চলে গেলেন স্বাতী নক্ষত্রের নারী

lekha

অনুপম মুখোপাধ্যায়

এই মুহূর্তে আমাদের সমাজে মৃত্যুর মিছিল চলছে। একের পর এক অসামান্য জীবন বিনা বাক্যব্যয়ে আমাদের থেকে খসে যাচ্ছে, ঝরে যাচ্ছে। একের পর এক মৃত্যু। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে একটা জাদুবাস্তব পরিস্থতির মধ্যে বেঁচে আছি। স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত চলে গেলেন। বাংলার অভিনয় শিল্প দীনতর হল।

আরও পড়ুন: শিউলি-কথা

স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর মঞ্চাভিনয় আমি দেখিনি। দেখেছি তাঁর দুটি সিনেমা। একটি সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ (১৯৮৪)। আরেকটি কয়েক বছর আগেই রিলিজড ‘বেলাশেষে’ (২০১৫)। এই দু’টি সিনেমা থেকে তাঁর সম্পর্কে যৎসামান্য ধারণায় আমি পৌঁছেছি। যখন আমাকে তাঁকে নিয়ে কিছু লিখতে বলা হল, আমার মনে হল কেবল মুগ্ধতার অধিকারেই দু-একটা কথা আমি লিখতে পারি।

‘ঘরে বাইরে’, যদি সত্যজিৎ রায়ের কোনো একটি সিনেমা আমার কাছে অনেকখানি অতৃপ্তি নিয়ে এসে থাকে, তবে এই সিনেমাই। ‘ঘরে বাইরে’-তে একরকম নির্মাণের ছক স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে কোনো বিক্ষেপ বা আক্ষেপের সুযোগ নেই। এরকম সিনেমা আমার ভালোলাগে না। সত্যজিতের প্রথমের দিকের সিনেমায় যেমন এক সজীবতা প্রতিটি দৃশ্যে লেপে থাকে, যেমন প্রতিটি দৃশ্যেই পাওয়া যায় এক অপরূপ অব্যক্ত সুষমা, সেটা ‘ঘরে বাইরে’-তে আমি পাইনি। অত্যন্ত সতর্ক। কোনো অভিনেতাই পরিচালকের বেঁধে দেওয়া গণ্ডির বাইরে নেই। স্বয়ং সৌমিত্রও নেই। বিমলা স্বাতীলেখাও যেন তাঁর প্রত্যেক অভিব্যক্তিতে সত্যজিতের নির্দেশই অনুসরণ করেছেন।

আরও পড়ুন: বিশ্বাসঘাতক

তার মধ্যেই তাঁর আশ্চর্য রূপ চোখে পড়ে। এই বিমলা চরিত্রটি বিশ্বসাহিত্যে মাদাম বোভারি, লেডি চ্যাটার্লি আর আনা কারেনিনার সমগোত্রীয়া। স্বাতীলেখাকে যে এই চরিত্রের জন্য সত্যজিৎ ভেবেছিলেন, সেটাই তাঁর জিনিয়াসের প্রমাণ। স্বাতীলেখাকে দেখে মনে হচ্ছিল বইয়ের পাতা থেকে বিমলা নেমে এসেছে। তাঁর প্রতিটি অঙ্গ সঞ্চালনে বিমলাকে দেখতে পেয়েছি, হয়তো স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তৃপ্ত হতেন এই চরিত্রে স্বাতীলেখাকে দেখতে পেলে। স্বামীর চরিত্রে (নিখিলেশ) ভিক্টর এবং সন্দীপের চরিত্রে সৌমিত্রর মতো পোড়খাওয়া ও অভিজ্ঞ অভিনেতার মাঝে স্বাতীলেখার বিমলা হয়ে ওঠা কি সহজ হয়েছিল, নাকি পৃথিবীর অন্যতম কঠিন ভূমিকা? আমার মনে হয় কঠিন। সৌমিত্রর সঙ্গে চুম্বনের দৃশ্য নিয়ে সে সময়ের বাঙালি খুব উদ্বেল হয়েছিল।

আমার দুর্দান্ত লেগেছে ‘বেলাশেষে’ সিনেমার স্বাতীলেখাকে। একজন রমণী তাঁর সমগ্র জীবন স্বামী আর সন্তানদের জন্য নিবেদন করার পর শেষ বয়সে এসে স্বামীর কাছে উপহার পাচ্ছেন ডিভোর্স, কারণ তাঁর স্বামী স্বাধীনতা চান। সেটা এতদিনে চাইতে হল? এই অভিযোগ দর্শকের মধ্য থেকে পর্দায় ছুটে যায়, আর কোথাও যেন স্বাতীলেখার সঙ্গে সহানুভূতির এক বন্ধনে দর্শক জড়িয়ে পড়েন। এই সিনেমার স্বাতীলেখাকে ভোলা যায় না। ঘরকন্নার প্রতিটি মুহূর্তে, অভিযোগে, নালিশে, বয়স্ক স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত আদরে, অভিভাবকত্বে স্বাতীলেখা অপরূপা। তাঁর সংলাপ ক্ষেপণের এক অদ্ভুত স্বাভাবিক অথচ নিজস্বতম একটা ভঙ্গি আছে ‘বেলাশেষে’ সিনেমায়। সেই সংলাপ তাই অত জীবন্ত হয়েছে। সিনেমাটির ঈষৎ অবিশ্বাস্য কাহিনিকেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে।

আমি তাঁর মঞ্চাভিনয় দেখিনি। এ আমার দুর্ভাগ্য। কলকাতার বাইরে ছোট শহরে থাকার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক কিছু হারাতে হয়। তারই একটা হয়তো কলকাতার নাট্যমঞ্চ। আমি ‘আন্তিগোনে’ নাটকের স্বাতীলেখাকে দেখিনি। কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রের অভিনয় থেকেই অনুমান করতে পারি কতখানি দৃপ্ত হতে পারে ওই নাটকে তাঁর পদচারণা, তাঁর ট্র্যাজিক মুহূর্তগুলো কতখানি উদ্ভাসিত হতে পারে।

এবং স্বাতীলেখা চলে গেলেন। একটা যুগ আমাদের মধ্যে থেকে বিদায় নিচ্ছে, এবং সঙ্গে তুলে নিয়ে যাচ্ছে নিজের মাইলফলকগুলো। এবার হয়তো আমাদের দূরত্ব বিষয়টা নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে হবে। সময়টা খুব বিশ্রীভাবে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *