তিরিশ বছর পরে: সেদিনের সেই অভিশপ্ত রাত

শুভ্রাংশু রায়

‘ইতালিয়া ৯০’-এর সৌজন্যে আমাদের সামনে টিভি এবং পত্রপত্রিকাগুলি অনেক বেশি রঙিন হতে শুরু করেছিল ততদিনে। ততদিনে আমারও ক্লাস এইটের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামের স্কুলে সিনিয়রদের মধ্যে নাম লেখানো হয়ে গেছে। পারিবারিক পরিবেশ এবং স্বভাবদোষে দেশ রাজনীতির খবরাখবর নিয়ে আগ্রহ ছিল কিঞ্চিৎ বেশি। খবর শুধু রাখতেই অবশ্য সীমাবদ্ধ থাকার বান্দা আমি ছিলাম না। পাড়ায়, পরিচিত সামান্য বড় বা কিছু ক্ষেত্রে বড়দের সঙ্গে সুযোগ পেলেই দেশ-বিদেশের ঘটনা নিয়ে নিজ মতামত ব্যক্ত করতাম বেশ উৎসাহ সহকারে।

আরও পড়ুন: বন্যালাগা গাঁয়ে…

তাতে বেশ কিছুজন আমায় ডেঁপো ছেলে মনে করলেও ওইসবের ধার ধারতাম না। আমার ছাত্রজীবনে প্রথম অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ভি পি সিং। তবে কিছুকাল পরেই তাঁর মন্ত্রিসভার পতন ঘটে এবং ৬৪ জন বিদ্রোহী সাংসদের সমর্থন  নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন বালিয়া থেকে নির্বাচিত সমাজবাদী নেতা চন্দ্রশেখর। মাত্র ৬৪ জন সাংসদ নিয়ে চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন কারণ তাঁকে সমর্থন করেছিলেন রাজীব গান্ধি এবং তাঁর দল কংগ্রেস।

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

রাজীব গান্ধিকে প্রথম পাশের বাড়িতে টিভির পর্দায় প্রথম দেখেছিলাম ইন্দিরা গান্ধির শেষ যাত্রার লাইভ সম্প্রসারণের সময়। ম্লান মুখের যুবক রাজীব গান্ধিকে সেই প্রথম দেখা। তারপর তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। কিছুদিন পর বোফর্স বিতর্ক উঠল। ’৮৭-তে অমিতাভ বচ্চনের পদত্যাগের পরে  ইলাহাবাদ উপনির্বাচনে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের জয়লাভ এবং তারপরই ১৯৮৯ নির্বাচন। সেই লোকসভা নির্বাচনে একদিকে বাম অন্যদিকে বিজেপি উভয়ের বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে দীর্ঘদিন পরে কেন্দ্রে অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ। এই সব ঘটনা যেন অতি দ্রুত ঘটে যাচ্ছিল। আমার জীবনে সেই সময় ছিল স্কুল ইউনিফর্মে হাফ প্যান্ট থেকে ফুল প্যান্ট পড়ার সময়। ১৯৮৯ নির্বাচনে সবথেকে বেশি চর্চিত শ্লোগান ছিল ‘গলি গলি মে শোর হ্যায় রাজীব গান্ধি চোর হ্যায়’। মনে পড়ে গ্রামবাংলায় এই হিন্দি শ্লোগান বাংলা হরফে লিখে কাঁচা পাকা বাড়ির দেওয়াল ভর্তি করে ফেলা হয়েছিল বামফ্রন্টের তরফে।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (২য় অংশ)

সঙ্গে ছিল নানা ধরনের কার্টুন। মনে পড়ে এক সিনিয়র বাম যুব নেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম রাজীব গান্ধি কেন চুরি করবেন। উত্তর ছিল ‘উনি চুরি করেননি ঘুস খেয়েছেন।’ বেশ অবাকই হয়েছিলাম। উনি কীভাবে কবে ঘুস খেতে গিয়ে ধরা পড়লেন যখন জানতে চেয়েছিলাম, বাম নেতা কর্মীদের কাছে কী রকম সব ধোঁয়াশা ঘেরা উত্তর পেয়েছিলাম সব। তারমধ্যে একটি নমুনা দিই ‘রাজীব গান্ধি ঠিক নয় ওনার শ্বাশুড়ি টাকা নিয়েছে বফর্স কোম্পানি থেকে’। এই বিতর্ক কালের নিয়মে বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু গ্রামের মিছিল থেকে বড় পর্দায় কেষ্ট মুখার্জি টাইপের হিন্দি উচ্চারণে রাজীব গান্ধিকে ‘চোর’ বলা শ্লোগান কিন্তু ভালো লাগেনি।

আরও পড়ুন: শম্ভু মিত্র: বাঙালির অহংকার

আর. কে. লক্ষ্মণের আঁকা কার্টুন

‘রাজীব গান্ধির মতো সুন্দর দেখতে ফর্সা চেহারার মানুষ কিছুতেই ঘুস খেতে পারেন না’— এটাই ছিল সহপাঠিনী ফেরদৌসীর ক্লাসে মন্তব্য। ঠিক ভুল বুঝিনি সত্য, কিন্তু ব্যক্তি আক্রমণের যে নমুনা সেদিন বামপন্থী দলগুলির তরফে রাখা হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ পরিণাম বাংলার রাজনীতির পক্ষে সুখকর হয়নি। ১৯৮৯ রাজীব গান্ধি হারলেন। কিছুদিন প্রধানমন্ত্রিত্ব চলানোর পরে ভি পি সিংয়ের গদি গেলেন এবং চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী হলেন।

আরও পড়ুন: বাঁক বদলকারী সাহিত্যস্রষ্টা মানিক

রাজীব গান্ধির সঙ্গে চন্দ্র শেখর

চন্দ্র শেখরকে সত্য বলতে আমার বেশ ভালোই লাগত। খোঁচা খোঁচা কাঁচা পাকা দাড়ি, জওহর কোর্ট, খাটো ধুতি এবং বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। অল্প দিনেই কেন জানি না মনে হতে লাগল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেশ মানানসই। খুব সম্ভবত তাঁর সময়ে বিশ্ব ব্যাঙ্কে ভারত সরকারকে কিছু সোনা বন্ধক রাখতে হয়েছিল আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন চালু রাখার জন্য। সোনা বন্ধক রাখা যে চরম বিপদের ইঙ্গিত, ততদিনে তা বোঝার বয়স হয়েছিল। তবু মনে হত চন্দ্র শেখর পারবেন। প্রণয় রায়ের কোনো একটা অনুষ্ঠানে তাঁর একটা ইন্টারভিউ দেখেছিলাম। সেই টিভি ইন্টারভিউতে মনের প্রত্যয় ফুটে উঠেছিল তাঁর প্রত্যেকটি কথায়। তারপর ছন্দপতন। খুব সম্ভবত ১৯৯১-র মার্চ মাসে রাজীব গান্ধি সমর্থন প্রত্যাহারের ঘোষণা করে দিলেন। সেদিনই ইস্তফা দিয়েছিলেন চন্দ্র শেখর। ফলত অকাল নির্বাচন। আর এই অকাল নির্বাচন যে রাজীব গান্ধির অকাল প্রয়াণের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা কল্পনাতেই ছিল না।

আরও পড়ুন: উনিশে মে, রক্তস্নাত মাতৃভাষা

নির্বাচন শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালের ২০ মে তারিখ থেকে। পরের পর্যায়ে দেশে ভোট ছিল ১২ জুন। যে সমস্ত রাজ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ে ভোট ছিল তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিল তামিলনাড়ু। ইতিমধ্যে খবরে  পড়েছিলাম রাজীব গান্ধির নেতৃত্বে কংগ্রেস মরিয়া প্রয়াস চালাচ্ছে ক্ষমতায় ফেরার। রাজীব গান্ধি নাকি প্রায়ই নিরাপত্তার বেড়াজাল ভেঙে মিশে যাচ্ছেন জনতার মাঝে। গিরিডির বাসিন্দা ছোটমামার মুখে শুলনাম, সেও নাকি রাজীব গান্ধির সঙ্গে বাজার করতে গিয়ে রাস্তায় করমর্দন করেছে নির্বাচনী প্রচারের সময়। মে মাস শেষ হতে তিন সপ্তাহ বাকি। হরিপালে বাড়িতে বসে ছোট মামা যখন বেশ গর্বিত মুখে রাজীব দর্শনের গল্প শোনাচ্ছিল বাবা শুধু একটা কথাই বলেছিলেন মনে পড়ে, ‘ওনার নিজের নিরাপত্তার কথাও ভাবা উচিত।’ বাবার মুখে কথাটা শুনেছিলাম, তবে কিশোর বয়সে সেটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহের শেষ দিন মামা গিরিডির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বিকেলে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসে কিছুটা মনখারাপ। রাতে তখন একটি সিরিয়াল হত। বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ‘বিবাহ অভিযান’ সেটি দেখে হাসতে হাসতে ঘুমোতে গেলাম। সেদিন ছিল ২১ মে, ১৯৯১। ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে সেই সময় ভয়ানক অঘটন ঘটে গেছে। টের পাওয়া সম্ভবও ছিল না। তখন তো খবর বলতে দূরদর্শনের নির্দিষ্ট সময়ের খবর আর রেডিয়োতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিউজ।

সকালবেলায় মায়ের ধাক্কায় ঘুম ভাঙল রেডিয়োতে চলছে সকাল ৬টা ২০ মিনিটের খবর। মা বলল, খবরে বলছে রাজীব গান্ধি নিহত। তামিলনাড়ুতে কোনো এক স্থানে (কিছুক্ষণ পরে শুনেছিলাম জায়গাটির নাম শ্রী পেরাম্বুদুর) নির্বাচনী সভায় গতকাল রাত ১০টা ১০ মিনিট নাগাদ এক আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে প্রাণ গেছে ইন্দিরা-তনয়ের। বাড়িতে গোপালদা নিয়মিত কাগজ দিত। তাও দ্রুত আরো খবর পাওয়ার জন্য কাগজ কিনতে ছুটলাম স্টেশনের দিকে।

পথে বেরিয়ে দেখি মানুষের জটলা। স্টেশনের কাছে কয়েকটি ছেলে শহিদ বেদি বানানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে। গিয়ে দেখি ‘স্টেটসম্যান’ খুব বড় খবর করেছে। ২২ মে কি উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে দিন কেটেছিল তার ব্যাখ্যা মেলা ভার। তারপর পরের কয়েকদিন শুধু সেদিনের ঘটনার খবরই পড়েছিলাম। আজ তিরিশ বছর পেরিয়ে এলাম। তিরিশ বছর বা তিন দশক। সময়টা নেহাত কম নয়। স্বভাবতই দেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। রাজীব গান্ধি হত্যার পরের দিন ঘটনার তদন্তভার তৎকালীন দেশের প্রধানমন্ত্রী চন্দ্র শেখর তুলে দেন সিবিআইয়ের হাতে। তখন সিবিআইয়ের জনতার চোখে একটা অন্য মানদণ্ড ছিল। জনতা প্রায় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মর্যাদা দিত কেন্দ্রীয় এই তদন্ত সংস্থাকে। যে সতেরো বছর বয়সি মহিলার আত্মঘাতী বিস্ফোরণের কারণে রাজীব গান্ধির প্রাণ যায়, সেই ধানুর বাবা নাকি ছিলেন স্বাধীন তামিল ইলমের অন্যতম আদি প্রবক্তা। সিবিআইয়ের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম ঘটনার তদন্ত করেছিল। পরে আদালতে চার্জশিট পেশ করার পরেও সব ধোঁয়াশা কাটেনি এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে। শোনা যায়, জাফনার ঘন জঙ্গলে ১৯৯০-এর মাঝামাঝি সময় প্রভাকরণ এক গোপন মিটিংয়ে রাজীব গান্ধিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন কয়েকজন সহচরকে সঙ্গে নিয়ে। কারণ প্রভাকরণদের আশঙ্কা ছিল রাজীব গান্ধি ক্ষমতায় ফিরে আসতে চলেছেন এবং সেক্ষেত্রে ভারত আবার শ্রীলঙ্কায় পিস কিপিং ফোর্স পাঠাতে পারে, যা তামিল টাইগারদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। অতএব রাজীব খতমের সিদ্ধান্ত এবং তার কার্যকর ২১ মে তারিখে। দেশজুড়ে তখন দশম লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়ে গেছে।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

8 comments

  • দারুণ লিখেছেন স্যার । এরম সহজ ভাষায় এত সুন্দর ব্যাখ্যা বাস্তবে বিরল স্যার

  • Debashis Majumdar

    Ami Tokhon khub chhoto. Kichhu smriti mone achhe. Character poribesh thomthome hoye jete dechhechhilam. Article ti pore samriddha holam.

  • Debashis Majumder

    Khub chhoto chhilam sei Samay. Tao sab kichhu thomke jete dechhechhilam. Article ta pore Samriddha holam.

  • Paramita Ghosh

    আমার জন্মের ও আগের ঘটনা … তবে শুনেও শিহরণ লাগে । সত্যিই হয়তো একজনের ইতিহাস ও আপনার ছাত্রী না হলে এত কিছু জেনেও অজানা হয়ে থাকতো অনেককিছুই ….

  • ঘটনাটি জানি কিন্তু তার কারণ আজও অজানা। বর্তমান ধর্মরাজনৈতিক বেড়াজালে রহস্যময় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কালের ইতিহাসে চাপা পড়ে গেছে।
    খুব ভালো লাগলো লেখাটি ।।

  • চমৎকার স্মৃতিচারণ – পড়তে পড়তে তিরিশ বছর বড়ো জীবন্ত হয়ে উঠলো। ধন্যবাদ লেখককে ।

  • সত্যি খুব সুন্দর উপস্থাপন, তবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বামেদের যে বিরোধিতা, তা কিন্তু এখনও আছে।

  • Lekhata pore chotobelar katha mone pore gelo. Sokale ghum theke othar por parar ekjon teacher er kache prothom khoborta sunechilam.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *