প্রায় তিন শতাব্দী ধরে শক্তির আরাধনা চলছে বনহুগলির ঘোষবাড়িতে

সায়ন ঘোষ

তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে সাবেকিয়ানা বজায় রেখে কালীপুজো করে চলেছে বনহুগলি ৬৫নং নিমচাঁদ মৈত্র স্ট্রিটের ঘোষ পরিবার। সমস্ত নিয়ম মেনে অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে এই পুজো হয়। বাড়ির প্রতিমা আনা হয় কুমারটুলি থেকে। বিগত তিনশো বছর ধরে প্রতিমার উচ্চতা অপরিবর্তিত। প্রতিমার উচ্চতা চার ফুট। কালীপুজোর দিন সন্ধ্যাবেলায় প্রথমে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করা হয় এবং লক্ষ্মীপুজো শেষ হলে কালীপুজো শুরু করা হয়। এই পুজোর দিন বাড়ির সকল সদস্য উপোস করে থাকেন পুজো সম্পন্ন না হ‌ওয়া পর্যন্ত। পুজো সম্পন্ন হলে পুজোর ভোগ খেয়ে সবাই উপোস ভঙ্গ করেন। পুজোর আগের দিন বাড়ির সদস্যরা গঙ্গার ঘাটে স্নান করে এসে পুজোর আয়োজন করতে থাকেন।

আরও পড়ুন: শান্তিপুরের প্রথম বারোয়ারি ডাকাত কালী পূজা

ঘোষ বাড়ির প্রবীণ সদস্যা আরতি ঘোষের কথায়, ঘোষ পরিবারের এক পূর্বপুরুষ মা কালীর কাছে স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুজো শুরু করেছিলেন। বিগত তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে সেই পুজো চলে আসছে। এই পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় কালীপুজোর একসপ্তাহ আগে থেকে। বাড়ির সদস্যরা মিলে একসঙ্গে মণ্ডপ বাঁধা থেকে শুরু করে প্রতিমা আনা, পুরোটাই অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে করেন। পঞ্জিকা মেনেই পুজো শুরু থেকে বিসর্জন অবধি হয়ে থাকে। প্রতিমা বিসর্জন করা হয় আলম বাজার গঙ্গার ঘাটে। দিনের পর দিন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হয়ে চলেছে। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন। কিন্তু তারপরেও ঐতিহ্য বজায় রেখে বিগত তিনশো বছর ধরে এক ভাবে পুজো হয়ে চলেছে। ফলে পুজোর বাজেট‌ও দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিবারের সদস্য অভিজিৎ ঘোষের কথায়, “এ বছর একটা পারিবারিক দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে কিন্তু তারপরেও আমরা পুজো বন্ধ করিনি। নিয়ম মেনে সাবেকিয়ানা বজায় রেখে আমরা বিগত বছরের মতো এবছর পুজো করছি।” বিগত তিনশো বছরে একবারের জন্য পুজো বন্ধ হয়নি। পরিবারের সদস্যরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের বাড়িতে স্বয়ং মা কালী অধিষ্ঠান করেন, তাই যাই হোক না কেন পুজো নিয়ম মেনে হবে।

আরও পড়ুন: মালঞ্চের ৩০০ বছরের দক্ষিণা কালীর টেরাকোটার মন্দির এখন বয়সের ভারে জীর্ণ

ঘোষবাড়ির পুজোর পুরোহিত আসেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলা থেকে। তিনি এই বাড়ির কুল পুরোহিত। বাড়ির সদস্যরা তাঁর থেকে দীক্ষা নিয়েছেন। এই বাড়ির পুজোর আর একটি বৈশিষ্ট্য হল পুজোর ভোগ। পুজোর পর এই ভোগ সবাইকে বিলি করা হয়। ঠাকুরের ভোগও কোনও বছর বন্ধ হয়না। এবছর‌ও ভোগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে বাড়ির সদস্য অভিষেক ঘোষ জানিয়েছেন। পুজোর দিন সকালে প্রতিমাকে সোনার গয়না পরিয়ে সাজানো হয়। এই গয়না আবার বিসর্জনের দিন সন্ধ্যায় প্রতিমা থেকে খুলে রাখা হয়। বাড়ির সদস্য অরিন্দম ঘোষের কথায়, বিসর্জনের দিন বাড়ির সকল সদস্য মিলে সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। তারপর সবাই একসঙ্গে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য র‌ওনা হন। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতেও সাবেকিয়ানা ও ঐতিহ্য বজায় রেখে করোনাবিধি মেনে পুজো করতে বদ্ধপরিকর বনহুগলির ঘোষ পরিবার।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *