একটু অন্যরকম গল্পের স্বাদ পেতে দেখতে পারেন চার পর্বের ওয়েব সিরিজ গরিবের ডার্ক ‘JL50’

অরিন্দম পাত্র

‘যখন সময় থমকে দাঁড়ায়…’ কিন্তু সময় কি সত্যিই থমকে দাঁড়াতে পারে? সময় তো বহমান নদীর স্রোতের মতো, বয়েই চলে, বয়েই চলে। কিন্তু যদি সত্যিই এরকম হত যে, সময়কে ফ্রিজ করে দেওয়া যেত? অথবা ফিরে যাওয়া যেত পুরনো সময়ে কোনওভাবে? মূলত এই বেসিক আইডিয়া অর্থাৎ টাইম ট্র‍্যাভেলকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ওয়েব সিরিজ JL50..

আরও পড়ুন: করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, এখন কেমন আছেন?

গল্পের শুরু আজকের দিনে ২০১৯ সালের প্রেক্ষাপটে, যখন এক যাত্রীবাহী বিমান AO26 হাইজ্যাক হয় কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে। হাইজ্যাকাররা যাত্রীদের প্রাণভিক্ষার পরিবর্তে তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের এক নেতা পার্থ মজুমদারের মুক্তি চায়। পাশাপাশি প্রায় একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের লাভার কাছে কোলাখাম গ্রামে পাহাড়ের খাদে আছড়ে পড়ে একটি বিমান, যার পোশাকি নাম JL50। অথচ এই বিমান নিখোঁজ হয়েছে আজ থেকে ৩৫ বছর আগেই অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে। বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে একমাত্র জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয় দু’জনকে, পাইলট বিহু ঘোষ এবং এক অধ্যাপক বিশ্বজিত চন্দ্র মিত্রকে! পর পর ঘটে যাওয়া এই ঘটনাপ্রবাহের জেরে এই টপ সিক্রেট ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব এসে পড়ে  সিবিআই অফিসার শান্তনুর হাতে। সাথি গৌরাঙ্গকে সঙ্গে নিয়ে শান্তনু শুরু করেন তদন্তের কাজ, যাতে ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন আর এক প্রৌঢ় অধ্যাপক সুব্রত দাস, যিনি এককালে সহকারী ছিলেন বিশ্বজিত চন্দ্র মিত্রের। এই রহস্যের মূল শিকড় কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত? কে এই অধ্যাপক বিশ্বজিত চন্দ্র? তাঁর সঙ্গে এই অতীতের হারিয়ে যাওয়া বিমানের যোগ কোথায়? আর কেনই বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এবিএ পার্থ মজুমদারের মুক্তির বদলে একটি প্লেন হাইজ্যাক করে বসল? মাত্র চারটে এপিসোড বা সাকুল্যে মোট ২ ঘণ্টার কিছু বেশি সময় খরচ করলে সব প্রশ্নের উত্তর পাবেন।

আরও পড়ুন: অবশেষে জামিনে মুক্ত সুশান্ত মৃত্যু রহস্যের মূল অভিযুক্ত রিয়া চক্রবর্তী

২০১৪ সালে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এক বিমান MH370 অনুরূপভাবে নিখোঁজ হয়েছিল বেজিং যাওয়ার পথে। না সেই প্লেন বা তার যাত্রীদের সৌভাগ্য হয়নি JL50-র মতো ফেরত আসার। সেই ঘটনা আর তার সঙ্গে ‘টাইম ট্র্যাভেল থিয়োরি’ মিশিয়ে লেখক-পরিচালক শৈলেন্দ্র ব্যাস তৈরি করেছেন এই চার পর্বের ওয়েব সিরিজ। গল্পটি বেশ ইউনিক, কারণ হিন্দি ছবির পর্দায় টাইম ট্র‍্যাভেল নিয়ে গুটিকয়েক হাস্যকর প্রচেষ্টা ছাড়া আর সেরকম কিছু প্রোজেক্ট কথা মাথায় আসে না। হলিউডে Back to the future থেকে শুরু করে Edge of tomorrow হয়ে Dr. Strange সহ এরকম ভূরি-ভূরি নিদর্শন পাওয়া যায়। তাই সেদিকটা মাথায় রাখলে এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সৎ ও প্রশংসনীয়। কিন্তু অল্প বাজেটে, যথাযথ গ্রাফিক্স ছাড়াই যতটা পারা যায়, ততটাই মুন্সিয়ানা দেখানোর চেষ্টা করেছেন পরিচালক ও কলাকুশলীরা। চিত্রনাট্য অত্যধিক টেনে টেনে লম্বা করা নয়।

ইদানীং ওয়েবসিরিজ দেখা বন্ধই করে দিয়েছিলাম ১০-১১ পর্বের পরেও গল্প শেষ না করার ধাক্কায়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এই সিরিজ উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। ১ আর ২ পর্ব গতিশীল। ৩-এর শুরুতে একটু স্থবিরতা এলেও শেষ পর্বে দুই টুইস্টের জোরে এ-যাত্রা মোটামুটি ভালোভাবেই পাশ করে যান পরিচালক। ক্যামেরার কাজ খুব ভালো লেগেছে, বিশেষত উত্তরবঙ্গ এবং কলকাতার চিত্রগ্রহণের দৃশ্যগুলি মনোরম। চিরচেনা লাভার মনাস্ট্রি, তার পাশের স্কুলের মাঠ, ড্রোন শটে পাহাড়িয়া জিগজ্যাগ রাস্তা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন ডি ও পি। অসীম ত্রিবেদির আবহসংগীত বেশ ভালো। উত্তরবঙ্গের রাস্তায় বাউল গানের ব্যবহার বেশ ভালো লাগে।

আরও পড়ুন: ‘BOLD’ সিনে অসম্ভব সাবলীল স্বপ্না এবার আসছে বিগ বসের ঘরে

অভিনয়ে মুখ্য তদন্তকারী অফিসার শান্তনুর চরিত্রে অভয় দেওল বেশ নিষ্প্রভ। গোটা ছবিতেই বেশ নিরুত্তাপ ও উদাসীন দেখিয়েছে তাঁকে। একমাত্র শেষ পর্বে নিজেকে নিজে অনাথ আশ্রমে ছেড়ে আসার দৃশ্যে তাঁর অভিনয় ভালো লাগে। হারিয়ে যাওয়া প্লেনের সঙ্গে ফিরে আসা অধ্যাপক বিশ্বজিত চন্দ্রের চরিত্রে পীযূষ মিশ্র স্বল্প উপস্থিতিতে অসাধারণ। তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশের দৃশ্যটিই ভয় ধরায় মনে। সুব্রত দাসের চরিত্রে আরেক বর্ষীয়ান ও দুর্ধর্ষ অভিনেতা পঙ্কজ কাপুর যথারীতি লাজবাব। তাঁর চারিত্রিক ট্রান্সফরমেশন ও অভিব্যক্তি মন কেড়ে নেয়। পাইলট বিহু ঘোষের চরিত্রে অন্যতমা প্রযোজিকা অভিনেত্রী রিতিকা আনন্দ চলনসই। বাকি অনেক ছোট ছোট রোলে বাংলার বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দেখে খুব ভালো লাগল। যেমন রাজেশ শর্মা, বরুণ চন্দ, শাশ্বতী গুহঠাকুরতা প্রমুখ। তবে বাংলার পটভূমিকায় গল্প হলেই মাঝেমধ্যে টুকটাক বাংলায় সংলাপ বলার অভ্যেসটা ত্যাগ করা উচিত আমার মতে। তাই সুব্রত দাস রূপী পঙ্কজ কাপুরের বাসের মধ্যে ভাঙা ভাঙা বাংলা বলাটা শ্রুতিসুখকর লাগে না।

কিছু লুপহোলস থেকেই যায়। যেরকম একটা হাই প্রোফাইল টপ সিক্রেট কেস হওয়া সত্ত্বেও হাসপাতালে পর্যাপ্ত পুলিশি প্রহরার অভাব। দুমদাম করে বিশ্বজিৎ চন্দ্রের পালিয়ে যাওয়া অথবা ৩৫ বছর পরে কলকাতার পাল্টে যাওয়া রাস্তাঘাট চিনে সুব্রত দাসের বাড়ি চলে আসা। কোন পুলিশ বা আর্মি সহযোগিতা ছাড়াই শান্তনুর একা প্লেন হাইজ্যাক রুখতে চলে যাওয়া, এইসব ত্রুটি-বিচ্যুতি নজর এড়ায় না।

শেষে বলব, একটু অন্যরকম গল্পের স্বাদ পেতে দেখতে পারেন এই দেশীয় কল্পবিজ্ঞান ছবি JL50 যাকে অনেকেই গরিবের ডার্ক বলে হাসাহাসি করছেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *