আজ রাজস্থানে ‘মহাসানান’, করোনার কারণে এ-বছর বাতিল পুষ্কর মেলা

শুভদীপ সিনহা

সকল তীর্থের অন্যতম হিন্দুতীর্থ পুষ্কর। শাস্ত্রমতেও পবিত্রতম তীর্থ হল তীর্থপিতা পুষ্কর। পদ্মপুরাণ মতে, কলির প্রভাব থেকে জগৎ রক্ষার জন্য স্বর্গের পবিত্র পুষ্করকে মর্ত্যে পাঠাবার মানসে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে পদ্ম ছোড়েন ব্রহ্মা। উদ্দেশ্য, পৃথিবীতে কলির প্রভাব মুক্ত স্থানের সন্ধান করা। পৃথিবী পরিভ্রমণকালে পুষ্করে একে একে পুষ্করে ৩টি জায়গা স্পর্শ করে পদ্ম। ওই তিনটি স্থান থেকেই বেরিয়ে আসে জল, রূপ নেয় সরোবরের। এগুলি হল— ব্রহ্ম পুষ্কর, মধ্যম বা বিষ্ণু পুষ্কর এবং কনিষ্ঠ বা রুদ্র পুষ্কর। মনস্কামনা পূরণ হতে ব্রহ্মার সাধ জাগে একবার এখানে যজ্ঞ করার। কথিত আছে, ৩৩ কোটি দেব-দেবী নিয়ে স্বর্গ থেকে ব্রহ্মা এখানে আসেন যজ্ঞ করতে। যজ্ঞের বিধি হল স্ত্রীসহ যজ্ঞ করার। স্বর্গের সব দেবী এলেও ব্রহ্মাপত্নী সাবিত্রী কিন্তু সময়ে যজ্ঞস্থলে আসতে পারলেন না। পুত্র নারদের পরামর্শ মেনে বেদমাতা গায়ত্রীদেবীকে গান্ধর্বমতে বিবাহ করে কনিষ্ঠ পুষ্করে যজ্ঞে বসেন ব্রহ্মা। কিন্তু এই সময় সাবিত্রী উপস্থিত হন যজ্ঞস্থলে। সবকিছু দেখে শুনে ক্ষুব্ধ, অপমানিত দেবী সাবিত্রী রোষানলে অভিশাপ দেন ব্রহ্মাকে— পুষ্কর ছাড়া আর কোথাও ব্রহ্মা নিত্যপূজিত হবেন না। বিবাহে মদত দেওয়ার জন্য অন্যান্য দেবদেবীও শাপান্ত হলেন। শোকে-দুঃখে পাহাড় চূড়ায় আশ্রয় নেন দেবী সাবিত্রী। সেখানে গড়ে উঠেছে সাবিত্রী মন্দির।

আরও পড়ুন: অমিত শাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল কৃষক সংগঠনগুলি

ভারতের একমাত্র ব্রহ্মা মন্দির। ফাইল চিত্র

এরপর কেটে যায় বহু বছর। আনুমানিক ৯ম শতকে রাজা নরহর রাও মৃগয়ায় বেরিয়ে আসেন পুষ্করে। রাজা বহুদিন হাতে শ্বেতকুষ্ঠ নিয়ে কষ্ট পাচ্ছিলেন। সরোবরের জলে হাত দিতেই রাজার শ্বেতি মিলিয়ে যেতে তিনি বিমূঢ় হয়ে যান। সেই থেকে প্রচারের পাদপ্রদীপে আসে পুষ্কর। ১৫টি উল্লেখ্যযোগ্য ঘাট থাকলেও বৃষ্টির জলে পুষ্ট এই সরোবরে মোট ৫২টি ঘাট আচে। কিংবদন্তি আছে, চার ধাম— বদ্রীনাথ, জগন্নাথ, দ্বারকা ও রামেশ্বরামের জলে পূত পুষ্কর তীর্থ। পুষ্কর স্নানে চারধামের দর্শনের পুণ্য হয়। এখানকার গৌঘাট, বরাহঘাট, রাজঘাট, স্বরূপঘাট, পঞ্চবীর ঘাটের অপরিসীম মাহাত্ম্য আছ। ব্রহ্মার যজ্ঞ তিথি ধরে কার্তিক মাসের শুক্লা একাদশী থেকে কৃষ্ণা প্রতিপদে লক্ষ লক্ষ যাত্রীর সমাবেশ হয় পুণ্যস্নানের জন্য। কথিত, এখানে স্নানে সব পাপ ধুয়ে গিয়ে মোক্ষলাভ হয়। এখানকার নাগকুণ্ড ঘাট স্নানে সন্তান লাভ, রূপতীর্থ ঘাটে রূপ বৃদ্ধি, কপিল কুণ্ডে দুরারোগ্য ব্যধির উপশম, মৃকুণ্ড মুনি ঘাটে জ্ঞানলাভ হয়। ব্রহ্মার যজ্ঞস্থানের স্মারক রূপে ছত্রী নির্মিত হয় ১৭৯১ সালে। শিবমন্দিরও আছে।

আরও পড়ুন: ভরতপুর-ধোলপুর জাট সংরক্ষণ: করোনার কারণে জাট মহাপঞ্চায়েতকে ৫ দিনের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত

পুষ্কর মেলা: বিশ্বের বৃহত্তম উটের মেলা। ফাইল চিত্র

তবে পুষ্করের মূল আকর্ষণ হল কুণ্ডের পশ্চিমে ব্রহ্মাঘাটে ভারতের প্রাচীনতম ব্রহ্মা মন্দির। বিরাট তোরণদ্বার, তোরণদ্বারে ব্রহ্মার বাহন হংস। ৪৩ ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে দ্বার পেরোতেই মূল মন্দির চত্বর। কেন্দ্রস্থলে জগৎপিতা ব্রহ্মা মন্দির। শ্বেতমর্মরের মন্দিরে লাল মোচার মতো চূড়া। গর্ভমন্দিরে রুপোর আসনে শ্বেতমর্মরে স্থূলকায়, রুপোর মুকুট শিরে নিয়ে রক্তবর্ণ চতুরানন হংসবাহন ব্রহ্মার মন্দির। বামে দেবী গায়ত্রী। কচ্ছপের প্রতিমূর্তি মূর্ত চত্বর জুড়ে নিজের নিজের মন্দিরে আছেন পাতালেশ্বর মহাদেব, নারদ, গণেশ, হস্তীপৃষ্ঠে ধনপতি কুবের, পঞ্চমুখী মহাদেব, সুর্যদেব, সপ্তর্ষি, সিংহবাহিনী অম্বা। সবারই মূর্তি শ্বেত মর্মর পাথরে তৈরি। বারবার কালের নিয়মে আর বিদেশি আক্রমণে বিনষ্ট হলেও শেষ আঘাত হানেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব। আবার ১৭১৯-এ মন্দির নির্মিত হলেও সেটি আবার বিনষ্ট হলে বর্তমান মন্দির করে দেন গোকুলচন্দ্র পারেখ ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকায় ১৮০৯ সালে।

২০১৬-র মেলা। ফাইল চিত্র

কার্তিক পূর্ণিমার মহাযোগে পুণ্যস্থানের ধুম পড়ে যায় পুষ্করে। সরকারি ব্যবস্থায় ১০ দিনের মেলা অনুষ্ঠিত হয় পুষ্করে। এরই নাম পুষ্কর মেলা বা ক্যামেল ফেয়ার। অনেক দূর থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন আঞ্চলিক বেশভূষায় ভূষিত হয়ে। গবাদি পশুর বেচাকেনা হয়। এছাড়াও পাওয়া যায় এনামেল করা নানা পণ্যসম্ভার, এম্ব্রয়ডরির করা সাজসজ্জা, উটের চামড়ার নানা দ্রব্য, গৃহস্থালির নানা দ্রব্য। আসর বসে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। নানা লোকনৃত্যেরও আসর বসে। উট আর ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা বসে। কথিত আছে, এই মেলার সূচনা করেন জাহাঙ্গির। 

উট আর ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা। ফাইল চিত্র

কার্তিক মাসের পূর্ণিমা দিবস উপলক্ষে আজ, সোমবার পুষ্কর সরোবরে একটি ‘মহাসানান’ হবে। এর মধ্য দিয়ে ছয় দিনের পঞ্চতীর্থ স্নান (ধর্মীয় মেলা) শেষ হবে। প্রতিবছর পূর্ণ চাঁদের অনুষ্ঠানে তিন লক্ষেরও বেশি ভক্ত পুষ্কর সরোবরে আসেন। তবে করোনার কারণে এ-বছর ভিন্ন চিত্র। সেখানকার রাজ্য সরকার পুষ্কর মেলা বাতিল করে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, প্রতি বছরের তুলনায় এবার ভক্তদের আগমন অনেক কম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও পুলিশ ও প্রশাসন পুরোপুরি প্রস্তুত। মহাসানান চলাকালীন করোনার সংক্রমণ রোধ এবং কোভিড বিধি মেনে চলার জন্য প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। সোমবার আলসুবাহ ব্রহ্মা মুহুর্তায় মহাসানান হবে।

হিন্দু তীর্থযাত্রীরা শাহী স্নানের জন্য পুষ্কর মেলায় উপস্থিত (২০১৭)। ফাইল চিত্র

ছয় দিবসীয় পঞ্চতীর্থ স্নানে রবিবার ব্রহ্মা চৌদাসে স্নানানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বিপুল সংখ্যক ভক্ত ব্রহ্মা ঘাট সরোবরে গতকাল স্নান করে ব্রহ্মা মন্দিরে গিয়ে পুণ্যার্জন করেছিলেন। গত চার দিনের তুলনায় রবিবার জনসমাগম বেশি ছিল। দিনভর ঘাট, বাজার ও মন্দিরে প্রচুর তৎপরতাও লক্ষ করা গিয়েছে। এ-কারণে আজ, সোমবার মহাসাননের জন্য বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রী আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সতর্কতা হিসাবে পুলিশ প্রশাসন শহরে প্রবেশের ঘাট, মন্দির, বাজার, প্রবেশপথে মোতায়েন করা রক্ষীদের সতর্ক করে দিয়েছে। করোনার সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসন ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। পৌরসভা থেকে ঘোষণা করে লোকজনকে বলা হচ্ছে যে, করোনার সংক্রমণের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাবের কারণে এবার পুষ্কর মেলা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি ভক্তদের অনাবশ্যকভাবে ভিড় জমা না করার এবং করোনার গাইড লাইন অনুসরণ না করার জন্যও আবেদন করা হচ্ছে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *