ফুটবল পরিসরে উপেক্ষিত দুই ইতালীয় ‘তরুণে’র গল্প

অংশুমান ভট্টাচার্য

তুরিন। ইতালির প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের শহরটি বর্তমানে পিডেমন্ট অঞ্চলের রাজধানী। মধ্যযুগের ইতালির প্রথম রাজধানী, রেনেসাঁ বা নবজাগরণের উদ্ভবের অন্যতম আঁতুড়ঘর এই তুরিন। এই শহরের প্রতিটা অলিতে-গলিতে  মিশে আছে ইতিহাসের গন্ধ। প্রাচীন শিল্প, নিও ক্লাসিকান স্থাপত্যের নিদর্শন আজও গাঁথা রয়েছে এই শহরের ইমারতগুলোয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তুরিন নিজের ঐতিহ্যকে ভুলে যায়নি, নতুনের সঙ্গে পুরাতনের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

আরও পড়ুন: মাদেইরার আগুন, রোজারিওর বৃষ্টি

জুভেন্তাস। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের নিয়মিত খোঁজখবর যাঁরা রাখেন, তাঁদের কাছে অতিপরিচিত এক নাম। ল্যাটিন ভাষায় ‘জুভেন্তাস’ শব্দের অর্থ যৌবন, অথচ ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি ইতালির তৃতীয় প্রাচীনতম ক্লাব। যেই ক্লাবের নামের অর্থই যৌবন, তারাই আজ ‘ওল্ড লেডি’ নামে পরিচিত ফুটবলমহলে। কাকতালীয়? হয়তো, বা হয়তো যৌবন আর ‘ওল্ড’-এর এই সংমিশ্রণে তুরিনের এই ক্লাব নিজেদের শহরের এই ঐতিহ্যই ধরে রেখেছে।

এই জুভেন্তাসেই খেলতে এসেছিল দুই তরুণ। প্রথমজন যখন এসেছিল জুভেন্তাসের অবস্থা তখন খুবই খারাপ, প্রথম ডিভিশন থেকে সদ্য দ্বিতীয় ডিভিশনে অবনমিত হয়েছে ঐতিহ্যশালী ক্লাব। পরের মরশুমেই অবশ্য প্রথম ডিভিশনে প্রত্যাবর্তন জুভের, কিন্তু তিনবারের ইউরোপ সেরারা তখন লিগেও চ্যাম্পিয়নের দৌড়ে নেই। কাকা-মালদিনিরা তখন মিলানকে ইউরোপ সেরা করছেন। দ্বিতীয়জন যখন এলেন সেই বছর আবার ইন্টারকে ত্রিমুকুট জেতাচ্ছেন ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’। ২০১০ থেকে একসঙ্গে পথ চলা শুরু সেই দুই তরুণের।

এর পর  কেটে গেছে কতগুলো বছর। টানা ন’বার লিগ জিতেছে তুরিনের ক্লাব। ইউরোপ সেরার দৌড়ে দু’বার শেষ ল্যাপে গিয়ে হেরে যেতে হয়েছে দুই স্প্যানিশ দৈত্যের কাছে। সব কিছুর সাক্ষী থেকেছেন এই দু’জন। লিগ জয়ে যেমন একসঙ্গে উৎসব করেছেন, তেমনি মিউনিখে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণার পর একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়েছেন। মাঝে একজন অবশ্য মিলানে পাড়ি দিয়েছিলেন, কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারেননি, পরের বছরই ফিরে এসেছিলেন বন্ধুর কাছে।

আরও পড়ুন: লেন্সের ভিতর থেকে বিশ্বজয় দর্শন: স্মৃতির সফরে শ্রেণিক শেঠ

ফুটবল মাঠে কত জুটি, কত বন্ধুত্বের গল্প নিয়ে কতকিছু লেখা হয়। জাভি-ইনিয়েস্তা, মেসি-সুয়ারেজ, রোনাল্ডো-মার্সেলো এমন কত-শত উদাহরণ। ডিফেন্ডাররা বরাবরই একটু উপেক্ষিত হন বটে, কিন্তু এই ইতালীয় মালদিনি-নেস্টাকে নিয়েও লেখালেখি হয়েছে, এমনকী স্পেনের হয়ে পিকে-রামোসের জুটি নিয়েও নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়েছে। কিন্তু এই দু’জনকে নিয়ে? নৈব নৈব চ! আর হবেই বা কেন, ক্লাবকে ইউরোপ সেরা করতে পারেননি কোনও দিন। দেশের হয়ে দু’জনেই একশোর বেশি ম্যাচ খেলেছেন, কিন্তু সাফল্য কই? একবার বিশ্বকাপে গ্রুপ স্টেজ থেকেই ছিটকে গেছে দল, আর একবার বিশ্বকাপে পৌঁছতেই পারেনি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

গতবছর কোভিডের প্রথম ঢেউয়ে বিধ্বস্ত ইতালি ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরেছে আজ। আড়াই বছর আগে দায়িত্ব নিয়ে ফুটবল মাঠেও ইতালিকে ছন্দে ফেরাচ্ছেন রবার্তো মানসিনি। এ যেন এক নবরূপের ইতালি, রক্ষণাত্মক ফুটবলের জন্য বিখ্যাত কানাভারো-মালদিনিদের দেশ আজ গতিময়, আক্রমণাত্মক ফুটবলের ঝড় তুলছে, যেই ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে প্রতিপক্ষ। ইউরো শুরুর আগে যেই ইতালিকে ধর্তব্যের মধ্যে আনছিলেন না বিশেষজ্ঞরা, গ্রুপ পর্বের পর তারাই টুর্নামেন্টের অন্যতম ডার্ক হর্স। পরিসংখ্যান বলছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর টানা তিরিশটা ম্যাচ অপরাজিত মানসিনি, যার মধ্যে পঁচিশটাতেই জয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আক্রমণাত্মক খোলসে মানসিনি দলকে সাজালেও টানা ১০০০ মিনিট একটাও গোল খায়নি ইতালি। আর এরজন্য মানসিনি ধন্যবাদ দিতেই পারেন তাঁর দলের দুই ‘বৃদ্ধ’কে। তারুণ্যে ভরপুর এই দলের সবথেকে অভিজ্ঞ দু’জন— দুই ‘চিরতরুণ’, সেই দু’জন বন্ধু, আজও যাঁরা খেলে চলেছেন একে অপরের পাশে। একজন চোট পেয়ে বেরিয়ে গেলে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড তুলে নিচ্ছেন, আর একজন পুরো দলকে আক্রমণে যাওয়ার ভরসা জোগাচ্ছন, রক্ষণে।

আরও পড়ুন: অন্য ২৫ জুনের গল্প: নব্বুইয়ে পা ভারতীয় ক্রিকেটের এক গৌরবোজ্জ্বল দিনের

ইতালি কাল নামছে শেষ ষোলোর ম্যাচে। হেরে গেলে কালই হয়তো জাতীয় দলের হয়ে চিয়েলিনি-বোনুচ্চির একসঙ্গে শেষ ম্যাচ হবে। ইতালি টুর্নামেন্টে কতদূর যাবে সময় বলবে, সবথেকে বেশি সময় গোল না খেয়ে থাকার রেকর্ড মানসিনির দল ভাঙতে পারবে কিনা সেটাও সময় বলবে, চিয়েলিনি-বোনুচ্চিকে ইতিহাস মনে রাখবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত। তাঁরা হয়তো মালদিনি বা ক্যানাভারো নন, কিন্তু ইতালীয় রক্ষণের যে গৌরব, নিজেদের সবটুকু দিয়ে তা বজায় রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন আজীবন। কতটা পেরেছেন তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু তাঁদের চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কোনও দিন। এটাই হয়তো দুই বন্ধুর সবচেয়ে বড় সাফল্য।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *