‘নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি’: বঙ্গে বিশ্বকর্মা

পৌষালী চক্রবর্তী

“ফুটপাথে সে ঘুমোয় যদি

কে দেয় তাকে বালিশ?

না দিক তবু কারুর কাছে

করবে না সে নালিশ।

আকাশছোঁয়া আপিসবাড়ি

তার নিচে ফুটপাথে

সেই ছেলেকেই রোজ দেখা যায়

জুতো বুরুশ হাতে

কাজ ফেলে সে দুপুরবেলা

লটকেছে এক ঘুড়ি

ঠিক যেন সেই দুষ্টু খোকা

তেমনি হুড়োহুড়ি

ফুটপাথে সে ঘুমোয় যদি

কে দেয় তাকে বালিশ

রোজ সে দেখি বলছে ডেকে

পালিশ, জুতো পালিশ”

ইস্টিশানের মিষ্টি গান শীর্ষক বইয়ের আলোচ্য ‘জুতো পালিশ’ কবিতায় কবি সরল দে জুতো পালিশ করা একটি ছেলের ফুটপাথে থাকা এবং দৈনন্দিন গ্লানির মধ্যে এক ঝলক মুক্ত বাতাসের মতো একটি ঘুড়িকে এনেছেন। আমাদের কাব্য, সাহিত্য, গানের মধ্যে যেসব শিশু কিশোর চরিত্রের অবতারণা দেখি, যাদের পেটের দায়ে, অভাবের তাড়নায় বা অন্য যেকোনও কারণে হোক কাজে নেমে পড়তে হয়েছে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই স্বপ্ন, ইচ্ছামুক্তির প্রতীক হয়ে আসছে ঘুড়ি। আমরা কবীর সুমনের গানে দেখি একটি ছেলে “বয়স বারো কি তেরো রিকশা চালাচ্ছে/ আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক ছেলেটাকে ডাকছে”। কিংবা, “যে ছেলেটা প্রাণপণে রিকশা চালাচ্ছে/ মুক্তির ঘুড়ি তাকে খবর পাঠাচ্ছে।” পড়া ফেলে, খেলা ফেলে যে শিশু বা কিশোর শ্রমিক হতে বাধ্য হয়েছে তার কাজ ভুলানিয়া, মন কেমনিয়া অবদমিত ইচ্ছের স্রোত অনেক সময়েই “আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক, মাটিতে অবজ্ঞা’।

আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ার সমসাময়িক সাহিত্যপত্র

ঘুড়ি ওড়ানো বাংলায়, ভারতের অন্যান্য প্রদেশে কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একটি জনপ্রিয় খেলা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ঘুড়ি ওড়ানো, ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা অথবা শুধু ঘুড়িকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর আয়োজন দেখা যায়। শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সের মধ্যেই ঘুড়ি ওড়ানো, ঘুড়ি কাটাকাটি করা জনপ্রিয়। সাধারণভাবে এই খেলায় ছেলেরাই বেশি সংখ্যায় অংশগ্রহণ করে। আমাদের উপরের উদাহরণ দু’টিতেও ছেলে শিশু শ্রমিকদের কাছে ঘুড়ি ধরা দিচ্ছে। হালে একটি ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনে ঠাকুমাকে তার নাতি-নাতনিদের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াতে দেখা যায়— “আমিও ছিলাম ঘুড়ির মতো উড়ে যেতাম ঠিক/ আজও বয়স আমায় পারেনি ছুঁতে, রঙিন চারিদিক”।

আরও পড়ুন: ভোজপুরি বিতর্ক: হিন্দি জাতীয়তাবাদ এবং আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

আরও মনে করা যেতে পারে সাম্প্রতিক এগারো সিনেমাটির কথা। সেখানে ঐতিহাসিক আইএফএ শিল্ডে ইস্ট ইয়র্কশায়ার ও পরাধীন ভারতের মোহনবাগানের মধ্যে ফাইনাল ম্যাচের দিনে আকাশের গায়ে ওড়া গোলসংখ্যা লেখা বিশেষ রঙের ঘুড়ি সবাইকে জানাচ্ছে ম্যাচের আপডেট। খেলোয়াড়ের ছাদে থাকা প্রণয়িনী সেই ঘুড়ি দেখে উদ্বেল হয়ে উঠছেন। বা, ‘জাপানিজ ওয়াইফ’ চলচ্চিত্রে বাঙালি শিক্ষকের জাপানি বউয়ের প্রেরিত সেইসব ঢাউস, কারুকার্য মণ্ডিত ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য…

আমার ছেলেবেলায় অবিশ্যি ঘুড়ি নিয়ে দৌড় ওই কাটা ঘুড়ি ধরা অবধিই। লাটাই নিয়ে অনেক কসরত করেও ঘুড়ি ওড়ানো সম্ভব হয়নি। আর বড় বয়সে কর্মসূত্রে ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় ভোটার তালিকায় নাম তোলার যে কাজ চলে, অর্থাৎ সামারি রিভিশন অফ ইলেক্টোরাল রোল, তার  প্রচার ও প্রসারের দিক— জনসাধারণকে অবহিত, সচেতন করার কাজ চলে তার অঙ্গ হিসাবে নির্বাচন কমিশনের লোগো এবং বার্তা সংবলিত ঘুড়ি ওড়ানোর কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা। খেলা, উৎসবের অঙ্গ ছাড়াও ঘুড়ির নানাবিধ ব্যবহার এক্ষেত্রে দেখা যায়।

বাংলায় ভাদ্র সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানোর চল আছে। এছাড়া সরস্বতী পুজোর দিনেও ঘুড়ি ওড়ানো হয়। পূর্ব,  পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে মকর সংক্রান্তিতে বড়াম দেবী পুজো ও বনদেবীর পুজো উপলক্ষে ঘুড়ি ওড়ানোর আয়োজন থাকে। শান্তিপুরে রথযাত্রায়, অক্ষয় তৃতীয়াতে বড়বাজারে ঘুড়ি ওড়ে। উত্তরবঙ্গে শীতকালেই ঘুড়ি ওড়ে। পৌষসংক্রান্তিতে বর্ধমানের ঘুড়ি উৎসব বিখ্যাত। বর্ধমানের মহারাজা মহারাজ বিজয়চাঁদ মহতাবের শুরু করা ঐতিহ্যের নিশান হিসেবে সদরঘাটের ঘুড়িমেলা আজও প্রসিদ্ধ।

আরও পড়ুন: ‘লেখকেরা বড় অভিমানী, তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ একটু বেশি প্রখর’: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা কি বিশ্বের প্রথম ইঞ্জিনিয়ারের তকমা পেতে পারেন? সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি এই চারযুগ ব্যাপ্ত রয়েছে বিশ্বকর্মার বিভিন্ন নির্মাণের অমর কথা। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দু’টি সূক্তে বিশ্বকর্মার উল্লেখ আছে। অষ্ট বসুর অষ্টম যিনি সেই প্রভাস এবং দেবগুরু বৃহস্পতির ভগ্নী যোগসিদ্ধার পুত্র হলেন বিশ্বকর্মা। ঋগ্বেদ অনুযায়ী সর্বজ্ঞ ও সর্বদর্শী বিশ্বকর্মার চক্ষু, মুখমণ্ডল, হস্ত ও পদযুগল চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত। বিশ্বকর্মার বিশ্বভুবন নির্মাণের আখ্যানবিশ্বে প্রবেশ করলে দেখা যায় সত্যযুগে বিশ্বকর্মা-নির্মিত স্বর্গলোক থেকে মর্তলোক শাসন করতেন দেবরাজ ইন্দ্র। ত্রেতা যুগে পার্বতীর সঙ্গে বিবাহের পর মহাদেবের ইচ্ছানুসারে সোনার প্রাসাদ নির্মাণ করেন বিশ্বকর্মা। গৃহপ্রবেশের পুজোয় আমন্ত্রিত রাবণ রাজা দক্ষিণা স্বরূপ সেটি মহাদেবের থেকে লাভ করলে স্বর্ণলঙ্কা রাবণের রাজধানী হয়ে ওঠে। এছাড়াও রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডে বিশ্বকর্মার স্থাপত্যকীর্তির যে পরিচয় পাওয়া যায় সেগুলি হল কুঞ্জর পর্বতস্থিত ঋষি অগস্ত্যের ভবন, কৈলাস পর্বতস্থিত কুবেরের অলকাপুরী। প্রজাপতি ব্রহ্মার জন্য বিশ্বকর্মা সুসজ্জিত পুষ্পক রথ নির্মাণ করেন। ব্রহ্মার কাছ থেকে কুবের সেটি পান। তারপর পুষ্পক রথ রাবণের অধিকারে আসে। দ্বাপরযুগে বিশ্বকর্মার অমরকীর্তি হল শ্রীকৃষ্ণের কর্মভূমি ও রাজধানী দ্বারকা নির্মাণ। কথিত আছে হস্তিনাপুর ও পাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বকর্মা। দেবতাদের অস্ত্র নির্মাণও বিশ্বকর্মার কীর্তি— বিষ্ণুর সুদর্শনচক্র, শিবের ত্রিশূল, ইন্দ্রের বজ্র, কার্তিকের শক্তি প্রভৃতি। পুরাণকথিত চারটি উপবেদের মধ্যে অন্যতম বাস্তুবিদ্যার রচয়িতা বিশ্বকর্মা।

আরও পড়ুন: অক্সিজেন সংবেদন

এই মহাকাব্যিক ও পৌরাণিক জগৎ ছেড়ে আমাদের আশপাশের বাস্তবতায় সন্ধান করলে দেখা যায় বাংলা, বিহার, ওড়িশা, অন্ধ্র, উত্তরপ্রদেশে ‘বিশ্বকর্মা’ নামক গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়। ইলোরায় বিশ্বকর্মা নামে একটি গুহা আছে, যার মূল হচ্ছেন বুদ্ধ— একই বুদ্ধমূর্তি শিক্ষামুদ্রায় পাশাপাশি বসে আছেন সারিবদ্ধ হয়ে। স্থাপত্য শিল্পকলার কথা বললে মহাভারত থেকে উঠে আসেন ময়দানব, খাণ্ডবদহনের পর যিনি খাণ্ডবপ্রস্থে অনুপম প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। প্রসঙ্গত বীরভূমের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের কর্মকার গোষ্ঠী প্রাতে যন্ত্রপুজো করে দিন শুরু করেন। তাঁরা নিজেদের উৎপত্তি মায়ার থেকে বলে দাবি করেন।

ভাদ্রের শেষদিনে বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে সঙ্গে অনেক জায়গাতেই মনসাপুজো, অরন্ধন পালিত হয়। এইদিন ইঞ্জিনিয়ার, কারিগর, গাড়িচালক, শ্রমিকদের কাছে এক বিশেষ দিন। স্বর্ণকার, কর্মকার, মৃৎশিল্পী, স্থাপত্যশিল্পী নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত যেকোনও ব্যক্তিই কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য, যন্ত্রপাতি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার বাসনায় বিশ্বকর্মার আরাধনা করেন— যেখানে যন্ত্র, কারিগরির অধিষ্ঠান সেখানেই বিশ্বকর্মা। মনে আসেন ‘আমি’ কবিতার রবীন্দ্রনাথ— ‘মানুষের অহংকার পটেই বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প’।

আরও পড়ুন: দিনরাত্রির কাব্য

বহুকাল থেকেই বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন আছে। হয়তো বিশ্বকর্মার পুষ্পক রথ এবং দেবতাদের জন্য উড়ন্ত বায়ুযান নির্মাণকে স্মরণ করে এই ঘুড়ি ওড়ানো। এদেশের মহাকাব্য, পুরাণের বিভিন্ন গল্পে বায়ুর থেকে ভারী বস্তুর আকাশমার্গে চলাচলের প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। পুষ্পকরথ তো তার বড় উদাহরণ। এছাড়া গন্ধমাদন নিয়ে হনুমানের আকাশপথে পৌঁছন, লাফিয়ে সাগর অতিক্রম করা, দেবতাদের আকাশপথে স্বর্গ-মর্তে যাতায়াতের অজস্র নিদর্শন দেখা যায়। সেসব ছাড়িয়ে এসে যদি ঘুড়ির ইতিহাসের দিকে একটু দেখা যায়, তবে চিনের আকাশে সর্বপ্রথম ঘুড়ি ওড়ে এই মতই সর্বজনগ্রাহ্য। বৃক্ষ-উপাসনার জন্য জড়ো হওয়া মানুষ গাছের পাতা উড়ে যাওয়া দেখেই নাকি প্রাচীনকালে ঘুড়ি ওড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। আরেক মতে, রোদবৃষ্টি থেকে বাঁচতে মাথায় পরা বাঁশের টুপির উড়ে যাওয়া দেখে ঘুড়ির কল্পনা আসে। চৈনিক সেনাধ্যক্ষ হান সিন যুদ্ধক্ষেত্রে রাত্রিবেলা লণ্ঠন লাগানো ঘুড়ি উড়িয়ে শত্রুসৈন্যকে ছত্রভঙ্গ করেন। যাই হোক, চিন দেশে শুরু হওয়া ঘুড়ি ওড়ানোর ধারা ধীরে ধীরে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে যায়। বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের হাত ধরে ঘুড়ি পৌঁছে যায় জাপানে। জাপানি লোককথায় আছে নারা সাম্রাজ্যের রাজধানী নাগোয়া দুর্গের সোনাদানা চুরি করার কাজে ঘুড়ির ব্যবহার হয়েছিল। প্রাচীন কোরিয়াতেও কৃষক বিদ্রোহ দমনকল্পে ঘুড়িতে গোলা বারুদ বেঁধে আগুন লাগানোর কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল। মজার কথা, মালয়েশিয়াতে যুদ্ধকালীন কৌশলের অঙ্গ হিসাবে ঘুড়িতে তির ব্যবহারে পরাস্ত হন ঘুড়িকে যুদ্ধক্রিয়ায় ব্যবহারকারী চৈনিকরাই। অনেকের মতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাধ্যমে ভারত-চিন আদানপ্রদানের কালে ভারতে ঘুড়ির প্রচলন হয়। দ্বাদশ শতকে নামদেবের লেখায় ঘুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সময়ে ঘুড়ি রাজারাজরার বিনোদন থেকে জনসাধারণের হাতে পৌঁছয়। পশ্চিমি দেশে সমুদ্র তীর বরাবর ঘুড়ি ওড়ানোর নানা ধরনের খেলা হয়।

আরও পড়ুন: পঞ্চাশটি ঝুরোগল্পের ডালি ‘তরুণিমার কোনও অসুখ নেই’

ঘুড়ি ওড়ানো। শিল্পী: সুজুকি হারুনোবু, ১৭৬৬ (মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট)

আমাদের দেশে অহরহ যে ঘুড়ি দেখা যায়, তার পোশাকি নাম ইন্ডিয়ান ফাইটার কাইট। চারকোণা কাগজের মাঝখানে থাকে শির কাঠি বা ঢাড্ডার কাঠি। এর উপর বৃত্তচাপের আকারে লাগানো থাকে পেটের কাঠি। পেটের কাঠির দুই প্রান্ত ঘুড়ির কাগজের ছাউনির দু’প্রান্তে আটকানো থাকে। ক্ষিপ্র গতি ও দ্রুত বাঁক নেওয়ার ক্ষমতা বিশিষ্ট এই হল আমাদের যুদ্ধবাজ ঘুড়ি। উত্তর ভারতে এমন যুদ্ধবাজ ‘পুরুষ’ গোত্রীয় ঘুড়ি হল গুড্ডা। আর পাতলা কাগজের লেজবিশিষ্ট স্ত্রী ঘুড়ি হল গুড্ডি। পঞ্জাবে মকর সংক্রান্তির দিন তুক্কল ঘুড়ি ওড়ানো হয়। পাকিস্তান-পঞ্জাবেও তুক্কলের প্রভূত জনপ্রিয়তা। রাত্রিকালে তুক্কলে করে প্রদীপ ওড়ানো হয়। এই ঢাউস তুক্কল ঘুড়ি দুই বাংলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এসে হয়েছে ঢাপবোস। গুজরাতে মকর সংক্রান্তির দিন ওড়ে বাবলা ঘুড়ি। সুদূর দক্ষিণের তামিলনাড়ুতে কখনও শ্রীরাম, কখনও ভীষণাকার যক্ষের প্রতিরূপের আদলে ঘুড়ি তৈরি হয়। নেপালে ঘুড়ি কাটাকাটির খেলাকে বলে চিট। আমাদের কোচবিহারে বানানো হয় সাপঘুড়ি। গ্রাম বাংলায় চিলা ঘুড়ি, ফেচকা ঘুড়ি, কৈরা ঘুড়ি ইত্যাদি বিভিন্ন নামের নানাবিধ গঠন ও আকৃতির ঘুড়ি দেখা যায়। এছাড়া পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি আরও বিভিন্ন রকম ঘুড়ি হয়। কলকাতার বাবু সংস্কৃতিতেও ঘুড়ি লড়াইয়ের প্রচলন ছিল। অবশ্য বেশি কসরত তাঁরা করতেন না। লোকলস্কর থাকত। তারাই বাবুদের হয়ে খাটত। হাত কাটার ভয়ে বাবুরা মাঞ্জাবিহীন সুতো ধরে থাকতেন। ঘুড়ির লেজ বানানো হত টাকার নোট দিয়ে। ধীরে ধীরে তা কলকাতা ছাড়াও অন্যান্য অঞ্চলের জমিদার, রাজবংশের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল কাইট অ্যাসোসিয়েশন। পরে ওস্তাদ ঘুড়িয়ালদের নিয়ে কলকাতায় আরও কাইট ক্লাব তৈরি হয়।

জন বেটের গ্রন্থ ‘দ্য মিস্ট্রিজ অফ নেচার অ্যান্ড আর্ট’ (১৬৩৫) থেকে একটি ঘুড়ির উডকাট প্রিন্ট

ঘুড়ি কাটাকাটির খেলার জন্য সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া অপরিহার্য। মাঞ্জা বা ডোর এ কাচগুঁড়ো, ব্লেডের গুঁড়ো, ভাতের মাড়, অ্যারারুট ইত্যাদি মেশানো হয়। কিছুদিন আগেও রাতজেগে মাঞ্জা দেওয়া পাড়ার ছেলেপুলেদের উৎসবের মতো ছিল। এখন অনেকটাই কমে গেছে।

ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কাইট ফেস্টিভ্যাল বিখ্যাত। বিশ্বকর্মা পুজোয় হইহই করে মাঠে, ছাদে ঘুড়ির লড়াইয়ে আকাশ রঙিন হয়ে যায় ‘নীল আকাশে লাল ঘুড়ি’র সমাবেশে। আর কী বার্তা দেয় ‘নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি’? দেখা যাক কবির বয়ানে—

‘বুকে হেঁটে কার্নিশ হয়েছো পার—

এখন আকাশে

কীভাবে উঠবে তুমি তেমন জানো না।

আমার আঙুলে যদি জাদু থাকে

আমার আঙুলে

যদি সুতো চালাবার কুশলতা থাকে

তাহলে তোমাকে আমি এক পলকের মধ্যে আড়ালে পাঠাবো

তুমি জেট অপ্সরীর মতো উড়ে যাবে সঠিক প্রবাসে…

আমি কব্জিভরে কোনো লাটাই টাঙিয়ে

তোমার উত্থান-টানে গা ভাসিয়ে দেব’

(প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত)

‘মাটিতে অবজ্ঞা’র সংসারযাপন থেকে ‘মাটি পৃথিবীর টান’ এড়িয়ে অনন্ত নীলে উড়ে যাওয়া ঘুড়ি যেন সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনের অপূর্ণ ইচ্ছের কথাই বলে…

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *