জয়ী

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

অনোমেটোপিয়া…

পিএসবি স্যারের গমগমে আওয়াজে সারা ক্লাস জুড়ে এক আবেশী মহল। ছাত্রছাত্রীরাও মোহিত। এই একটা ক্লাসের প্রতি সকলের টান অবিরাম। কিন্তু সুহৃদের মন আজ কফিহাউস-পানে। অনাদিদা, তরুণ, অরুণিমা, দেবারতি, গোপাল, শুভ, লোপা… সকলে ওর জন্যই অপেক্ষায় নিশ্চিত। আজ কফিহাউসে এক নামি দূরদর্শন চ্যানেলের জমজমাট বিতর্কসভা: আধুনিকতা বর্তমানের এক ক্ষয়‌ রোগ। পক্ষে প্রেসিডেন্সির সুহৃদ আর লোপা, স্কটিশ চার্চের অরুণিমা ও শুভ এবং আশুতোষ কলেজের দেবারতি ও গোপাল। বিপক্ষে কলকাতার তিন নামি কলেজের ছ’জন।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: গৌরচন্দ্রিকা

আগে ওরা সকলে কয়েক বার বসেছে বিষয়টা নিয়ে। সুহৃদের মেধা ও শাণিত যুক্তি বাকিদের চূড়ান্ত আশাবাদী করেছে। ও এটা বোঝে। বিষয়টা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয় ও। চিন্তা শুধু বুড়ো বাবাকে বাঁচানো নিয়ে। হঠাৎ কনুইয়ের গুঁতো। কানে সঞ্চিতার ফিসফিস— ‘‘ক্লাসে মন না দিয়ে স্যারকেও অমনোযোগী করে তুলছিস। কড়া চোখে দেখেছে কয়েক বার….”। সুহৃদ বুঝতে পারছে, কিন্তু মন আজ বড় বেয়াড়া! ক্লাসের সেরা ছাত্রের অমনোযোগী হওয়া স্যারকে ভাবাচ্ছে। ওকে বাংলা বিভাগ তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী তারা হিসেবে সকলে ভেবে ফেলেছে। পিএসবি স্যারের প্রিয় ছাত্র ও। স্যারের ছেলে বলে মজাও ওকে সহ্য করতে হয় মাঝেমাঝে। 

এদিকে স্যার বলে চলেছেন— অনোমেটোপিয়ার উদাহরণ হিসেবে তোমরা ‘ঝনঝন’ ‘টনটন’ ‘খানখান’ শব্দগুলো ভাবতে পারো। শব্দগুলো এমন যা উচ্চারণেই তার অনুষঙ্গ আসে। যেমন— ঝনঝন শব্দটি উচ্চারিত হলেই কাঁসার বাসন পরার অনুষঙ্গ আসে। তেমনি টনটন শব্দের উচ্চারণে আসে শারীরিক কষ্টের অনুষঙ্গ। 

বেশ মজা পাচ্ছে সুহৃদ। স্যারের শব্দচয়ন ও উদাহরণ সহযোগে ব্যাখ্যা বিষয়কে এমন প্রাঞ্জল করে দেয় যে, ভোলা কঠিন! হঠাৎ ওর দিকে তাকিয়ে স্যারের প্রশ্নবাণ— ‘‘এই যে ভালো ছেলে, বাংলা কবিতায় এরকম উদাহরণ দিতে পারো?” স্যারের খোঁচাটা বুঝল ও। সঙ্গে কারণটাও। 

বিষয়টা ও আগেই পড়েছে কলেজের বাইরে ফুটপাথের দোকান থেকে কেনা একটা বইয়ে। হাসিমুখে স্যারের চোখে চোখ রেখে বলে উঠল— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার একটা লাইন মনে পড়ছে ‘‘দরদর বেগে জলে পড়ি জল ছলছল উঠে বাজিরে… ‘‘বেগে, জল এবং পড়া শব্দ তিনটির অনুষঙ্গ সমগ্র লাইনটিকে অর্থবহ করেছে। 

আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ

শিকার ফসকে যাওয়ার হতাশা স্যারের সারা চোখেমুখে। সারা ক্লাসের বিস্ময় ভরা চোখে কোথায় যেন গর্বের ঝিলিক। যাক্ বাবা, এ যাত্রায় বাঁচা গেল। নাহলে আরো কত কী যে আজ শুনতে হত! ক্লাস শেষের পরে সকলকে নিয়ে ছুটল কফি হাউজের দিকে। সিঁড়িতে অনাদিদার সঙ্গে দেখা। আজ ফুটপাতে ওনার স্ত্রীর হাতে তৈরি গয়নার বড়ি বিক্রি বন্ধ রেখে সুহৃদের লড়াইয়ের সাক্ষী হতে এসেছে। ওর বারণ শোনেনি। সুহৃদই যে ওর জীবনের লড়াইয়ের শিক্ষক। 

কফি হাউসের দোতলায় বামদিকে ওদের বসার আয়োজন। দর্শক ডানদিকে। ও তাকিয়ে দেখল তিনতলার ব্যালকনিতেও ভিড়। বেশ সম্মানের লড়াই হবে, ও বুঝতে পারল।  চোখ বুজে জোরে শ্বাস নিল। মনকে শান্ত করার এ পদ্ধতি সাধুবাবার কাছ থেকে শেখা। আত্মনিয়ন্ত্রণ! মনকে ও বলতে লাগল, এ প্ল্যাটফর্ম ওর। বুড়ো বাবাকে বাঁচানোর এই সুযোগ ও ব্যবহার করবেই। পারতেই হবে ওকে। সকলের আগ্রহ ও টেনে নিয়ে যাবে ওর গ্রাম আমোদপুরের শ্মশানের পাশে আশি বছরের বুড়ো বট গাছটার দিকে। রাস্তা সম্প্রসারণের নামে ওই গাছকাটার নির্দেশিকাকে আজ সকলের সামনে বিশেষত মিডিয়ার সামনে তুলে ধরতে হবে। যেকোনওভাবেই হোক আধুনিকতার অভিশাপের কথা বলতে গিয়ে প্রকৃতি, অরণ্য, সবুজের অভিযান ও জুড়ে দিতে হবে। সেভাবেই ভেবে রেখেছে গত কয়েক দিন ধরে। সঞ্চিতা এক ফাঁকে বলেছে, ধুম মচালে। ও আজ ধুমই মচাবে!

সঞ্চালক এক নামি সংবাদপত্রের সম্পাদক। বিচারকের আসনে তিনজন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সুহাস ব্যানার্জি, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. তনয়া পাত্র এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অর্কপ্রভ সেন। অর্কপ্রভ সেনের সঙ্গে আগেই আলাপ ওর। কলেজের ম্যাগাজিনে ওর লেখা ‘নদীর আত্মকথা’ পড়ে খুব প্রশংসা করেছিলেন কলেজের সমাবর্তনে এসে। ওনার দিকে তাকাতেই এক মুচকি হাসি জানিয়ে দিল ওকে ভোলেননি। 

যুদ্ধের কৌশল আর একবার ঠিক করে দিল ও সকলকে। সঞ্চালকের শুরুর বক্তব্য বিতর্ক সভার সুর বেঁধে দিল। নিঃশব্দ কফিহাউস। এত নিস্তব্ধতা কবে দেখেছে ভেবে পেল না ও। টসে ওদের বক্তব্য প্রথম। শুরু করল অরুণিমা সুহৃদের বেঁধে দেওয়া গতে। বিপক্ষকে ফাঁদে ফেলতে হবে। আধুনিকতাকে যেন খুব বড় করে দেখাতে যায় ওরা।  তারপরই পেরেক পুঁততে শুরু করবে সুহৃদ। ফিনিক্স পাখির নীতি থেকে আজ অগ্নি ডানা খুঁজবে ও।

আরও পড়ুন: আঁকা-লেখা

পক্ষে-বিপক্ষে লড়াই বেশ জমে উঠেছে। আধুনিকতা অসাম্যের ফাঁকটাকে বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলছে এবং গরিষ্ঠ সমাজের বুকের ওপর হাতে গোনা কিছু মানুষকে শোষণের তাজমহল বানাতে সাহায্য করছে—অরুণিমার বক্তব্য তাতিয়ে তুলল সঙ্গীদের। ওদের রাকেশ বলে ছেলেটি লড়াই চালাল। শুভ তুলে ধরল অর্থনীতির কথা— দু’মুঠো ভাতের লোভে দিনে দিনে ‘রুরাল আরবান মাইগ্রেশন’ মোট উৎপাদনের বোঝা বাড়িয়ে চলেছে, স্বল্প আয়ের ফাঁদে মানুষ আটকে পড়ে নাভিশ্বাস তুলছে। বিরোধী বক্তব্য বেশ বেসুরো লাগল।  সুহৃদ বুঝল শিকার ফাঁদে পড়ছে আস্তে আস্তে।

দেবারতি তুলে ধরল চিকিৎসাব্যবস্থার কথা। চিকিৎসাব্যবস্থা আজকাল বড় দামি হয়ে উঠেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার মুষ্টিমেয় মানুষের সুবিধা বাড়িয়ে দিয়েছে ইত্যাদি। গোপাল বলে উঠল— সুকুমার অনুভূতি মৃতপ্রায়, আত্মকেন্দ্রিকতা সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে চলেছে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ। গোপালের বক্তব্যে হাততালির রেশ থাকল অনেকক্ষণ। 

ওদের মধুপর্ণা বলে মেয়েটি অসম্ভব স্মার্ট ও বুদ্ধিমতী। মাঝেমাঝে ভারী ভারী ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে ধন্দে ফেলতে চাইছে। সুহৃদ বুঝল আর নয়। খাপখোলা তলোয়ারের মতো চকচক করে উঠল ওর চোখ। শুরু করল স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে— আধুনিকতার আত্মজা যে নগরায়ণ তার চাপে প্রকৃতি আজ নিদারুণ সংকটে, দিনে দিনে শিশুর সংখ্যা বাড়ছে আর উল্টোদিকে গাছের সংখ্যা কমছে, আধুনিকতার লালিত পালিত দূষণ আজ সভ্যতাকেই সংকটে ফেলে দিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিকতার লোলুপ চাউনি আশি বছরের জটাধারী ঊর্ধ্ববাহু বৃদ্ধ বটগাছকেও ছাড়ছে না।

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

মধুপর্ণা লড়াইয়ের চেষ্টায়। কিন্তু সুহৃদের একের পর এক প্রশ্নবাণে যেন অসহায় হয়ে পড়ছে বারেবারে।  এ সুহৃদকে যেন আগে কেউ দেখেনি। এত আগুন বুকে! একসময় মধুপর্ণা মাথায় হাত চাপা দিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। ফলাফল যেন জেনে গেল সকলে। সকলকে অবাক করে সুহৃদ উঠে দাঁড়াল। ভেজা গলায় বলে উঠল, আধুনিকতা যদি এই সুন্দরকে নিয়ে আসে তাহলে বলতে হবে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘‘সুন্দরের হাত দুটো বেঁধে দাও, সময় হয়েছে”। অবাক বিস্ময়ে কফিহাউস। সত্যিই এক তারার উদয় দেখল সকলে। কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপর হাততালির বন্যা কফি হাউসের মেঝে, দেওয়াল, ছাদ সর্বত্র ভাসিয়ে দিচ্ছে যেন। সকলেই ছুঁতে চায় সুহৃদকে— বন্ধুদের প্রিয় ‘হৃদেকে’। ওর হাতে ধরা এখন বুড়ো বাবাকে বাঁচানোর আবেদন নিয়ে পোস্টার। বন্ধুদের সকলের হাতেও তাই। সকলেই যে ব্যাকুল বুড়ো বাবাকে নিয়ে।

সুহৃদ মুখ নীচু করে বসে। টেবিলে টপটপ করে ঝরে পড়ছে মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু। বাবার যন্ত্রণা, সাধুবাবার কষ্ট, বুড়ো বাবার মৃত্যু ভয়— সব ওর ভিতরে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ভেঙে গেছে সব সংযমের বাঁধ।

আর একটা মুখ মনে পড়ছে আজ। ওই মুখ মনে পড়লেই সারাশরীর জুড়ে ঘৃণার আগুন তখন। ভুলতে চায়, কিন্তু পারে কই!

মুখটা ওর মায়ের। ওর সাতবছর যখন বয়স, তখন নিজের পিসতুতো দাদা বুবাইয়ের সঙ্গে পালিয়ে যায় ওদের ফেলে। সেই থেকে ওর বাবাই এক শরীরে মা ও বাবা। পরম স্নেহে মানুষ করে তুলেছে ওকে। আজ অনেকটা বড় হয়ে উঠে বাবা আর ও একে অপরের পরিপূরক যেন। ওদের কাছে ওই মহিলা এখন অতীত। তবুও কেন যে আজ…!

আরও পড়ুন: ২৬ মে, ১৯২৮: ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে একটি না ভোলা দিন

হঠাৎ বন্ধুদের ধাক্কা। ওর বন্ধুরা ওকে ঘিরে ধরে আনন্দ করছে। শুভর কানফাটানো সিটির আওয়াজে সকলের মুখে হাসি। হাতের উল্টোদিকে চোখের জল মুছে ওঠে দাঁড়াল ও। ক্যামেরার ঝলকানি ওর দিকে। বন্ধুদের হাতে থাকা বুড়ো বাবাকে বাঁচানোর পোস্টারগুলো একে একে ক্যামেরার লেন্সে। হঠাৎ সামনে অনাদিদাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল ও। হতবাক সকলে। গাছ বাঁচানোর জন্য এক যুবকের পবিত্র কান্না সকলকে ছুঁয়ে গেল যেন। চোখের কোণ কি ভিজে উঠল সকলের? আধুনিক সমাজ দেখল বুড়ো বটগাছকে বাঁচাতে এক বিজয়ীর কী করুণ কান্না! ধন্য ধন্য হৃদে! ওর কান্নার আসল কারণ কেউ জানল না!

আমোদপুর গ্রামের শেষে যে জাতীয় সড়ক গেছে হলদিয়ার দিকে তার একটু দূরেই ড্যাং ড্যাং করে দাঁড়িয়ে সুহৃদের বুড়ো বাবা— আশি বছরের এক বৃদ্ধ বট। জটাজুটোধারী। ছেলে বেলায় ওই ঝুরিগুলোকে ওরা বলত দাড়ি। সেই থেকেই এই বৃদ্ধ বট ওর কাছে বুড়ো বাবা, ওর আর এক পালক। ওর বাড়ি যেন এখানেই। একটু দূরেই শ্মশান। সেখানে থাকে এক সাধুবাবা। ওর আর এক অভিভাবক। মায়ের স্নেহ বঞ্চিত সুহৃদকে এই দু’জন যেন পরম মমতায় অশেষ ভালোবাসায় বড় করেছে।

ওর বাবা ছ’মাইল দূরের অফিস ফরাসডাঙগার হাসপাতাল ও রোগী নিয়েই ব্যস্ত। ও বোঝে বাবার কষ্ট। অধিকাংশ দিন মুমূর্ষু রোগী নিয়ে কলকাতার হাসপাতালে ছোটে। শুকিয়ে যাওয়া শরীরে রক্ত দিয়ে রোগী বাঁচাতেও পিছপা হয়না। প্রথম দিকে বাবার বন্ধুরা বোঝানোর চেষ্টা করত। কিন্তু পরে বুঝতে পারে বাবার ওই কাজেই শান্তি। সুহৃদ ও কিছু বলে না। বাবা ফিরলে ফোন করে। তখন ও শ্মশান থেকে বাড়ি যায়। অধিকাংশ রাতেই ও সাধুবাবার কাছেই থাকে। ওর সঙ্গ ভালো লাগে সুহৃদের। সাধুবাবার কাছ থেকে কত কিছু শিখেছে ও। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ছিল সাধুবাবা। নামি কোম্পানিতে কাজ করত। কিন্তু কেন যেসব ছেড়ে-ছুড়ে এই শ্মশানে তা বলেনি কোনওদিন। সুহৃদ ও জানতে চায়নি। হয়তো সেখানেও কোনও বিশ্বাসঘাতকতার ছবি!

কফি হাউসের সেদিনকার ঘটনা সকলের জানা। বাবা সাধুবাবাও জেনেছে। গত তিনদিন সাধুবাবার কাছেই কাটল ওর। সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরচর্চা করত ওরা। আধঘণ্টা ধ্যানে বসত দু’জনে। সাধুবাবা মনকে নিয়ন্ত্রণের উপায় শিখিয়েছে ওকে। তারপর মুড়ি ছোলা খেয়ে সাধুবাবা গ্রামে গ্রামে ভিক্ষায় বেড়িয়ে যেত। ও সেসময় একাই থাকত বুড়ো বাবার ছায়ায়। দুপুরে সাধুবাবা ফিরলে চালে ডালে সিদ্ধ খেতো। আধুনিকতা থেকে অনেক দূরে ছিল সুহৃদের এই শ্মশান-যাপন।

অন্যান্য দিনের মতো আজও সাধুবাবা ভিক্ষায় গেছে। বুড়ো বাবার সঙ্গে এখন ও একা। দূরে জাতীয় সড়কে ছুটে চলা গাড়িগুলোর দিকে একমনে তাকিয়ে। কোথায় ছুটছে সব? নিজের গন্তব্যে? বাড়িতে? ভালোবাসার মানুষের কাছে? একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো যেন নিজের অজান্তেই। হঠাৎ এক চিৎকারে চোখ ঘোরালো। দেখল ধুলো উড়িয়ে একটা কালো গাড়ি ছুটে আসছে ওর দিকে। গ্রামের বেশ কিছু ছেলে পিছনে দৌড়চ্ছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল সেই দিকে। গাড়িটা সামনে দাঁড়াতেই চমক। গাড়ি থেকে একে একে নেমে এলো সঞ্চিতা, দেবারতি, লোপা, শুভ, গোপাল, অনাদিদা ও সবশেষে সেদিনের সেই সঞ্চালক সংবাদপত্রের সম্পাদকমশাই। বন্ধুদের দেখে সুখঝরা অনুভূতি তখন। সকলে হইচই করে যা জানাল, তাতে একরাশ বিস্ময় ওর।

দেবারতির বাবা সরকারের এক বড় আমলা, জানতো সুহৃদ। দেবারতিরা কফি হাউসের ঘটনার পরদিন সকলে মিলে ওর বাবাকে গিয়ে ধরে। কিছু একটা করতেই হবে। ঘটনাটা টিভির সৌজন্যে তখন সকলের মুখে মুখে। ওর বাবাও আগ্রহী হন। বিশেষত সুহৃদের জন্য। বিতর্ক সভায় সুহৃদের অকাট্য যুক্তি ও বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপন ওর প্রতি সকলের একটা আবেগ তৈরি করেছে। বিশেষভাবে অনাদিদাকে জড়িয়ে ধরে ওর কান্না। সারারাজ্য দেখেছে এক যুবক এক বুড়ো বটগাছকে বাঁচানোর জন্য কী আকুলভাবে নিরুপায় হয়ে কেঁদে চলেছে।

আরও পড়ুন: ‘এ তুফান ভারী দিতে হবে পাড়ি’, জন্মদিনে ঝোড়ো কবি নজরুল

প্রশাসক মহলে আলোড়ন যথারীতি। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর নিজ উদ্যোগে খোঁজ নিয়েছে। দেবারতির বাবাও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অনুরোধ করেছেন, যাতে গাছ বাঁচিয়ে কাজ হয়। কাল মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, রাস্তা একটু ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। বটগাছ কোনওভাবেই কাটা যাবে না। ইউরেকা! ইউরেকা! যুদ্ধজয়ের খু্শি সকলের চোখে মুখে বুড়ো বাবাকে জড়িয়ে ধরে। সংবাদপত্রের সম্পাদক বিতর্ক সভার বিজয়ীর পুরস্কারমূল্য পঞ্চাশ হাজার টাকা ও স্মারক সুহৃদের হাতে তুলে দিতে এসেছেন। সঙ্গে এনেছেন ক্যামেরাম্যানকেও। মজা করে ওকে তৈরি থাকতে বললেন। মিডিয়ার লোক এলো বলে ওর ও বুড়ো বাবার ছবি নিতে।

পুরস্কারের টাকার ভাগ বন্ধুরা কেউ নিতে রাজি হয়নি। প্রায় দু’মাইল দূরে পাশের গ্রামে স্কুলে যেতে বাচ্চাগুলোর অসুবিধার কথা ভেবে গ্রামে এক শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির ইচ্ছার কথা একবার বলেছিল সুহৃদ ওর বন্ধুদের। ওর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য এই টাকাটা খরচ হোক সবাই চায় ওরা। কথা দিলো বাকি টাকার জোগাড় সকলে মিলে করবে। সম্পাদক মশাইও পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন। প্রয়োজনে সকলে মাঝেমাঝে এসে পড়াবে বলেছে ওরা।

টাকাটা সকলে মিলে সুহৃদের বাবা ও সাধুবাবার হাতে তুলে দিল। সারা আমোদপুর গ্রামে এখন খুশির হাওয়া। ওর বাবার গর্বিত হাঁটাচলা সুহৃদকে সুখ দিচ্ছে খুব। সব হারানো মানুষটাকে একটা কিছুতে তো জয়ী করা গেল!

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *