মন্দির বানিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় রেল, দেড়শতাধিক বছর ধরে সেখানেই আরাধ্য দুর্গাপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গা

দীপান্বিতা হাজরা

চোখ মেললেই দেখতে পাচ্ছি নদীর ধারে কাশের মেলা, নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ আর ভোরের শিশির মাখা  শিউলি। এত দিনের অপেক্ষা শেষ। শুরু হয়েছে মাতৃ আরাধনা কাল, আনন্দ আর খুশি। এই সময়টা নাকি দেবতাদের নিদ্রাকাল। তাই দেবীকে জাগ্রত করার রীতি প্রচলিত। স্বয়ং রামচন্দ্র রাবণবধের উদ্দেশ্যে দেবীকে অকালে উদ্বোধিত করেছিলেন বলে এই পুজো অকালবোধন নামে পরিচিত। এখনও তাই মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন বা নিদ্রাভঙ্গের আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। অনেকে এই নিদ্রাভঙ্গকে নিজের ঘুমন্ত সত্তার জাগরণ বলে ব্যাখা করেন— “উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত।”

আরও পড়ুন: নারায়ণপুরের সরকার বাড়ির দুর্গার চালচিত্রে আঁকা থাকে গ্রামের বিদ্যালয়ের ছবি

আজ বলব, দুর্গাপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবারের পুজোর গল্প। দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ আমলে রেলদপ্তর তাদের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার রায় রামগতি রায়বাহাদুরের দুর্গা মন্দির নির্মাণ করে দেয়। পরিবার সূত্রে বলা হয়, ছয় মাস সময় দিলেও তিন মাসের মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করে রেল চালিয়ে দেখিয়েছিলেন রামগতি। তাই ব্রিটিশ রেলকর্তারা তাঁর পরিবারের মন্দির নির্মাণের দায়িত্ব নিয়ে নেন। রামগতি মুখোপাধ্যায় ব্রিটিশ সরকারের কাছে রায় বাহাদুর উপাধি পেয়েছিলেন।

পুজোর গল্প জানতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে হাঁটতে হবে বৈকি। রামগতি মুখোপাধ্যায়ের বাবা ছিলেন উত্তর চব্বিশ পরগনার আড়িয়াদহের বাসিন্দা। খুব অল্প বয়সে পিতৃহারা হন রামগতি। বোন আর একমাত্র ছেলেকে কুলডিহাতে নিয়ে আসেন মামা। চরম অভাবের মধ্যেও লেখাপড়া চালিয়ে যান রামগতিবাবু। অবশেষে উনি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি পান এবং রেলদপ্তরে ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি পান।

মুখোপাধ্যায় পরিবারে দেবী দুর্গার প্রতিষ্ঠা নিয়ে এক কাহিনি আছে। রামগতি তখন বেকার। রামগতিবাবুর মা কুলডিহার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের অষ্টমীর ভোগ রান্না করেছিলেন। সবাই বলেন, দেবী নিজে সেই ভোগ খান। ভোগের মধ্যে পাঁচ আঙুলের দাগ ছিল। এই দেখে প্রথমে কুলডিহার চট্টোপাধ্যায় পরিবার রামগতিবাবুর মাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন ভোগ চুরি করে খাওয়ার অপরাধে। অষ্টমীর রাতেই দেবী স্বপ্নাদেশ দেন রামগতিবাবুর পরিবারের পুজো নেওয়ার। নবমীর দিন থেকে রামগতিবাবুর পরিবারে ঘট পুজোর মাধ্যমে আরাধনা শুরু হয়। এইভাবে চলতে থাকে প্রায় ১৪ বছর। এরপর ভারতীয় রেল থেকে মন্দির নির্মাণ করে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: চুঁচুড়ার দত্ত-বোস-মল্লিক-বড় শীল বাড়ির দুর্গোৎসব আজও টিকিয়ে রেখেছে পরম্পরাকে

মুখোপাধ্যায় পরিবারের রীতিনীতি এবং দেবীর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। সপ্তমীর দিন কালো ছাগল বলি দেওয়া হয় এবং অষ্টমীর দিন সাদা ছাগল বলি দেওয়া হয়। নবমীর দিন হয় নরনারায়ণ সেবা। আর মহাভোগে ২৪ কেজি দুধে পাঁচ পোয়া চালের পরমান্ন ভোগ করা হয়। ষষ্ঠী থেকে একাদশীর দিন পর্যন্ত একসঙ্গে সমস্ত শরিক খাওয়াদাওয়া করেন। নবমীর দিন প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো কুলচণ্ডী তলায় দু’টি ছাগল বলি দেওয়া হয়। একাদশীর দিন মহাধুমধামে বিসর্জন দেওয়া হয়। বাজি, আলো, বাজনা আর পরিবারের মেয়েদের চোখের জলে অপেক্ষা থাকে আগামী বছরের।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *