এটাই পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্য

গৌতম দে

এই লেখাটা যখন লিখছি তখন আপনারা নিশ্চিত জেনে গেছেন, পশ্চিমবাংলার মানুষ কার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটাই হওয়ার কথা ছিল। তার কারণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছিল জাতপাত ও ধর্মের মেরুকরণ ততই প্রকট হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক বাতাবরণ। এটা পশ্চিমবাংলার আমজনতা মেনে নিতে পারেননি।

এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, আমার ছেলেবেলাকার কথা। আমার বেড়ে ওঠা টালিগঞ্জের হিন্দু-মুসলিম অধ্যুষিত আধা গ্রাম এবং আধা শহুরে। আমাদের বাড়িতে খেজুরগাছ কাটতে আসতেন বাদল শেখ। আমরা ‘বাদলকাকা’ বলে ডাকতাম। বাড়িতে বাবা জ্যাঠার সঙ্গে ছুটিছাটার দিনে একসঙ্গে চা খেতে দেখেছি। কোনও দিন আমাদের মনে হয়নি যে, বাদলকাকা মুসলিম। আমি যে ইস্কুলে পড়তাম, সেই ইস্কুলে অনেক মুসলিম বন্ধু ছিল আমার। এখনও আমার অনেক বন্ধু আছেন যাঁরা স্ব-স্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত। কখনও মনে হয়নি তাঁরা মুসলিম। কিংবা আমি হিন্দু। এখনও মনে হয় না। বহুবার ঈদের সময় আমি মুসলিম বন্ধুদের বাড়িতে পাত পেরে খেয়েছি। এই লেখাটা লিখতে গিয়ে বারবার আমাকে ‘মুসলিম’ শব্দটি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এটাই আমার কাছে লজ্জার। এটা কিন্তু পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতি নয়, পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্য নয়।

আরও পড়ুন: গণতন্ত্র ও আমরা

এখনও এই বাংলায় হিন্দু মসুলিম যৌথভাবে দুর্গাপুজো করেন। বিভিন্ন উৎসবে আনন্দ করেন একসঙ্গে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখেন। এই ঐতিহ্য ভাঙতে বিজেপি নামক এক সর্বভারতীয় দল উঠেপড়ে লেগেছিল। ভেবেছিল উত্তরপ্রদেশের ‘জাতপাতের তাস’ খেলে এই বাংলায় সরকার গঠন করবে। ‘সোনার বাংলা’ তৈরি করবে। সেই গুড়ে বালি ফেলে দিয়েছে এই পশ্চিমবাংলার সাধারণ মানুষ। বুঝিয়ে দিয়েছে, আমরা পরম্পরাভাবে সহাবস্থানে থাকতে ভালোবাসি। শান্তি চাই।

সাংবাদিক অজিত অনজুম ‘সোনার বাংলা’ তল্লাশ করতে গিয়ে পশ্চিমবাংলার এক কৃষককে বলেছিলেন― সোনার বাংলা গড়তে চাইছে বিজেপি, আপনি কী বলেন? উত্তরে সেই কৃষক গড়গড় করে বলেছিলেন― সেই কবে ডি এল রায় লিখে গেছেন ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা/ আমাদেরই বসুন্ধরা/ তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা…।’ সোনার বাংলার কথা রবি ঠাকুরও সেই কবে বলে গেছেন, ‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি…। সাংবাদিক তো থ। সেই কৃষককে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধি হত্যা, বাবরি মসজিদ ভাঙার পর সমগ্র দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। একের পর এক সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল দেশজুড়ে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘরদোর গেরস্থালি। সেই হত্যাযজ্ঞের আঁচ পড়েনি পশ্চিমবাংলায়। একটুও। সেইসময় সরকারে যাঁরা ছিলেন এবং কলকাতার বেশ কিছু বুদ্ধিজীবীরা আগলে রেখেছিলেন পশ্চিমবাংলার মানুষকে। পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতিকে। এটাই পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্য।

আরও পড়ুন: বাংলা নিজের মেয়েকেই চাইল, কিন্তু বাংলার মানুষও এখনও অনেক কিছু চায়

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সপার্ষদরা ডেলি প্যাসেঞ্জারের মতো এই বাংলার মাটি কামড়ে পড়ে সেই রক্তাক্ত ‘তাস’ খেলতে চেয়েছিলেন। দেশের আশু কর্তব্য, কোনটা আগে করা উচিত তা ভুলে গেছিলেন। নোটবন্দি থেকে একের পর এক জনবিরোধী কাজ করে গেছেন। মানুষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে চলেছেন দিনের পর দিন। এখনও সেই ধারা অব্যাহত। এই করোনাকালে প্রায় সমস্ত রাজ্যের মানুষ অক্সিজেনের অভাবে তড়পে তড়পে মারা যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য পরিষেবা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। পুরো দেশটাকে নরকে পরিণত করেছেন। সেই আগুনে সারাদেশ জ্বলছে। চারদিকে ‘নাই’ ‘নাই’ রব। কাজ হারানো মানুষের হাহাকার সমগ্র দেশ জুড়ে। হু-হু করে বাড়ছে চাকরিহীনতার সংখ্যা। যেসব মানুষেরা সুদের ওপর নির্ভর করে সংসার চালাতেন তাঁদের হাহাকার কানে যায়নি। সমগ্র দেশজুড়ে একটা অরাজকতার পরিবেশে লুট চলছে। মুখবুজে তা সমর্থন করে গেছেন। আপনাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুধর্মকে রক্ষা করতে হবে। তাই একটা রামমন্দির চাই। আপনারা ভুলে গেছেন, এই দেশের ধর্ম নিরপেক্ষতা। সংবিধানের নিরপেক্ষতাকে লাঞ্ছিত করে নিজেদের প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে কুক্ষিগত করতে চেয়েছেন। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। আজ মানুষ টিভি খুলতে ভয় পায়। খবরের কাগজ চোখের সামনে মেলে ধরলেই কান্না দু’চোখে নেমে আসে।

উনিশের লোকসভা নির্বাচনে বাম ভোটারদের ভোট রামে গিয়েছিল। অঙ্ক তাই বলেছিল। এবারের ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে নিশ্চিত করে বলতে পারি, সেই বাম ভোটগুলো জোড়াফুলে গেছে। তার কারণ দীর্ঘ করোনাকালে মমতাই সর্বাগ্রে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পশ্চিমবাংলার সর্বহারা মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এর আগে বহুবার দেখেছি টিভির পর্দায় তাঁর নেতৃত্বে আগুনে বিধ্বস্ত হাসপাতালে রুগিদের রেস্কিউ করতে। লকডাউনের সময় একমাত্র তাঁকেই দেখেছি রাস্তায় নামতে। এই ২০২১-এও দেখেছি কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মাত্র পাঁচ টাকায় ডাল ভাত সবজি ও একটি সেদ্ধ ডিম বিক্রি করতে। খেতেও দেখেছি বহু বহু মানুষকে। প্রত্যন্ত গ্রামে রাস্তাঘাট, পানীয় জল, মিড ডে মিল, ছোট ছোট পড়ুয়াদের ইস্কুল ইউনিফর্ম বইখাতা পেন পেনসিল থেকে শুরু করে বহু বহু প্রকল্প চালু করেছেন। মানুষের প্রাইমারি চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এইরকম ঘটনা একটা নয়, শয়ে শয়ে বলা যেতে পারে। কি করে অস্বীকার করি তা!

আমার বামপন্থী বন্ধুদের কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি ‘চটিপিসিকে সিংহাসন থেকে নামাতে হবে। একমাত্র নামাতে পারে বিজেপি।’ সেইসব বন্ধুদের বলি, মাঝেমাঝে মনে হয়, মমতা এবং মমতার দল বুঝি প্রকৃত সর্বহারার দল। নইলে এতো মানুষের জনসমর্থন পাবে কেন? কেউ কেউ হয়তো বলবেন চোরের দল। ডাকাতের দল। সব দলেই কম বেশি চোর ডাকাত আছে।

আমি অবাক হয়নি সংযুক্ত মোর্চার এই হাল দেখে। আবারও মনে পড়ে উত্তাল সত্তর দশক। একের পর এক খুন হচ্ছেন বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরা। আমার প্রতিবন্ধী ইস্কুলের মাস্টারমশাইকে কুপিয়ে খুন করা হল। চোখ বুজলেই এখনও চোখের সামনে দেখতে পাই তার হেমন্ত শার্ট পরা সাদাজামা আর ধুতি রক্তে ভিজে গেছে। নর্দমায় পড়ে আছেন। কত মানুষকে লাশ হয়ে ভাসতে দেখেছি আদিগঙ্গার জলে। রংকলের মাঠে। করুণাময়ীর ইটখোলায়। তখন বরাহনগর আর টালিগঞ্জ ছিল মুক্তাঞ্চল। ট্যাক্সিওলারা সন্ধ্যার পর গঙ্গার ওপারে যেতে ভয় পেত।

এখনও এই কলকাতা শহরে বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় অনেক শহিদবেদি আছে। খুনিরা হয়তো কেউ বেঁচে আছেন। মারাও গেছেন। বিচার হয়নি। অবশেষে সেই কংগ্রেসের হাত ধরতে হয়েছিল সিপিএমকে। এমনকী কেন্দ্রে সরকারে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হাতছাড়া হয়েছিল। ঐতিহাসিক ভুলের মাশুল সেই যে শুরু হয়েছিল, তা এখনও অব্যাহত আছে। এখন খড়কুটোর মতো ভেসে থাকার জন্য নতুন দল সেকুলার ফ্রন্টকেও পাশে নিয়েছে। এই নির্বাচনে তার প্রভাব পড়েছে। প্রকৃত বামপন্থীরা মেনে নিতে পারেনি। প্রবল প্রতাপ দলটা তাই আজ মূষিকে পরিণত হয়েছে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। এরপর হয়তো অঙ্কের বিশ্লেষণ হবে। পারসেন্টের বিচারে কতটা বাড়ল নাকি কমল। এই রক্তক্ষরণের মধ্যে কিছু তাজা রক্তেরস্রোত একটু একটু ঢুকছে সাদাচুলের সিপিএমের শরীরে। এইটুকু যা আশার আলো। হয়তো ভবিষ্যৎ বলবে সে কথা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *