বাবা শব্দটি আসলে একগুচ্ছ অনুভব

Fathers Day

দেবযানী ভট্টাচার্য

বাবা মানে আমার কাছে আমার সেই নির্মাণকারী ঈশ্বর, যাকে বিগত কয়েক দশক ধরে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় না জানি আরও কত কত রূপে অনবরত সাপটে-সুপটে খেয়ে নিজেকে আস্ত একটি দামোদর শেঠ করে চলেছিলাম আমি। আকণ্ঠ, বলা উচিত আশরীর আমার তাঁরই ঘাম, রক্ত, পরিশ্রম, ত্যাগ, তিতিক্ষা, স্নেহ, ভালোবাসা, যত্ন, আদর, উদ্বেগ, আগলানো, পিতৃত্ব আর বন্ধুত্বের এক বিরাট অংশের জীবনভাগ।

আরও পড়ুন: বাবা

কোনও এক তথাকথিত ‘ফাদার্স ডে’-তে তাকে আমার আলাদা করে কিচ্ছু বলার ধৃষ্টতা নেই। বাতাসকে যেমন ধন্যবাদ দিই না শ্বাসবায়ু জোগান দেওয়ার জন্য, মাটিকে যেমন কৃতজ্ঞতা জানাই না দাঁড়াতে দেওয়ার জন্য, জলকে যেমন কৃতার্থতা জানাই না প্রাণরক্ষার জন্য, তেমনই বাবাকে ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা কৃতার্থতা কিস্যু জানাব না আমাকে আমি করে গড়ে তোলার জন্য। স্পর্ধা নেই যে! চিরকাল কেবল চূড়ান্ত স্বার্থপরের মতো বায়না করে এসেছি― সাইকেলের পিছনে চালের বস্তার মতো আমাকে বয়ে নিয়ে বেড়ানোটা তোমাকে আরও আরও বহুদিন চালিয়ে যেতে হবে, হাঁটতে হলে পাশাপাশি লম্বা খুব লম্বা ছায়াটা দিয়ে আমাকে বহু বছর এখনও রোদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে, নিজের শেষ পাতের ভাতের দলায় মাছের টুকরো কিংবা খাসির মেটে বা ডিমের কুসুম পুরে গোল্লা করে আমায় খাইয়ে দিতে হবে আরও অনেকদিন, জ্বরের ঘোরে চোখ পুড়ে গেলে তালপাতার পাখার বাতাস করে জলপট্টিতে কপাল জুড়োতে হবে এখনও বহু রাত, প্রেমে অপ্রেমে কাজে অকাজে চলায় বলায় আমার উপর আসা যেকোনও ধাক্কা সামলাতে হবে তোমাকেই। তুমি আমার বাবা যে, আমার ফাইকাস বেঙ্গলেনসিস। আজ এত কথা বলার সুযোগ নেই। কেবল স্যালুট বস বলতে পারি। মনে মনে।

আমাদের গল্প শুনবেন? বেশ। শুনুন তবে। অনেক পুরনো গল্প কিন্তু! আমাদের ছাদ দেওয়া ঘর নয়। ঘরের চালের ঢাল লম্বা বারান্দার মাথার উপর দিয়ে ঝুঁকে পড়েছে উঠোনের এলাকায়, জাফরি কাজের বারান্দা লাগছে যেন আধ কপাল ঘোমটা দেওয়া কর্মরতা পাড়াগেঁয়ে গেরস্থ বউ। ঘোমটার কিন্তু অনেক রকমফের হয়। শউর ঘর হতে বাপের ঘরে যাওয়ার কালের ঘোমটা আর উল্টো পিঠে আসার ঘোমটা কিন্তু মোটেও এক নয়। আবার ধান সেদ্ধ করার সময়কার ঘোমটার সঙ্গে কাঁথা সেলাইয়ের সময়কার ঘোমটাতে ফারাক বেশ খানিক। তাই বললাম কর্মরতা। সে ঘোমটা কিছু অন্যরকম কিনা।

ধ্যুস কী বলতে বসে কী বলতে লেগেছি! যাক গে যাক, তা সেই ঘোমটায় গড়া হাসিমাখা মুখখানিতে ঠোঁটের ফাঁকে দাঁতের সারি উঁকি দিচ্ছে যেন এমন ক’টা নিকোনো ঝকঝকে সিঁড়ি। সিঁড়ির আবার বিশেষত্ব আছে। দু-পয়সারই হোক কী দশ পয়সার, জমিদার বাড়ি হলেই পুষ্করিণী থাকবেই আর বলা বাহুল্য ঘাটও থাকবে। এইবার সেই ঘাটের কাঠামো মনের চোখে দেখে নিন। সারসার সিঁড়ির দুই পাশে তাদের আগাগোড়া আগলানো ধাপে ধাপে বেঁটে পাঁচিল মতো আকৃতিদের ঠাহর করতে পারছেন? আমাদের ঘরে দু’টোক’টা সিঁড়ি থাকলেও, ওইরকম খুদে পাঁচিল আছে, তবে কিনা তা একপাশে। জায়গাটা আমার ভারী প্রিয়। পড়াশোনা করা এবং করানো যথাক্রমে আমার ও বাবার বিশেষ প্রিয় কোনও বিষয় নয়, যেটুকু করতে হবে মায়ের হস্তধৃত হিলহিলে পাঁচনের ডরে সেটুকু খুবসকালের পাঁচন গেলার মতো সেরে নিয়েই সিঁড়িতে আসীন জনক-দুহিতা। গল্প, গল্প আর গল্প। বাবা পইঠায় আর আমি পাঁচিলে পা ছড়িয়ে। কোলে মুড়ির বাটি। যেদিন যেমন গল্প, সামনের আবছায়া মাখা উঠোন সেদিন তেমন সাথ দেবে। অভিযান কালাহারি বা সাহারাতে, সে হয়ে গেল বালুময় মরুভূমি। যুদ্ধ ওয়াটার্লু বা কলিঙ্গে, উঠোন-ঘেরা গাছেরা সব সৈন্যদল। এরকমই একদিন কল্পনায় সামনের আবছায়া মাখা চন্দন রঙা মাটি তখন মা গঙ্গা কারণ বাবা গল্প বলছে আকাশগঙ্গার।

আরও পড়ুন: তিনটি কবিতা

গুণ করা বলে একটা কথা আছে। বশীকরণ। আকাশগঙ্গা আমায় বশীকরণ করেছে। খেলতে গিয়ে চটজলদি ‘হুস’ হয়ে মাঠের মাঝে খাড়া আমি দাঁড়িয়ে থাকি মাথাটা প্রায় পিঠে নুইয়ে, খেলা সম্পর্কে বাস্তবিকই বে-হুঁশ। খেলুড়েরা রাগ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারপর একলা ছেড়ে দেয় আমায়। আমি সেই আলোময় ছায়াপথ খুঁজে ফিরি। চওড়া রাস্তা। ঘুমের মতো নির্ভার, ভরসার মতো মোলায়েম। আশ্বাসের মতো নিটোল। আমার খুব দরকার ওই পথে পৌঁছনোর পথটার হদিশ।

কেন?

আমার একটা নিশ্চিন্তিপুর আছে। অর্ধেক অর্ধেক রাখা। আমার বাবার বুক। মায়ের কোল। মুখ ডুবোলে স্কন্ধকাটা থেকে ভোঁদড় কারোর ভয় চোখে লেগে থাকে না। কিন্তু, বাবার নেই। আমি শুনেছি মাঝঘুমে তন্দ্রা হালকা হয়ে এলে বাবা মা-কে বলছে কাকজোছনায় বিজয় সরকারের, আব্বাসউদ্দীনের গান গেয়ে ঠাম্মার চিঁড়ে কোটার গল্প। ঘোর বর্ষায় চিত্রার পাড়ের বুকজল ঠেলে ঠাকুদ্দার ছোট ছেলেকে শুকনো ইশকুলে পৌঁছে দেওয়ার গল্প। মধুর আমার মায়ের হাসি গানখানা কোনও দিনই বাবা পুরোটা গায় না। থেমে যায়। আধখানা গান টলটল করে উদাসী চাওয়ায়।

মায়েরও নেই। কালবোশেখির ঝঞ্ঝার শেষ দুপুরে, উলোটিপালোটি খায় গাছগাছালি, উপড়ে পড়ে শব্দ পাই। আমি শুয়ে থাকি কাঁথা জড়িয়ে মায়ের ওমে, মা বলে চলে কীভাবে দাদুর অকাল মৃত্যুদিনে এইভাবেই উপড়ে গেছিল কিছু গাছ, কিছু সম্পর্ক, কিছু সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যৎ। ঝড় হয়েছিল, কিন্তু তা অদেখা। কেবল দাপটটা দেখেছে বহু বছর ধরে। অকারণেই বেশি করে আঁকড়ে ধরে আমায়। ঘুম পাড়ায়।

কত মানুষের কতো খালি খালি জায়গা থাকে বুকের ভিতরে। হু-হু করে হাওয়া বয়। মড়ার খুলির ভিতরে হাওয়া গললে আওয়াজ ওঠে শিঁ-শিঁ। ওই খালি খালি জায়গাগুলোতেও অমন শব্দেরা ওড়ে। মানুষ ভয় পায়। তাই কাঁদে।

সতীন ঝেঁটিয়ে দেওয়া সন্ধ্যা পিসি কাঁদে। পেটে পুঁজ ভরা দীনুকাকু কাঁদে। তালাক পাওয়া পেট বাঁধানো আলেয়া কাঁদে। ধুতিতে বাহ্য করেও মালুম না পাওয়া ক্ষেপা গদাই কাঁদে।

আমি ঠাহর পাই।

এদের সবার জন্য ওই পথটা খুঁজে পেতেই হবে। যার যা হারিয়েছে, যার যা নেই, সব না কি ওই পথের বাঁকে বাঁকে জমা করা আছে। কালো কালো চোখ চলে না ঘর সব। তাতেই বন্দি। ওই কালকুঠুরিতে জব্দ হওয়ার আগে পথের নিশানা দিতে এখানে ওখানে জ্বালিয়ে গেছে আলোর মশাল। ওরা বসে আছে পিত্যেসে। কেউ আসবে। ওদের চিনবে। ফিরিয়ে নেবে।

কেউ যায় না।

কিন্তু সেখানে যে যেতেই হবে।

অ্যাস্ট্রোনমির কোর্স করাকালীন টেলিস্কোপে চোখ রেখে ফোকাস করতে করতে ছেলেবেলার আকুতি খুব মনে ভাসত। বোকার মতো ইচ্ছে করত একবারটি দেখার। যেখানে, কেউ যায়নি। কেউ যায় না কক্ষনো। ওরা ওখানেই আছে। আজও। আমার বাবা বলেছে আছে। তাই ওরা আছেই। আজ তো বাবাও ওদের কাছে আছে!

মন ভারী হয়ে গেল বুঝি? হালকা করে দিই?

ভটচায বামুনের পরিবার তো, একটা সময় অবধি বৃথা মাংস ঢুকত না হেঁশেলে। রামপাঁঠা (উপায়ান্তরে খাসি) যদিওবা কালেকালে জায়গা করে নিলো নিজের, রামপাখির আজও নো এন্ট্রি। মুরগির মাংস আর সজনে পালংয়ের ছিবড়েতে তফাতটাই নাকি বুঝে ওঠা হলোনা জীবৎকালে। কার? আমার পিতৃদেবের!

সে যাক, এবার ওই পাঁঠা বা খাসি রাঁধতে যে বাসন এক্কেবারে হারাম তা হল প্রেসার কুকার। কড়াইয়ের মিঠেকড়া ওমে একে একে মশল্লা আর আলুকে তেলে মষ্টানো থেকে হটিয়ে, যাবতীয় তেল মশল্লা আলু আদা পেঁয়াজ রসুন সমেত কুকারে জন্মের শোধ সগুষ্ঠি সিন্দুক আটকান আটকিয়ে পাঁঠা খাসির মাংস রাঁধলে, তা নাকি সত্তর পেরোলে তবেই খাওয়া বিধেয়― যখন কিনা দাঁতেরা মায়া কাটায় মাড়ির। রামশশী ভটচাযের ছোট পুত্তুরের পার্সোনাল পাঁজিতে তেমনই লেখে আর কি। (ওই ভয়প্রদ মাংস খাওয়ার ভয়েই কি সত্তর পেরোতে দিলেন না নিজেকে?) তার ইস্তিরিটি তো আরও এককাঠি সরেস। পেঁয়াজবাটা রসুনবাটা ছাড়া তেজপাতা জিরে আদা ঘি গরম মশল্লায় তৈয়ের নিরিমিষ মাংস (মমপ্রদত্ত নাম) তার হাতে যা খোলে সে বন্নোনা না খেলে মাত্তর টেন পার্সেন্ট কনভে করা সম্ভবপর।

পুরোনো কালের গল্প বলি।
সম্বৎসর পুকুরে চান করতাম। তা শীতকালে হতো কী, সোম থেকে শনি একরকম ইশকুলে যাওয়ার তাড়ায় নেয়ে নিতেই হতো, রবিবারের দুপুরে ঘাটের পৈঠায় দাঁড়িয়ে কুমির তোমার জলকে নেমেছি রকম পা ছোঁয়াতাম হিম হিম জলে, নামার সাহস বা ইচ্ছে কোনটাই থাকতো না।
মা কড়াইয়ে মাংসে মশলায় জমিয়ে কষতে কষতে রান্নাঘরের জানলা দিয়ে কড়া নজর রাখত সাবধানতার কারণে। যখন দেখতো মেয়ে ঘাটে এক্কাদোক্কা খেলছে, চানের লক্ষণ নেই তিলমাত্র, ওমনি বলে উঠতো, “যে পাঁচ মিনিটে স্নান সেরে মাথা মুছে তুলসীতলায় জল দিয়ে আমার কাছে আসবে সেইই একটা কষা মাংস পাবে।”
ব্যস! এপাং ওপাং ঝপাং!
গরমকালে আবার জল থেকে ওঠানোর জন্য এই একই অস্ত্র ছিল মায়ের।

সেই ছোট্টবেলা থেকেই বাড়িতে মাংস মানেই আমার নসীবে স্নান সেরে এক কি দুই টুকরো কষা জুটবেই। খেতে বসে মেটের টুকরো সে তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
হকদার ভাই!

সারা সপ্তাহ সকাল সাড়ে নয়টায় মা বেড়ে দিতো ভাত একটা সেদ্ধ, ডাল, মাছ আর তরকারি, বড়ো কাঁসার বগী থালায় বাটিতে। বাবা নিজে খেয়ে আমাকে খাইয়ে বগলদাবা করে নিয়ে বেরোতো। আমার ইশকুলের সিঁড়িতে আমাকে সাইকেল থেকে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতো নিজের ইশকুলে। এই মোটামুটি রুটিন।

কিন্তু রবিবারের দুপুরে আমার খাওয়ার মধ্যে একটা বিশেষত্ব থাকতো, তা হলো, উনুনে বসানো ফুটন্ত ঝোলের কড়াই থেকে ডিরেক্ট কাঁসার কাঁসি অর্থাৎ কানা উচুঁ ছোটো থালায় চটকানো ভাতের ঠিক মধ্যিখানে এক হাতা গরম ঝোলের ঝপাত্ করে পড়া একটুকরো আলু আর দুইটুকরো মাংস মেটে সমেত। হাপুস হাপুস করে গোল্লা গুলো গিলে ফেলতে ফেলতে সেদিন হুশ বলতেই খাওয়া শেষ।
বাবা মা পরে খেতো একসাথে কাজকর্ম সেরে গল্পগাছা করতে করতে।
বাবা তাঁতের শাড়ির পাড় বসানো উলের কাজ করা আসনে বসতো আর কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি বরাদ্দ ছিল আমার বসার জন্য। সেই পিঁড়িটায় আমায় আগে বসিয়ে রান্না সারতে সারতেই খাইয়ে দিতো মা ভাতে মাংসে মেখেজুখে।
এইবার জয়ঢাক পেট নিয়ে কোলবালিশ আঁকড়ে শুয়ে মায়ের দু একটা আলতো চাপড় গায়ে পিঠে পড়তেই ঘুম নেমে আসতো ঝুরঝুরিয়ে।
ঘুমের ঝিলে তলিয়ে যেতে যেতেও একটা ভাবনা ঠিক সফরী ঠোকরান দিতো। বাবা খেতে বসে একসময় বারকয়েক ডাকবে, ঘুমঘুম চোখে উঠবো, গুটিগুটি রান্নাঘরের দাওয়ায় গেলেই দেখতে পাবো নলির হাড় ভেঙে মজ্জা বের করছে বাবা।
মেয়ে খাবে, তাই ডাকাডাকি।
মা ছদ্মরাগ দেখাতো,”হ্যাঁ, তোমার মেয়েকে তো আমি না খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছি কি না, তাই ডেকে সোহাগ করো এইবার! ঘুমচোখে যদি গলায় আটকে বিষম খায় তুমিই সামলিয়ো!”

বাবার পাতের ভাগ পেয়ে এইভাবেই এসেছি দুইহাজার আঠারোর মাঝামাঝি অবধি একইভাবে।
কপালে পাইস থেকে পাঁচতারা সবেরই দিশি বিদেশী কুইজিন জুটেছে, কিন্তু ওই নরম নরম ভাত মাংসের গরম গরম গরাসের স্বাদ মেলেনি কোত্থাও। আর ওই নলির হাড় ভেঙে সুড়ুৎ করে টেনে নেওয়া মজ্জার শাঁসের স্বাদ, সেওতো আর মেলেনি কোথাও।

কেন এসব কেত্তন জুড়লাম হটাৎ? বলি তাহলে। একে তো আজ ফাদার্স ডে, বাবা এসেই পড়ত কোনও না কোনও লেখায়, তার উপরে রোববারের দুপুর–পাঁঠা খাসি ছাড়া ধু ধু মরুভূমি মনে হয়।

আরেকটি গল্প বলে শেষ করি।
শীতকালে রাত্রে ভাত হতো না বড়ো একটা। রুটি বা লুচি হতো। সাথে তরকারি, মাছ দুধ মিষ্টি যেমন যেমন যায় আর কি। রবিবারে তাই মাংস লুচি বাঁধা ছিল।তারপর অবশ্য বাবা মা দুজনেরই বয়স বেড়েছে। রোগব্যাধি জুটেছে কিছু। রেডমিট ইনটেকে নজরদারি বসে গেছে। ফি রোববারে মাংস হয়না আর। একটা বাদ একটাতে হয়। তেমনই এসেছিল মাংসহীন এক রোববার রাত। লুচি, বেগুনভাজা বাঁধাকপির তরকারি আর মিষ্টি। রাতের খাবার টেবিলে প্রায় শেষের দিকে খাওয়া, তিনজনে কুটুরকাটুর চলছে, পেছনের বারান্দা দিয়ে ঢুকলো ন’মামা। হাতে বড়োসড়ো একটা বাটি। গন্ধেই মালুম হলো জাষ্ট রাঁধা খাসির মাংস।

  • ইশ! আরেকটু আগে এলে না ন’মামা! আমার খাওয়া তো শেষ!
    শোকের আকস্মিকতায় আমার হার্টফেল না হয়ে যায়!
    মা অল্প হেসে বলে উঠলো, “কাল সক্কাল সক্কাল উঠে প্রাত্যহিকী শুনে যদি চিঠি লিখতে বসিস তো সকালে গরম গরম দুইখানা ভেজে দেবো, এই মাংস দিয়েই খাস”।
    ব্যস! বিগলিত হাসি আমার।
    ভাবা যায়! এখনো অস্ত্র শানাচ্ছেন ভদ্রমহিলা!
    নিজেকে কী বলা যায় এটা ছাড়া — ওরে মণি, আধবুড়ি হয়ে গেলি, তুই কবে শোধরাবি! কী লজ্জা কী লজ্জা!
    হি হি হি…

আমার, খুব আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি কী জানেন?

বাবা শব্দটি আসলে একগুচ্ছ অনুভব।

এক এক সময় এক এক কুচি বাবা মিশে যায় খুব চেনা, অল্প চেনা, অচেনা এমনকি অদেখা বা হঠাৎ চেনা কোনও কোনও মানুষের মধ্যে।

ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুরে একসা হওয়ার দিনগুলোতে আঁকড়ে রাখেন পরম মমতায় যে অনাত্মীয় আশ্রয়েরা, তাঁদের মায়াময় চোখে ঠোঁটে বুকে বাবা’র পরশ।

জ্বালাপোড়া রোদের তাপ থেকে বাঁচাতে নিজের পিঠের ছায়ায় মাথা গুঁজে রাখতে বলে সিধে বসে কয়েকঘণ্টা বাইক চালায় যে বন্ধু, তার স্নেহার্দ্র ঋজুতায় বাবা’র পরশ।

শুনশান গলিতে সদ্য কলেজ পড়ুয়ার একলা জড়সড় চলাচলে দূরত্ব বজায় রেখেও যে সতর্ক পাহারায় পার করায় সেই পাড়ার ঠেকের উল্মোঝুল্মো উদাসী ছোকরাদের আগলে হাঁটায় বাবা’র পরশ।

প্রাণান্তকর ভীড় ঠেলে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে বিপজ্জনকভাবে প্রায় ত্রিশঙ্কু পড়ে গেলে আচমকাই যে হাতগুলো শক্ত করে ধরে তুলে আনে তাঁদের হাতগুলোর দৃঢ় পেশিতে বাবা’র পরশ।

এক ঝুড়ি উদ্দাম ঝগড়ার পরেও পছন্দের প্রতিটি জিনিস খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসা, প্রায় ধমকে ধামকে বগলদাবা করে প্রিয় খাবারের ঠেকে পৌঁছে যাওয়া সেই অসমবয়সী বন্ধুতার গার্জেনি গমকে বাবা’র পরশ।

ব্যক্তিগত হাজারো সমস্যা ও শত ব্যস্ততার মধ্যেও অজস্র বানানভুল শুধরে লেখালেখি সর্বজনের সামনে রাখার যোগ্য করে দেন যে প্রচারবিমুখ মানুষটি তার তীক্ষ্ণধী চশমা কলমে বাবা’র পরশ।

অজস্রবার ফালাফালা ছিঁড়েখুঁড়ে যাই নিজেই, অজস্রবার টুকরোগুলো জুটিয়ে আনি নিজেই।

সঙ্গে কেবল ওই বাবা’র ছোট্ট ছোট্ট কুচিরা থাকে।

সব মনে পড়ে গেল একের পর এক। ফাদার্স ডে তে। পৃথিবীর সমস্ত বাবারা যারা সন্তানের কাছে সশরীরে আছেন তারা ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন অনেক অনেক দিন।
আর যে সব বাবারা আমার বাবার মত পাড়ি দিয়েছেন চাঁদের আলোয় দেশে, মহানন্দে থাকুন সেখানে।
দেখা হবে।

সব্বাইকেই আদর।
অনেক অনেক আদর।

নিবন্ধক পরিচিতি :

ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শেষে বর্ত্তমানে পেশা শিক্ষকতা।
মূলত নিজস্ব ব্লগ ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যধর্মী লেখালেখির সূত্রেই পরিচিতি। দুই বাংলার বিভিন্ন গ্রন্থ, পত্র পত্রিকায় ও সংকলনে প্রকাশ পেয়েছে গল্প কবিতা প্রবন্ধ।
“আনন্দ নগরীর সেকাল” প্রথম প্রকাশিত রম্য প্রবন্ধ সংকলন।
আকাশবাণী কলকাতার মৈত্রী প্রচার তরঙ্গে ধারাবাহিক ভাবে প্রচারিত একাধিক বিষয়নির্ভর অনুষ্ঠানের কথিকা লেখিকা হিসেবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Paramita Ghosh

    বেশি কিছু বলার থাকতে পারেনা কারন বিষয় টা বাবা …. সব বাবা মা ই নিজেদের সন্তান দের মাথার উপর সবসময় ছায়া হয়ে থাকে সে বয়স যতই হোক … পৃথিবীর সমস্ত বাবা মা শুধু ভালো থাকুক এই কামনা ।।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *