বারোভুঁইয়ার অন্যতম ভুঁইয়া চাঁদ রায়ের শান্তিপুরের রথের কাহিনি

রাহুল হালদার

তখন অনেক ছোট। বাবার লম্বায় বড়, হাইটে উঁচু সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম কখনও গঙ্গার ঘাটে আবার কখনও মতিগঞ্জ মোড় হয়ে বহু বছরের পুরনো গঙ্গার স্রোতের অভিমুখ বদলে যাওয়ার ফলে যে খালের সৃষ্টি হয়েছে, সেই খালপাড় ধরে নৃসিংহপুর ঘাটের দিকে। মালঞ্চ এলাকা পেরিয়ে দু’দিকে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠান জমি। তারপর মুনসীর পুল। সেখানে লেখা দেখতাম—

“আবার আসিও ফিরে
শ্রীধাম শান্তিপুরে।”

আরও পড়ুন: শ্রীচৈতন্যদেব ও বাংলার জগন্নাথ সংস্কৃতি

ছেলেবেলায় শান্তিপুরের মাহাত্ম্য কতটা জানতাম না অথবা বলা যেতে পারে সে বয়সে এই চিন্তা মনে আসার কথাও নয়। পরে যখন বড় হলাম একটু একটু করে জানতে লাগলাম বৈচিত্র্যময় শান্তিপুরের ইতিহাস। ধর্মীয়, সামাজিক, শিক্ষা, শিল্পকলা, হস্তশিল্প, শাক্ত, বৈষ্ণব, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী ইত্যাদিতে অসংখ্য মানুষের অবদানের কথা। মেতে উঠতে লাগলাম শান্তিপুরেরই নিজস্ব কিছু ঘরানার পুজোর সঙ্গে যে পুজোপালা বাংলায় অসংখ্য স্থানে হলেও এখানে তার কিছু ব্যতিক্রমী লোকাচার দেখা যায়।

এখন যেহেতু রথের সময়, তাই শান্তিপুরের রথযাত্রার দিকে খেয়াল করব। রথযাত্রায় জগন্নাথ, বলভদ্র আর সুভদ্রার পুজো হলেও শান্তিপুরের নামকরা সবক’টি রথে পূজিত তিন দেব-দেবীর সঙ্গে পূজিত হন ভগবান রামচন্দ্র, যিনি স্থানীয় লোকমুখে হলেন রঘুনাথ।

আরও পড়ুন: সূর্যাস্তের দেশে

আষাঢ় মাসের আষাঢ়ের রথযাত্রা শান্তিপুরে ধুমধামের সঙ্গে শহর ও গ্রামে হয়ে থাকে। শহরের রঘুনাথের রথের মাহাত্ম্য যেমন অনেকেরই জানা আছে, তেমনি আরেকটি ইতিহাস আর মিথের কাহিনি নিয়ে শান্তিপুর শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে একদা বর্ধিষ্ণু গঙ্গা তীরবর্তী গ্রাম বাগআঁচড়ায় আয়োজন করা হয় ঐতিহাসিক চরিত্র চাঁদ রায়ের রথের।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১০ম অংশ)

 শান্তিপুরের বাগআঁচড়ার বিখ্যাত পুরুষ চাঁদ রায়, গ্রামের মানুষের মুখে ঘোরে তিনি নাকি নিজ প্রচলন করেছিলেন রথের। প্রাচীন ইতিহাস আর মিথ জড়িয়ে রয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া এমন একটি রথের প্রচলন আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে থেকে নতুন করে সূচনা করেছেন গ্রামের মানুষজনেরা।

বাগআঁচড়াতে চাঁদ রায়ের আগমনের যে কাহিনি এখানকার লোকমুখে প্রচলিত সেটা হল, তৎকালীন বাংলার বিক্রমপুরে কর্ণাট থেকে আগত নিম রায় স্বাধীন জমিদারি স্থাপন করেন। তাঁর বংশের সপ্তম পুরুষ চাঁদ রায় ও কেদার রায়। এদের সঙ্গে সখ্যতা ছিল আরেক ভুঁইয়া ঈশা খাঁর। ঈশা খাঁ যখন একবার চাঁদ রায়দের রাজধানী শ্রীপুরের আতিথ্য গ্রহণ করছিলেন, সেই সময় তিনি চাঁদ রায়ের বিধবা কন্যা সোনামণির অপূর্ব রূপ দেখে মোহিত হয়ে যান এবং তাঁকে লাভ করবার জন্য দৃঢ়সংকল্প করেন। এই সম্পর্কে চাঁদ রায়ের আপত্তি থাকবে এটা জেনে যখন ঈশা সোনামণিকে তুলে নিয়ে যান, তখন চাঁদ রায় মনে অনুশোচনা হয় যে ভুঁইয়ারা যখন সবাই মিলে স্বাধীন জমিদারি চালাচ্ছিল মিলেমিশে তখন যদি নিজেদের মধ্যেই এত অমিল ও বিশ্বাসঘাতকতা থাকে তাহলে কীসের মোহে এই জোটবদ্ধ হওয়া। তাঁর এই অনুশোচনা যখন ঘৃণায় রূপান্তরিত হয় তখন তিনি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন।

নদীপথে আসতে আসতে প্রকৃতির নিবিড় কোলে প্রায় জনসাধারণ শূন্য বাগআঁচড়ার এই স্থান তাঁর পছন্দ হয়ে গেলে তিনি এখানেই বসতি স্থাপন করেন। তাঁর বসবাস করবার জায়গাটির নাম তাঁর নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে হয় চাঁদরা। চাঁদ রায় ছিলেন শিব ভক্ত, তাই তিনি শিব মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুধু শিব মন্দিরই নয়, এরপর তিনি জগন্নাথদেবের আরাধনাও করতেন। সেই উপলক্ষে চাঁদ রায় জগন্নাথদেবের জন্য রথ আর সেই রথকে গঙ্গা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্মাণ করেছিলেন জাঙ্গাল। সেই জাঙ্গালের চিহ্ন আজও কিছু কিছু আছে। (যদিও ইতিহাসবিদরা কেউ কেউ চাঁদ রায়কে যেমন বারোভুঁইয়ার এক ভুঁইয়া বলেছেন আবার কেউ কেউ বলেছেন তিনি ছিলেন রুদ্র রায়ের দেওয়ান। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গলে’ কবি চাঁদ রায়ের বর্ণনায় বলেছেন ‘প্রিয় জ্ঞাতি জগন্নাথ রায় চাঁদ রায়’)।

এরপর ১৯৮৬ সালে চাঁদ রায় প্রতিষ্ঠিত রথকে নতুন করে দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী সমেত বাগআঁচড়ার আরও কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষেরা নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রথমে দশ বছর লোহার চাকা সমেত বাঁশের রথ ছিল। তারপর যেহেতু বাগআঁচড়ার বাজারে রথ উপলক্ষে বড় মেলা সহ মানুষের উন্মাদনা বাড়তে লাগল তখন তারা বাজার কমিটিকে রথের দায়িত্ব নিতে বলায় বাজার কমিটির পক্ষ থেকে পরবর্তীকালে রথটি লোহার নির্মিত হয়। নতুন করে চাঁদ রায়ের রথের যেদিন সূচনা হয় সেই দিন রথটি উদ্বোধন করেন মহাপ্রভু বাড়ির গোবিন্দ গোপাল গোস্বামী মহাশয়, হিজুলি কৃষ্ণকুঠির আশ্রমের শাশ্বতদাস কাঠিয়াবাবা এবং পান্থপাড়া আশ্রমের পরমানন্দ ব্রহ্মচারী মহাশয়।

বাগআঁচড়ার রথে স্নানযাত্রা হবার পর শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা পালিত হয়। সেদিন রথ টেনে নিয়ে গিয়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছে জগদীশ ঘোষের বাড়ির মন্দিরে সাতদিন থাকে এরপর উল্টোরথে দারুময় জগন্নাথ বলরাম এবং সুভদ্রার মূর্তি রথযাত্রা সমাপ্ত হলে দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী গৃহমন্দিরে সারাবছর নিত্যসেবা পান।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *