২০২০-র বিস্ময়কর প্রাণী

অনিন্দ্য বর্মন

মানুষের জন্য ২০২০ বছরটা বেশ খারাপ সময়। করোনাভাইরাস অতিমারি দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের জীবজগৎ সর্বদাই পরিবর্তনশীল এবং প্রকৃতির রোষের কাছে মানুষ ভীষণভাবে দুর্বল— ভাগ্যহীন। এই অবস্থায় বহু মানুষ জীবিকার কারণেই নতুনভাবে ভাবতে বা শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন। পৃথিবীর বহু জায়গা বর্তমানে কর্মহীনতার গ্রাসে। এই বছর মানুষ যেখানে হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিল, সেখানে পাখি, পোকা, মাছ কিংবা স্তন্যপায়ীরা নিজেদের মতো করে বিস্তারলাভ করেছে। এর কারণ সম্ভবত বিপুলাংশে তাদের প্রাকৃতিক পরিসরে মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়া। ২০২০-তে প্রথমবার ইউএসএ-তে মার্ডার হরনেট (বোলতা) দেখা গেছে। আবার একরকমের অক্টোপাস পাওয়া গেছে, যারা মোবাইলে থাকা ইমোজি-র মতো দেখতে এবং জানা গেছে যে প্ল্যাটিপাসরা কালো আলোর তলায় চকমক করে ওঠে।

এই লেখাটি সেই সব পাখি, পোকা, মাছ এবং স্তন্যপায়ীদের নিয়ে যারা এই বছর মানুষকে চমকে দিয়েছে এবং এদের ওপর গবেষণা কিংবা এদের সন্ধান মানুষকে মোহিত করেছে। আশা করা যায়, পাঠক এতে চমকিত হবেন।

১. পৃথিবীর সবথেকে লম্বা প্রাণী

আরও পড়ুন: ২০২০-র দশটি অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার

অনেকভাবেই মনে করা হয়েছে ২০২০ একটি দীর্ঘ সময়। এই বছরই বৈজ্ঞানিকরা সমুদ্রের তলায় সম্ভবত পৃথিবীর সবথেকে লম্বা প্রাণীর খোঁজ পেয়েছেন। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কাছে সমুদ্রের তলায় ১৫০ ফুট লম্বা সাইফোনফোর-এর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া মিউজিয়মের সিনিয়র রিসার্চ বৈজ্ঞানিক ড. নেরিদা উইলসন জানান, এটিকে একটি বৃহৎ এবং চমৎকার ইউএফও-র মতো দেখতে। প্রত্যেক সাইফোনফোর হল জুইডস-দের একটা সমষ্টি। এইক্ষেত্রে শারীরিক কোষ একত্রিত হয়ে হাজার গুণ বিস্তার লাভ করে এবং একটি দীর্ঘ, সুতোর মতো শরীর গঠন করে। যদিও ড. উইলসন-এর সহকর্মীরা এই প্রাণীটিকে সিলি স্ট্রিং (ছন্নছাড়া) বলে আখ্যা দিয়েছেন, ড. উইলসন জানাচ্ছেন যে এই প্রাণী যথেষ্টই সুসংগঠিত।

. স্যালাম্যান্ডারদের রাস্তা অধিগ্রহণ

এই বছর, ইউনাইটেড স্টেটসে উভচর প্রাণীর পরিযানের সময় করোনাভাইরাস অতিমারির সময়ের সঙ্গে মিলে গিয়েছে। সামাজিক দূরত্ব এবং নিয়মের ফলে রাস্তায় গাড়ির চলাচল অনেক কমে গেছে। কিছু অপরিকল্পিত এবং বড় মাপের পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্পেটোলজি-র ছাত্র (সরীসৃপ সংক্রান্ত বিজ্ঞানী) গ্রেগ লেক্ল্যায়ার বলেছেন— ‘‘আমরা এই রকম সুযোগ খুবই কম পাই। এর ফলে জানা যায়, মানুষের উপস্থিতি সরীসৃপদের রাস্তা পার হওয়ার সময় কতটা প্রভাব ফেলে।” তিনি স্যালাম্যান্ডারদের রাস্তা পারাপার এবং চলাচলের বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন।

. কাঠি এবং পাতার তৈরি অনন্য ইতিহাস

আরও পড়ুন: সুধীন-শ্যামল জুটি এবং বাঙালিয়ানায় মোড়া জিঙ্গল বেল

পাতা পোকা (লিফ ইনসেক্ট) নিয়ে শতাব্দী-প্রাচীন একটা রহস্য রয়েছে, এই ন্যানোফিলিয়াম প্রজাতির নারীদের কী হল? ২০১৮-র বসন্তে মন্ট্রেয়াল ইন্সেক্টেরিয়ামের বৈজ্ঞানিক স্তেফান লে তিরান্ত একটি বটুয়া পান। তাতে ১৩টি ডিম ছিল। তিনি প্রাথমিকভাবে ভেবেছিলেন ডিম ফুটে পাতাপোকা বেরোবে। এই ডিমগুলি গোলাকৃতির বদলে ছিল ত্রিকোণাকৃতির। অনেকটা বাদামি রঙের ল্যান্টার্নের মতো এবং প্রায় চিয়া বীজের সমান বড়। এই পোকাগুলি ডিম ফুটে বেরোনোর পর একটি বন্য নারী ফাইলিয়াম আসেকিনসে পোকার সঙ্গে রাখা হয়। এটি ছিল পাপুয়া নিউ গিনি থেকে সংগৃহীত পাতাপোকা। এরা ফ্রনডোসাম প্রজাতির পোকা। এবং সেটাও শুধু মাত্র নারী পোকা দেখেই চিহ্নিত করা সম্ভব। ডিম ফোটার পর দু’টি পোকা সরু কাঠির মতো দেখতে হয়। ধীরে ধীরে তাদের ডানাও গজায়। ন্যানোফিলিয়াম পোকার সঙ্গে তাদের এক বিশেষ সাদৃশ্য আছে। কিন্তু জিনাস অনুযায়ী দেখা যায়, এর মধ্যে ৬টি পোকাই পুরুষ। গবেষণা থেকে পরিষ্কার যে, এই দু’টি প্রজাতিই একই গোষ্ঠীর এবং তাদের নতুন নামকরণ হয় ন্যানোফিলিয়াম আসেকিনসে। নিউ ইয়র্ক সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক রয়েস কামিং বলেছেন— ‘‘আমরা ১৯০৬ থেকে এই প্রজাতির শুধু পুরুষ পোকাই পেয়ে এসেছি। এবার আমাদের হাতে মারাত্মক একটা প্রমাণ এসেছে।”

. ইমোজির মতো দেখতে অক্টোপাস

আরও পড়ুন: মহামানব যিশু খ্রিস্ট, মানবপ্রেমের ঘনীভূত রূপ

অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ বা প্রবাল প্রাচীর এবং প্রবাল সমুদ্রে ঠিক কী আছে? এই অঞ্চলটি বেশি খতিয়ে দেখা হয়নি। সম্প্রতি একটি বৈজ্ঞানিক দল এই অঞ্চলে গবেষণা চালিয়ে জানতে পেরেছেন যে, এখানে প্রচুর বিভিন্ন ধরনের প্রাণী আছে। তার সঙ্গে আছে অদ্ভুতুড়ে ভুতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং অসামান্য গভীর প্রবাল। স্কিমিট ওশান ইন্সটিটিউট এখানে ধ্বনি তরঙ্গ মাধ্যম ব্যবহার করে একটি অভিযান চালায়। রোবটের ব্যবহার করে সমুদ্রের গভীরের নিকষ অন্ধকারে ছবিও তোলা হয়েছে। এই অভিযানের সময় বৈজ্ঞানিকরা ডাম্বো অক্টোপাসের সন্ধান পেয়েছেন, যাকে একদম মোবাইলে থাকে অক্টোপাসের ইমোজির মতো দেখতে। তারা এই অঞ্চলে গভীর গুহায় বাস করে। এই পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার সাগরের গভীরে জীবন্ত এবং শক্ত প্রবালের সন্ধানও পাওয়া গেছে। এছাড়াও ১০টি নতুন প্রজাতির মাছ, শামুক এবং স্পঞ্জের সন্ধান পাওয়া গেছে।

. হামিংবার্ড-এর মতো ঘুম

আরও পড়ুন: বিশ্বজনীন ক্রিসমাস উৎসবের কিছু অভিনব উদ্‌যাপন

এই ২০২০-তে বেঁচে থাকার একটা উপায় হল হামিংবার্ডের মতো হওয়া। এই দুরন্ত পাখিগুলির মেটাবলিসম শিরদাঁড়া যুক্ত প্রাণীর মধ্যে সবথেকে চমকপ্রদ এবং তাদের দুরন্ত জীবন কাটানোর জন্য তারা মাঝেমাঝে মধুর সঙ্গে নিজের দেহের কিছুটা ওজনের উপাদানও খেয়ে ফেলে। নিজেদের এনার্জি বাঁচানোর জন্য লাতিন আমেরিকার আন্দিজ পাহাড়ের হামিংবার্ডরা প্রায় মানসিক ঘুমের অবস্থায় চলে যায়। এটা প্রায় ঘুমের কাছাকাছি একটা অবস্থা যখন তাদের শরীরের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)-এ নেমে আসে। বছর শেষ হয়ে আসার সঙ্গেই এদের সম্বন্ধে আগামী দিনে আরও অনেক কিছুই জানা যাবে।

. প্ল্যাটিপাসের আলোর চমক

শেষ যখন প্ল্যাটিপাসকে পরীক্ষা করা হয়েছিল, জানা গিয়েছিল যে এরা স্তন্যপায়ী। এদের পা হাঁসের মতো জোড়া, হাঁসের মতোই খালে-বিলে থাকে এবং ডিম পাড়ে। এছাড়াও এরা বিষ তৈরি করতে সক্ষম। এখন দেখা যাচ্ছে, এদের সাধারণ মানের চামড়ার আর একটি বৈশিষ্ট্য আছে। এদের গায়ে কালো রঙের আলো ফেললে এরা চকমকিয়ে ওঠে। প্ল্যাটিপাসের গায়ে আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি ফেললে দেখা যায়, তাদের লোমে ফ্লুয়োরিস আছে এবং তাদের দেহ থেকে সবজে-নীল আলো বিচ্ছুরিত হয়। প্ল্যাটিপাসই একমাত্র স্তন্যপায়ী, যাদের এই বৈশিষ্ট আছে। তবে কেন তারা এটা করে, তা এখনও জানা যায়নি। এটাও ধারণা করা হচ্ছে, প্ল্যাটিপাসের মতো আলোক বিচ্ছুরণকারী প্রাণী হয়তো আরও আছে।

. করোনাভাইরাসের উৎস সম্ভবত বাদুড়

একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক দল এবং চায়নার উহান ইন্সটিটিউট অফ ভাইরোলজির এক বৈজ্ঞানিক চায়নার বাদুড়কে করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে পরীক্ষা করেছেন। জানা গিয়েছে হর্সশু বাদুড় থেকেই করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। এই বৈজ্ঞানিকরা, যাঁরা মূলত আমেরিকান এবং চিনা, একটি বড় মাপের পরীক্ষা চালিয়েছেন এবং এটাও খুঁজে বের করেছেন যে, কীভাবে বাদুড় থেকে এই ভাইরাস মানুষের দেহে ছড়িয়েছে। জেনেটিক যে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, তা চমকপ্রদ। এই হর্সশু বাদুড় বহু রোগ ছড়িয়ে থাকে। এদের কারণেই ২০০৩-এ সার্স ভাইরাস ছড়িয়েছিল। তবে বাদুড় থেকে করোনা সরাসরি কীভাবে মানুষের দেহে এলো, সেই সন্ধান পাওয়া যায়নি। হতেই পারে, এই ভাইরাস বহু বাদুড় এবং পশুর দেহে আছে এবং সেখান থেকেই ধীরে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়েছে।

. কেনিয়ার পঙ্গপাল

কেনিয়ার ওয়াম্বা, একটি কৃষিজীবী জনপদের ৬৮ বছরের বাসিন্দা জোসেফ কাটোন লেপারোল-এর কথায়— ‘‘দেখে মনে হয়েছিল একটি বৃহৎ ছাতা পুরো আকাশকে ঢেকে ফেলেছে।’’ জুন মাসে একটি ক্ষিপ্র মরু পঙ্গপালের দল কেনিয়ায় প্রায় তাণ্ডব চালিয়েছে। তাদের সমষ্টির আকারই মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। প্রথমে তারা ভেবেছিল কালো বর্ষার মেঘ এগিয়ে আসছে। এই পঙ্গপাল দিনে প্রায় ৮০ মাইল যাত্রা করতে সক্ষম। এদের সমষ্টির প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৮০ মিলিয়ন পঙ্গপাল থাকে। এরা একদিনে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ সমান খাদ্য খাওয়ার শক্তি রাখে। যদিও রাসায়নিক ছড়িয়ে এই পোকার মোকাবিলা করা যায়, তবুও মানুষের ভয় ছিল যে রাসায়নিক তাদের খাওয়ার জলকে দূষিত করে তুলবে। দৈনন্দিন এবং কৃষিকার্য এতে ব্যাহত হবে। পরিবেশ এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন এই পঙ্গপালের হামলাকে আরও দ্রুত এবং মারাত্মক করে তুলবে।

. আমেরিকায় মার্ডার হর্নেটের আবির্ভাব

২০২০-র বসন্তে প্রথমবার ইউএসএ-তে মার্ডার হরনেট (বোলতা) দেখা গিয়েছে, যা ভীষণভাবে মানুষের নজর কেড়েছে। এশিয়ার এই বৃহৎ বোলতা স্বভাবে খুবই মারকুটে। একটা মৌমাছির চাক ধ্বংস করতে এরা মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় নেয়। সমস্ত মৌমাছি মেরে তাদের দেহাবশেষ নিয়ে গিয়ে নিজেদের বাচ্চাদের খাওয়ায়। বড় শিকারের ক্ষেত্রে এরা নিজেদের বিষাক্ত হুল ব্যবহার করে। এই হুল মৌমাছি পালনের কাপড় ভেদ করতে সক্ষম। অন্য প্রাণীর দেহে ঢুকলে মনে হয় জ্বলন্ত লোহার রড শরীরে প্রবেশ করছে। এই শরতে, ওয়াশিংটন প্রদেশের উত্তর-পশ্চিম প্যাসিফিকে প্রথম এই বোলতার চাক লক্ষ্য করা হয় এবং তা সত্বর ধ্বংস করা হয়। মারাত্মক কোনও ক্ষতি করার আগেই বোলতা-সমেত এই চাকটি ধ্বংস করা গিয়েছে। যদিও আর কোনও চাক দেখা যায়নি, তবুও এলাকার মানুষ আগামী ৩ বছরের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করছেন যাতে এই বোলতা বাসা বাঁধতে না পারে।

১০. করোনাভাইরাস ঠেকাতে মিঙ্ক হত্যা

মিঙ্ক বেজি সম্প্রদায়ের প্রাণী। এই বছর ডেনমার্ক সরকার ১০০০-এর বেশি পশুশালায় সহস্রাধিক মিঙ্ক হত্যার নির্দেশ দিয়েছে। এই মিঙ্কগুলি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিল। যাতে মানুষের শরীরে এই ভাইরাস না ছড়ায়, তাই এই নির্মম আদেশ দেওয়া হয়। বৈজ্ঞানিকরা অবশ্য বলছেন যে, ড্যানিশ সরকারের এহেন পদক্ষেপের পিছনে আরও কারণ আছে। মিঙ্ক ফার্মগুলি করোনাভাইরাসের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছিল। জানা গিয়েছে যে, মিঙ্কই একমাত্র প্রাণী যার দেহ থেকে করোনাভাইরাস সরাসরি মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। এই ব্যাপারটি মানুষের জন্য প্রবল ক্ষতিকারক। মিঙ্করা আক্রান্ত হলে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকগুণ বেড়ে যাবে। এছাড়া অন্য প্রাণীরাও আক্রান্ত হতে পারে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *