে বোনা কাপড়ের অলৌকিক ক্ষমতায় গর্ভধারণ সম্ভব।

আরও পড়ুন: কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমা কেবলমাত্র চলচ্চিত্রের গুণেই ভাস্বর

কিয়ারার তৈরি শিল্পকর্ম

কিয়ারা বলেন, এই সামুদ্রিক সিল্ক সহস্রাব্দ প্রাচীন এবং এই সূচীশিল্পের উৎস ইহুদি। হিব্রু বাইবেলে পরোক্ষভাবে রাজা সলোমনের এক পোশাকের বর্ণনা রয়েছে, যা সূর্যের আলোয় স্বর্ণালি রং হয়ে ওঠে। এছাড়াও বাইবেলেরই ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্টে অনেকবার ‘শাইনিং লিনেন’ শব্দটার উল্লেখ আছে, যা অনেক গবেষক সামুদ্রিক সিল্ক বলে মনে করলেও ২০১৭ সালে ইসরাইলের টিমনা ভ্যালিতে খননকার্যে তিন হাজার বছর পুরনো রাজা সলোমনের সময়কার পোশাকের টুকরো আবিষ্কার হবার পর দেখা গেছে সেইসময় পোশাক তৈরিতে ছাগলের লোম, পশুর চামড়া, গাছের বাকল ব্যবহার হত। সামুদ্রিক ঝিনুক থেকে পাওয়া সুতো নয়। মিশরের পিরামিড বা পেরুর সমাধিক্ষেত্রে মমি বা মৃতদেহের গায়ে যে প্রাচীনতম বোনা কাপড়ের নিদর্শন পাওয়া গেছে তার বেশিরভাগই বুনো ফ্লাক্স গাছ থেকে তৈরি লিনেন বা পশুর পশম থেকে তৈরি।

আরও পড়ুন: ছাঁকনি

Chiara Vigo | Max Paradiso
সুতো বুনছেন কিয়েরা

সামুদ্রিক সিল্কের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় রোমান ঐতিহাসিক প্রকোপিয়াস লেখায় খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে। সমসময়ে মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, রোমের রাজা এবং ধনী ব্যক্তিরা এই সামুদ্রিক সিল্কের তৈরি পোশাক পড়তেন। এই সিল্কের আরবি নাম ‘সুফ-আল বাহার’। নবম শতাব্দীতে আরবে সামুদ্রিক সিল্কের তৈরি একটি পোশাকের দাম ছিল এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা।

অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে এই সিল্কের পোশাক জনপ্রিয় ছিল কিন্তু অত্যন্ত দামি হওয়ায় সহজলভ্য ছিল না। সিনথেটিক সুতো আবিষ্কারের পর এর চাহিদা ক্রমশ নিম্নমুখী হতে থাকে। সেইসঙ্গে সামুদ্রিক দূষণের কারণে এই বিশেষ প্রজাতির ঝিনুকও তেমন পাওয়া যেত না। এইসব কারণে এই সূচীশিল্প বিলুপ্তির মুখে।

৬৬ বছর বয়সি বৃদ্ধা কিয়ারা ২০০ বছরের পুরনো ঘরে বসে একাই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর একনিষ্ঠ শিল্পচর্চা। ইতালি সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন সেখানকার সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ইতালিয়ান রিপাবলিক নাইটহুড’। তবু কিয়ারাকে লড়াই চালিয়েই যেতে হচ্ছে। ২০০৫ সালে সামান্য সরঞ্জামসহ তাঁর বয়ন ঘরটিকে পৃথিবীর একমাত্র সামুদ্রিক সিল্ক বা বাইসেস মিউজিয়াম হিসেবে দর্শকের সামনে খুলে দেন কিয়ারা। কিন্তু প্রবেশমূল্য নিতেন না। দর্শকদের সামান্য দান এবং কয়লাখনিতে একদা কর্মরত স্বামীর পেনশনে তাঁদের সংসার চলত। প্রবেশমূল্য না থাকায় হঠাৎই স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটি থেকে তার মিউজিয়াম বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর দু’জন স্বেচ্ছাসেবক এবং সার্ডিনিয়ার প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে কিয়ারা তাঁর শিল্পকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন সঙ্গে মিউজিয়ামও।

আরও পড়ুন: ইয়াস: এক ত্রাণকর্মীর জবানবন্দি

ঝিনুক হাতে পৃথিবীর সর্বশেষ সামুদ্রিক সিল্ক সূচীশিল্পী

পারিবারিক নিয়মানুসারে কিয়ারা গুপ্ত শিল্পবিদ্যা শিখিয়েছিলেন তাঁর মেয়ে মাড্ডালেনাকে। কিন্তু মেয়ে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগ্রহী নয়। তাতে কিয়ারা দমে যাননি। তিনি জানান, এই শিল্প তিনি তাকেই শেখাবেন যে সারাজীবন এই শিল্পের জন্য উৎসর্গ করতে পারবে। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে এমন লোক কোথায়!

শুধু সামুদ্রিক সিল্ক নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক বয়নশিল্পের অস্তিত্ব সংকটে, যেমন— ঢাকার মসলিন, আফ্রিকার গাছের বাকল থেকে তৈরি সূচীশিল্প ‘কুবো’, পেরুর ইনকা সভ্যতার সময়কার বিশেষ ভেড়ার লোমে তৈরি সুতো ‘অ্যালপাকা ফ্লিস’। আর কয়েক দশক বাদে এই সমস্ত বয়নশিল্পের নিদর্শন কেবল পরবর্তী প্রজন্মের বিস্ময় উদ্রেক করবে।

ভূমধ্যসাগরের নীল জলের সামনে দাঁড়িয়ে দিনে দু’বার সূর্যসাক্ষী রেখে কিয়ারা তার শপথ স্মরণ করেন, এই গোপন বিদ্যা যা ‘সমুদ্রের আত্মাকে ছোঁয়ার মতো পবিত্র’, তা কাউকে দেবেন না। সমুদ্র, সামুদ্রিক প্রাণ বাঁচাতে তিনি দায়বদ্ধ। কিয়ারা সত্যিকারের সমুদ্রের মানসকন্যা। আজকের পৃথিবীতে যেখানে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি, মূল্যবোধ সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে বাজার- অর্থনীতি সেখানে কিয়ারার এই শিল্প শুধু শিল্প নয় মূল্যবোধের কথা বলে। সামুদ্রিক সিল্কের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও কিয়ারার তৈরি শিল্প চিরজীবী হোক তেমন সমুদ্রের গভীরে ‘পিন্না নবিলিস’ ঝিনুকেরা নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকুক।

নবনীতা সেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ, এমফিল। বর্তমান নিবাস আমেরিকা। লেখার বিষয় প্রবন্ধ, গল্প। লেখা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তরের সারাদিন সংবাদপত্র, চার নম্বর প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগাজিনে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *